মূল পাতা / ফিচার / একাকী মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি

একাকী মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি

রুমকি (ছদ্মনাম)। বয়স তেত্রিশ। ঝকঝকে স্মার্ট ইয়াং লেডি। অবস্থাপন্ন ঘরের মেয়ে। এক শনিবারের বিকেলে চেম্বারে এলো। রুমকি একাকী মা। ছেলের বয়স চার বছর। পারিবারিকভাবেই বিয়ে হয় তার। বিয়ের পর থেকেই স্বামী এবং স্বামীর পরিবারের বহুরকম অন্যায্য চাহিদার মুখোমখি হতে হয় রুমকিকে। স্বামী সংসারের কোনো খরচ দিত না, শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকত প্রায়ই। এক পর্যায়ে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমেই বিচ্ছেদ হয়ে যায়।

বিবাহ বিচ্ছেদের পর থেকে রুমকিকে তার আত্মীয় স্বজনের অনেক রকম বিরূপ মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি তার বাবাও বলেন যে, রুমকিকে নিয়ে তিনি লজ্জিত এবং আত্মীয়স্বজনের মুখোমুখি হতে পারেন না। নামকরা ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলো রুমকির ছেলেকে ভর্তির ব্যাপারে আপত্তি জানায়। বিভিন্ন রকম সামাজিক হয়রানির শিকার হতে থাকে রুমকিকে।

রুমকির জীবনের গল্প শুনে একটা কবিতার পঙ্ক্তি মনে পড়ল- ‘ I talk to God but the sky is empty’ কবি সিলভিয়া প্লাথের এই বাণীটির মধ্যোকার গভীর একাকীত্বের মতোই কি একলা মায়েদের জীবন? সবক্ষেত্রেই কি শূন্যতা সঙ্গী হয় তাদের? আমরা একাকী মায়েদেরকে ( Single Mother ) নিয়ে গবেষণাটি শুরু করলাম। গবেষণাটি এখন শেষ পর্যায়ে। ১৫৬ জন একাকী মায়ের উপরে গবেষণাটি চালানো হয়। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত সব ধরনের মাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নিম্নবিত্ত মায়েদের উপাত্ত বস্তি ও গৃহকর্মীদের কাছ থেকেই মূলত নেওয়া হয়েছে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মায়েদের উপাত্ত সুবিধাজনকভাবে (Purposive and convenient ) নেওয়া হয়েছে।

কারা একাকী মা? পরিসংখ্যান:
বিধবা, বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া এবং অবিবাহিত মায়েরা হচ্ছেন একাকী মা। একলা মায়েরা প্রায়শই নিঃসঙ্গ, বিষণ্ণ, চাপগ্রস্ত থাকেন। বাধ্য হয়েই তাদের অতিরিক্ত কাজের চাপ নিতে হয়। সেই সাথে আরো বিভিন্নরকম সমস্যা আছে তাদের জীবনে। নিজেদের আবেগ অনুভূতিকে যেমন তাদের নিজেদেরই সামলাতে হয় তেমন একই সাথে যত্ন নিতে হয় সন্তান এবং আত্মীয়স্বজনের আবেগ-অনুভূতির। আর্থিক সমস্যা, সন্তানের আচরণগত সমস্যা এবং সমাজের বিভিন্নরকম অবজ্ঞা, অবহেলা, হয়রানি এসবও তাদেরকে মোকাবেলা করতে হয়।

সাম্প্রতিক গবেষণা এবং গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা গিয়েছে যে, ঢাকা শহরে একাকী মায়ের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। ঢাকার দুই অংশের সিটি কর্পোরেশন তালিকা অনুসারে দেখা যায়, নারীদের বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বিবাহবিচ্ছেদের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্ত্রীরা বিবাহ- বিচ্ছেদের আবেদন করছেন স্বামীর শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতনের অভিযোগে এবং স্বামীরা অভিযোগ করছেন স্ত্রীর ‘অবাধ্যতা এবং উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের’। সিটি কর্পোরেশনের তথ্য অনুসারে, ২০১১ সালে মোট বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন ৫,৩৮২টি এবং তার মধ্যে স্ত্রীর আবেদন ৩,৪৪৪টি এবং ২০১৩ সালে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৬,৮৮০টি (মোট আবেদন ৮,১৯১)। সারা বিশ্বেই বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশ্চাত্য সমাজে বিবাহবিচ্ছেদ এবং পুর্নবিবাহ জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখা হলেও এশিয়ার বেশিরভাগ দেশেই বিবাহবিচ্ছেদ অথবা স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকা অত্যন্ত নেতিবাচক একটি বিষয় হিসেবেই গণ্য করা হয়। নারীরা এখন শিক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছেন। কর্মক্ষেত্রেও তারা অত্যন্ত দক্ষ। ভালো অংকের পারিশ্রমিকও পাচ্ছেন। এ সবের পরিপ্রেক্ষিতে নির্যাতিত স্ত্রীদের অনেকেই মনে করেন না যে, তাদের চেয়ে ‘শক্তিশালী’ কাউকে তাদের দেখাশোনা করতে হবে- ফলে স্বামীর থেকে আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

এবারে জানা যাক- বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ কী? কারণ হিসেবে পাওয়া যায় শারীরিক, যৌন এবং মানসিক নির্যাতন, স্বামীর মাদকাসক্তি, ব্যক্তিত্বের ভিন্নতা, শ্বশুরবাড়িতে শত্রুভাবাপন্ন অবস্থা, আর্থিক সমস্যা, যৌনজীবনে অসঙ্গতি, ভালোবাসাহীনতা, সাংস্কৃতিক এবং জীবনযাপনের ধারায় ভিন্নতা, মানসিক টানাপোড়েন অথবা মানসিক রোগ, বিয়ে সম্পর্কটির প্রতি অঙ্গীকার বা দায়িত্বশীলতার অভাব, সন্তানধারণ এবং লালনপালনে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, পিতামাতা অথবা পরিবারের অন্যদের হস্তক্ষেপ, প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গিতে আটকে থাকা এবং নারীদের ব্যক্তিগত মতামত উপেক্ষা করা ইত্যাদি।

একক অভিভাবকত্বের চ্যালেঞ্জ:
সব ধরনের সুযোগসুবিধার উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও প্যারেন্টিং একটি কঠিন বিষয়। সেই জায়গায় একা সন্তান লালনপালন করতে গেলে প্রতিক‚লতা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। তাই একক অভিভাবকত্বের দায়িত্ব নিয়ে মায়েদের অপরিমেয় প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। অতিরিক্ত কাজের চাপ, গৃহস্থালির কাজ, আবেগগত চাপ, আর্থিক সমস্যা ইত্যাদি একজন একলা মাকে নিজেরই সামলাতে হয়।

একাকী মায়ের উপর এর প্রভাব:
সন্তান লালনপালনে বাবা-মা দুইজনকেই অনেক ধরনের আবেগগত সঙ্কটের মোকাবেলা করতে হয় এবং সন্তানের আবেগগত চাহিদার প্রতি সচেতন থাকতে হয়। একজন একাকী মাকে তার নিজের এবং সন্তানের আবেগগত চাহিদা পূরণে সবসময় প্রস্তুত থাকতে হয়।বিভিন্ন প্রতিকূলতার সাথে একা একা যুদ্ধ করে একাকী মা হয়ে পড়েন নিঃসঙ্গ, বিষণ্ণ এবং উদ্বিগ্ন। এসব মায়েদের মধ্যে প্রায়ই নানারকম অসুস্থতাও দেখা যায়। একক অভিভাবকত্বের চাপ এবং তার ফলাফলস্বরূপ শারীরিক-মানসিক নেতিবাচক প্রভাবের কারণে তাদের মৃত্যুর ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

সন্তানদের ওপর প্রভাব:
একাকী মায়েদের বিভিন্ন সমস্যা তাদের সন্তানদের মধ্যেও সমস্যা তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- সমাজবিরোধী কার্যকলাপ, আগ্রাসী আচরণ, উদ্বিগ্নতা, বিষণ্ণতা, স্কুলে সমস্যা, স্কুলে অনুপস্থিতি, স্কুল থেকে বাদ পড়া (এই ক্ষেত্রে মেয়েদের তুলনায় ছেলে সন্তানদের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখা যায়), উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে না পারা, আর্থিক এবং মানসিক অসুবিধা, অপরাধমূলক কার্যক্রম ও মাদকাসক্তিতে জড়িয়ে পড়া, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন অসুবিধা ইত্যাদি। Weitzman ১৯৮৫ সালের গবেষণায় দেখান, এমনকি পাশ্চাত্যেও বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া মায়েদের সন্তানদের স্বাস্থ্যবীমাসহ জীবনের গুণগত মানের অবনতি হতে দেখা যায়। এই অবস্থাকে তিনি বলেছেন- Feminization of poverty (Weitzman IJ 1985) ।

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি:
তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একলা মায়েরা সামাজিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। তাদেরকে সমাজে নিচুভাবে দেখা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিধবা নারীদেরকে সম্পত্তির উত্তরাধিকার দেয়া হয় না। অন্যান্য সাহায্য থেকেও প্রায়শই তাদের বঞ্চিত করা হয়। বিচ্ছেদ হওয়া পরিবারকে ( Broken families ’- বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে এই শব্দটা প্রায়ই ব্যবহার করা হয়) সামাজিক নিয়মের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখা হয়। বিভিন্ন রকম সামাজিক অমর্যাদারও শিকার হন তারা। আগে পরিবারের সদস্য হিসেবে একা একজন নারী (সন্তানসহ অথবা সন্তান ছাড়া) পরিবারের যত্ন পেতেন। নগরায়নের ফলে পারিবারিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ায় সেটাও এখন কমে এসেছে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীরা পারিবারিক সীমিত সম্পদ ব্যবহার করার ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার হন। আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারে পুরুষ সদস্যদের তুলনায় এ কারণে নারীরা আরো বেশি বঞ্চনার শিকার হন।

ঢাকা শহরের একাকী মায়েদের বিষণ্ণতা, উদ্বিগ্নতা এবং মানসিক চাপের উপস্থিতি এবং তীব্রতা সংক্রান্ত সাম্প্রতিক সময়ে চলাকালীন একটি গবেষণার উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ৩১ থেকে ৪০ বছরের বয়সে একলা মায়েদের সংখ্যা সর্বোচ্চ (৫৮%), চাকুরিজীবী আছেন ৬৯% যা
পেশাগত বিবেচনায় সর্বোচ্চ। গৃহকর্মী এবং গৃহিনী ২৭% এবং বেকার আছেন ১৩%। স্বামী থেকে পৃথক আছেন ৩৩%, বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে শতকরা ৫৪ জনের এবং বিধবা আছেন ৬৯%। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিষণ্ণতাজনিত রোগ ২৭%, উদ্বিগ্নতাজনিত রোগ ৩৩% এবং বিষণ্ণতা এবং উদ্বিগ্নতা এক সাথে আছে শতকরা ২৪ ভাগের। মানসিক চাপের তীব্রতা মৃদু, মাঝারি এবং তীব্র আছে যথাক্রমে ২২%, ১৬% এবং ৬%। মায়েরা যেসব প্রশ্নের মুখোমুখি হন তার উত্তরে পাওয়া গেছে ক্রমানুসারে অতিরিক্ত কাজের চাপ, আর্থিক সংকট এবং সামাজিক হয়রানি। সন্তান লালনপালন,আবেগগত সহায়তা এবং আর্থিক সহযোগিতা প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের পরিবার অন্তত তিনগুণ বেশি সহায়তা দিয়ে থাকে স্বামীর পরিবারের চেয়ে। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই সহযোগিতা মোটেও সন্তোষজনক নয়।

সন্তানদের মধ্যে সমস্যা হিসেবে পাওয়া গেছে বিষণ্ণতা, উদ্বিগ্নতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব, পড়ালেখার মানে অবনতি, স্কুলে বিদ্রুপের শিকার হওয়া, আচরণগত সমস্যা ইত্যাদি। একলা মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও তাদের সন্তানদের সুষ্ঠু লালনপালনের দিকে আমাদের বিশেষ নজর দিতে হবে। প্রয়োজনে সন্তান লালনপালনে আবেগগত-আর্থিক-পারিবারিক-সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সহযোগিতা। সেই সাথে দরকার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। মা এবং সন্তান উভয়েরই শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যার যথাযথ ব্যবস্থাপনা একান্ত প্রয়োজন।

সবশেষে বলতে চাই, আমাদের দেশে বিশেষ করে শহর অঞ্চলে একাকী মায়ের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। একাকী মা হিসেবে জীবনের সংকট যেমন গভীর, সামাজিক প্রতিকূলতাও অনেক। এই অবস্থার অস্থায়ী এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে মা ও সন্তানের মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর। যথাযথ সহযোগিতা পেলে এবং সময়মতো চিহ্নিত করে চিকিৎসার আওতায় আসলে একজন একলা মা তাঁর এই সমস্যাগুলোকে মোকাবেলা করে নেতিবাচক প্রভাব থেকে বের হয়ে আসতে পারেন এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য তাঁর নির্দিষ্ট ভূমিকা বজায় রাখতে পারেন।

 

বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টস্ আয়োজিত নবম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই গবেষণাটি সাইন্টিফিক পেপার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। উপস্থাপন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. ঝুনু শামসুন্নাহার। মনের খবরের জন্য গবেষণাটি সংকলন করেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সৃজনী আহমেদ। যা মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিন এর তৃতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতাল, মগবাজার