মানসিক রোগ: কার কী দায়িত্ব 1

মানসিক রোগ: কার কী দায়িত্ব

মানসিক রোগবিশেষজ্ঞ

যেকোনো মানসিক রোগের ডায়াগনোসিস/রোগ নির্ণয় করা (According to DSM V) ।

ঔষধ লাগবে নাকি রোগী সাইকোথেরাপীতে ভালো হবে অথবা ঔষধ এবং সাইকোথেরাপী উভয়ই প্রয়োজন তা রোগীর জন্য নির্ধারণ করেন।

রোগী বাসায় রেখে আউটডোর ব্যাসিসে অথবা ভর্তি করে চিকিৎসা করাতে হবে তা নির্ধারণ করেন ।

রোগ নির্ণয়ের পর ডাক্তার অনেক সময় নিজে সাইকোথেরাপী দিয়ে থাকেন অথবা মনোবিজ্ঞানী/clinical psychologist এর কাছে রেফার করে দেন এবং উল্লেখ করে দেন কি ধরনের থেরাপী রোগীর দরকার।

শিশু থেকে পূর্ণবয়ষ্ক সকল প্রকার মানসিক রোগের চিকিৎসা মানসিক রোগবিশেষজ্ঞ করেন।

মনোবিজ্ঞানী/clinical psychologist

মনোবিজ্ঞানী/clinical psychologist/ সাইকোথেরাপিস্ট কেবলমাত্র সকল প্রকার থেরাপী সংক্রান্ত ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ। কোনো প্রকার Medicine দেয়ার কোনো এখতিয়ার তাঁদের নেই (এটা আন্তর্জাতিক নিয়ম, Medicine দিতে হলে তাঁকে এমবিবিএস ডিগ্রী ধারী হতেই হবে)।

অনেক সময় মনোবিজ্ঞানী/clinical psychologist রোগ নির্ণয়ে সক্ষম হতে পারেন দীর্ঘ কালীন দক্ষতার কারণে এবং সেই অনুযায়ী রোগীকে নানাবিধ সাইকোথেরাপী দিয়ে থাকেন।

নিউরোলজিস্ট/স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ

 নিউরোলজিস্টগণ Stroke, Brain tumor, Epilepsy, Multiple sclerosis, GBS, Motor Neuron Disease, Myasthenia Gravis, Quadriplegia, Wilson disease ইত্যাদি নিয়ে কাজ করেন এবং চিকিৎসা দেন। আক্ষরিক অর্থে ব্রেনের ডাক্তারই নিউরোলজিস্ট তবে মানসিক রোগের ডাক্তার নিউরোলজিস্ট নন তাই তাদের চিকিৎসার আওতায় যেসব রোগ পরে তা উপরোক্ত তালিকা দিয়ে বোঝানো হয়েছে।

 অনেক সময়ে নিউরোলজিক্যাল রোগের কারণে রোগীর দীর্ঘকালীন বা স্বল্পকালীন সময়ে কোনো মানসিক রোগ দেখা দিলে তাও মানসিকরোগ বিশেষজ্ঞ যৌথভাবে নিউরোলজিস্ট এর সাথে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন।

মানসিক রোগের চিকিৎসা করানোর সময় নিম্নলিখিত বিষয়ে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের করনীয়

 যদি বুঝতে পারেন আপনার আত্মীয়ের মানসিক রোগ হয়েছে তাহলে সর্ব প্রথম তাকে মানসিক রোগের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান এবং চিকিৎসা করে দ্রুত সারিয়ে তুলুন। কুসংস্কার, আবেগ, সামাজিক লজ্জার কারণে আবোল-তাবোল ভাবে চিকিৎসা করালে রোগ দীর্ঘায়িত হবে এবং সেরে উঠতে সময় লাগবে। পরিবারে কারো মানসিক রোগ দেখা দিলে স্নায়ুরোগ, হৃদরোগ, মেডিসিন, গাইনী রোগ বিশেষজ্ঞ দেখিয়ে অযথা সময় নষ্ট করবেননা।

 জ্বীন পরীর আসর ভেবে অনেকে হুজুর-কবিরাজের কাছে অনেক লম্বা সময় ও টাকা নষ্ট করে ফেলেন। ইসলাম ধর্মে জ্বীনের অস্তিত্ব আছে তাই এটা উপেক্ষা করার বিষয়না। জ্বীন থেকে মানুষকে রক্ষা করার প্রক্রিয়াকে “রুকাইয়া” বলে এবং এই পদ্ধতি সবাই পারেনা। সামান্য কিছু আলেম সঠিক পদ্ধতিতে “রুকাইয়া” করতে পারেন কিছু নির্দিষ্ট দোয়া দুরুদের মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালা কোন মানুষকে জ্বীন পালা/বোতলে ভর্তি করে রাখা/জ্বীন চালান দেয়ার ক্ষমতা দিয়ে পাঠাননি তাই এমন বিষয়ে অদ্ভুত কথা না বলাই শ্রেয়।

 মানসিক রোগের কারণে একটি দীর্ঘ সময়ের জন্য রোগীকে ঔষধ খেতে হয়। আপনার ডাক্তার আপনাকে সেই সময়টা আনুমানিক ভাবে বলে দিবেন। ধৈর্য্য ধরে চিকিৎসা করান এবং যেভাবে ঔষধ খেতে বলবেন রোগীকে নিজ দায়ীত্বে খাওয়াবেন হাল ছেড়ে দিবেন না।

 বেশিরভাগ পরিবারের সদস্য কিছুদিন যাবার পর রোগীর দায়িত্বে ঔষধ খাওয়াটা ছেড়ে দেন ফলে অনেক সময় রোগী নিজে থেকে ঔষধ খাওয়া বন্ধ করে ফেলেন। ফলে পুনরায় রোগ দেখা দেয় এবং আত্মীয় স্বজন ভাবতে থাকেন ঔষধ কাজ করছেনা।

 মানসিক রোগের জন্য ব্যবহৃত ঔষধের কিছু “সাইড এফেক্ট” থাকে যেমন-ঘুম হওয়া, গলা শুকিয়ে আসা, চোখে ঝাপ্সা দেখা, গ্যাষ্ট্রিকের সমস্যা বৃদ্ধি পাওয়া, পায়খানা কষা হয়ে যাওয়া। কিছুদিন খাবার পর এই সাইড এফেক্ট গুলির মাত্রা কমে আসে এবং এক সময় বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় মানসিক রোগের ঔষধ খেলে কিছুটা ওজন বৃদ্ধি পায় ক্ষুধা বেড়ে যাওয়ার জন্য, এই বাড়তি ওজন খাদ্য নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে কমানো সম্ভব। সারাদিন বসে ঔষধের প্যাকেটে যেসব সাইড  এফেক্ট লেখা থাকে সেটা পড়ে, ডাক্তার কত খারাপ ঔষধ দিলো এবং তাতে আপনার লিভার, কিডনী খারাপ হয়ে যাচ্ছে ভাবার আদৌ কোনো যৌক্তিকতা নেই।  ঔষধের প্যাকেটে যেসব সাইড-এফেক্ট লেখা থাকে তার সব গুলি আপনার হবেই এবং আপনার/রোগীর সব কিছু নষ্ট হয়ে যাবে এটা ভাবা সঠিক নয়।

 রোগী সিরিয়াস, কারো কথা শোনে না, সব বুঝে, নেট থেকে সব পড়ে ফেলেছে জোর করে ঔষধ খাওয়ানো যাবেনা এবং সাথে, ওরে বাবা!! ইঞ্জেকশনের নাম নেয়া যাবেনা—-এমন কথা বলার আগে চিন্তা করুন আপনি ডাক্তারের কাছে এসেছেন; কোন ওঝা, যাদুকরের কাছে না। মানসিক রোগের ডাক্তার শুরুতে রোগীকে মুখে খাওার ঔষধই দিয়ে থাকেন, যখন রোগীকে কোনোভাবেই মুখে ঔষধ খাওানো সম্ভব হয়না তখনই ইঞ্জেকশনের বিষয়টা আসে।

 আমরা নিজেরা কাউন্সেলিং করে রোগী ম্যানেজ করে ফেলেছি তাই ঔষধ ছাড়া দেখেন ঠিক হয় কিনা এমন রসিকতা করার চেষ্টা থেকে বের হয়ে আসেন। কাউন্সেলিং একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাপার, রোগীর সাথে পারিবারিক সদস্যরা বসে রোগ বিষয়ে শলাপরামর্শকে “কাউন্সেলিং” বলে না তাই এই নির্দিষ্ট শব্দটি ব্যবহার করে রোগটাকে হাল্কা করে ফেললে চিকিৎসা শুরু করতে দেরী হবে।

 পরিবারে কারো মানসিক রোগ আছে জানতে চাইলে normally behave করেন এবং বলেন নাই বা আছে। ১৪ গুষ্টির মধ্যে এমন কিছু নাই এগুলা বলে নিজেকে অপমান করবেন না।

 দীর্ঘদিন অন্য শারীরিক রোগে ভোগার কারণেও মানসিক রোগ হতে পারে। সেটা স্বয়ং শারীরিক রোগটি (যেমন- বহুদিনের ডায়বেটিস, এসএলই, মৃগী-রোগ ইত্যাদি) কারণেও হতে পারে অথবা সেই রোগে যেসব ঔষধ ব্যবহার করা হয় তার সাইড-এফেক্ট এর কারণেও হতে পারে (যেমন steroid, anti hypertensive medicine, chemotherapy ইত্যাদি)। যেকোনো কারণে মানসিক রোগ দেখা দিলে যত দ্রুত এর চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন আপনার রোগী তত দ্রুত মানসিক রোগ মুক্ত হতে পারবেন।

 মানসিক রোগ অন্য যেকোনো শারীরিক রোগের মত একটি রোগ। সহজ ভাবে নিন এবং চিকিৎসা করে সুস্থ হয়ে উঠুন। হাতে গোনা কিছু মানসিক রোগের কারণে হয়তো সারাজীবন ঔষধ খেতে হয়, তাই একবার মানসিক রোগের ঔষধ খেলে আজীবন খেতে হয় এটা একেবারে ভুল ধারণা।

 মানসিক রোগের চিকিৎসক কেবল ঘুমের ঔষধ দেন এমন একটি জনপ্রিয় ধারণা সবাই কম বেশি ধারণ করেন। যে কোনো মানসিক রোগে অন্যান্য উপসর্গের সাথে সাথে রোগীর ঘুম কমে যায়। চিকিৎসা শুরু হওয়ার পর পর রোগী যখন অন্যান্য উপসর্গ মুক্ত হতে থাকেন যেমন, উত্তেজনা, অস্থিরতা, অশান্তি, অস্বাভাবিক চিন্তা প্রবণতা সাথে সাথে রোগীর ঘুমের পরিমাণ বৃদ্ধিপায়। রোগীর সুস্থ হয়ে উঠার সাথে তাল মিলিয়ে পরবর্তি চিকিৎসা চালিয়ে গেলে বুঝতে পারবেন রোগী ঘুমের ঔষধ খাচ্ছিলেন না তার মানসিক রোগ নিয়ন্ত্রণে আসছে এবং ঘুমের পরিমাণও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। কেবল মাত্র ঘুম পাড়িয়ে রাখা মানসিকরোগের চিকিৎসা নয়।

 মানসিক রোগী সুস্থ হয়ে উঠলে বিয়েতে যেমন কোনো বাঁধা নেই তেমনই বিয়ে দিয়ে দিলে মানসিক রোগ ঠিক হয়ে যায় এটা ভ্রান্ত ধারণা।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।