আপনার দাম্পত্য সুরক্ষিত তো! 1

আপনার দাম্পত্য সুরক্ষিত তো!

স্বর্গের উদ্যানে সুখে দিন কাটাচ্ছিলেন সৃষ্টির প্রথম মানব-মানবী। প্রেম-ভালোবাসা, সরলতা আর আমোদে-আহ্লাদে কাটছিল সময়গুলো। কিন্তু, সেই সুখের উদ্যানে একদিন প্রবেশ করল কালসাপ। প্রথম মানবীকে জড়িয়ে ফেলল তার মোহজালে। প্রথম মানবী ভুলে গেলেন যাবতীয় সতর্কতা বাণী। তাঁর সাথে একইভাবে পদস্খলন ঘটল প্রথম মানবেরও। খেয়ে ফেললেন তাঁরা নিষিদ্ধ গন্ধম ফল। ফলাফলে, পতিত হলেন মর্ত্যে। সুখ যেন এখন মরীচিকা, দুঃখই সম্বল। এই পতনের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে সেই চিরসুখের উদ্যানে প্রবেশের চেষ্টা করে যাচ্ছে তাঁদের বংশধরেরা। তারই অংশ হিসেবে পৃথিবীতেই স্বর্গউদ্যান তৈরির সুপ্ত আশা নিয়ে সংসার শুরু করেন অসংখ্য দম্পতি। কিন্তু কারো কারো ক্ষেত্রে, সেই সুখের উদ্যানেও প্রবেশ করে কালসাপ, বিচিত্র রকমের কালসাপ। কখনো কালীয় নাগের মতো হাজার ফণা তুলে, আবার কখনো বেহুলার বাসরঘরের মতোই সূক্ষ কোনো এক ছিদ্রপথে প্রবেশ ঘটে তাদের। সুখ হয়ে যায় মরীচিকা, জীবন বিভীষিকাময়।

ইকবাল আর সোহানার দীর্ঘদিনের প্রেম পরিণতি পায় বিয়ের মধ্যে দিয়ে। প্রথম বছরটা মোটামুটি গেলেও দ্বিতীয় বছর থেকে খিটিমিটিটা বাড়তেই থাকে। নিজেদের ক্যারিয়ারের যুদ্ধ, সংসারের টুকিটাকি ঝামেলা-সবমিলিয়ে কিছু কিছু খিটিমিটি ধীরে ধীরে হয়ে উঠল বিশাল ব্যাপার। ইকবালের প্রিয় গান ছিল ‘পৃথিবীর যত সুখ যত ভালোবাসা, সবি যে তোমায় দিব একটাই আশা’। সোহানা আগে রাগ করলে এই গানটা শুনিয়ে দিত বারবার। আর এই গান এখন বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে ইকবালের জন্য। কথায় কথায় ‘এই তোমার সুখ দেয়া’, ‘কী দিতে পারবা তা তো জানি’, ‘গান শুনার বাইরে আর কিছু নেই কপালে আমার’-এই সব শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা ইকবালের। কথার পিঠে কথা আসে। ইকবালও তাই ছেড়ে কথা বলে না। প্রত্যুত্তরে সেও জিজ্ঞাসা করে কী দিয়েছ আমায়? এই কে কী দিয়েছে তার নির্ণয় করতে করতে কখন যে নিজেদের ভিতরের তাল কেটে গেছে আর বুঝতে পারেনি কেউই। যখন বুঝতে পারল তখন বিচ্ছেদ ছাড়া আর গতি নেই। অবাস্তব প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার বাস্তব কষ্ট আর তা মেনে নিতে না পারার আক্ষেপই রূপ নেয় কালসাপের। সেই কালসাপের ছোবলে নীল হয়ে শুধু অপ্রাপ্তি আর হতাশাই সার হয়। সুখভোগ আর হয় না।

জয়িতা আর আমিনুলের বিয়ে হয় পারিবারিকভাবেই। জয়িতা তার নামের মতোই রুচিশীল, উদ্যমী আর প্রাণখোলা। আমিনুল তার পরিবারে একমাত্র উচ্চশিক্ষিত। সেও ভদ্র, শান্ত এবং পরিবার অন্তপ্রাণ। পারিবারিকভাবে বিয়ে হলেও তাই উভয়েই খুব ভালোভাবে মিশে যায় বিয়ের আগের কয়েক মাসের ভিতর। দুজনেরই মনে হচ্ছিল কেন আরো আগে দেখা হয়নি। ভালোভাবেই বিয়েটা হয়ে গেল। দুয়েকদিন যেতেই শুরু হলো সমস্যা। আমিনুল ছাড়া পরিবারের অন্যরা সবাই মোটামুটি শিক্ষিত। নিজেদের নির্ধারিত গন্ডিতেই কেটে গেছে জীবন। তাই, তাদের চিন্তাভাবনার সাথে মিলিয়ে চলা খুব কঠিন। জয়িতার হলো সবচেয়ে বেশি সমস্যা। সে জীবনের যে উদ্দেশ্য, যে জীবনযাপনের পদ্ধতি আজীবন লালন করে এসেছে, নিজের রুচিবোধকে যেই উঁচু তারে বেঁধেছে, তার সাথে এই পরিবারের বাকি সদস্যদের আকাশ-পাতাল ব্যবধান। জয়িতার কাছে খুবই তুচ্ছ মনে হওয়া কত ব্যাপার এদের কাছে চরম গুরুত্বপূর্ণ। সেই সাথে প্রজন্মের পার্থক্য তো আছেই। বেসরকারি বড়ো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে দেখেই জয়িতাকে ঘরে এনেছে এই পরিবার। কিন্তু সেই পর্যায়ের একজন মানুষের যে স্বাভাবিক চলন-বলন তা আর পছন্দ হয় না তাদের। ব্যপারটা অনেকটাই যেন এরকমÑআমিনুলের এমন আয়, বউয়ের চাকরি না করলেই তো চলে। তাও তো আমরা চাকরি করতে বাধা দিচ্ছি না। কিন্তু শাড়ি পরে, মাথায় ঘোমটা দিয়ে যেতে আপত্তি কেন? এই শহরে আমাদের আত্মীয়-স্বজন আছে। তারা যদি রাস্তাঘাটে দেখে আমিনুলের বউ ড্যাং ড্যাং করে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাহলে আমাদের মানসম্মান কি আর থাকে। আর যতকিছুই কর, ঘরের রান্নাটা কে করবে? এইরকম করে ঘুরে বেড়ালে সংসারের কী হবে? ছয় মাস হয়ে গেল এখনো বাচ্চা হলো না কেন? এইরকম বিষয়াদি প্রতিদিনই ঘটতে থাকে রুটিন মাফিক। বিয়ের তিনদিনের মাথায় যেখানে বেড়াতে আসা একজন আত্মীয়া বাচ্চা হবার সুখবর নেই কেন জিজ্ঞেস করতে পারে, সেখানে ছয়মাস তো অনেক লম্বা সময়। বাড়িতে জয়িতা একটা মুখরোচক বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়ে গেল। তার শ্বশুর-শাশুড়িকে অন্যরা উসকে দিতে থাকে, আর তারাও এসব নিয়ে কখনো সরাসরি, কখনো ইশারা-ইঙ্গিতে অতিষ্ঠ করে তোলে জয়িতাকে। ভদ্রতাবোধের কারণে জয়িতা না পারে কিছু বলতে, না পারে সইতে। জানে বলতে গেলেই সংসারে অশান্তি হবে, পরিবর্তন হবে না কিছুই। সে চেপে ধরে শুধু আমিনুলকে। আমিনুলের অবস্থা হয় শাঁখের করাতের মতো। সে উভয়পক্ষকেই ভালোবাসে, বুঝে এবং একসাথে চায়। কখনো এদিকে, কখনো ওদিকে ধামাচাপা দিয়ে শান্ত করতে চায় পরিস্থিতি-কারণ সে দৃঢ়ভাবে কথা বলতে পারে না। পাছে কেউ কষ্ট পায়। যদি কিছু বলেও বা, মা-বাবা ভাবে বউয়ের শেখানো বুলি আওড়াচ্ছে আমিনুল, আগে তো ছেলেটা এমন করত না; আর বউ ভাবে সবসময় শুধু বাপ-মায়ের পক্ষে সাফাই গায়, আমার কষ্ট একটুও বুঝে না। আবার এতদিনের অনেক কিছু তার চোখে স্বাভাবিক থাকলেও এখন বুঝতে পারে-এসব চিন্তাধারায় আসলে সমস্যা আছে। কিন্তু বুঝতে প্রায়ই বিলম্ব হয়। আর তার ফাঁকে ঘটে যায় একের পর এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। কখনো ঠিক করে উঠতে পারে না কাকে ঠিক ধরবে। এভাবেই দিন চলতে থাকে আর অসন্তোষের পাহাড় জমতে থাকে। জয়িতা ভাবে কেন আমিনুল শক্ত হয়ে সত্যকে সত্য, মিথ্যাকে মিথ্যা বলতে পারে না। আমিনুল ভাবে, জয়িতা একটু মানিয়ে চললেই বা এসব কথা পাত্তা না দিলেই তো হয়। এরই মধ্যে একদিন কোনো এক আত্মীয়ার মাধ্যমে শুরু হয় জয়িতার চরিত্র নিয়ে নোংরা কথাবার্তা। প্রায়ই জয়িতার অফিসে চাকরি করা এক নিম্নপদস্থ ব্যক্তির বরাত দিয়ে আমদানি হতে থাকে অফিসে জয়িতা কার সাথে কী করে তারই রসালো বর্ণনা। আমিনুলের কানে প্রথম যখন আসে, তখন সে তীব্র ঘৃণা নিয়ে তাকায় বক্তার দিকে। তার চোখের ভাষা কিছুদিন আটকে রাখে এসব কথাবার্তা। কিন্তু, একেবারে থামে না। ফলে, বিয়ের বছরপূর্তির আগেই আমিনুলের মনে সন্দেহ দানা বাঁধে। রাতের বেলা মন খারাপ ও বিরক্তির কারণে জয়িতার পাশ ফিরে শুয়ে থাকাটা হাওয়া দেয় মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা সন্দেহকে। একদিন অফিসেরই কাজে এক সহকর্মীর সাথে আরেকটা অফিসে যায় জয়িতা। রিকশায় চড়ে একসাথে ফেরার পথে তাদের দেখতে পায় আমিনুল। রাতের বেলা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, ইনিয়ে বিনিয়ে জানতে চায় আমিনুল-অফিসে আজ কী কী করলে। হঠাৎ করে অফিসের ব্যাপারে এত জানতে চাওয়া, তাও আবার অনেক ঘুরপ্যাঁচে-জয়িতার মনে সন্দেহ জাগায়। বাসায় কী কথাবার্তা চলে তা জয়িতাও জানে। তাই, নিরাপদ থাকার সুবিধার্থে সংক্ষেপেই সারে আলাপ। অন্য অফিসে যাওয়ার কথা বাদ দেওয়াটা কিন্তু কাল হয়ে দাঁড়ায় জয়িতার জন্যে, তারই অজান্তে। আমিনুল ধরেই নেয়, জয়িতা আসলে আর তাকে ভালোবাসে না। শুধু সংসারটাই করছে। অন্যদের কথাগুলোই ঠিক। এভাবেই, নিজেদের মধ্যে খোলামেলা আলাপের অভাবে, পারস্পরিক আস্থাহীনতার পরিবেশ তৈরি হয়। সেই সুযোগে তৃতীয় পক্ষের প্ররোচনায় অথবা বিনা প্ররোচনায় ঢুকে পড়ে সন্দেহের কালসাপ। এ বড়ো ভয়ংকর এক কালসাপ। ক্ষুদ্র এক ছিদ্রের সুযোগে ঢুকলেও হাজার হাজার ফণা তার। একদিকে দমন করলে অন্যদিকে ফণা তুলে। তাই, একবার যদি এই সন্দেহ নামক কালসাপ ঢুকে পড়ে, সে যে ধরনের সন্দেহই হোক না কেন, পরিণতি শুধুই কষ্ট। তাই বলা চলে, দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে বড়ো কালসাপটির নাম-সন্দেহ।

নুসরাত আর আরমান-সদ্য ঢাকায় এসেছে। আগে একটা মফস্বল শহরে ছিল তারা। চার বছর বয়সী একটা ছেলেও আছে তাদের। অনেক দেন-দরবার করে আরমান ঢাকায় বদলী হয়ে এসেছে। নুসরাত পুরোদস্তুর গৃহিণী। এতদিন বেশ ভালোই চলছিল। কিন্তু ঢাকায় আসার পর আস্তে আস্তে পাশের বাসার ভাবিদের সাথে আলাপ পরিচয় হল। গল্পে-গুজবে প্রায়ই উঠে আসে শাড়ি-গয়না-আসবাবের গল্প, দেশবিদেশ ভ্রমণের কাহিনী, আরো কত ঠাট-বাটের গপ্পো। শুনে শুনে এক ধরনের হীনম্মন্যতা পেয়ে বসে নুসরাতকে। নিজের কোনো কিছুই যেন পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারে না আর। মফস্বলে থাকতে যেই বিষয়গুলো তাকে ভালোলাগায় ভরিয়ে দিত, সেগুলো এখন হাস্যকর লাগে। ভাবে, কি বোকাই না ছিলাম। নিজের সোফাসেট মনে হয় যেন চকচকে না, ওয়ারড্রবটা যেন পুরোনো, এই ডিজাইনের শোকেস তো মধ্যবিত্তদের ঘরে থাকে, পর্দাগুলো আরো ভারী আরো কুঁচি নিয়ে হতে হবে, বড়ো একটা স্মার্ট টিভি না হলে আর চলে না, ছেলেটার বয়স চার হয়ে গেছে-ইস! কেন যে আর একবছর আগে আসা হলো না। এখন তো ভালো স্কুলগুলো আর নিবে না বোধহয়। এই পাঁচ বছরের বিবাহিত জীবনে দুইবার শুধু কক্সবাজার আর জাফলং। তাও আবার গুষ্ঠিশুদ্ধ ভ্রমণে নিজেদের মতো করে একটু কাছাকাছি হবার সুযোগ ছিল কই? ভাবিদের কাছ থেকে দেখে দেখে ফেসবুকে একটা একাউন্ট খুলে ফেলে নুসরাত। সেই সাথে যেন খুলে গেল এক অচেনা জগতের দুয়ার। কত পুরাতন বান্ধবী, স্বজনের সাথে নতুন করে পরিচয় হলো। তাদের ফেসবুকে দেয়া স্ট্যাটাস, ছবি সব যেন বাঁধভাঙা সুখের পরিচয় বহন করে। আর, নুসরাত ভিতরে ভিতরে কেমন এক ধরনের ঈর্ষায় ভুগে। ধীরে ধীরে ঈর্ষা রূপ নেয় ক্রোধে। কেন আরমান তার চাহিদাপূরণ করে না, কেন তারা ঘুরতে যায় না-এরকম হাজারো কেন নিয়ে ক্রোধে ফুটতে থাকে নুসরাত। আরমান প্রথমে অবাক হয় তার এই পরিবর্তনে, তারপর বুঝাতে চেষ্টা করে, পরে রাগারাগি শুরু করে। রাগের কারণে নুসরাতের অনেক যৌক্তিক দাবিও আর পূরণ হয় না। সেগুলো আবার পরবর্তী সময়ে রাগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এক অন্ধচক্র ঘিরে আবর্তিত হতে থাকে তাদের জীবন। দুজনেরই মনে হতে থাকে ছেলেটা যদি না থাকত তাহলে একদিনেই সব চুকেবুকে যেত। ছেলের দিকে তাকিয়ে বয়ে নিয়ে যায় দাম্পত্য জীবন, কালসাপের বিষে নীল হতে হতে। যে কালসাপ শুধু অন্যের সাথে তুলনা করাতেই ব্যস্ত রাখে, নিজের দিকে তাকানোর সময় দেয় না।

আব্দুল আর মর্জিনার বিয়ে হলো সে অনেক বছর। প্রথম কয়েক মাস বাদ দিয়ে একই নিয়মে কেটে যাচ্ছে জীবন। সকালে মর্জিনা বেরিয়ে যায় গৃহকর্মির কাজে। এই বাসা-ওই বাসা, এই মেস-সেই মেস করে বাসায় আসে, ভাত রান্না করে, ঘরের যাবতীয় কাজ সারে, বিকালে আবার বের হয়, ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যারাত। আব্দুল বেলা হলে উঠে ঘুম থেকে, অনেক সময় নিয়ে দাঁত মাজে, নাস্তা খায়, হেলতে দুলতে বের হয় রিকশা নিয়ে। তবে, রিকশা চালানোর চেয়ে জুয়া খেলা, আড্ডা দেয়া, সিনেমা দেখা এসবেই বেশি সময় কাটে। দুপুরে খেতে এসে যদি কোনো অসুবিধা হয়, তো তুমুল ঝগড়া বাঁধিয়ে দেয়। খেয়ে দুপুরের ঘুম ঘুমিয়ে আবার বের হয়। অনেক রাতে মদ খেয়ে টলতে টলতে ফিরে আসে বাসায়। আর নিয়ম করে বউ পেটায়। তারপর মরা মানুষের মতো ঘুম। ইদানীং মারধরের মাত্রা বেশ বেড়ে গেছে। কারণ, তার নিশ্চিত বিশ্বাস মর্জিনা অন্য কারো সাথে শারীরিক সম্পর্ক করে, যদিও অন্য কেউই তার কথা বিশ্বাস করে না। তারা বরং মর্জিনাকে সহানুভ‚তি দেখায়। আর এটা আব্দুলের সন্দেহকে আরো দৃঢ় করে। এইভাবে চলতে চলতে একদিন মর্জিনাকে বেধড়ক পেটায় আব্দুল। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে কোনোমতে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসে মর্জিনা। আব্দুলকে সবাই বলে মানসিক রোগের ডাক্তার দেখাতে, মদ ছেড়ে দিতে। কিন্তু সে তা করে না। অবশেষে, মর্জিনা আব্দুলকে ত্যাগ করেÑদুটো অবোধ সন্তানকে সাথে নিয়ে। ভেঙে যায় একজোড়া মানুষের স্বর্গসুখের স্বপ্ন-মাদক নামক কালসাপের ছোবলে। মাদকাসক্তি একটা মানসিক রোগ। এরকম আরো কিছু মানসিক রোগেও মানুষের স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ হয়। জীবন হারায় সুখের পরশ।

জামান সাহেবের সুখের সংসার। একমাত্র ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে, আর একমাত্র মেয়ে পড়ছে ডাক্তারী। স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ঠিক যেন সুরা দিয়েই ভরিয়ে রেখেছেন কানায় কানায় জামান সাহেবের জীবনের পানপাত্রটিকে। কর্পোরেট চাকরির মধ্যগগণ পার হয়ে যাওয়া জামান সাহেবের অফিসে একদিন যোগদান করে ছটফটে, প্রাণোচ্ছল এবং বেশ ভালোই সুন্দরী নাজমুন। জামান সাহেবের অধীনে কাজ করতে আসা নাজমুনের এই প্রাণোচ্ছলতা শুরু থেকেই বেশ ভালো লেগে যায় তাঁর। এই কাজ সেই কাজ, একসাথে লাঞ্চ, ব্যক্তিগত কথাবার্তা-এই সবের ফাঁকে ফাঁকে এই ভালো লাগাটা কখন যে উভয়ের কাছে পারস্পরিক ভালোলাগায় বলা চলে ভালোবাসায় রূপ নিয়েছে কেউ টের করতে পারেনি। যখন অনুভব করতে পারলেন তখন যথেষ্ট দেরি হয়ে গেছে। মানসিকভাবে এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে কাটতে লাগল জামান সাহেবের সময়গুলো। একদিকে ভালোলাগা, আকর্ষণ; অন্যদিকে অপরাধবোধ, সামাজিক অসুবিধা, লোকলজ্জার ভয়। আর সবচেয়ে বড়ো কথা, নাজমুনের জীবন মাত্র শুরু আর জামান সাহেবের শেষের দিকে। অতএব, এই সম্পর্কের যে আদৌ কোনো সুখকর পরিণতি নেই-এটা উভয়েই জানেন। হঠাৎ একদিন সুরাইয়া বেগম বিষয়টি জানতে পারেন। শুরু হয় চরম অশান্তি। ছেলেমেয়েদের পৃথিবীটাও যেন টলে উঠে। নিত্যদিন তর্কাতর্কি, মানঅভিমান, দোষারোপ এসবের মধ্যে আটকে যায় পুরো পরিবারটি। এমনই অবস্থা বাইরের কাউকে বলাও চলে না। চার দেয়ালের ভিতর আটকে রাখতে হয় সব। চার দেয়াল তো ঠিকই থাকে, শুধু পরিবারটা আর ঠিক থাকে না। ঘোরলাগানো এক কালসাপের কারণে স্বর্গটা হয়ে উঠে নরকের আরেক নাম।

এখানে যাদের কথা বলা হল তারা সবাই চেষ্টা করছিল একটি সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ার। কিন্তু, কিছু কালসাপ কিছু মানুষের মাথায় আগে থেকেই এমন বিষ ছড়িয়ে রাখে-যেখানে সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ার কোনো ইচ্ছেই থাকে না। যেমন-যৌতুকের জন্য বিয়ে, জীবনসঙ্গীকে মানুষের মর্যাদা না দেয়া, দাম্পত্য জীবনের আসল উদ্দেশ্যই না জানা, চারিত্রিক বা নৈতিক অসততাসহ অনেক কিছুই। এগুলোকেও একেকটা কালসাপ বলা চলে। যারা মানুষের দাম্পত্য জীবনকে বিষিয়ে তুলে। তাই, সতত সতর্ক থাকুন, কোনো কালসাপ যেন আপনার সুখের ঘরে ঢুকে না পড়ে, কোনো ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে। পৃথিবীতেই তৈরি হোক স্বর্গসুখ। কেননা, একটি সুখী দাম্পত্য জীবন মানে একটি সুখী পরিবার, একটি সুখী সমাজ, একটি সুখী রাষ্ট্র।

সূত্রঃ মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিন, ২য় বর্ষ, ৭ম সংখ্যায় প্রকাশিত।

ডা. পঞ্চানন আচার্য্য। স্থায়ী ঠিকানা চট্টগ্রাম। তবে, কলেজ শিক্ষক মায়ের চাকুরিসূত্রে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কেটেছে শৈশব। মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হন পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবং উচ্চ-মাধ্যমিক চট্টগ্রাম কলেজ থেকে। সিলেট এম. এ. জি. ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ থেকে এম.বি.বি.এস পাসের পর সরকারি চাকুরিতে যোগদান করেন। মেডিক্যালে পড়ার সময় থেকেই মনোরোগ নিয়ে পড়ার প্রতি আগ্রহ। তাই, ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্ধারিত সময়ের চাকুরি শেষে ভর্তি হন মনোরোগবিদ্যায় এম.ডি(রেসিডেন্সি) কোর্সে। বর্তমানে তিনি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। বংশপরম্পরায় প্রাপ্ত শিক্ষকতার ধারা বজায় রেখে চিকিৎসক ও শিক্ষক হওয়াটাই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। বই, সঙ্গীত আর লেখালেখিতেই কাটে অবসর সময়ের বেশির ভাগ। স্বপ্ন দেখেন - মেধা ও মননশীলতার চর্চায় অগ্রগামী একটা বাংলাদেশের।