মূল পাতা / জীবনাচরণ / পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মীদের একটু হাসিমুখ অনেক স্বস্তি দেয়

পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মীদের একটু হাসিমুখ অনেক স্বস্তি দেয়

একজন নারী যখন সন্তান ধারণ করেন তখন তার দৈনন্দিন জীবন বদলে যায়। কাজের সক্ষমতা আগের মত থাকে না। অনেক কাজ তার জন্য হয়ে পড়ে ঝুকিপূর্ণও। আর তিনি যদি হন চাকরিজীবী তাহলে তার বাস্তবতা নিঃসন্দেহে আরো কঠিন। মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য তার ঘরের সুস্থিতি, সহানুভূতিপূর্ণ প্রতিবেশ যেমন প্রয়োজন তেমনি অপরিহার্য তার কর্মক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশ। একজন কর্মজীবী গর্ভবতী মায়ের প্রত্যাশা-প্রতিবন্ধকতা-বাস্তবতা নিয়ে মনের খবরের সাথে কথা বলেছেন ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক তামান্না আরা।

এটা কি আপনার প্রথম সন্তান?

হ্যাঁ, আমার সাথে বেড়ে ওঠা এটাই আমার প্রথম সন্তান।

আপনি কি কোনো চাকরি করেন?

আমি ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজে বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসাবে কর্মরত আছি।

এখনকার শারীরিক পরিস্থিতিতে ঘরে-বাইরের কাজ সামলে নিতে কি একটু বেশি বেগ পেতে হয়?

হ্যাঁ, তাতো একটু হয়ই। আগের মত পরিশ্রম না পারি ঘরে করতে, না পারি বাইরে করতে। ক্লাসে চল্লিশ মিনিট টানা কথা বলা একটু বেশি কষ্টের হয়ে যায়। তবে আমার ছেলেরা অনেক ভা‌ল, তারা ব্যাপারটা বুঝতে পারে। এবং আমাকে অনেক সহায়তাও করে।

গর্ভবতী মা হিসেবে চাকরিক্ষেত্রে পুরোপুরি সহযোগিতা পান?

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাই। তবে কিছু কিছু সময়…।

কখনো কোনো সহকর্মীর এমন মনোভাবের মুখোমুখি হয়েছেন যে সন্তান ধারণের ছুতোয় আপনি বাড়তি সুযোগ নিচ্ছেন?

আমি সব সময় চাই যে কেউ যেন মনে না করে যে আমি বাড়তি সুবিধা নিচ্ছি। তাই চেষ্টা করি সুবিধা কম নিতে, কিন্তু অনেক সময় পেরে উঠতে পারি না। কষ্টের কথা হচ্ছে এমন মনোভাবের মুখোমুখি হতে হয় নারী সহকর্মীর কাছ থেকেই। সেটাও সংখ্যায় খুবই কম। তাদেরও দোষ নেই। তারাও এমন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গেছে হয়তো।

গর্ভবতী মায়ের মানসিক সুস্থতার জন্য চাকরিক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবেশ আপনার প্রত্যাশিত?

মানসিক সুস্থতার জন্য চাকরির ক্ষেত্রে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ খুবই প্রয়োজন। যেদিন কলেজে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন হই, সেদিন সারাটা দিন আমার খারাপ যায়। বাসায় এসেও এর প্রভাব পড়ে। সাথে বেড়ে ওঠা বাবুও যেন বুঝতে পারে কিছু একটা হয়েছে। তাই তার নড়াচড়াও যেন একটু কম হয়ে যায়। গুটিশুটি মেরে পেটের এক কোনায় শক্ত হয়ে বসে থাকে (মনে হয়)। বাবার শত আবদারেও নড়ে ওঠে না। তাই মনে হয় আমি যেমন শত শারীরিক কষ্টেও হেসে সবার সাথে কথা বলি (অপছন্দের লোক হলেও) তেমনি সবাই যেন আমার এবং আমার মত প্রত্যাশিত মায়ের সাথে এমন আচরণ করে।

চাকরির প্রয়োজনে আপনাকে বাইরে যেতে হয়, কখনো কি এমন হয়েছে রাস্তাঘাটের তিক্ত কোনো অভিজ্ঞতা আপনাকে মানসিকভাবে অস্থির করছে?

এইদিক দিয়ে আমি খানিকটা ভাগ্যবান। শুনেছি অনেকে এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছে কিন্তু আমাকে এমন কোনো কিছুর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়নি।

একজন কর্মজীবী গর্ভবতী মা হিসেবে ঘর-কর্মক্ষেত্র-রাস্তাঘাট অর্থাৎ আপনার বিচরণক্ষেত্রকে কি আপনার জন্য যথেষ্ট বান্ধব বলে মনে করেন?

না। আমি তা মনে করিনা। ঘর প্রথমে নিরাপদ হতে হবে। আমি একজনকে জানি যার গর্ভকালীন সময় কেটেছে আতঙ্কের মধ্য দিয়ে। সে ঘরের মাঝে ভূত দেখত। যে ভূতটা আসলে তার পরিবারের একজন কাছের সদস্য। যার সাপোর্ট আসলে ওই সময় বেশি দরকার ছিল। আমার বন্ধুটি (বর) যখন অফিস থেকে এসে রান্না করে তখন আমি blessed feel করি। সব ঘরেই এমন বন্ধুসুলভ সহধর্মী দরকার। কর্মক্ষেত্রে, রাস্তাঘাটের মানুষদের মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। বিশেষ করে উঠতি বয়সের ছেলেদের সচেতন করা। আমি আমার ছেলেদের (ছাত্রদের) যে সহায়তাটা পাই, এই ছেলেরাই কি অন্যদের সাহায্য করে? শ্রদ্ধাবোধ থাকাটা খুব প্রয়োজন।

গর্ভবতী মায়ের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

হরমোনের যখন খুশি তখন পরিবর্তনের সাথে সাথে মায়ের মন মানসিকতাও এই সময় অনেক বেশি উঠানামা করে। তাই খাবার থেকে শুরু করে আচরণ সবকিছুতেই আসে পরিবর্তন। মানসিক স্বাস্থ্য ভাল না থাকলে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ে সব কিছুর উপর। তাই খুব গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত এই বিষয়টি।

গর্ভবতী মা হিসেবে আপনার মানসিক সুস্থতার জন্য ঘরে-কর্মক্ষেত্রে-রাস্তায় অর্থাৎ চারপাশের মানুষগুলোর কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?

এই সময়টা খুব অসহায় লাগে। তাই পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মীদের একটু হাসিমুখ অনেক স্বস্তি দেয়। কলেজে যাওয়ার সময় একজন ট্রাফিক পুলিশ আমাকে প্রতিদিন রাস্তা পাড় করে দেয়। আমি তাকে হেসে বলি thankyou officer. আমি তাঁর কাছেও কৃতজ্ঞ। আমার মনে হয় আমি অন্যদের তুলনায় একটু ভাল ভাবে পাড় করছি আমার গর্ভকালীন সময়। অন্যরা আরও ভালভাবে পাড় করুক এই সময়, আমি যেন তাদের সহায়তা করতে পারি।

তামান্না আরা নিজের অভিজ্ঞতায় ঘরে এবং কর্মক্ষেত্রে সহযোগিতাপূর্ণ পরিবেশের কথা বললেও আমাদের সমাজের অধিকাংশ নারীর ক্ষেত্রে সেটি ঘটে না। তারা ঘরেও যেমন যথাযথ সহযোগিতা, সহানুভূতি পান না তেমনি ঘরের বাইরেও পোহাতে হয় নানান দুর্ভোগ। অনেকে কর্মক্ষেত্রেও পান না প্রয়োজনীয় সহমর্মিতা। বাচ্চা জন্মের পর এই দুর্ভোগ পৌঁছায় চূড়ান্ত সীমায়। কারণ একজন কর্মজীবী মায়ের সন্তান দেখাশোনার জন্য নেই কোনো সুব্যবস্থা। যে কারণে বাংলাদেশে গর্ভধারণের পর কিংবা সন্তান জন্মের পর কর্মজীবী মায়ের চাকরি ছেড়ে দেয়ার ঘটনা ঘটে অহরহ। এতে করে রাষ্ট্রে একদিকে একজন কর্মদক্ষ নাগরিকের সেবা থেকে বঞ্চিত হয় অন্যদিকে একজন কর্মজীবী নারী নারীত্বের শেকলে বাঁধা পড়ে মানসিকভাবে হয়ে পড়েন বিষণ্ণ, হতাশাগ্রস্ত। যেটা প্রভাব ফেলতে পারে তার সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রেও। কাজেই শিক্ষিত কিংবা আদর্শ জাতি গঠনের জন্য শুধু ‘শিক্ষিত মা’-ই যথেষ্ট নয়, তাকে হতে হবে সুস্থও-শারীরিক এবং মানসিকভাবে। আর এই দায়টা একজন নারীর একার নয়। এই দায় পরিবারের, সমাজের এবং রাষ্ট্রের।

সাদিকা রুমন, বিশেষ প্রতিবেদক
মনেরখবর.কম