মূল পাতা / ফিচার / মানসিক সুস্থতার জন্য “নিরুদ্বেগ প্রতিক্রিয়া” কৌশল

মানসিক সুস্থতার জন্য “নিরুদ্বেগ প্রতিক্রিয়া” কৌশল

আমাদের মধ্যে যারা যারা কোন না কোন মানসিক সমস্যায় ভুগছে, তাদের পক্ষে অন্তত কিছু সময়ের জন্য নিরুদ্বেগ থাকাও একটি অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। কিছু, নিরুদ্বেগ থাকার বেশ কিছু কার্যকরী কৌশল আমাদের হাতে আছে।

  • আমরা চেষ্টা করলেই শিখতে পারি কিভাবে নিরুদ্বেগ থাকা যায়। আপনাদের দৈনন্দিন জীবনে কিভাবে নিরুদ্বেগ থাকতে পারেন তার কিছু কৌশল আজই শিখে নিন।
  • নিরুদ্বেগ থাকার শক্তি শুধুমাত্র আমাদের মনের মধ্যে নয়। এখানে দেয়া পরামর্শগুলো আপনাদের সাহায্য করবে “নিরুদ্বেগ প্রতিক্রিয়া” শিখতে।

আপনি যদি অতিরিক্ত উদ্বেগ রোগে ভুগেন, অথবা যে কোন ধরণের মানসিক সমস্যার জন্য চিকিৎসাধীন হয়ে থাকেন, আপনার জন্য নিরুদ্বেগ থাকতে পারা অত্যান্ত জরুরী প্রয়োজনীয় একটি ব্যাপার। আজকের এই পোষ্টে আমরা শিখবো কিভাবে ইচ্ছে করে দুশ্চিন্তা দূর করে শরীর ও মনকে ভালো রাখা যায়। আমরা এও আপনাকে জানাবো যে কিভাবে মাত্র ৪টি নিয়ম অনুসরণ করে আপনি ইচ্ছে করলেই নিজেকে নিরুদ্বেগ রাখতে পারবেন ও নিজের শরীরকে ভালো রাখতে পারবেন।

নিরুদ্বেগ হওয়া একটি মানসিক অবস্থার চাইতে বেশি কিছু

নিরুদ্বেগ থাকা শুধুমাত্র একটি মানসিক পরিস্থিতি নয়, এটি একটি শারীরিক অবস্থা। ইচ্ছে করে নিরুদ্বেগ থাকতে পারলে আমাদের শরীরে এমন কিছু প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে যা গণনীয়। আপনি যখন নিরুদ্বেগ থাকেন তখন আপনার শরীরে নিচে দেয়া প্রতিক্রিয়াগুলো লক্ষ্য করা যায়ঃ

  • নিম্ন হৃদস্পন্দন
  • নিম্ন রক্ত চাপ
  • কম অক্সিজেনের ব্যবহার
  • ধীর গতির শ্বাস-প্রশ্বাস
  • নিরুদ্বেগ/নিরুত্তেজ মাংসপেশী
  • মস্তিষ্কে বেশি বেশি রক্ত সঞ্চালন

উপরে লেখা প্রতিক্রিয়াগুলো, বিশেষ করে যখন একসাথে দেখা যায় – এগুলোকে বলা হয় “নিরুদ্বেগ প্রতিক্রিয়া”। অবশ্যই আমরা সবসময় চাই নিরুদ্বেগ থাকতে, উদ্বেগের মধ্যে নয়। কিন্তু “নিরুদ্বেগ প্রতিক্রিয়া” এর চাইতেও বেশি কিছু আমাদের জন্য; এর বেশ কিছু শারীরিক সুবিধাও আছে। নিরুদ্বেগ হলে “যুদ্ধ অথবা পলায়ন” অবস্থার পরিবর্তে আমাদের শরীরে এসে পরে “বিশ্রাম অথবা হজম করা” অবস্থা, এবং বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়ঃ

  • শরীরের ব্যাথা-বেদনা থেকে মুক্তি
  • শরীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি
  • বেশি বেশি সমস্যা সমাধান করতে পারা
  • বেশি প্রেরণা পাওয়া ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি
  • শরীরে শক্তি ও মনোযোগ বেড়ে যাওয়া

বিশেষ করে যারা দীর্ঘকালস্থায়ী ও অতিরিক্ত দুশিন্তা বা উদ্বেগে ভুগছেন, তাদের জন্য এটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যারা এই সমস্যায় ভুগছেন, তারা জানেন যে অতিরিক্ত উদ্বেগ আমাদের জীবনে কত রকম সমস্যা নিয়ে আসে; এই মানসিক সমস্যাগুলো আমাদের কাজে ব্যাঘাত করে, আমাদের কোন কিছুতে মনোযোগী হতে নিবৃত করে, অন্যদের সাথে আমাদেরকে মন খুলে যোগাযোগ করতে দেয় না, ও আমাদের সব সম্পর্কের মধ্যেও ঝামেলা সৃষ্টি করে। তাই, আমরা যদি শিখতে পারি কিভাবে ইচ্ছা করে নিরুদ্বেগ থাকা যায়, আমাদের জীবনের অনেক সমস্যা কমে যাবে।

কোন ওষুধ বা নেশাদ্রব্য ছাড়া দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে শেখা

যারা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ, বা অন্য কোন মানসিক সমস্যায় ভুগছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে, ওষুধ ব্যবহারে রোগীরা উপকৃত হয়, কিন্তু সবসময় নয়।

এমনও হয় যে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত রোগীরা নিজেরাই নিজেদের চিকিৎসা শুরু করে দেয়, কোন চেনা ওষুধ, নেশাদ্রব্য, মাদক বা অবৈধভাবে কেনা কোন ক্ষতিকর ওষুধ দিয়ে। এসব ওষুধ বা নেশাদ্রব্যের ব্যবহারে একজন রোগী খুব তাড়াতাড়ি এগুলোর প্রতি আসক্ত হয়ে পরে; যার ফলে হতে পারে “সহ-ঘটক সমস্যাঃ আসক্তি এবং মানসিক রোগ”।

অবশ্য এও ঠিক যে অনেকেই ঠিক ওষুধ ব্যবহারে মানসিক রোগ থেকে মুক্তি পেয়েছে; ওষুধ আসলে আসক্তির চিকিৎসার একটি অংশ মাত্র। শুধুমাত্র ওষুধ ব্যবহারে মানসিক রোগ, বিশেষ করে উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা, থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। নিজে থেকে দুশ্চিন্তাকে দমিয়ে রাখা এবং সেটা থেকে মুক্তি পাওয়া আমাদের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অহেতুক দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পাবার একটি ভালো উপায় হচ্ছে নিজের জীবনে “নিরুদ্বেগ প্রতিক্রিয়া” প্রয়োগ করা।

বাস্তব এই যে, নিরুদ্বেগ হতে পারা এমন একটি শৃঙ্খলা যা আমরা নিজে থেকে শিখতে ও অনুশীলন করতে পারি। আপনি যদি কোন ধরণের মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে থাকেন, নিজে থেকে নিরুদ্বেগ ও শিথিল হতে শেখা আপনার জন্য একটি অত্যান্ত জরুরী কাজ। আসুন জেনে নেই কি কি কৌশল আপনি অবলম্বন করতে পারেন নিজে থেকে নিরুদ্বেগ হয়ে উঠতে।

সাধারণ নিষ্ক্রিয় নিরুদ্বেগ থেকে বের হয়ে “নিরুদ্বেগ প্রতিক্রিয়া” পর্যন্ত

“নিরুদ্বেগ প্রতিক্রিয়া”র শক্তি এবং কিভাবে এটা আমাদের শরীরকে সাহায্য করতে পারে – সেটা নিয়ে আমরা আগেই আলাপ করেছি। কিন্তু এই পর্যন্ত এসে, আমাদের উচিৎ “নিষ্ক্রিয় নিরুদ্বেগ” এবং “নিরুদ্বেগ প্রতিক্রিয়া”র মধ্যের পার্থক্যগুলো বোঝা। “নিষ্ক্রিয় নিরুদ্বেগ” মানে যখন আমরা অবসরে নিজেদের মত করে বিশ্রাম নেই। যেমন মনে করুন, যখন কোন কাজ থাকে না, আমরা বাসার সোফায় শুয়ে থাকি অথবা আমাদের পছন্দের একটি আরামদায়ক চেয়ারে বসে টিভি দেখি।

“নিষ্ক্রিয় নিরুদ্বেগ” অবস্থায় হয়তো আমরা খুব স্বচ্ছন্দ অবস্থায় থাকি, কিন্তু এর দ্বারা আমাদের মধ্যে “নিরুদ্বেগ প্রতিক্রিয়া” তৈরি হয় না। অবসরে আরাম করা অনেক জরুরী হতে পারে, কিন্তু শুধু আরাম দিয়ে আমাদের ভেতরের উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা দূর করা সম্ভব নয়। নিষ্ক্রিয় নিরুদ্বেগের সুবিধাগুলো অত্যান্ত সীমিত।

নিচে নিরুদ্বেগ হবার যে কয়টি কৌশল বর্ণনা করা হয়েছে সেগুলো সব আমাদের শরীরে “নিরুদ্বেগ প্রতিক্রিয়া” তৈরি করতে পারে, এই ব্যাপারটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমানিত হয়েছে। অন্যভাবে বলতে গেলে, এইসব কৌশল আমাদের শরীরে সাধারণ আরাম বা নিরুদ্বেগ অবস্থার বাইরে গিয়ে আমাদের জন্য আসল ও সঠিক উপকারিতা এনে দেয়।

পরামর্শ#১ : ঠিকভাবে নিঃশ্বাস নিতে শিখুন

গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারা শান্ত থাকার খুব সহজ একটি কৌশল, এবং এটা যেকোন সময়, যে কোন জায়গায় ব্যবহার করা যায়। এই কৌশল শেখার পর এটি সহজেই ব্যবহার করা অন্য বেশ কিছু নিরুদ্বেগ থাকার কৌশল শেখা যায়। তাই, গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিতে শেখা আমাদের শরীর ও মনের জন্য অত্যান্ত জরুরী একটি কৌশল।

গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিতে, আপনাকে প্রথমে একটি আরামদায়ক চেয়ারে সোজা হয়ে বসতে হবে। তারপর, আপনার নাক দিয়ে আস্তে আস্তে বুক ভরে গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিতে হবে। খেয়াল রাখবেন যে, নিঃশ্বাস নেয়ার সময় আপনার কাঁধ উচু না হয়ে যায়। বরং, নিঃশ্বাস নেয়ার সময় আপনার বুকের মধ্যচ্ছদা ব্যবহার করুন। এভাবে নিঃশ্বাস নিলে, আপনার পেট উচু হতে থাকবে, আপনার কাঁধ নয়। তারপর, ধীরে ধীরে আপনার মুখ (নাক নয়) ব্যবহার করে নিঃশ্বাস ছেড়ে দিন। (আরও জানুন কিভাবে বুকের মধ্যচ্ছদা ব্যবহার করে সঠিকভাবে নিঃশ্বাস নিতে হয়।)

এরকম আরও কয়েকবার করুন, এবং প্রতিবার গুনতে থাকুন আপনি কয়বার নিঃশ্বাস নিলেন। এভাবে বার বার নিঃশ্বাস নেবার ফলে আপনার রক্তে অক্সিজেনের পরিমান বেড়ে যাবে, এবং ধীরে ধীরে আপনি উদ্বেগমুক্ত হতে থাকবেন।

পরামর্শ২: প্রগতিশীলভাবে মাংসপেশীকে নিরুদ্বেগ করতে শিখুন

যখন আপনি গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিতে শিখে গিয়েছেন, তখন সময় শরীরের আরেকটি অংশকে শিথিল ও নিরুদ্বেগ করতে শেখাঃ আপনার শরীরের মাংসপেশীকে। প্রগতিশীলভাবে মাংসপেশীকে নিরুদ্বেগ করতে, আপনাকে শরীরের এক অংশের পেশী থেকে অন্য অংশে যেতে হবে, একটির পর একটি, আস্তে আস্তে প্রত্যাকটিকে প্রথমে টানটান ও তারপরে শিথিল করে।

এই কৌশলটি এই কারনে গুরুত্বপূর্ণ যে, এর সাহায্যে আপনি নিজের শরীরের প্রতিটা মাংসপেশী সম্পর্কে জানতে পারবেন, বিশেষ করে মাংসপেশীর নিবিড়তা ও শিথিলতা সম্পর্কে। যখন আপনি খুব উদ্বেগের মধ্যে থাকবেন, আপনার মাংসপেশীগুলো টানটান হয়ে থাকবে। আপনি যদি নিজের এই পরিবর্তন সম্পর্কে অবগত হন, তাহলে খুব তাড়াতাড়ি আপনি উদ্বেগের চিহ্নগুলো বুঝতে পারবেন; ফলে, দ্রুত নিজের মাংসপেশীগুলোকে নিজে নিজেই শিথিল করে ফেলতে পারবেন।

ব্রিটিশ কলোম্বিয়া’র “উদ্বেগ রোগ এসোসিয়েশন” থেকে প্রকাশিত প্রগতিশীলভাবে মাংসপেশীকে নিরুদ্বেগ করার নিয়মগুলো এখানে দেখে নিন।

পরামর্শ#৩: ধ্যান করতে শিখুন

শরীরে “নিরুদ্বেগ প্রতিক্রিয়া” তৈরি করার জন্য বেশ কিছু বিশেষ ধ্যান রয়েছে। তাদের মধ্যে একটি হল “মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন” বা “মনোযোগ ধ্যান” – অর্থাৎ একটি মুহূর্তে সম্পূর্ণভাবে, শরীর ও মন দিয়ে, উপস্থিত থাকতে পারার অনুশীলন করা। যে সব মানুষ কোন না কোন মানসিক সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য প্রতিদিন কিছুক্ষণের জন্য হলেও “মনোযোগ ধ্যান” করা অত্যান্ত জরুরী।

আমরা প্রথমে যে গভীরভাবে নিঃশ্বাস নেয়ার কৌশলটির কথা বলেছিলাম, তাও আসলে এক ধরণের “মনোযোগ ধ্যান”। কিন্তু ধ্যানের এই পর্যায়ে পৌছাতে নিঃশ্বাস ছাড়াও আরও অন্য উপায় আছে। আমাদের উচিৎ নতুন অবস্থায় প্রথমে নিজেদের নিঃশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখা, তারপর অন্য উপায়ের সন্ধান করা। অন্য উপায়গুলোর মধ্যে আছেঃ নিজের শরীরের সবগুলো সংবেদনের প্রতি মনোযোগ দেয়া, আমাদের আশেপাশের শব্দগুলোর প্রতি মনোযোগ দেয়া, আমাদের মনে যে চিন্তাগুলো এসেছে সেগুলোর প্রতি মনোযোগ দেয়া, এবং সেই মুহূর্তে যা যা হছে সে সবকিছুর প্রতি মনোযোগী হওয়া।

নিরুদ্বেগ হবার আরেকটি খুব কার্যকরী কৌশল হচ্ছে নিজের শরীরকে খুঁটিয়ে দেখার ধ্যান করা। এই ধ্যানের কৌশলে আপনাকে নিজের শরীরের বিভিন্ন অংশগুলোর প্রতি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মনোযোগ দিতে হবে, আলাদা আলাদা করে। এই ধ্যানটিরও অনেক উপকারিতা আছে, এবং এটি শেখার পর আপনি মাংসপেশীকে নিরুদ্বেগ করার অন্য সব প্রগতিশীলভাবে কৌশলও শিখতে পারবেন।

পরামর্শ#৪: যোগব্যায়াম করুন

যোগব্যায়াম বা “ইয়োগা” একটি অত্যান্ত প্রাচীন ব্যায়ামের অনুশীলন যা আমাদের শরীরের জন্য অত্যান্ত উপকারী, বিশেষ করে দুশ্চিন্তা দূর করতে এবং শরীর ও মনকে নিরুদ্বেগ করতে। যোগব্যায়াম আসলে গভীরভাবে ও মনোযোগ সহকারে নিঃশ্বাস নেয়া ও বেশ কিছু ব্যায়ামের আসনের সমন্বয়। এই আসনগুলোর সাহায্যে আমরা আমাদের পুরো শরীরের ও সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতি আলাদা করে মনোযোগ দিতে পারি। আসলে, যোগব্যায়াম উপরে বর্ণনা করা প্রত্যাকটি পরামর্শের একটি সমন্বয়।

যোগব্যায়ামের অনেক উপকারিতা আছে, বিশেষ করে আমাদের শরীরের জন্য। এই ব্যায়াম আমাদের শরীরকে শক্ত করে এবং আমাদের মাংসপেশীগুলোকে দৃঢ় করে। কিন্তু আপনি যদি এই ব্যায়ামে নতুন হন, আপনার উচিৎ হবে একটু সাবধান হওয়া, কারন যোগব্যায়াম ঠিকমত না করতে পারলে আপনি খারাপভাবে আহত হতে পারেন। যদি আপনি যোগব্যায়াম শিখতেই চান, অবশ্যই আপনার আশেপাশের কোন যোগব্যায়ামের কোর্সে ভর্তি হতে হবে। অথবা, অন্তত ইন্টারনেটে যোগব্যায়ামের ভিডিও দেখেও আপনি শিখতে পারেন।

সূত্রঃ ঢাকা কেবিন