মূল পাতা / মনস্তত্ত্ব / হিটলারের মনস্তত্ত্ব

হিটলারের মনস্তত্ত্ব

হিটলার কি এগ্রেসিভ? দুর্দান্ত খেপাটে? মোহগ্রস্ত, আত্মকেন্দিক্র? নাসির্সিস্টিক? নাকি সব সময় প্রচন্ড অ্যাংসাস বা উদ্বিগ্ন ছিলেন? তার ক্যারিশমেটিক জীবনের পেছনেই বা কী রহস্য? কেমন প্রেমিকই বা ছিলেন হিটলার?

মার্চ মাসে জন্ম নেওয়া এডলফ হিটলারের ব্যক্তিত্ব,মনস্তত্ত্বের দিকে যাওয়ার আগে আমরা একটা গল্প শুনে নিই- একটা বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে যে গল্পের শুরু- চার বছর বয়সী একটা ছেলে এক শীতের সকালে বরফের কুয়োতে পড়ে গেল। বেঁচে থাকার প্রাণান্ত চেষ্টার পরেও যখন ছেলেটির ছোট ফুসফুস পানি ও ঠান্ডার সাথে কুলিয়ে উঠতে পারছিল না, তখনই দেবদূতের মতো আবির্ভাব হলেন এক ভদ্রলোক। ছেলেটিকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচালেন। ভয়ানক এক অভিজ্ঞতা থেকে ফিরে এসে ছেলেটি যখন তার পাশে দাঁড়ানো অভয় দিতে থাকা ভদ্রলোককে দেখল, সে একটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ করলো। সেটি হলো- তার পাশে দাঁড়ানো লোকটির পোশাক, একটা সাদা আলখাল্লা। একটু বড় হতেই ছেলেটি বুঝতে শিখল ধমর্যাজকরা এমন সাদা আলখাল্লা পরেন, তাই ছেলেটিও পণ করল সে এমন সাদা আলখাল্লা পরা ধমর্যাজক হয়ে মানুষের উপকার করে বেড়াবে। ১৮ বছর বয়সে ছেলেটি জানতে পারল তার মায়ের শরীরে বাসা বেঁধেছে জীবনঘাতী ক্যান্সার। ছেলেটি তার পরিবারের আথির্ক দৈন্যতার ও মায়ের চিকিৎসার বিষয়টি পক্রাশ করল অদ্ভুতভাবে। মানুষ দেখল, রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটা কিশোর নিজের আঁকা চিত্রকর্ম বিক্রি করছে। কেন? মায়ের চিকিৎসার জন্য। আবার এক পর্যায়ে এসে দেখা গেল, একসময় ধমর্যাজক হতে চাওয়া ছেলেটির নাম সত্যিই নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীতদের তালিকায় আছে! আর্শ্চযজনক হলেও সত্য- সুন্দর সকাল যেমন সবসময় সুন্দর দিনের পূর্বাভাস দেয় না, ঠিক তেমনই সুখকর অতীত সবসময় সুন্দর আগামীর কথা বলে না। কারণ, এতক্ষণ যার শৈশব-কৈশোর-যৌবনকালের কথা বলা হচ্ছিল, তিনি আর কেউ নন, এডলফ হিটলার। যাকে বলা হয় ইতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি। অনেকের মুখে অশুভ ও ঘৃণার সাথে উচ্চারিত হয় তার নাম, অনেকে আবার সাফাই গান তার মতাদর্শের।

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় তার মতাদর্শ নয় বরং তার ব্যক্তিত্ব মনোদৈহিক দিকগুলো নিয়ে। অথচ সেগুলো নিয়ে আলোচনা করতে গিয়েই আমাদের সামনে বারবার চলে আসবে দ্বিতীয় বিশযুদ্ধ- তার মতাদর্শসহ নানা আনুষঙ্গিক দিক। বলা হয়ে থাকে, ‘পরাজিতের ইতিহাস লিখে শত্রু আর জয়ীর চাটুকার।’ তাই শত্রু যখন পরাজিতের ইতিহাস লিখবে তখন তাতে যে ঐতিহাসিক সত্যটি সবসময় থাকবে তা কিন্তু নয়। কারণ কোনো কোনো মিথ্যাকেও সত্য হিসেবে অনেকক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা যায়। এছাড়াও আমাদের মনে রাখতে হবে, দিন শেষে হিটলার ছিলেন পরাজিতের দলে। অতএব বতর্মান পৃথিবীতে হিটলারের বিপক্ষে বিজয়ী দলের ইতিহাসে হিটলারের অবদানটি যে সঠিকভাবে বণির্ত সেটিও নির্দ্বিধ নয়। তবুও আমরা নানা তথ্য-উপাত্তের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে হিটলারের মনস্তাত্ত্বিক একটা রূপ ব্যাখ্যা আকারে দাঁড় করাতে পারি। ইতিহাসের নানা দিক পরির্বতন ও অজানা বিষয় গোচরে আসা সাপেক্ষে এই ব্যাখ্যাও হয়তো বা পরির্বতনীয়।

তবে শুরুটা হোক একটা কাল্পনিক ঘটনাপব্রাহ ও কথোপকথন দিয়ে, যার মাঝামাঝি থাকবে ঘটনা প্রবাহের দ্রুত বিশ্লেষণ এবং শেষে থাকবে উপসংহার। অফিস অব স্ট্র্যাটেজিক সাভির্সেস (ওএসএস)-এর পরিচালক বিল ডেনোভান অনেকক্ষণ যাবৎ নিজের কক্ষে একাকী পায়চারি করছেন। মে মাসের আকাশ দেখা যাচ্ছে তার জানালার ওপাশে। একটা গুমোট ভাব যেন জুড়ে আছে সারা আকাশটায়। সময়টা ১৯৪৩। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে চলেছে চারপাশে। দরজায় শব্দ হলো। ভেতরে ঢুকলেন মধ্যবয়সী আরেক ভদ্রলোক।

-‘ওহ মি. ল্যাংগার!’ হেসে অভ্যর্থনা জানালেন ডেনোভান। ‘আপনারই অপেক্ষা করছিলাম।’ একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে ল্যাংগার সকৌতুকে জিজ্ঞেস করলেন,

-জরুরি তলব কেন?

-সাহায্যের জন্য। জবাব দিলেন ডেনোভান।

-অবশেষে সাইকোএনালিস্টের সাহায্য স্পাই সার্ভিসে দরকার পড়ল!

-অস্বীকার করার উপায় নেই কারণ আপনার সাবজেক্ট স্বংয় ‘এডলফ হিটলার’।

হ্যাঁ, হয়তোবা এমনই কথোপকথন ছিল ওএসএস (বর্তমান সিআইএ)-এর চিফ ডেনোভানের সাথে সাইকোএনালিস্ট মি. ল্যাংগারের, যা পরবর্তীতে উন্মোচিত করেছিল ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়। যে মানুষটি মানবসভ্যতার এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় ও ভয়ংকর যুদ্ধ শুরুর নেপথ্যে ছিলেন, সেই জার্মান লৌহমানব এডলফ হিটলারের আগুন চোখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কিছু অন্ধকারকে আলোর সামনে নিয়ে আসায় যে অধ্যায় অবদান রেখেছে।

১৯৪৩ সালের শুরুর সময়টায়ও অক্ষশক্তির কাছে নাজেহাল হচ্ছিল মিত্র বাহিনী। এরমধ্যেই জার্মান সেনাবাহিনী প্রবেশ করেছে রাশিয়ায়, হিটলারকে থামানোর জন্য সম্ভাব্য সব পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে মিত্রবাহিনীর সদস্যদেশগুলো। যুদ্ধের এমন অবস্থায় ওএসএস জানতে চায় হিটলারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্বন্ধে। এরজন্য প্রোপাগান্ডা মেশিন হটিয়ে সাধারণ মানুষ হিটলারের নানা চারিত্রিক দিক ও সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করতে ওএসএস ডেকে পাঠিয়েছে একদল সাইকোএনালিটিস্টদের। যারা পাঁচ মাস পরে একটি রিপোটর্ও জমা দিয়েছিল ওএসএস অফিসে। কী ছিলো সে রির্পোটের? কোন মনস্তত্ত্বীয় দিকগুলোর কারণে হিটলার হয়ে উঠেছিলেন নৃশংস ও ভয়ানক? জানতে হলে ফিরে যেতে হবে অনেক আগের প্রেক্ষাপটে- ফুয়েরারের ‘ফুয়েরার’ হয়ে ওঠার আগের জীবনটায়।

হিটলারের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ল্যাংগার বেছে নিয়েছিলেন ফ্রয়েডের বিশ্লেষণ-পদ্ধতিকে। যার শুরুটা হয়, হিটলারের ক্যাস্টেশ্রন এংজাইটিতে ভোগার সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে। ক্যাস্টেশ্রন এংজাইটি হচ্ছে এমন এক ধরনের মানসিক অবস্থা যেখানে একজন বালক তার যৌনাঙ্গ নিয়ে ভীত হয়ে ওঠে। ল্যাংগার হিটলারের নিজের রচিত বই মাইন ক্যাম্ফ (Mein kampf)-এ বারবার ‘সিফিলিস’ শব্দটির অতি প্রয়োগ দেখে ধারণা করেন- হিটলার শৈশবকাল থেকে ক্যাস্টেশ্রন এংজাইটিতে ভুগছিলেন। হিটলারের শৈশবকাল থেকে উঠে আসে- তার বাবা দ্বারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার নানা অভিজ্ঞতা। এর ফলে হিটলার শৈশবে জন্মদাতা পিতাকে ঘৃণার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন তার মায়ের ওপর। যাকে ফ্রয়েডীয় ভাষায় ‘ইডিপাস কমপ্লেক্স’ বলা হয়। বাবার প্রতি তীব্র বিদ্বেষ তাকে ঠেলে দেয় মায়ের প্রতি এই অসচেতন নির্ভরতার দিকে; এই ইডিপাস কমপ্লেক্স। অপরদিকে সে সময়ের যৌনমনস্তাত্ত্বিক এই পরিবতর্নকালে বাবাকে ভয় পাওয়া নিয়ে হিটলারের তৈরি হয় ক্যাস্টেশ্রন এংজাইটি। যা পরবর্তীকালে তার চিন্তা-চেতনায় প্রভাব বিস্তার করে। যার প্রমাণ এই ‘সিফিলিস’ শব্দটাকে আত্মজীবনীতে বারবার ব্যবহার করা।

ফ্রয়েডীয় বিশ্লেষণের আরেকটি পর্যায়ে দেখা যায়- হিটলারের নৃশংসতার কারণ হিসেবে ল্যাংগার তুলে এনেছিলেন শৈশবে যৌনমনস্তাত্ত্বিক বিকাশের ‘এনাল ফেজ’-এ হিটলারের অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতাকে। এ বিশ্লেষণটি গতি পায় যখন ল্যাংগার ও তার সহযোগীরা দেখা পান হিটলার পরিবারের একসময়ের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ফেড্ররিক ব্রচের। ব্রচের দেয়া তথ্য থেকে তাঁরা এডলফের মায়ের শুচিবায়ুতা সমন্ধে জানতে পারেন যা এডলফকে পরবর্তী সময়ে এনাল রিটেন্টিভ ব্যক্তিতে পরিণত করেছিল। ফ্রয়েডের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এনাল রিটেন্টিভ ব্যক্তিদের নৃশংস, যৌনস্পৃহাহীন অথবা যৌনবিকৃত (পারর্ভাট) বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়। যার প্রমাণ পাওয়া যায়, হিটলারের হোমোসেক্সুয়ালিটি বিষয়ক বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে বা বান্ধবী ইভা ব্রাউনের সাথে তার দৈহিক সর্ম্পক স্থাপণের অদ্ভুত বণর্না থেকে।

ল্যাংগারের মতে, হিটলার তার মানসিক অসঙ্গতিগুলো ঢাকার জন্য বেছে নিয়েছিলেন ‘এন্টি সেমিটিজম’ আদর্শ। যা থেকেই পরবর্তীতে সৃষ্টি হয় হলোকাস্ট। ভাইদের মৃত্যুর পরেও হিটলার তার নিজের বেঁচে থাকাকে ‘বিশেষ উদ্দেশ্য পূরণের জন্য’ বলে ধরে নিয়েছিলেন। ফ্রয়েড যাকে ‘মসীহা কমপ্লেক্স’ বলে নামকরণ করে গেছেন আগেই। এই ‘মসীহা কমপ্লেক্স’ -এর ছায়া দেখা যায় হিটলারের উচ্চাভিলাষী সিদ্ধান্ত, একরোখা মানসিকতা ও নিজেকে ভুলের ঊর্দ্ধে দাবি করা থেকে। যেমন- ১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি তৃতীয় রাইখের সময় হিটলার দম্ভ ভরে বলে ওঠেন, ‘এ রাইখ হাজার বছর বেঁচে থাকবে।’ ল্যাংগার ও তার সহযোগীরা হিটলারের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের পর, হিটলারের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তগুলো কেমন হতে পারে তার কিছু সম্ভাব্য বর্ণনাদেন। যেমন :

১. যুদ্ধে চাপে পড়া মাত্রই হিটলার জনসম্মুখে আসা বন্ধ করে দেবেন। পরবর্তীতে রাশিয়ায় জার্মান বাহিনীর পরাজয়ের পর হিটলারকে জনসম্মুখে খুব কম দেখা যায়।

২. ক্যাস্টেশ্রন এংজাইটি, মসীহা কমপ্লেক্স ছাড়াও পারসোনালিটি ডিজঅর্ডারে ভোগা হিটলার যুদ্ধের পরিণাম বিজয় অথবা মৃত্যু এই দুই শব্দের মধ্যে ভাগ করে নেবেন।

৩. পরাজয় বরণের চেয়ে হিটলার বরং আত্মহত্যা করবেন। হিটলারের ভবিষ্যৎ কমর্কান্ড ও আচরণবিধি সর্ম্পকে ল্যাংগার ও তাঁর টিম প্রদত্ত প্রতিটি সম্ভাব্যতা সত্য প্রমাণিত হয়েছিল এবং ১৯৪৩ এর ঠিক দু-বছর পর ১৯৪৫-এ হিটলার পরাজিত হয়ে নিজ বাংকারে আত্মহত্যা করেন।

এ বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা জয়ী শক্তির নথিপত্র থেকে পাওয়া। ইতিহাসের একটা পাঠ তাই এভাবে হিটলারকে বিশ্লেষণ করাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করিয়ে দেয়। অন্যদিকে আগাগোড়া একটা শিল্পসত্তার অধিকারী, প্রকৃতি প্রেমিক, পশু প্রেমিক, স্বজাতির প্রতি তীব্র ভালোবাসায় আবদ্ধ, আধুনিক জার্মানির সূচনালগ্নের কারিগর হিসেবে হিটলারকে যখন আমরা দেখি, তখন আমরা অনেকটা দ্বিধায় পড়ে যাই। তবে রক্তের হোলি খেলায় মত্ত হিটলার যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলেন হিংস্রতার থাবায় সেটা প্রমাণিত। যা তাকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় অপরাধী হিসেবে দাঁড় করানোর জন্য যথেষ্ট।

সূত্র: মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিন, ১ম বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যায় প্রকাশিত।