লেখকদের লেখাই তার মানসিক সুস্থতার অঙ্গীকার 1

লেখকদের লেখাই তার মানসিক সুস্থতার অঙ্গীকার

কবি মোহাম্মদ রফিক। কবিতার সাথে তাঁর প্রায় ৫৩ বছরের বসতি। এখনো লিখে চলেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগে শিক্ষকতা করেন ১৯৭৪ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত। সুদীর্ঘ কর্মজীবন পার করে অবসর নেবার পর বাইরের জগত থেকে অনেকটাই গুটিয়ে নেন নিজেকে। বলতে গেলে বর্তমান জীবনে লেখাই তাঁর নিত্য দিনের নিকটতর সহচর। বয়স, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সমস্ত কিছু তুচ্ছ হয়ে যায় লেখনীর অমোঘ আকর্ষণে। এখন তিনি কেমন আছেন, একজন সৃষ্টিশীল মানুষ কীভাবে মুখোমুখি হন বয়োসচিত নৈঃসঙ্গের সাথে এসব নিয়ে কথা বলেছেন মনের খবর প্রতিনিধির সাথে।

কেমন আছেন?
ভালো

কী লিখছেন?
এখন বেশিরভাগ সময় গদ্য লিখছি। তার সঙ্গে কবিতা এসে গেলে কবিতাও লিখছি।

নিঃসঙ্গ বোধ করেন?
সামান্য।

একজন সাধারণ মানুষের নিঃসঙ্গতা থেকে কবির নিঃসঙ্গতা কি আলাদা?
মনে হয় না। আর আমি কবিকে সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা ভাবি না।

কিন্তু যিনি লিখে প্রকাশ করতে পারেন আর যিনি লিখে তার অনুভূতির প্রকাশ ঘটাতে পারেন না দু’জনে কি ফারাক নেই?
হ্যাঁ এটুকুই হয়তো পার্থক্য। আর তো কোনো পার্থক্য দেখি না।

আপনার সমসাময়িক যাঁদেরকে হারিয়েছেন তাঁদের অভাব বোধ করেন?
হ্যাঁ করি। বিশেষ করে ইলিয়াসকে (আখতারুজ্জামান ইলিয়াস) খুব মনে পড়ে। ইলিয়াসকে আমি প্রায়ই স্বপ্ন দেখি।

কবিরা কি অন্যদের তুলনায় স্পর্শকাতর নন?
এটা কি সত্য নাকি আমরা ভেবে নিই? এখন আমি বিশ্বাস করি যে সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে একটা ঐক্য আছে। যেমন ধরো আমরা পশু, পাখি, মাছ আহার করে বেঁচে থাকি। আবার তুমি যখন মারা যাবে তখন কিন্তু পোকামাকড় তোমাকে খাবে। সুতরাং আমরা কিন্তু পরস্পরের আহার। পরস্পরকে আমরা বাঁচিয়েও রাখছি। যেমন পৃথিবীতে পিঁপড়ে না থাকলে আমরা থাকব না, গাছ না থাকলেও আমরা থাকব না। সুতরাং আমরা পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। সমস্ত সৃষ্টিটাই একসূত্রে গাঁথা। সেইভাবে ভাবতে গেলে আমি আর যে মানুষটা  রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, জোরে জোরে কথা বলছে তার মধ্যে তো খুব একটা আসমুদ্রহিমাচল প্রমাণ পার্থক্য থাকার কথা না। কিন্তু আমার বেড়ে ওঠা, আমার গড়ে ওঠা, আমার চিন্তা-চৈতন্য সৃষ্টি হয়তো আমাকে কিছুটা দূরত্বে নিয়ে গিয়েছে।

আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কী?
এখন আমার মনে হয় আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ভালোবাসা। আমি প্রচুর ভালোবাসা পেয়েছি।

মানুষ হিসেবে নিজের সবচেয়ে বড় গুণ কী বলে মনে করেন?
আমি এখনো মানুষকে ভালোবাসতে পারি। এটাই আমার বড় গুণ।

খারাপ গুণ?
মাঝে মাঝে ধৈর্যহারা হয়ে যাই।

লেখা ছাড়া  মোহাম্মদ রফিকের কোন দিকটিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন যা তাঁকে লেখক করে তুলেছে?
সাহস। আমার কিন্তু অসীম সাহস। সেটা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। তুমি ভেবে দেখো যখন আমি শর্ট প্যান্ট ছেড়ে ফুল প্যান্ট ধরিনি, আমার গোঁফও গজায়নি তখন আমার পাকিস্তানী সামরিক আইন কোর্টে বিচার হয়েছিল আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য।

পেছনের  জীবন যদি  ফিরে পেতেন কোন জিনিসটা আবার পেতে চাইতেন?
এখন আর আমি পিছনের জীবন ফিরে পেতে চাই না। আমি যে জীবন যাপন করে এসছি সেই জীবনই আমার কাছে মহার্ঘ্য।

কবি কে নানারকম গঞ্জনার মুখোমুখি হতে হয় সংসারে বা সমাজে আপনি কি এরকম গঞ্জনার মুখোমুখি হয়েছেন?
অবশ্যই হয়েছি। আমি মনে করি এক্ষেত্রে কবিরও একটা দায় আছে। যেমন: কবি নিজেই ভাবে আমি সবার থেকে আলাদা। দ্বিতীয়ত সে ভাবে- আমি এমন লেখাই লিখবো বা এমন লেখাই হয়তো লেখা যে লেখা সাধারণের মধ্যে যাবে না। এটা ভুল আধুনিকতা প্রসূত ধারণা বা আধুনিকতার ভুল ব্যাখ্যা বলে আমি মনে করি।

একজন লেখকের জন্য মানসিক সুস্থতা কতটা প্রয়োজন?
একজন লেখকের লেখাই তার মানসিক সুস্থতার অঙ্গীকার। মানসিক অসুস্থতা নিয়ে তো কেউ লেখক হতে পারে না। একজন মানুষের ভেতরে মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ থাকতে পারে। কিন্তু সে তো লেখার ভেতর দিয়ে সুস্থ হয়ে যায়। শারীরিক অর্থেও, মানসিক অর্থেও। একজন শিল্পী তার ছবি আঁকার ভেতর দিয়ে সুস্থ হয়, একজন কবি কবিতা লেখার ভেতর দিয়ে- কবিতা লিখে সে যত আনন্দিত হয় আর কিছুতে হয় না।

মোহাম্মদ রফিক যেমন বলেন ‘একজন লেখকের লেখাই তার মানসিক সুস্থতার অঙ্গীকার।’ জীবনের যে কোনো পর্যায়ে যে কোনো কাজের ক্ষেত্রেই কথাটি প্রযোজ্য- হোক সেটা সৃষ্টিশীল কাজ কিংবা অন্য কিছু- সফল কাজের জন্য বা কাজে সফলতার জন্য মানসিক সুস্থতা অপরিহার্য।

সাদিকা রুমন, বিশেষ প্রতিবেদক
মনেরখবর.কম