মানসিক রোগ নিয়ে সচেতন না হলে...

মানসিক রোগ নিয়ে সচেতন না হলে…

“….সাঙ্গোপাঙ্গ, সারমেও, শুকর পুঙ্গব সকল তাদের ভন্ড কবিরাজ আর ল্যাংটা বাবার গুনকীর্তন করবে, দল বেঁধে হাত তুলে কোরাস তুলবে তাদের পক্ষে ‘বাবা বাবা’ বলে…” মানসিক রোগ নিয়ে সচেতন না হলে…, মানসিক রোগ নিয়ে সচেতন না হলে কি হবে? অথবা মানসিক রোগ নিয়ে সচেতনতার আদৌ কোন প্রয়োজন আছে কিনা? এ বিষয়ে কিছুটা লেখার ইচ্ছা পোষণ করছি। কারণ অনেক জ্ঞানী গুনে মহাজ্ঞানী! বলেন ‘মানসিক রোগ আবার রোগ নাকি! এগুলো সব ভাওতাবাজী’।

দেখুন, মানসিক রোগ নিয়ে সচেতন না হলে তার প্রভাব সব ক্ষেত্রেই পড়বে। পারিবারিক সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রেই পড়বে। আপনি যদি মানসিক রোগ নিয়ে না’ই জানেন তাহলে আপনি বুঝবেন না যাকে আপনি ভালোবাসেন, যাকে আপনি মান সম্মান মর্যাদা দিয়ে সবার উপরে তুলে ধরছেন তিনি কি আসলেই তার যোগ্য? নাকি তার মধ্যে মানসিক কোন সমস্যা আছে? তার কি চিকিৎসা দরকার? আর এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি না বুঝলে ধ্বংস আপনার জন্যে অনিবার্য। পৃথিবীর অনেক দেশের রাজা-বাদশা, সম্রাট, মানসিক বিকারগ্রস্ত ছিলেন বলে সেসব দেশ আজও তার খারাপ পরিণতি বয়ে বেড়াচ্ছে। এসব বড় বড় বিষয় নিয়ে কথা বলছিনা। সামান্য বিষয় নিয়ে আলোকপাত করি।

মানসিক রোগ নিয়ে সচেতন না হলে কি হবে? সবচেয়ে বড় অসুবিধা হবে আপনার আশে পাশে কবিরাজ আর ফুঁ- বাবাদের দৌরাত্ম বেড়ে যাবে। হাঠে মাঠে ঘাঠে ব্যাগ হাতে এমবিবিএস ডাক্তার আর দৌড়াবে না। লোটা আর কম্বল হাতে ফুঁ- বাবা আর কবিরাজদের আনাগোনা দেখা যাবে। কারন দেশে মানসিক রোগী ভয়াবহ আকারে বাড়ছে। তারা হাঠে মাঠে ঘাঠে সে সব মানসিক রোগীদের চিকিৎসা করবে। আপনি হাসছেন তাতে আমার কি? আমিতো মানসিক রুগী না, ডাক্তার না, সাধারণ একটা মানুষ। আমার বিপদ কেনো হবে? হ্যা বিপদ আপনার হবে। কারণ এই সব লোটাবাটি ওয়ালা কবিরাজ আর ফুঁ-বাবারা এক সময় মানসিক রোগের পাশাপাশি অন্য রোগেরও চিকিৎসা করবে। তারা ক্যন্সার হাঁপানি ডায়বেটিস টিউমার সব রোগের চিকিৎসা শুরু করে দেবে। তারা সংখ্যা থাকবে প্রচুর। আপনি থাকবেন অজ্ঞ। তাদের ভুয়া আধ্যাত্মিকতার সাথে আপনি বা আপনার স্বজন পেরে উঠবে না। তারা চিকিৎসা করবে হাতির মতো ফুঁ-দিয়ে, বিশাল বিশাল জনসভা করে। তারা মাইক টাইসনের মতো কিল ঘুষি দিয়ে অথবা ম্যারেডোনার মতো লাথি গুতো দিয়ে চিকিৎসা করবে আপনার বা আপনার আত্মীয়ের টিউমার, ক্যান্সার, ডায়বেটিস, হাঁপানি । আর সেসব ভালো ও হবে কারন তাদের প্রেক্টিসে থাকবে ফিফটি ফিফটি শেয়ারিং। “ফুঁ” বাবদ “ফি” এর শেয়ার বিজনেস থাকায় তাদের ‘সাঙ্গোপাঙ্গ’, ‘সারমেও’, ‘শুকর পুঙ্গব’, সকল ল্যাংটা বাবা বা কবিরাজ বাবার গুনকীর্তন করবে, দল বেঁধে হাত তুলে কোরাস তুলবে তাদের পক্ষে ‘বাবা বাবা’ বলে। তাদের প্রচার প্রোপাগান্ডা থাকবে বেশি। ফলোয়ার থাকবে বেশি। তারা টুসি মেরে পেটের টিউমার বার্স্ট করবে। আপনি না পেরে যাবেন সার্জারী ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার বলবেন টিউমার বার্স্ট হয়েছে অপারেশন করতে হবে। অপারেশন আনসাকসেসফুল হবে। কবিরাজ, ফুঁ – বাবা’রা বলবে, “আমিতো ফুঁ- দিয়া, ঘুষি দিয়া, লাথি দিয়া তোমার টিউমার ভুত’রে ভ্যানিস করে দিসি.., তোমরা সবাই স্বাক্ষী, কারন যাবার সব তার পেটের টিউমার মিলায়া গেসিলো। তাইনা? ডাক্তার না মাইরা ফেলছে অপারেশন করতে গিয়া। ডাক্তারের কাছে গেছো কে?”। তার কথাই মানুষ বিশ্বেস করবে। জানেন কেনো? কারণ ঐ যে বললাম, তারা সংখ্যায় থাকবে অনেক অনেক বেশী। আর তারা উপর নীচে সারমেয় আর শুকর সব ম্যানেজ করে চলবে।

তাই আসুন ফ্লুপেনথিক্সল মেলিট্রাসিন আর হাংকি বাংকি ছেড়ে দিয়ে নিজে মানসিক রোগ নিয়ে সচেতন হোন। অন্যকে সচেতন করুন। “মানসিক রোগ কি রোগ নাকি?!! সব ভাওতাবাজী!!” এ ধরনের চিন্তা চেতনা পরিহার করুন।

উন্নত বিশ্বে সবার আগে প্রাধান্য দেওয়া হয় মানসিক স্বাস্থ্য কে। আমেরিকাতে কিন্ডারগার্টেন স্কুলে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে পড়াশোনা শুরু করা হয়েছে এখন। ইউরোপের একটা ছোট বাচ্চাকে একজন ময়লা কাপড় চোপড় পরা ল্যাংটা “সিজোফ্রেনিয়া” রোগী দেখিয়ে দিয়ে যদি বলেন, “এটা কি?” সে বলবে, “সে ঘোরতর মানসিক রোগে ভুগছে”। আর অজ্ঞতার জন্যে আমাদের দেশে ছোট কেনো, অনেক বুড়ো এমন কি অনেক শিক্ষিত লোক প্রথমেই বলবে, “মনে হয় আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ওয়ালা কোন এক মহান সাধক বাবা এসেছেন”। তারা তার বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ধুয়ে প্রথমেই এক গ্লাস পানি খেয়ে নিবে। অন্যকেও খেতে বলবে। আর এর একমাত্র কারণ মানসিক রোগ নিয়ে অজ্ঞতা।

ডা. সাঈদ এনাম সহকারী অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজে।