আত্মহত্যা, কুসংস্কার: বৈজ্ঞানিক তথ্য

আত্মহত্যা, কুসংস্কার: বৈজ্ঞানিক তথ্য

‘আত্মহত্যা’ শব্দটি শুনলেই আমাদের অনেকের মাথায় সাধারনভাবে চলে আসে ‘এটা কি কথা বলার মতো কোনো বিষয়!’, ‘খেয়েদেয়ে কাজ না থাকলে এসব করে মানুষ।’, ‘আজকালকার ঢং।’, ‘ভীরু কাপুরুষের কাজ!’ আবার অনেকের মাথায় আসে ‘এটাই সমাধান’, ‘আর পারছি না-নিজেকে শেষ করাই ভালো’। কেউ শব্দটা শুনলেই আঁৎকে ওঠেন, কেউ চুপচাপ থাকবেন কিন্তু বিরক্ত হবেন। কেউ এই বিষয়ে কথা বলতেই চান না। কোনো পরিবারে যদি আত্মহত্যার ঘটনা থাকে তাহলে তারা নিজেরাই সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন সেটা লুকিয়ে রাখতে নইলে বিভিন্ন রকম হয়রানির শিকার হন। প্রচন্ড শোকে কাতর বাবা-মা চেষ্টা করেন আড়ালে কান্নাকাটি করতে, ঘটনার একটা বর্ণনা তৈরি করতে যাতে মৃত আত্মাকে অন্তত পরিচিত কেউ অপমান না করতে পারেন। এই অবস্থার পেছনে কাজ করে আমাদের কিছু ধারণা। এই ধারণাগুলোর পেছনে বৈজ্ঞানিক, বিশ্লেষণধর্মী ব্যাখ্যা না থাকলেও সমাজে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে, চটকদারিত্বের জন্য, সমস্যা থেকে আমাদের পালিয়ে থাকা বা সমস্যা এড়িয়ে যাওয়া অধিকতর পছন্দের কাজ হওয়ার জন্য ধারণাগুলো টিকে থাকে। দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের সমাজে কারো জীবনে একবার আত্মহত্যার চিন্তা মাথায় আসলে অথবা চেষ্টা করে থাকলে তাকে সেই ঘটনা দিয়েই চিহ্নিত করে ফেলা হয়। কিন্তু আত্মহত্যার চিন্তা বা চেষ্টা কোনো ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য নয়, বরং এটা নির্দেশ করে যে ব্যক্তিটি প্রচন্ড কষ্টে আছেন এবং তার সহায়তা এবং চিকিৎসা দরকার। আত্মহত্যা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলো সেই সহায়তা এবং চিকিৎসা থেকে ব্যক্তিকে দূরে রেখে দেয়। এই লেখায় বহুল প্রচলিত ভুলধারণাগুলো নিয়ে পাঠককে বলার চেষ্টা করব।

ভুল ধারণা : আত্মহত্যার চিন্তা কেবল মানসিক রোগাক্রান্তদেরই আসে।

তথ্য : অনেক মানসিক রোগীরই আত্মহত্যার চিন্তা আসে না। অপরদিকে যতজন আত্মহত্যা করেন তাদের সবার মানসিক রোগ থাকে না। গবেষণায় পাওয়া যায়, মানসিক রোগাক্রান্তদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা মানসিক রোগাক্রান্ত নয় এমন মানুষদের তুলনায় ৩-১২ গুন বেশি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই জীবনের চলমান সংকট যেমন সম্পর্কজনিত জটিলতা, আইনগত সমস্যা, ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়া, কোনো জটিল/দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক রোগ, নিকটজনের মৃত্যু, গৃহহীন হয়ে পড়া, যৌন নির্যাতন, আর্থিক সংকট এগুলোও একজন ব্যক্তিকে আত্মহত্যার দিকে নিয়ে যেতে পারে। ২০১৮ সালে ভারতের মহারাষ্ট্রে ৬০০০০ কৃষক আত্মহত্যা করেন বীজের উচ্চমূল্য এবং মাথার ওপর ঋণের বোঝার জন্য। ২০১৭- ১৮ সালে বাংলাদেশে হাওড় অঞ্চলে প্রচন্ড বন্যায় সব ফসল হারিয়ে কৃষকদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা বেড়ে যায়।

ভুল ধারণা : কোনো ব্যক্তি যদি একবার আত্মহত্যার চিন্তা করেন বা চেষ্টা করেন তাহলে আজীবনই সেটা থাকে।

তথ্য : গবেষণায় দেখা যায়, তীব্র আত্মহত্যার চিন্তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বল্পস্থায়ী এবং নির্দিষ্ট অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে। দেখা যায় যথাযথ সহায়তা, চিকিৎসা পেলে এই পথটার চিন্তা অনেকেই আর করেন না। একবার আত্মহত্যার চেষ্টা থেকে বেঁচে ফিরে এসে একজন ব্যক্তি সুন্দর, সফল জীবনযাপন করতে পারেন। আমেরিকার সানফ্রান্সিস্কোর ইতিহাস বিখ্যাত গোল্ডেন গেট ব্রিজ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যার চেষ্টাকারীদের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বেঁচে যাওয়া ২৯ জনই এরকম মনোভাব জানিয়েছেন যে, শূন্যে থাকা সেকেন্ডের কমসময়ে তাদের মাথায় এসেছিল-‘এটা জীবনের সবচেয়ে বাজে পদক্ষেপ’ এবং প্রত্যেকেই ঐ মুহূর্তে বাঁচতে চেয়েছিলেন। ড. স্ট্যাসি ফ্রিডেনথাল তাঁর একটি গবেষণাপত্রে দেখিয়েছেন, এই ব্রিজ থেকে লাফ দেয়ার চিন্তা করে পিছিয়ে যাওয়া ৫১৫ জনের মধ্যে কেবল ৭% পরবর্তীতে আত্মহত্যা করেছিল। অর্থাৎ বেশিরভাগই পরবর্তীতে আত্মহত্যার চিন্তা বা চেষ্টা করেননি।

ভুল ধারণা : বেশিরভাগ আত্মহত্যাই হঠাৎ করে ঘটে, কোনো সতর্কতা কিংবা বিপজ্জনক চিন্তা ছাড়াই।

তথ্য : বেশিরভাগ আত্মহত্যার আগেই ব্যক্তি কিছু লক্ষণ প্রকাশ করেন। এটা হতে পারে কথাবার্তার মাধ্যমে, হতে পারে আচরণে। অনেক ব্যক্তি এই লক্ষণগুলো তাদের নিকটজনদেরই শুধু এটা জানান। অনেক কারণেই নিকটজনেরা এগুলো এড়িয়ে যেতে পারেন বা না বুঝতে পারেন; যেমন বিষণ্ণতা, নিজেকে গুটিয়ে নেয়া, খামখেয়ালি আচরণ, নিরাশ হয়ে ওঠা, হঠাৎ মেজাজের পরিবর্তন, দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া এরকম পূর্বাভাস। যেই কারণে ধারণাটা তৈরি হয় যে, আত্মহত্যাটি হঠাৎ করেই কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই হয়েছে।

ভুল ধারণা : আত্মহত্যা যারা করে তারা স্বার্থপর এবং কাপুরুষ।

তথ্য : আত্মহত্যা করার পেছনে কারণ এটা নয় যে মানুষটা বাঁচতে চায় না, বরং তারা যন্ত্রণা শেষ করতে চায়। যেই ব্যক্তি আত্মহত্যার চিন্তা করছেন তিনি গভীর যন্ত্রণার ভেতরে থেকে নিরাশায় ভুগছেন। তারা আসলে ‘স্রেফ নিজেরটা দেখছে’ এরকম নয়, বরং তারা কোনো মানসিক রোগে ভুগছেন অথবা জীবনে কোনো সংকটে আছেন। ‘কাপুরুষ’, ‘স্বার্থপর’ হিসেবে দূরে ঠেলে দিলে তাদের সাহায্য চাওয়ার পথ বন্ধ করে দেয়া হয়।

ভুল ধারণা : আত্মহত্যার বিষয়ে কথা বলা মানে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়া অথবা উৎসাহিত করা।

তথ্য : আত্মহত্যার সাথে অনেক নেতিবাচক ধারণা জড়িয়ে থাকায় বেশিরভাগ মানুষই এই বিষয়ে কথা বলতে চান না। কিন্তু আত্মহত্যা নিয়ে কথা বললে শুধু যে এই বিষয়ে নেতিবাচক ধারণা কমে তাই নয় এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সহায়তা নিতে পারেন, তাদের চিন্তাভাবনা অন্যরকমভাবে যাচাই করে দেখতে পারেন এবং নিজেদের ঘটনা অন্যদের জানিয়ে সাহায্য করতে পারেন।

ভুল ধারণা : আত্মহত্যার প্রবণতা জ্বিন ভূতের আসর।

তথ্য : আমাদের দেশে মানসিক সমস্যার মতো আত্মহত্যার প্রবণতাও জ্বিন ভূতের আসর মনে করা হয় এবং দেখা যায় আসল সমস্যা একই জায়গায় থেকে যায় আর কবিরাজ, ওঝার পকেট ভারী হতে থাকে। জ্বিন তাড়ানোর নামে অনেকরকম অত্যাচারও চলে। যার ফলে ব্যক্তি আরো সমস্যায় পড়ে যান। যেখানে সমস্যা হচ্ছে যৌতুকের কারণে গৃহবধূটি অত্যাচারিত হয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে, তারপর উদ্ধার হয়ে পরবর্তীতে জ্বিনের ডাকের জন্য পরিবারের সদস্যরা কবিরাজের কাছে তাকে নিয়ে গেছে। একসময় নিরুপায় হয়ে আবারো আত্মহত্যার চেষ্টা করে ফেলছে।

আত্মহত্যা নিয়ে ভুল ধারণাগুলো দূর করে এই বিষয়ে কথা বলা, ঝুঁকিতে থাকা মানুষটিকে দূরে না ঠেলে দিয়ে সহায়তা করার চেষ্টা শুধু যে একজনের প্রাণ বাঁচাতে পারে তাই নয়, সমাজকে এবং সংশ্লিষ্টবিজ্ঞানকেও সমৃদ্ধ করতে পারে। তাই জটিল এই বিষয়টি নিয়ে প্রচলিত ধারণায় গা না ভাসিয়ে আরো জানার এবং বোঝার চেষ্টার শুভকামনা থাকল পাঠকের প্রতি।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতাল, মগবাজার