মূল পাতা / জীবনাচরণ / মন প্রতিদিন / বাস্তবতাকে মেনে নেয়ার মানসিকতাই মুক্তি দিতে পারে বার্ধক্যের হতাশা থেকে

বাস্তবতাকে মেনে নেয়ার মানসিকতাই মুক্তি দিতে পারে বার্ধক্যের হতাশা থেকে

মুহাম্মদ আব্দুল হালীম; ৪৫ বছর শিক্ষকতা করেছেন। ছিলেন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সহ-সভাপতি। অবসর নিয়েছেন ১৩ বছর আগে। কর্মময় একটি জীবন পার করে এখন কেমন আছেন, জীবনকে কীভাবে দেখছেন, প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া পৃথিবীর সাথে কীভাবে জীবনকে মেলাচ্ছেন এসব নিয়েই কথা বলেছেন মনের খবরের সাথে।

কেমন আছেন?
হ্যাঁ ভালো আছি।

এখন আপনার কত বয়স?
৮৩ বছর।

ক’জন ছেলেমেয়ে আপনার?
ছয়জন ছেলেমেয়ে।

কেউ কি কাছে থাকে?
না কাছে থাকার সুযোগ নেই কারো। কর্মসূত্রে একেকজন একেক জায়গায় থাকে।

সময় কাটে কীভাবে?
আল্লাহর ইবাদত করি- নামাজ পড়ি, পেপার পড়ি, কোরআন শরীফ পড়ি এভাবেই সময় কাটে।

একাকীত্ব কাজ করে?
না তেমনভাবে কাজ করে না।

হতাশা কাজ করে?
কখনো কখনো কাজ করে।

কী নিয়ে হতাশা কাজ করে?
সন্তানদের বিভিন্ন সংকটের কথা ভেবে তাদের জন্য হতাশা কাজ করে। কখনো কখনো শারীরিক অসুস্থতাগুলোর জন্যও হতাশা বোধ কাজ করে।

আপনার জীবন নিয়ে কি আপনি পরিতৃপ্ত?
হ্যাঁ পরিতৃপ্ত। ছেলেমেয়েদের কথা যখন চিন্তা করি খুব ভালো লাগে। আল্লাহতায়ালা ছেলেমেয়েদের নিয়ে আমাকে খুব শান্তিতে রেখেছেন। কাউকে কাউকে দেখি ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে কত আঘাত পাচ্ছে। কিন্তু আমি কখনো ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে আন্তরিক কোনো কষ্ট পাইনি, এখনো পাচ্ছি না। এটা আমাকে খুব শান্তি দেয়।

এখন দেখি শিক্ষকদের মধ্যে ছাত্র-ছাত্রীদের উপযুক্ত শিক্ষা দেয়ার মানসিকতাই নেই। এটা খুব কষ্ট দেয়। আমি উগান্ডাতে দেখেছি সেখানকার পড়াশুনা এত উন্নত! অথচ উগান্ডা একটি অনুন্নত দেশ। সেখানকার শিক্ষকরা প্রচণ্ড পরিশ্রম করে। অথচ আমরা দিনের পর দিন আরো অবনতির দিকে যাচ্ছি।

আপনি বলেছেন সন্তানদের নিয়ে আপনি পরিতৃপ্ত আপনি কি পিতা হিসেবে নিজেকে সার্থক মনে করেন?
হ্যাঁ বলা যায়। আমি সুখী। আমার ছেলেমেয়েদেরকে উচ্চশিক্ষিত করতে পেরেছি। এখন শুধু কামনা করি আমার সন্তানরা যাতে দ্বীনের পথে থাকে।

আপনার দৃষ্টিতে কোন কারণগুলো বা কোন কারণটি পিতা হিসেবে আপনাকে সার্থক করেছে?
জীবনের প্রথম থেকেই ছেলেমেয়ে পরিবারের সাথে একসাথে থাকতে পেরেছি। কখনো তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়নি বা থাকিনি এটা একটা বড় কারণ বলে আমি মনে করি। আর আমি সবসময় আমার সন্তানদের সততা এবং দ্বীনের শিক্ষা দিয়েছি। আমি মনে করি তার একটা প্রভাব সবার মধ্যে রয়েছে।

আপনার কোনো বিশেষ শখ আছে?
আগে আমি ঘুরতে ভালোবাসতাম। বই পড়তে পছন্দ করতাম। ঢাকায় আসলেই আমি দু-চারটে বই কিনে নিয়ে যেতাম স্কুল লাইব্রেরীর জন্য। কোনোটাই না পড়ে দিতাম না।

এখন সে শখগুলো কাজ করে ভেতরে?
এখন কোনো কিছু পাওয়ার ইচ্ছা নেই। যাতে বেশি বেশি আল্লাহর ইবাদত করতে পারি আমল করতে পারি এটাই চাওয়া, এটাই শখ।

ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছা বা বই পড়ার ইচ্ছা এখন কাজ করে না?
এখন তো আর সম্ভব হয় না। কখনো কখনো পড়তে চেষ্টা করি। কিন্তু চোখের কষ্ট হয়, সময় লাগে বেশি তাই পড়ার আগ্রহটা ওভাবে কাজ করে না।

কাজের অভাব বোধ করেন?
না সেভাবে করি না।

আপনার বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন যারা আপনার সমসাময়িক ছিল তাদের বেশির ভাগই নিশ্চয়ই এখন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন তাদের অভাব কি কষ্ট দেয়?
হ্যাঁ তাদের কথা খুব বেশি মনে হয়। সঙ্গী-সাথী যারা ছিল তাদের কথা মনে হয়, দেখা না করতে পারার দুঃখ হয়। কথা বলতে, দেখা করতে ইচ্ছা হয়। দেখা করতেই বেশি ইচ্ছা হয়। মনে হয় যাই কিন্তু শারীরিক অসুবিধার কারণে যাওয়া হয়ে ওঠে না। কিন্তু খুব যেতে ইচ্ছা করে। বসে বসে হিসাব করি কে কতটুকু বড়, কে সিনিয়র, কে জুনিয়র।

মানসিক সুস্থতা, জীবনের জন্য মানসিক সুস্থ থাকার প্রয়োজনীয়তা এই বিষয়গুলো নিয়ে কখনো ভেবেছেন?
সেরকম কোনো সংকট কখনো আসেনি তাই এসব বিষয় নিয়ে ভাবাও হয়নি। আল্লাহ পৃথিবীতে একজন মানুষকে যতটা সম্মানিত করতে পারেন আমার মনে হয় আমি সেটা পেয়েছি। শিক্ষক সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকার কারণে সারা বাংলাদেশেই প্রায় আমার যাওয়া হয়েছে, বিভিন্ন জেলায় বন্ধু হয়েছে। কিংবা দেশের বাইরেও যখন বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়েছে সেখানেও মানুষের সম্মান-ভালোবাসা পেয়েছি। আমার কর্মজীবন নিয়েও আমি পরিতৃপ্ত। তাই আলাদা করে কখনো মানসিক সুস্থতার বিষয়ে ভাবা হয়নি।

একজন শিক্ষক হিসেবে আপনার সময়, ছাত্র-ছাত্রী এবং এখনকার সময়, সমাজকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
এটা আমাকে খুব কষ্ট দেয়। আমরা যে পড়িয়েছি অত্যন্ত কষ্ট করে পড়িয়েছি। নিজে পড়ালেখা করে কীভাবে ছাত্রদের প্রয়োজন মেটাবো, চাহিদা মেটাবো সবসময় চেষ্টা থাকতো এবং চিন্তা করতাম। কিন্তু এখন দেখি শিক্ষকদের মধ্যে ছাত্র-ছাত্রীদের উপযুক্ত শিক্ষা দেয়ার মানসিকতাই নেই। এটা খুব কষ্ট দেয়। আমি উগান্ডাতে দেখেছি সেখানকার পড়াশুনা এত উন্নত! অথচ উগান্ডা একটি অনুন্নত দেশ। সেখানকার শিক্ষকরা প্রচণ্ড পরিশ্রম করে। অথচ আমরা দিনের পর দিন আরো অবনতির দিকে যাচ্ছি। আমি যখন শিক্ষক ছিলাম। তখন ছেলেমেয়েদের মধ্যে একটা সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ছিল। তারা বই পড়তো, স্কুলে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা হতো, ম্যাগাজিন বের হতো। আমি দেখেছি এর ভেতর দিয়ে কিছু ছেলেমেয়ে উজ্জীবিত হয়েছে এবং তাদের পরবর্তী জীবনেও তার প্রভাব রয়ে গেছে। এখন এগুলো না থাকার একটা কারণ পড়াশুনা নেই। শিক্ষকরাও সেই উদ্যোগ নিয়ে পড়ায় না, ছেলেমেয়েরাও উৎসাহিত হয় না।

এই অবস্থা থেকে কি উত্তরণ সম্ভব? আপনি কি মনে করেন যে এই অবস্থা পরিবর্তিত হবে?
এটা সার্বিকভাবে সামাজিক অবক্ষয়েরই একটা অংশ। বিচ্ছিন্ন চেষ্টায় এর থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। সামগ্রিক প্রচেষ্টাতেই সেটা সম্ভব হতে পারে।

বয়সের সাথে সাথে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়, জীবন বদলায়, বদলায় চারপাশের পৃথিবীও। কমে যায় শারীরিক সামর্থ্য-সক্ষমতা। কর্মময় একটা জীবন পার করার পর অখণ্ড অবসর অনেকের স্বাভাবিক মানসিক স্বাস্থ্যকেও বিঘ্নিত করে। কিন্তু জীবনের স্বাভাবিকতাকে অস্বীকার করার কিংবা প্রাকৃতিক সত্যকে লঙ্ঘনের ক্ষমতা মানুষের নেই। বরং সময়ের বাস্তবতাকে মেনে নিলেই সম্ভব মানসিকভাবে সুস্থ থাকা।

সাদিকা রুমন, বিশেষ প্রতিবেদক
মনেরখবর.কম