নভেরা আহমেদ 1

নভেরা আহমেদ

অলৌকিক নয়, লৌকিক বাস্তবতা

নভেরা আহমেদ একজন ভাস্কর্য শিল্পী। তাঁর প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী হয়েছিল ১৯৬০ সালে ৭ আগস্ট, কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগার প্রাঙ্গনে। ‘ইনার গেজ’ শিরোনামের প্রদর্শনীটি শুধু বাংলাদেশই নয়, গোটা পাকিস্তানেই ছিল কোনো ভাস্করের প্রথম একক প্রদর্শনী। তিনি শিল্পীবন্ধু হামিদুর রহমানের সাথে শহীদ মিনারের নকশা প্রণয়নের কাজ করেছিলেন।

নভেরা আহমেদ ১৯৫১ সালে ক্যাম্বার ওয়েল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটসের ন্যাশনাল ডিপ্লোমা ইন ডিজাইনের মডেলিং ও স্কাল্পচার কোর্সে ভর্তি হন। ১৯৫৫ সালে নভেরার প্রত্যয়ন পত্রে তাঁর অধ্যক্ষ ড. ক্যারেল ফোগে (Dr. Karelvogel) লিখেছিলেন-

Her studies from life show a strong sense of observation and certainly there is originality and depth of thought in her compositions. Her portrait heads are full of life. Though in general working in the European way Miss. Ahmed’s sculptures show how indelible is the unconscious influence of
Eastern monumentality and traditions…The personality developed here well, I am convinced, become a fine artist and inspiring teacher, given the necessary help and opportunity.

নভেরা মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন পাশ্চাত্য শিক্ষা ও নিজ শেকড়ের মধ্যে। এদেশের সহজলভ্য উপকরণ, যেমন: সিমেন্ট, প্লাস্টার, কাঠ ইত্যাদিকে সমন্বয় করেছেন কাজে।

নভেরা আহমেদের কাজের বিষয়বস্তু ঘুরেফিরে মানুষ- মানুষের সংগ্রাম, দেশ-সংস্কৃতি; কিন্তু তাতে সংমিশ্রিত হয়েছে আন্তর্জাতিকতাবোধ। পরিবার, মা, শিশু নিয়ে তিনি বেশ কিছু কাজ করেছেন। গরু এসেছে তার কাজে। বুদ্ধ এসেছে শান্তির বার্তাবাহক হিসেবে।

কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরের দেয়ালে নভেরা আহমেদের ১৯৫৭ সালে করা একটি হাই রিলিফ ম্যুরাল ভাস্কর্য এখনও রয়েছে। আগ্রহীরা দেখতে যেতে পারেন জাতীয় জাদুঘর প্রাঙ্গনে বহিরাঙ্গন ভাস্কর্যটিও। এগুলোতে সাবলীল রেখা,
আলিক স্পেস নিয়ে তাঁর নিরীক্ষার দেখা মেলে।

নভেরা আহমেদ এদেশের প্রথম বহিরাঙ্গন ভাস্কর্য স্থাপনের স্বীকৃতির দাবিদার। এই ভাস্কর্যটি ১৯৫৮ সালে তেজগাঁয়ে তদানীন্তন শিল্পপতির বাসস্থানের আঙিনায় ‘কাউ অ্যান্ড টু ফিগার্স’ শিরোনামে স্থাপিত হয়। পরবর্তীতে তিনি এটি জাতীয় জাদুঘর-কর্তৃপক্ষকে প্রদান করেন।

এই প্রবন্ধে নভেরা আহমেদের ভাস্কর্যের শিল্পগুণ বিচার ও বিশ্লেষণ মূল লক্ষ্য নয়। বলা যেতে পারে- দু শো বছরের উপনিবেশিকতা, দেশ ভাগ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর সামরিক শাসনের নিষ্পেষণ, ধর্মীয় মৌলবাদের মাথাচাড়া দিয়ে উঠবার প্রক্রিয়া- অর্থাৎ ঐতিহাসিকভাবে সমস্ত প্রগতিশীলতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার দ্বিধাদ্বদ্বের মধ্য দিয়ে একজন বিরলপ্রজ শিল্পীর মনস্তত্ত্বের আলোক ফেলাই এই আলোচনার উদ্দিষ্ট।

নভেরা আহমেদ আমাদের গর্ব করবার মতো একটি জায়গা। যদিও দেশের প্রতি তাঁর অভিমান ছিল মনে করা হয় এবং ৬০ দশকের শেষে তিনি দেশান্তরী হন নিজ ইচ্ছায় এবং একেবারে নিভৃত আড়ালে নিজেকে রেখেছেন। একটা সময় পর্যন্ত এটিও জানা যায়নি যে, আদৌ তিনি বেঁচে আছেন কিনা? দীর্ঘ সময় পর ১৯৯৫ সালের মার্চে প্যারিসে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত কে এম সেহাবুদ্দিন সম্পর্কে নভেরার মামাতো ভাইয়ের মাধ্যম জানা যায় যে, নভেরা আহমেদ বেঁচে আছেন। প্যারিসে আছেন। বিয়ে করেছেন তাঁরই এক বন্ধু গ্রেগোয়া দ্য ব্রুনসকে। সেখানে নিভৃতে কাজ করে গেছেন। ২০১৪ সালের ১৪ জানুয়ারি নভেরা আহমেদের একটি একক প্রদর্শনীও হয়।

আজকে থেকে প্রায় ৭৮ বছর আগে তিনি পাকিস্তানে কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের আমন্ত্রণে সেখানে জাতীয় প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে শিশু-দার্শনিক নামে একটি ভাস্কর্যের জন্য প্রেসিডেন্ট পুরস্কার পান। তিনি পাকিস্তান গিয়েছিলেন এই আশায় যে- যেখানে ধনপতি ব্যবসায়ীরা তাঁর কাজ কিনবেন, অর্থনৈতিক দৈন্য ঘুচিয়ে স্বাধীন শিল্পী হিসেবে তিনি কাজ করে যেতে পারবেন। যেহেতু, এদেশে তিনি বেশ অর্থকষ্টে চলছিলেন। শিল্পী রফিকুন নবী লিখেছেন, ১৯৬৪ সালের আগে পর্যন্ত নভেরাই ছিলেন একাকী ভাস্কর। অর্থাৎ ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে পথিকৃতের আসনটি তাঁর। অথচ নভেরা ১৯৭০ সালে ব্যাংককে ভাস্কর্য প্রদর্শনী করেন। সেখানেও প্রশংসিত হন। কিন্তু একজন শিল্পীর টিকে থাকবার জন্য কি ব্রুশিয়ারে ভালো ভালো লেখাই যথেষ্ট? নাকি নিত্য জীবনে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য অন্যদের সহযোগিতাও প্রয়োজন? বিভিন্ন লেখায় উঠে আসা তাঁর জীবনচার, সাজপোষাক, স্বাধীনচেতা স্বভাব, অনুসন্ধিৎসুমন, কঠোর পরিশ্রম করবার ক্ষমতা সেই সময়ের তথাকথিত নারী সমাজের সাথে যে বেমানান ছিল সেটা ২০১৮ সালেও বুঝতে কারো কষ্ট হবার কথা নয়।

সুতরাং, পুরুষতান্ত্রিকাতর ক্লিশে চরিত্রের বিশ্লেষণও প্রয়োজন একজন নভেরা আহমেদের গুরুত্ব বুঝবার জন্য। আহমেদ সজীবের ‘নভেরা বৃত্তান্ত’-এ নভেরা আহমেদের সাথে ফোনালাপের একটি অংশের বর্ণনায় জানা যায়, সুস্থ হলে একবার দেশে ফিরতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর আর দেশে ফেরা হলো না। ২০১৫-এর ৬ মে ফ্রান্সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু কী এমন ঘটেছিল নভেরা আহমেদের মনের জগতে যে কারণে তিনি নিজ দেশ থেকে স্বেচ্ছানির্বাসনে গেলেন? এমনকি পরিবারের সাথেও সম্পর্কচ্ছেদ করতে বাধ্য হলেন?

লেখাপত্র ঘেঁটে অনুমান করা যায়- নভেরা আহমেদের সত্যানুসন্ধান, নিরীক্ষামূলক শিল্পমন, ব্যক্তিগতভাবে স্বাধীনচেতা মনোভাব, সৌন্দর্য, বুদ্ধিদীপ্ততাই হয়তো তাঁর জীবনটাকে বিরামহীন সংগ্রামক্ষেত্রে পরিণত করেছিলো? এখানে উল্লেখ করার প্রাসঙ্গিক যে, ১৯৯৮- এ বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের উদ্যোগে নভেরার একটি একক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। যেটি সম্পর্কে ভাস্কর সমালোচক লালা রুখ সেলিম লিখেছিলেন, ‘১৯৬০ থেকে ১৯৯৮ দীর্ঘ ৩৮ বছর। এতদিন পর আবার ঢাকা নগরীতে হচ্ছে নভেরার একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী, আবার সেই একই কাজ। তবে বোর শিল্পকর্মগুলো ভাঙা, দুমড়ানো, মোচড়ানো, চল্টা উঠে যাওয়া। এতোদিনের অবজ্ঞা অবহেলা সেগুলোতে ফুটে উঠেছে পরিষ্কার।’ নভেরা আহমেদের মৃত্যুর পর জাতীয় জাদুঘরে ২০১৫ তে আরেকটি প্রদর্শনী আয়োজিত হয়।

পুনশ্চ লালারুদা সেলিমের ১৯৯৮ এর লেখার সমপটভূমি- অযত্ন অবহেলা যেন নভেরা আহমেদের প্রাপ্তি। অবশ্য বৃহৎভাবে বললে, এদেশে শিল্প ও শিল্পীর প্রতি যথার্থ সম্মান সহযোগিতার সংস্কৃতি তৈরি হয়নি। আসলে, নভেরা আহমেদ এবং এস.এম. সুলতান দু’জনই এতটাই মৌলিক যে তথাকথিত শিল্প প্রতিষ্ঠান বা বলয় তাঁদের ওজন বুঝে উঠতে পারেননি। শুধু ফ্যান্টাসাইক-ই করা হয়েছে তাঁদের। মর্যাদা দেয়া হয়নি। দু জনই কলকাতা আর্ট কলেজ কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও শিল্প চিন্তার বহু দূর সীমানা অতিক্রম করে গিয়েছেন। ফলে নভেরা আহমেদকে খুঁজে পাওয়া যায়নি স্বাধীন বাংলাদেশের শিল্প বিষয়ক কোনো বই অথবা দীর্ঘ বা নাতিদীর্ঘ কোনো তালিকা অথবা আলোচনায়। শহীদ মিনারের নকশার অন্যতম রূপকার হিসেবে তাঁর শ্রম কোনো অর্থ বহন করেনি ইতিহাসবেত্তাদের কাছে! হয়তো সে অভিমানেই তিনি নিজেকে নির্বাসিত করেছেন।

জাতি হিসেবে আমরা সত্যিই দুর্ভাগা যে, যথাযথ আন্তরিকতায় আমরা করতে পারিনি ব্যক্তি নভেরা আহমেদের মনোজগতের তলানির খোঁজ, তাঁর শিল্পীসত্তার যোগ্য সমাদর।

লেখক: জাফরিন গুলশান

সূত্র: মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিন, ১ম বর্ষ, ৩য় সংখ্যায় প্রকাশিত।