দাম্পত্য-সংঘাত শিশুদের ওপর প্রভাব ফেলে

দাম্পত্য-সংঘাত শিশুদের ওপর প্রভাব ফেলে

বিশ বছরের মুন্না। বন্ধুর সাথে কথা বলতে বলতে হাউমাউ করে কাঁদছিল। বন্ধুর বাসায় তিনদিন ধরে আছে সে। কোনোভাবেই গুছিয়ে বলতে পারেনি কী হয়েছে তার, কেন বাসা থেকে বের হয়ে এসে বন্ধুর বাসায় পড়ে আছে সে। মুন্নার খুব বেশি বন্ধু নেই, দুইতিনজনের মধ্যে এই বন্ধুকেই সে মনের কথা একটু বলে। স্কুল জীবনে একসঙ্গে, তারপর কলেজ আলাদা ছিল, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার একসঙ্গে তারা। বন্ধু অভি একটা বিষয় আন্দাজ করতে পারল যে, বাসাতেই কিছু একটা হয়েছে, কারণ যতবার বাসার কথা জিজ্ঞেস করা হয় বা অভি মুন্নাকে বাসায় নিয়ে যেতে চায় ততবারই কান্নায় ভেঙে পড়ে, না-হয় অস্থির হয়ে যায় মুন্না। অভি এরমধ্যে মুন্নার বাসায় ফোন করে জানিয়ে রেখেছে যে মুন্না তাদের বাসায়। তবে একটা বিষয় অভির কাছে অবাক লাগে যে, মুন্নার মা খবরটা শোনার পর কেবল ‘আচ্ছা, ঠিক আছে’ বলে ফোন রেখে দিলেন। তবে চারদিনের দিন মুন্নাকে তার মা এসে নিয়ে গেলেন। মুন্না ফোঁপাতে ফোঁপাতে বিদায় নিল।

বন্ধু হিসেবে অভি কিছুটা চিন্তার মধ্যে রয়ে গেল। অভির মা-বাবার কাছে একটা কথা শুনে অভির চিন্তা আরো বাড়ল। বাবা জানালেন, ড্রয়িং রুমে তারা স্বামীস্ত্রী একসঙ্গে টিভি দেখছিলেন। সেই সময় মুন্নাকে দেখে তারা ‘কী বাবা, কেমন আছ?’ বলে একসাথে বসে টিভি দেখতে বলেন। মুন্না তখন কোনো উত্তর না দিয়ে বারবার হাত মুঠো করে ও খুলতে থাকে আর বিড়বিড় করে কী যেন বলতে থাকে। অস্পষ্ট কথাগুলোর মধ্যে বারবার এমন কিছু শব্দও শুনতে পান উনারা-‘আমার সাথেই কেন?’, ‘শালার আমারই সব দোষ’, ‘থাকুম না আমি, থাক তোরা’। এসব শুনে অভি চিন্তিত হয়ে বন্ধুকে ফোন করে। ওপাশে রিং বেজে যায় কিন্তু কেউ ধরে না। ভার্সিটিতে ক্লাস বন্ধ, তাই বাসার দিকে ছোটে সে। কিন্তু মুন্নাকে পায় না। জানতে পারে যে মুন্না নাকি হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল তাই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছে তার বাবা-মা। মুন্নার ছোটো ভাই হাসপাতালের ঠিকানা দিতেই দ্রুত ছুটে যায় অভি।

সেখানে গিয়ে মুন্নার বাবা-মার কাছে একটা শীতল আচরণ পায় সে। উনারা কোনোভাবেই অভিকে কথা বলতে দিতে নারাজ। অভি বহু কষ্টে বন্ধুর ফাইল জোগাড় করে দেখে নেয়। একটা বিষয় দেখে খুশি হয় যে, একজন মনোরোগ চিকিৎসককে ডাকা হয়েছে এবং উনি মুন্নার সাথে আলাদাভাবে কথা বলতে চেয়েছেন। অভি আন্দাজ করে নিল যে উনিও মুন্নার বাবা-মার অসহযোগিতাপূর্ণ আচরণই পেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত মুন্না আলাদাভাবে কথা বলতে পারে এবং তার আচরণের প্রেক্ষাপটগুলো জানাতে পারে।

মুন্নার বাবা-মার মধ্যে পারস্পরিক একটা দ্বন্দ্ব ছোটবেলা থেকেই মুন্না দেখে আসছে। ওর বাবার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে উনি ঘরে প্রচন্ড রেগে গিয়ে স্ত্রী এবং সন্তানকে গালিগালাজ এবং মারধর করলেও বাইরের কেউই কিছু বুঝতে পারবে না। মুন্নাকে প্রায়ই তার বাবা শাসান যে তাকে বাইরে বের করে দেবেন। মায়ের সাথে মুন্নার সম্পর্ক অনিশ্চয়তার। মুন্নার শুধু ভয় লাগে যে, মাকে বাবা মেরে ফেলবে। এই অনিশ্চয়তা ছোটবেলায় তার কাছে একটা সত্য ছিল আর এখন এই ভয়টা নিয়ে নিজের কাছে তার নিজেকে হাস্যকর লাগে। মুন্নার ছোটোভাই সম্পর্কে সে জানায় যে, ছোটোভাই এসবে গা করে না, তার অনেক বন্ধু, বিভিন্ন কাজ এবং সে মুন্নার মতো নিজেকে দায়ী করে না বাবা-মায়ের খারাপ সম্পর্কের জন্য। কিন্তু মুন্নার শুধু মনে পড়ে, তার মা বিভিন্ন সময়ে এই কথাটা নিজের আত্মীয়দের বলতেন যে, ছেলেটার মুখ চেয়ে এই সংসারে পড়ে আছেন। এখনো পর্যন্ত মুন্নার কাছে মনে হয় মায়ের যাবতীয় কষ্টের জন্য দায়ী সে। সতেরো বছর বয়সের পর থেকে মুন্না ঘরে বেশ প্রতিবাদী হইয়ে ওঠে। বাবাকে সে জবাব দেয়, বাবা-মার গায়ে হাতও তোলে। মা’র বিষয়েও তার অভিযোগ যে মা তাকে বেশি আঁকড়ে রেখে বাইরের জগৎ থেকে আলাদা করায় সে নির্ভার হতে পারেনি কখনো। বন্ধুত্ব সে ভয় পায়, মনের কথা খুলে বলতে পারে না, অস্তিত্বের সংকটে ভোগে।

অভির বাসায় যেদিন চলে এসেছিল তার আগে বাসায় খুব ঝামেলার পর সে বের হয়ে বন্ধুর বাসায় যায়, কিন্তু বন্ধুকেও ভরসা করতে পারেনি। বাসায় এসে একইরকম থাকে বাবার আচরণ, বরং তার গায়ে হাতও ওঠায় বাবা। সেই সময় প্রচন্ড অসহায় বোধ নিয়ে কখন মাথা ঘুরে ওঠে এটা তার মনে নেই। হাসপাতাল থেকে বাসায় যেতে চায় না মুন্না কিছুতেই। চিকিৎসকদের ক্রমাগত অনুরোধ করে তার বাবা-মাকে বলতে যে, তারা যেন তাকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দেন। যেদিন ছুটি লেখা হয় সেদিন সে হাউমাউ করে কেঁদে অভিকে শক্ত করে ধরে রেখে তার বাসায় গেলেই শুধু হাসপাতাল ছাড়বে-এই শর্ত আদায় করে নেয়। বাবা তাকে অনেকবার ‘কী পাগলামি হচ্ছে এটা!’ বললেও সে একই আচরণ করতে থাকে। মুন্নার সমস্যাগুলোর গোড়ায় আছে তার বাবা-মার পারস্পরিক সংঘাতময় সম্পর্ক।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, সন্তানরা যখন পিতামাতার দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পরিবেশে বেড়ে ওঠে তখন তাদের আবেগীয় গঠনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দাম্পত্য সম্পর্কে ঝগড়াঝাঁটি, অশান্তি, অসহযোগিতা, দ্বন্দ্ব থাকতে পারে। কিন্তু সেগুলো মিটে গেলে, সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে গেলে সেটা সন্তানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না। বরং পারস্পরিক কোনো দ্বন্দ্ব যখন বাবা-মায়েরা মিটিয়ে ফেলতে পারেন তখন সন্তান সেখান থেকে সামাজিক দক্ষতা শিখতে পারে। কিন্তু যদি বাবা-মায়ের মধ্য দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে তাহলে সন্তান অসহায় বোধ করে। বাবা-মায়ের দাম্পত্য সম্পর্কের ধরনের বিষয়ে অনেক ছোটবেলা থেকেই সন্তানরা ধারণা তৈরি করে। অসহযোগী এবং সংঘাতময় পরিবেশ তাদের অতি সতর্ক, উদ্বিগ্ন করে তোলে। পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ আচরণকে ভুলভাবে গ্রহণ করে, যার ফলে সামাজিকভাবে তারা পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে না। পিতা-মাতার দাম্পত্য সম্পর্কে অনিশ্চয়তা থাকলে সন্তানের মানসিক বিকাশেও তা বাধা দেয়। দম্পতির মধ্যে বারবার সম্পর্কচ্ছেদের হুমকি, আলাদা থাকা, একে অপরের সাথে কোনো যোগাযোগ না থাকা এরকম আচরণ সন্তানের সামনে চলে আসতে থাকলে বিপর্যস্ত হয় সন্তানের মনোজগৎ। ব্যক্তিত্বের বিকাশে বাধা পড়ে, নিজেও সম্পর্কের ক্ষেত্রে হয়ে উঠে উদ্বিগ্ন, অনিশ্চিত। ভাষা বিকাশে, আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হয় সন্তানের। সংঘাত এড়াতে যদি একজন চুপ করে থাকেন, নিস্পৃহ থাকেন তাতেও সন্তানের ওপর পরবর্তীকালে নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায়।

পৃথক পৃথক গবেষক এই বিষয়ে আলোকপাত করে দেখিয়েছেন যে, অন্তর্মুখী সন্তান, আচরণগত সমস্যা আছে এমন সন্তান বাবা-মায়ের দ্বন্দ্বের জন্য নিজেকে দায়ী মনে করে। এরকম সন্তানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব বেশি পড়ে। পর পর দুই প্রজন্মকে বৈজ্ঞানিকভাবে লক্ষ করে দেখা গেছে, এরকম সন্তান নিজেদের দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অদক্ষ থাকে এবং যেই ধরনের আচরণ বাবা-মাকে করতে দেখেছে তেমনটাই করে ফেলে নিজেদের সন্তানকেও সমস্যায় ফেলে। পিতা-মাতার নিজেদের সুস্থ, সুন্দর, সহযোগিতাপূর্ণ দাম্পত্য সম্পর্ক সন্তানের মানসিক বিকাশে খুব গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিন, ১ম বর্ষ, ৭ম সংখ্যায় প্রকাশিত

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতাল, মগবাজার