মূল পাতা / ফিচার / মাদকের হাতেখড়ি উৎসবে-পার্বণে

মাদকের হাতেখড়ি উৎসবে-পার্বণে

এসএসসি-এইচএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ পাওয়া নিহালের ইচ্ছে ছিল কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে উচ্চতর পড়াশোনার, স্বপ্ন ছিল বুয়েটে ভর্তি হওয়ার। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পেতে ব্যর্থ হয়ে বিভাগীয় শহরের বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স বিষয়ে ভর্তি হয় সে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি বাড়ি ভাড়া করে থাকে। সেখানে আত্মীয়-পরিজন নেই। তারা থাকেন দূরে। স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানে সুযোগ না পেয়ে আর বাবা-মা থেকে দূরে অচেনা অনাত্মীয় পরিবেশে থাকতে হওয়ায় প্রথম প্রথম মন খারাপ হলেও পরবর্তীতে মানিয়ে নেয় সে। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই ভালো ফল নিয়ে জীবন গড়ার জন্য প্রত্যয়ী হয়। নতুন জায়গায় নতুন নতুন সহপাঠী, নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হয়। বছর কেটে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে মেস-বাড়ির এক রুমের সহপাঠীরা রাতে নিহালসহ অন্য কয়েক ছাত্রকেও আমন্ত্রণ জানায় তাদের রুমে। রাত বারোটায় কেক কাটা হবে। নিহালরা সেখানে যায়। কেক-পর্ব শেষে মিউজিকের তালে তালে হৈ-হুল্লোড়, নাচ চলতে থাকে। এর মধ্যে ঐ রুমের এক ছাত্র বিশেষ পানীয়ের বোতল বের করে, একজন একটি ট্যাবলেট গুঁড়ো করে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলে রেখে তার নিচে আগুন ধরিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে নাক দিয়ে ধোঁয়া টানতে থাকে। নিহাল বুঝতে পারে, ওরা মাদক নিচ্ছে। আনন্দ- উৎসবের মাঝেই একজন নিহালকে প্রস্তাব দেয় ওরকম করে ধোঁয়া টানার। নেশা ক্ষতিকর- জানে নিহাল। ইঙ্গিতে জানিয়ে দেয়, নেবে না সে। সহপাঠী বলে, ‘আরে তুমি তো আর নেশা করছ না, আজকে পার্টিতে জাস্ট মজা করার জন্য নাও। ফুর্তি হবে বেশি। প্রতিদিন তো আর নিবে না আমাদের মতো।’ আরো দু-এক সহপাঠী তাল দেয় সে কথায়, ‘পার্টিতে একটু আধটু নিলে ক্ষতি নেই। বিশেষ বিশেষ দিনে আজকাল সবাই খায় এসব। পার্টিতে নেয়া তো আর নেশা না।’ তাদের কথায় প্রভাবিত হয় নিহাল। একটু মজা করায় কী আর সমস্যা! আজকে তো বিশেষ দিনই-বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির বর্ষ-পূর্তি। ধোঁয়া নিয়ে বেশ চাঙা ভাব হয় নিহালের। সারারাত চলে পার্টি। কিছুদিন পর ঐ রুমের এক সহপাঠীর জন্মদিন। সে রাতেও পার্টি। পার্টিতে আবারও ধোঁয়া সেবন। আরো দু-এক উৎসব যায় এমন করে। এরপর সপ্তাহখানেক কোনো উৎসব না থাকায় কেমন যেন অস্বস্তি হতে থাকে নিহালের। কী যেন দরকার তার! কিসের যেন অভাব! অস্বস্তি নিয়ে ঐ সহপাঠীর রুমে যায় সে কোনো উৎসবের উপলক্ষ্য ছাড়াই। কয়েক মাস পর নিহাল টের পায় কী বিপর্যয় ঘটে গেছে তার জীবনে। রাত কাটে নির্ঘুম, শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়তে থাকে, মেজাজ হয় খিটখিটে, গলামুখ শুকিয়ে আসতে থাকে অনবরত। ঐ ধোঁয়া নিলেই কেবল শান্তি, ফুর্তি। পড়াশোনায় অনিয়মিত, রেজাল্ট খারাপ হতে থাকে। বাড়ি থেকে পাঠানো টাকায় এখন আর মাস চলে না। টাকার বেশিরভাগই চলে যায় ধোঁয়ার পেছনে। বন্ধে বাড়ি গেলে তার চেহারা দেখে বাবা-মা আঁতকে ওঠেন। বাড়ির আশপাশে নেশার আড্ডা খুঁজে বের করে সে। পরিচিতদের চোখে পড়ে যায় নেশা করার সময়। বাবা-মা’র কানে আসে সে কথা। তাদের চাপে একসময় নিহাল স্বীকার করে সবকিছু। বাড়িতে থেকে নিজে নিজে নেশামুক্ত হওয়ার চেষ্টা চালায় কিছুদিন। ব্যর্থ হয়ে পরবর্তীতে ভর্তি হতে হয় মাদক নিরাময় কেন্দ্রে।

নিহালের মতো অনেকেরই মাদকে হাতেখড়ি হয় উৎসব-পার্বণে। বারো মাসে তেরো পার্বণের এ দেশ। দেশীয় কৃষ্টির অংশ হিসেবে বেশ কিছু উৎসব বিশেষ আনন্দে বা মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে বহুদিন ধরে। তবে, সাম্প্রতিককালে বিশেষ কিছু স্থানে বিশেষ কিছু দলে সেসব উৎসব পালনের রীতিতে পরিবর্তন আসছে। মাদক হয়ে উঠছে উৎসব পালনের অন্যতম অনুষঙ্গ। থার্টি ফার্স্ট কিংবা পহেলা বৈশাখ, ঈদ, পূজার মতো সার্বজনীন উপলক্ষ্য তো রয়েছেই; বিশেষ ব্যক্তিগত উৎসব, যেমন- বিয়ে, জন্মদিন, পেশাগত বা শিক্ষাগত কোনো সাফল্যের উদ্যাপনেও সঙ্গী হচ্ছে মাদক। সেসব উৎসবে আমন্ত্রিত হচ্ছে আগে কখনো মাদক না নেয়া মানুষজনও। কৌশলে হোক বা চাপে হোক, কিংবা কৌতূহলে কিংবা সহজলভ্যতায়- সেখানে মাদকমুক্তরাও অভিজ্ঞতা নিচ্ছেন মাদকের। বলার চেষ্টা করছেন- এটি ‘রিক্রিয়েশনাল ইউজ’, কেবলমাত্র উৎসবে আনন্দের জন্য নেয়া হচ্ছে এটি, এতে ক্ষতির তেমন আশঙ্কা নেই। অনেকে ‘এক্সপেরিমেন্টাল ইউজ’ করার অজুহাত দিচ্ছেন- খেয়ে দেখিই না কী হয়! মাদকাসক্তরাও দল ভারী করার জন্য এদের প্রলুব্ধ করছেন, ‘আশ্বাস’ দিচ্ছেন- ‘এক্সপেরিমেন্টাল’ বা ‘রিক্রিয়েশনাল’ মাদক গ্রহণে ক্ষতির কিছু নেই। কিন্তু প্রকৃত সত্য ভিন্ন। কৌতূহলে বা উৎসবে ক্ষণস্থায়ী আনন্দের জন্য নেয়া এ মাদকই স্থায়ী নেশার পথ খুলে দিচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক-মানসিক নানাবিধ সমস্যার শিকার হচ্ছে মাদকাসক্তরা।

শুধু শারীরিক বা মানসিক ক্ষতিতেই মাদকাসক্তির প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমান সময়ের তারুণ্যের একটি বড় অংশের সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম প্রধান কারণ মাদকের বিস্তার। মাদকসেবীর যুগল জীবন কখনো সুখের হয় না। নেশার পেছনে সময় দেয়ার কারণে পরিবারকে যেমন এরা সময় দিতে পারেন না, তেমনি পারিবারিক দায়িত্ববোধও এদের গড়ে ওঠে না অথবা নষ্ট হয়ে যায়। যার ফলাফল নিত্য কলহ, মারপিট; অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেপারেশন বা ডিভোর্স। যেসব সংসার কোনোমতে টিকে থাকে সেখানেও মাদকসেবীর সঙ্গী/সঙ্গিনী চরম হতাশাপূর্ণ জীবন-যাপন করেন। তাদের ছেলে-মেয়েও বিপথে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে। মাদকসেবী ছাত্রের পড়ালেখার মান যেমন কমতে থাকে, তেমনি কর্মক্ষেত্রেও নেশায় আসক্ত ব্যক্তি তার দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা হারাতে থাকেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাদকসেবী ভালো চাকরি বা কাজ পান না। আবার পেলেও তা ধরে রাখতে পারেন না। মাদকসেবী চাকুরিজীবী হলে ঘন ঘন চাকরি থেকে ছাঁটাই হতে থাকেন, ব্যবসায়ী হলে ব্যবসায় ধ্বস নামে। অন্যান্য পেশায় নিয়োজিতরাও স্ব স্ব ক্ষেত্রে দক্ষতা প্রদর্শনে ব্যর্থ হন। মাদক সেবনের ফলে সম্ভাব্য দক্ষ জনগোষ্ঠীর বিশাল একটি অংশের মেধা ও কর্মক্ষমতার অপচয় হয়।

এই বিশাল অপচয়ের সূচনা হতে পারে উৎসবের ক্ষণে পরখ করা মাদকের হাত ধরে। উৎসবে মাদক সেবনের তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কথাও আমাদের অজানা নয়। জন্মদিনের উৎসবে মাদক সেবন করে অতিথি নারী বা বান্ধবীকে ধর্ষণের বেশ কিছু ঘটনা ইতিমধ্যে মিডিয়ার কল্যাণে সবারই জানা। একইভাবে, মাদক সেবন করে উৎসব-স্থল থেকে গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন বা ঘটিয়েছেন অনেকে। কখনো মাদকের অভিজ্ঞতা না থাকা ব্যক্তি প্রথমবারের মতো উৎসবে মাদক নিয়ে এর বিরূপ শারীরিক প্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, এমন অনেক ঘটনার সাক্ষী হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা। মাদক থেকে মুক্তির জন্য চিকিৎসা নিয়ে ভালো আছেন, এমন অনেকের ক্ষেত্রে পুনরায় মাদক শুরু বা ‘রিলাপস্’-এরও একটি বড় কারণ উৎসবের মাদক।

অন্যান্য অনেক রোগের মতোই মাদকাসক্তির ক্ষেত্রেও প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ শ্রেয়। এই প্রতিরোধের প্রথম কথাই হচ্ছে- জীবনে একবারের জন্যও মাদক না নেয়া। কৌতূহলেও না, তথাকথিত স্মার্ট হওয়ার জন্যও না, উৎসবের অংশ হিসেবেও না। বন্ধু নির্বাচনে সতর্ক হতে হবে। উৎসবের অজুহাতেই হোক না কেন-একবারের জন্যও মাদক নিতে যে উৎসাহিত করে সে কখনো প্রকৃত ভালো বন্ধু হতে পারে না।