করোনাকালে নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য

করোনাকালে নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য

করোনাকালীন সময়ে লকডাউন থেকে হঠাৎ করেই কর্মজীবী নারীরা কিভাবে সাংসারিক কাজ ও পরিবার সামলানোর বাড়তি চাপ নিচ্ছে এতে কি কি ধরনের মানসিক সমস্যা হতে পারে বলে মনে করছেন?

:করোনাকালীন সময়ে সবকিছুর যে পরিবর্তন হয়েছে এটার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল না। হঠাৎ করেই লকডাউন এর মত সিদ্ধান্ত আসলে অনেকেই মেনে নিতে পারেনি। কি করবো না করবো, কি হবে, কিভাবে চলবো, বাসায় কি খাবে, কাজের চাপ বেড়ে যাবে কিনা, এই যে একটা আতংক। এর জন্য অনেকের মধ্যে এনজাইটি তৈরি হচ্ছে, হাত ধোয়ার ব্যাপারে অনেকের মধ্যে অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার (ওসিডি) তৈরি হচ্ছে। নিজে বার বার হাত ধুচ্ছে, পরিবারের অন্য সদস্যদের হাত ধুতে বাধ্য করছে। অনেকে খুব আতংকিত, হতাশা হচ্ছে। আতংকিত হয়ে রাতে বার বার ঘুম থেকে জেগে উঠছে, উদ্বিগ্নতা তৈরি হচ্ছে। অনেকে বেশি আতংকিত থাকার কারণে ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হচ্ছে, বাসার ভিতরে বাহিরে যেখানেই যাচ্ছে না কেন তার করোনা হবে, এমনটা ভাবছে। তারা স্বাভাবিক জীবনে যাওনের মধ্য দিয়ে যেতে পারছে না। অনেক মহিলা প্রেগন্যান্ট আছে, তারা সারাক্ষণ চিন্তায় থাকে, কোন সমস্যা হলে চিকিৎসা পাবে কিনা, এসবের জন্য বিভিন্ন স্ট্রেস তৈরি হয়। এসবের জন্য স্ট্রেস রিলেটেড যত সমস্যা আছে, আস্তে আস্তে সেগুলো বাড়তে থাকে।

ছুটি শেষে কর্মজীবী মায়েদের কাজে ফিরতে হচ্ছে আবার ঘরে এসে বাচ্চা সামলানো এসময়গুলোতে তারা কিভাবে মানসিক ভাবে দৃঢ় থাকতে পারে?

:হঠাৎ করেই চলে আসা পরিবর্তনগুলোর জন্য আতংকিত না, সর্তক হতে হবে। আতংকিত হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে।নিজের স্বাস্থ্যবিধি সঠিকভাবে মেনে চলা, অন্যকে সহায়তা করা,নিজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো। আর নিজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য স্টেস ফি থাকতে হবে। পরিবারের সদস্যদের সহায়তা নেয়া, কাজ ভাগ করে নেয়া যেতে পারে। দিনের কিছু সময় বের করে রিলেক্সজেশন করা, খাদ্য তালিকায় সুষম খাবার রাখা, নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া। এসব কিছু মানসিক প্রশান্তিতে রাখতে সহায়তা করবে।

মহিলাদের ক্ষেত্রে মানসিক সমস্যার অনেক ঝুঁকি থাকে, একজন্য জৈবিক উপাদান নাকি জৈবিক ও সামাজিক দুটি উপাদানই দায়ী?

:বিভিন্ন কারণ মিলিয়েই কিন্তু মানসিক সমস্যা হয়। খুব কম মানসিক সমস্যা আছে শুধু একটা কারণে হয়। মানসিক সমস্যার জন্য দায়ী থাকতে পারে- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, আত্মবিশ্বাস, যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা জন্য অ্যাবিলিটি কম থাকতে পারে। জীবনের কোন একটি ক্ষতি, চাপ, সোশ্যাল ফ্যাক্টর, বায়োলজিক্যাল ফ্যাক্টর, জীবনের প্রতিটি ধাপ, যেমনঃ একটি মেয়ে যখন কিশোরী অবস্থায় যায়, বিয়ের ক্ষেত্রে, শ্বশুর বাড়িতে, মাতৃত্বকালীন সময় এসব প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি মেয়ে পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি চাপ নিয়ে থাকে। একটা সময়ে এসব চাপ না নিতে পারলে একটা দীর্ঘমেয়াদী মানসিক সমস্যায় পড়ে যায়। জৈবিক ও সামাজিক উপাদান গুলোও যে এক্ষেত্রে অনেকটা দায়ী সেটা বুঝায় যাচ্ছে

মেয়েদের ক্রমশ বিকাশের ক্ষেত্রে যে স্ট্রেস এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়, ছেলেদের থেকেও ভিন্নভাব, এক্ষেত্রে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আপনার কাছে কেমন ধরনের মহিলারা মানসিক সমস্যা নিয়ে আসেন?

:পরিবার থেকেই ছোটবেলা থেকে মেয়েদের ভিন্ন আঙ্গিকে বোঝানো হয় ছেলেদের থেকে তারা ভিন্ন। মেয়েরা ক্রমশ বিকাশের মধ্য দিয়ে একটি মানসিক চাপে থাকে। সেটা অনেকটা পরিবারের অনুশাসনের কারণে চাপা থাকে। কিন্তু মেয়েদের ও আবেগ আছে, সেই আবেগ যদি ঠিকমত প্রকাশ করতে না পারে তাহলে সে মানসিক কোন সমস্যায় ভুগতে পারে। আগে থেকেই একটা কুসংস্কার ছিল, মেয়েদের সাথে যাই’ই ঘটুক না কেন মুখ বুঝে সহ্য করা, কিন্তু এখন কিছুটা কম হলেও পুরোপুরি না। একটা সমতা আনতে হবে। পরিবারে মা বাবা ছেলে মেয়েদের তফাৎ না বুঝিয়ে একটা গুড পেরেন্টিং এর মাধ্যমে অনেক সমস্যার সমাধান আনতে পারেন।

ছোটবেলা অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ করে মেয়ে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে সেক্সুয়াল অ্যাবইউজ এর কথা শোনা যায়, সেক্ষেত্রে মা বাবার রোলটা কিরকম হওয়া উচিত বা কি ভূমিকা পালন করবে তারা?

:গুড প্যারেন্টিং সম্পর্কে আগে ভালোমতো বুঝতে হবে। সবার ক্ষেত্রে সমস্যা হয় না, যদি হয়ে থাকে তাহলে সেটা কিভাবে মোকাবেলা করবে ছোটবেলা থেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে, বাচ্চার সাথে মা বাবার সম্পর্ক ভালো হতে পারে। পরিবারের বাচ্চাদের গুরুত্ব বোঝাতে হবে, বাচ্চাকে সময় দিতে হবে। মা বাবাকে ঐ জায়গাটা তৈরি করতে হবে যাতে বাচ্চা তার সব সমস্যা সহজে বলতে পারে। বাচ্চাদের বিশ্বাস করাতে হবে যে মা বাবা সব সময় তাদের পাশে আছে। সত্যতা বিচার করে মা বাবা কে তাদের পাশে বিশ্বাস স্থাপন করাতে হবে। সমতা, সমঝোতা, সঠিক শিক্ষা, গুড পেরেন্টিং এর কোন বিকল্প নেই।

বিশেষ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে মেয়েদের প্রেগন্যান্সির সময় এবং পিরিয়ডের সময় মুড সুইং হয়, সেক্ষেত্রে পারিবারিক সমস্যা হয়, সেক্ষেত্রে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় মুড সুইং এর ব্যাপারটা?

:আসলে এক্ষেত্রে হরমোনাল ব্যাপার থাকে। হরমোনের কারনেও এরকম পরিবর্তন হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে মুড সুইং এর ব্যাপারগুলো হয় বায়োলজিকাল। এক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়ে পাশে থাকতে হবে। তাকে বুঝতে হবে।

মাতৃত্বকালীন সময়ে নতুন মায়েরা অনেক সময় অনেক চিন্তা বা হতাশায় থাকে এক্ষেত্রে কিছু বলুন।

:এটা একটা ন্যাচারাল প্রসেস। অনেক সময় বিয়ের পর মাতৃত্বকালীন সময়ে একটা কাউন্সেলিং নিতে পারে। রেগুলার চেকআপ এর মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যের ও যত্ন নিতে পারে। চিন্তা মুক্ত থেকে নিজেকে সুস্থ রাখার সাথে বাচ্চার ব্যাপারগুলো দেখবে। পরিবারের সহযোগিতায় নতুন মায়েদের ক্ষেত্রে সুস্থ থাকার জন্য যা যা করনীয় প্রয়োজনমত করে নিতে পারে।

আফটার মেনোপজ একজন মহিলা বা বয়স্ক মহিলার কি ধরনের মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে?

:এটাও একটা হরমোনাল ব্যাপার। এটা নিয়ে অনেকে ডিপ্রেশনে থাকে, চিন্তায় থাকে, শারীরিক পরিবর্তনের সাথে সাথে আতংকিত থাকে, দাম্পত্য জীবন নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করে। সে তার নরমাল জীবন থেকে দূরে চলে যাচ্ছে ভেবে আতংকিত থাকে। এটা একটা নরমাল ব্যাপার, এটা মেনে নিয়ে সুন্দর মত হ্যান্ডেল করে নিতে পারে। এটা নিয়ে হতাশা হওয়ার কিছু নেই। যদি প্রয়োজন মনে করে তাহলে সে কোন মনোচিকিৎসকের পরামর্শ নিতপ পারে।

বয়স্ক যাদের অন্য রোগ আছে করোনাকালীন সময়ে তাদের জন্য কি সাজেশন দিবেন?

:তাদের সে রোগের চিকিৎসা সব সময় এর মত চালিয়ে যেতে হবে। ভিটামিন সি যুক্ত খাবার, সুষম খাবার খেতে হবে। পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে তাহলে তার ইউমিনিটি বাড়বে। আর স্ট্রেস ফ্রি থাকলে শারীরিকভাবে তারা আরও বেশি সুস্থ থাকবে। ইউমিনিটি ঠিক থাকলে সব ধরনের রোগের বেলাই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে।

বয়স্ক অনেকে আছে করোনার ব্যাপারে মানতে চাচ্ছে না, বাসায় থাকছে না, আবার অনেকে আছে এতো বেশি ভয় পাচ্ছে যে বাসার লোকদের প্যানিক করে তুলছে এর থেকে উওরণের উপায় কি?

:বয়োজ্যেষ্ঠ হলেই যে সবাই ভালো বুঝবেন তা না, তাকে সুন্দর মত ভালোমত বুঝাতে হবে, বাসায় থাকার সুবিধাগুলো। হরমোনাল কারণেও তাদের আচরণে পরিবর্তন আসে, ঐসময় তাদের পাশে থেকে ঠান্ডাভাবে বুঝাতে হবে। আর যারা প্যানিক হচ্ছেন প্রতিনিয়ত করোনার নিউজগুলো না দেখে একবার দেখলো, বাসায় অন্যান্য কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকলো। আতংকিত যাতে না হয়ে যায় পরিবারের লোকদের ধৈর্য ধরে আশস্ত করা।

বাচ্চাদের মোবাইল আসক্তি কিভাবে কমানো যায়?

:বাচ্চার মোবাইল এর প্রতি আসক্তি এটা শুধু একার বাচ্চার দোষ না। এটা মা বাবাকে শুরুতেই খেয়াল রাখা উচিত। বাচ্চাকে আদোও মেবাইল দেয়া যাবে কিনা, দিলে কোন বয়সে দিতে হবে। শুরুতেই নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাচ্চাকে মোবাইল এর সম্পর্কে ধারনা দিতে হবে। বাচ্চাকে সময় দিতে পারে, খেলাধূলা, বাসার ছাদে গিয়ে আড্ডা। একটা নির্দিষ্ট সময় এর জন্য শুধু ব্যবহার করতে দেয়া যেতে পারে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে মা বাবাকেই মোবাইল এর সঠিক ব্যাবহার সম্পর্কে ধারনা দিতে হবে।

করোনা রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, মানুষ যে অসচেতন, এটা কি আমরা তাদের বুঝাতে পারছি না, নাকি তারা বুঝতে পারছে না? 

:আসলে এ ব্যাপারটা যারা বুঝতে চায় না তারাই ভালো বলতে পারবেন। এটার দায়তো আসলে কাউকে ঐভাবে দেয়া যাবে না। নিজের সুস্থ থাকা, পরিবারের সুস্থ থাকার দায়িত্ব নিজেদরই নিতে হবে। কেউ যদি বুঝতে না চায় তাদের বুঝানো কঠিন। নিজেদের পদক্ষেপ নিজেদেরই নিতে হবে। সব দায় সরকার বা রাষ্ট্রের নয়।

করোনার পরবর্তী সময়ে মানসিক স্বাস্থ্যের উপর একটা প্রভাব আসতে চলেছে, এক্ষেত্রে আগে থেকেই আমরা কিভাবে সচেতন হতে পারি?

:অবশ্যই মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কাজ করতে হবে। আগে থেকেই যারা মানসিক রোগী তাদের নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যাবে। আর যারা নতুন সমস্যায় ভুগছেন তারা সেইজন্য সেবা নেয়া শুরু করতে পারেন। সবচেয়ে বড় কথা নিজেকে সময় দিতে হবে। রিলেক্স থাকতে হবে,মাইন্ডফুলনেস থাকতে হবে। ভীতি হওয়া যাবে না৷ ফিজিক্যাল এর সাথে মানসিক স্বাস্থ্যের ও গুরুত্ব দিতে হবে। যার যেভাবে ভালো লাগে সে ভাবে নিজেকে রিলিভ করে নিতে পারে।

বি. দ্র এটি: একটি অনলাইন টক শো’তে চাইল্ড এ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট সাইকিয়াট্রিস্ট অধ্যাপক ডা. নাহিদ মাহজাবিন মোর্শেদ এর সাক্ষাৎকার এর শ্রুতিলিখন।

মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে চিকিৎসকের সরাসরি পরামর্শ পেতে দেখুন: মনের খবর ব্লগ
করোনায় মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক টেলিসেবা পেতে দেখুন: সার্বক্ষণিক যোগাযোগ
করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
করোনায় সচেতনতা বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও বার্তা দেখুন: সুস্থ থাকুন সর্তক থাকুন

https://www.youtube.com/watch?v=sMBR-Xy2ce8&t=19s