মূল পাতা / ফিচার / স্পেসিফিক ফোবিয়া: এ্যারোপ্লেন, লিফট, উচ্চতা, রক্ত ইত্যাদি বিষয়ে আপনার কি অহেতুক ভীতি রয়েছে?

স্পেসিফিক ফোবিয়া: এ্যারোপ্লেন, লিফট, উচ্চতা, রক্ত ইত্যাদি বিষয়ে আপনার কি অহেতুক ভীতি রয়েছে?

মানুষ মাত্রই ভয় পায়। ভয়ের সময় মনের ভিতর আলোড়ন তৈরি হয় যা বাইরে থেকেও বুঝতে পারা যায় । যাকে আমরা আবেগ বলি। ভয়ের বিষয়টিকে যৌক্তিক বা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ধরা হয়। অন্য দিকে স্পেসিফিক ফোবিয়া বা অহেতুক ভীতি/ভয় হয় অযৌক্তিক ভাবে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা যদি ভয়ের আশংকা করে অথবা ভীতিকর বস্তু বা পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় তখন শরীরে একটা আন্দোলিত অবস্থা অনুভব করে। অনেকে কোনো প্রাকৃতিক পরিবেশ পরিস্থিতিতে ভয় পায় এবং অনেকের প্রাণী ভীতি থাকে। এসবের ক্ষেত্রে আমাদের মস্তিষ্কের সিমপ্যাথিটিক নার্ভাস সিস্টেম এর মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। আবার যারা রক্ত ইনজেকশনের মত বিষয়ের ক্ষেত্রে ভয় পায় তাদের ভ্যাসোভেগাল ফেন্টিং বা প্রায় মুর্চ্ছা যাওয়ার মত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এক্ষেত্রে প্রথম দিকে হৃদপিন্ডের গতি এবং রক্তচাপ বৃদ্ধি করে এবং পরবর্তীতে হৃদস্পন্দন এবং রক্তচাপ কমিয়ে ফেলে। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন প্রকাশিত ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড এস্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল ফর সেন্ট্রাল ডিজঅর্ডার (ডি এস এম-৫)-এ স্পেসিফিক ফোবিয়া নির্ণয়ের জন্য কতগুলো লক্ষণের কথা বলা হয়েছে ।

উল্লেখ করার মত অথবা  চোখে পড়ার মত ভয় বা উদ্বেগ কোনো বিশেষ বস্ত বা পরিস্থিতির প্রতি হয়ে থাকে (এ্যারোপ্লেন ভীতি, উচ্চতা, প্রাণী, ইনজেকশন নিতে ভয়, রক্ত দেখে ভয়)। নোট: শিশুরা এই ভয় প্রকাশ করে কান্নাকাটি করে, হঠাৎ করে অল্প সময়ের জন্য রেগে যায় তার পরই আবার খুব বেশি পরিমাণে ঠান্ডা হয়ে যায়।

ভীতিকর বস্তু বা পরিস্থিতিতে প্রায় সব সময়ই তাৎক্ষনিকভাবে ভয় বা উদ্বেগে ভোগে।

ভীতিকর বস্ত বা পরিস্থিতি সচেতনভাবে এড়িয়ে চলে অথবা একটা তীব্র ভয় বা উদ্বেগের বেদনা দায়ক অভিজ্ঞতার সৃষ্টি হয়।

যে বিশেষ বস্তু বা পরিস্থিতিতে ভীতি বা উদ্বেগের সৃষ্টি হচ্ছে সেই বস্তু বা পরিস্থিতি সত্যিকার ভাবেই বিপদজনক কিনা এবং সামাজিক সাংস্কৃতিক পটভূমির প্রেক্ষাপটে বিষয়টি সমস্যা কিনা তা বিবেচনায় আনতে হবে।

এই ভয়, উদ্বেগ এবং এড়িয়ে চলা দীর্ঘমেয়াদী হয়। সাধারণত ৬ মাস বা তার বেশি হয়ে থাকে।

এই ভয়, উদ্বেগ এবং এড়িয়ে চলার কারণে ক্লিনিক্যালি তাৎপর্যপূর্ণভাবে যন্ত্রণা বা ব্যাঘাত সৃষ্টি হয় তার সামাজিক, পেশাগত এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক কাজ কর্মের ক্ষেত্রে।

এই অস্বাভাবিকতাকে অন্য কোনো মানসিক ডিজঅর্ডার দ্বারা ব্যাখ্যা না করাই ভাল। যেমন: ভয়, উদ্বেগ অথবা প্যানিক অ্যাটাক এর মত লক্ষণ যে সকল পরিস্থিতিতে হয় সেই সব পরিস্থিতির দ্বারা অথবা অন্যান্য অক্ষমতা জনিত লক্ষণ যা এগারোফেবিয়ায় দেখা যায় তা দ্বারা। কোনো বস্তু বা পরিস্থিতি সম্পর্কিত অবসেশন যা অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার -এ হয় তা দ্বারা। আঘাত বা বেদনাদায়ক/মর্মান্তিক ঘটনার স্মৃতি মনে পড়া যা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার এ দেখা যায় তা দ্বারা। বাড়ী/ভালবাসার মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার (যা সেপারেশন অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার এ দেখা যায়) অথবা সামাজিক পরিস্থিতিতে ভয় (যা সোস্যাল অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার এর ক্ষেত্রে দেখা যায়) দ্বারা।

বিশেষায়িতকরণ:
ব্যক্তি ঠিক কোন পরিস্থিতিতে ভয় পাচ্ছে তা নির্দিষ্ট করতে হবে। যেমন: প্রাণী ভীতির ক্ষেত্রে মাকড়সা, কীটপতঙ্গ, কুকুর কোনটিকে ভয় পাচ্ছে। প্রাকৃতিক পরিবেশ যেমন: উচ্চতা, ঝড়, পানি এই গুলোর মধ্যে কোনটিকে ভয় পাচ্ছে। রক্ত ইনজেকশন ক্ষত যেমন: সুঁই, দ্রুত রোগ ছড়িয়ে পড়ার পরিস্থিতি সম্পর্কিত কিনা। এ্যারোপ্লেন, এলিভেটর, বদ্ধস্থান সম্পর্কিত ভয় কিনা এবং অন্যান্য আরো কিছু পরিস্থিতি যেমন : যে সকল পরিস্থিতিতে দম বন্ধ হয়ে আসে বা বমি আসে; শিশুদের ক্ষেত্রে উচ্চ শব্দ এবং বিশেষ পোশাক পরিহিত লোক জনকে ভয়। আমেরিকাতে প্রায় ১২ মাস পর্যন্ত স্পেসিফিক ফোবিয়ায় ভুগছে এমন আক্রান্তের হার ৭%-৯%, ইউরোপীয় দেশ গুলোর ক্ষেত্রে ৬% দেখা যায়। কিন্তু এশিয়া, আফ্রিকান এবং ল্যাটিন আমেরিকানদের মধ্যে কম দেখা যায় (২%-৪%)। প্রায় ৫% শিশুর মধ্যে দেখা যায় যাদের ১৬% এর বয়সই থাকে ১৩-১৭ বৎসরের মধ্যে। বয়স্কদের মধ্যে কম দেখা যায়। মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় এবং এর অনুপাত ২:১। প্রাণীর প্রতি ভীতি, প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং পরিস্থিতির কারণে ভীত হয় মেয়েরা। অন্য দিকে রক্ত ইনজেকশন ক্ষতের মত বিষয় গুলোর প্রতি ভীতি উভয়ের ক্ষেত্রে সমান ভাবে হয়ে থাকে।

বিভিন্ন কারণে স্পেসিফিক ফোবিয়া দেখা দিতে পারে।  কোনো ধরনের মানসিক আঘাত বা দুঃখ জনক ঘটনার অভিজ্ঞতা থাকলে যেমন: কোনো প্রাণীর দ্বারা আক্রমণ হওয়া বা লিফটে আটকে যাওয়া। কাউকে বেদনা দায়ক বা মর্মান্তিক ঘটনায় পতিত হতে দেখলে। যেমন: কাউকে পানিতে ডুবে মরে যেতে দেখলে। যাইহোক, ভীতিকর পরিস্থিতিতে অপ্রত্যাশিতভাবে প্যানিক অ্যাটাকও হতে পারে। যেমন: টেলিভিশনে প্লেন দূর্ঘটনার চলমান দৃশ্য দেখে। স্পেসিফিক ফোবিয়াতে আক্রান্তদের মধ্যে অনেকেই তাদের ভীতিকর অনুভূতির শুরুর কারণ বলতে পারে না। সাধারণত শৈশব কালেই ঘটে থাকে। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই ১০ বছরের আগেই হয়ে থাকে, গড়ে ৭ এবং ১১ বছরের মধ্যে শুরু হয়। যদিও বয়স্কদের মধ্যে এই ফোবিয়া কম দেখা যায় তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে বয়স কালেও এটা হতে পারে। এক্ষেত্রে স্পেসিফিক ফোবিয়া ডায়গনোসিস করার সময় কিছু বিষয় বিবেচনায় আনতে হবে। আসলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শৈশব এবং কৈশর কালে হলেও যেকোনো বয়সেই এটা হতে পারে, আঘাত জনিক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলে।

স্পেসিফিক ফোবিয়ার ক্ষেত্রে পরিবেশগত যে উপাদান গুলোকে ঝুকিপূর্ণ মনে করা হয় তা হচ্ছে পিতা-মাতার অতিশাসন পিতা-মাতার মৃত্যু, বিচ্ছেদ, শারীরিক এবং যৌন হয়রানি। এছাড়া বংশগতির প্রভাবও দেখা যায়।

ভয় মানুষের জীবনের চলার পথকে সংকুচিত করে দেয়। তাই ভয় কে মন থেকে কেটে বাদ দিতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সম্মুখীন হওয়া প্রয়োজন। সকলে ভয়হীন সুখী  সোনালী জীবন-যাপন করুণ এই প্রত্যাশা।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।