মূল পাতা / জীবনাচরণ / আমার ভালো লাগাটা যে আমার সন্তান অবধি পৌঁছায় এ বিষয়টা সে মনে রাখুক এটাই আমার প্রত্যাশা

আমার ভালো লাগাটা যে আমার সন্তান অবধি পৌঁছায় এ বিষয়টা সে মনে রাখুক এটাই আমার প্রত্যাশা

 যেকোনো নতুন জন্ম পৃথিবীকে সামনের পথে ধাবিত করে। একজন নারী সন্তান জন্মদানের মধ্য দিয়ে অংশগ্রহণ করে পৃথিবীর সম্মুখধাবন প্রক্রিয়ায়। কাজেই সন্তান জন্ম দেয়া কোনো সহজ-সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়ম শুধু নয়। আর যেহেতু নতুন জন্ম নেয়া মানুষটির ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ পৃথিবী, কাজেই তাকে সে উপযোগী করে গড়ে তোলার দায়িত্ব জন্মদাতা-জন্মদাত্রী এবং প্রত্যেকটি সম্পৃক্ত মানুষের। এই দায়িত্বটি একটা শিশুর জন্মের পর কিংবা স্কুলে দেবার পর শুরু হয় না। সন্তান গর্ভে আসার সাথে সাথেই মা-বাবা-পরিবার-সমাজ এই দায়িত্বের ভাগীদার হয়ে পড়ে। কারণ একজন মায়ের শারীরিক-মানসিক এককথায় সার্বিক সুস্থতার ওপরই নির্ভর করে সুসন্তান জন্মদানের নিশ্চয়তা। তাই গর্ভবতী মাকে সুস্থ রাখার দায়িত্ব তার সাথে সম্পৃক্ত সকলের। কিন্তু আমরা গর্ভবতী মায়ের শারীরিক সুস্থতার ব্যাপারে যতটুকুই বা সচেতন, তার মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে এখনো আমরা শিখিনি। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় মনের খবর ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করছে গর্ভবতী মায়ের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তার নিজের ভাবনা এবং প্রত্যাশা।

প্রথম পর্বে নিজের গর্ভধারণের অভিজ্ঞতা-অনুভূতি-মানসিক অবস্থা নিয়ে মনের খবরের সাথে কথা বলেছেন নন্দিতা (ছদ্মনাম)।

গর্ভধারণের কত মাস পার করছেন?

২৭ সপ্তাহ, অর্থাৎ ৭ মাস চলছে।

এটা কি আপনার প্রথম সন্তান?

হ্যাঁ।

প্রথম সন্তান ধারণের অনুভূতি কীরকম?

প্রথম সন্তান ধারণের অনুভূতি খুবই আনন্দের একই সাথে বিচিত্রও। সম্পূর্ণ নতুন এক অনুভূতি যার সাথে কোনো কিছুরই তুলনা হয় না। নিজের মধ্যে নতুন প্রাণকে ধারণ করা, একটু একটু করে পূর্ণতা দেয়া এ সব কিছুই যেন নিজেকে আরো বেশি পরিপূর্ণ, আরো বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। তবে কিছুটা ভয়, সংশয়ও থাকে। এ সময় নিজের মাকে আরো বেশি অনুভব করা যায়।

গর্ভধারণের পর থেকেই একজন নারীর জীবনকাঠামোর অনেক পরিবর্তন ঘটে, এই        পরিবর্তন কি আপনার ভেতর কোনোরকম হতাশা তৈরি করেছে কখনো?

সত্যি বলতে আমার জীবন যাপনে যে ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো এসেছে তা আমাকে খুব একটা হতাশ করে না। আমার শারীরিক পরিবর্তনগুলোকে আমি উপভোগ করি। তবে হ্যাঁ চলাফেরায় কিছু বাঁধা আছে, ইচ্ছে হলেই অনেক কিছু করা যায় না এই অবস্থায়। এগুলো মেনে নিয়েছি।

গর্ভকালীন সময়ে মানসিক অবস্থার নানা পরিবর্তন ঘটে, আপনি কীভাবে এই পরিবর্তনগুলোর মুখোমুখি হয়েছেন?

বরাবরই আমি একটু চাপা স্বভাবের এবং আমি আমার মায়ের ওপর প্রচণ্ড নির্ভরশীল। শুধু এখন না সব সময়ই মায়ের জন্যে আমার মধ্যে এক ধরনের শূন্যতা কাজ করে। এখন তার মাত্রাটা আরো বেশি। আমি এবং আমার বাবা মা ভিন্ন শহরে থাকায় তাঁদেরকে সব সময় কাছে পাই না। এটা আমার মধ্যে এক ধরনের চাপ তৈরি করে, কিন্তু তা আমি প্রকাশ করি না সাধারণত। এছাড়া নিজেকে মাঝে মাঝে বন্দী মনে হয়, হয়তো ইচ্ছে করে কোথাও যাই বা প্রিয় কোনো মানুষের সাথে কিছু সময় কাটাই কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে না। তখন অন্য কোনো ভাবে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করি, যাতে আমার মন খারাপ বা হতাশা আমার সন্তানের ওপর কোনো প্রভাব না ফেলে।

গর্ভবতী মায়ের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

গর্ভবতী মায়ের মানসিক স্বাস্থ্য তার শারীরিক স্বাস্থ্যের মতই গুরুত্বপূর্ণ কেননা একজন গর্ভবতী নারীর শারীরিক স্বাস্থ্য অনেকাংশেই তার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভরশীল। গর্ভবতী নারীর মানিসিক কষ্ট, হতাশা, দুশ্চিন্তা নানা রকম শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। তাই পরিবারের উচিৎ এ বিষয়ে নজর রাখা।

আপনার মানসিক সুস্থতার জন্য পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে, বিশেষত আপনার  স্বামীর কাছে কী প্রত্যাশা করেন?

অন্য যে কারো কাছেই আমার প্রত্যাশা খুবই কম। আমি নিজের মত থাকতে ভালোবাসি। তবে এসময়ে একটু বাড়তি যত্ন, প্রাধান্য সবাই চায়, আমিও এর ব্যতিক্রম নই। আমার স্বামী একজন বেসরকারি চাকুরিজীবী। বাসায় বেশি সময় দেয়া তার জন্য কষ্টসাধ্য। তার পরও যতটা সময় বাসায় থাকে সে সময় অন্যান্য কাজে সময় ব্যয় না করে আমাকে একটু বেশি সময় দিলে আমার ভালোলাগে। কাজের ফাঁকে সময় বের করে ফোনে খোঁজ নিলে ভালো লাগে। আমার ভালোলাগাটা যে আমার সন্তান অবধি পৌঁছায় এ বিষয়টা সে মনে রাখুক এটাই আমার প্রত্যাশা।

আপনার স্বামীর প্রতি কি কখনো এমন অনুযোগ কাজ করে যে আপনি একাই এত কষ্ট করছেন তাকে এতটা কষ্ট করতে হচ্ছে না?

না আমার তেমন মনে হয় না। যদিও শারীরিক ভাবে আমি আমাদের সন্তানকে বড় করে তুলছি কিন্তু মানসিক ভাবে আমরা দুজনেই তার দ্বায়িত্ব নিচ্ছি। আর এটা তো প্রাকৃতিক, সে চাইলেও আমার কষ্ট বা ভালোলাগার ভাগ নিতে পারবে না। আমার সন্তান যখন আমার গর্ভে হাত পা নেড়ে তার উপস্থিতি জানান দেয় তখনকার অনুভূতি তো ভাগ করা যায় না, ঠিক তেমনি আমার কোমরের ব্যথার ভাগও কারো পক্ষে নেয়া সম্ভব নয়।

মানসিকভাবে কখনো বিপর্যস্ত বোধ করলে সে পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার জন্য কী করেন?

মন খারাপ থাকলে সাধারণত নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করি। কাছের মানুষ যারা, যারা আমাকে বোঝে বা যাদের সঙ্গ আমার ভালো লাগে তাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করি, এছাড়া আমার পরিচিত গর্ভবতী নারী বা নতুন মা হয়েছেন এমন নারীদের সাথে যোগাযোগ রাখি। এছাড়া টিভি দেখি, গান শুনি। ফেইসবুকে বসি। রান্না করি। আর অনাগত সন্তানের কথা ভাবি। মনে মনে ওকে নিয়ে ঘুরতে যাই।

অনাগত সন্তানের জন্য কীভাবে মানসিকভাবে নিজেকে তৈরি করছেন?

নিজেকে অনেক ভাবে নতুন করে জানছি। আগে হয়তো অনেক কিছু হুটহাট করে ফেলতাম এখন তেমন না। কোনো কথা বা কাজের আগে ভেবে নিচ্ছি। আগের চেয়ে ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা বেড়েছে বা বাড়ানোর চেষ্টা করছি। নিজের খারাপ অভ্যাস বা আচরণগুলো ত্যাগ করার চেষ্টা করছি যাতে আমার খারাপ আচরণ আমার সন্তানের ওপর প্রভাব না ফেলে। মোট কথা নিজেকে শুধরে নেয়ার চেষ্টা করছি। কেননা সবার মত আমিও চাই আমার সন্তান যেন একজন সুস্থ মনের মানুষ হিসাবে বেড়ে ওঠে।

নন্দিতার মত আমাদেরও প্রত্যাশা, যে শিশু ভূমিষ্ট হয়েছে অথবা পৃথিবীর আলো দেখবার অপেক্ষায় আছে প্রত্যেকেই বেড়ে উঠুক সুস্থ মনের মানুষ হিসেবে এবং গড়ে উঠুক সুমানব হয়ে। তাদের হাতে নিরাপদ হোক ভবিষ্যত পৃথিবী। আর তাই আমাদেরকে নজর দিতে হবে অঙ্কুরের দিকেই। নিশ্চিত করতে হবে গর্ভবতী মায়ের মানসিক সুস্থতা।

সাদিকা রুমন, বিশেষ প্রতিবেদক
মনেরখবর.কম