মূল পাতা / জীবনাচরণ / মন প্রতিদিন / কেমন আছেন একবিংশ শতকের প্রজন্ম?- শেষ পর্ব

কেমন আছেন একবিংশ শতকের প্রজন্ম?- শেষ পর্ব

ইংরেজিতে একটি শব্দ রয়েছে ‘মিলেনিয়াল’। গত শতকের শেষাংশে অর্থাৎ ৮০ ও ৯০ এর দশকে যাদের জন্ম তাদেরকেই বলা হয় মিলেনিয়াল। ব্যাপক প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও তার প্রসার, বৈশ্বিকীকরণ ইত্যাদি দ্রুত পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে সবচাইতে বেশি যেতে হয়েছে এই মিলেনিয়ালদের।

একবিংশ শতাব্দীর শুরুটা ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। এখানে এসে যেন প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে একটু একটু করে গিলে ফেলছে। একবিংশ শতাব্দীর প্রজন্মের সৃষ্টি হচ্ছে আত্মিক সংকট। একবিংশ শতাব্দীর প্রজন্ম শুধু এক বয়সের নয়। এ প্রজন্ম হচ্ছে তারাই এই একবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই যাদের বোঝার বয়স হয়েছে। এ প্রজন্মের সদস্য সদ্য কৈশোর থেকে পূর্ণ যৌবন পর্যন্ত। আরও আশ্চর্যের বিষয়, আলাদা আলাদাভাবে হলেও অনেকের অনুভূতি অনেকটাই মিলে যাচ্ছে। ‘দা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা অবলম্বনে এই একবিংশীয় প্রজন্মের কয়েকজনের মনের কথা তুলে ধরছেন মাসাফি আহমেদ ফেরদৌস অনিক। এ যেন অল্প কয়েকজনের মনের কথাই প্রতিনিধিত্ব করছে একটা পুরো প্রজন্মের। দুই পর্বের এই প্রতিবেদনের আজ প্রকাশিত হচ্ছে শেষ পর্ব।

রোনি জয়েসঃকগনিটিভ বিহ্যাভেরিয়াল থেরাপি” এক আশার আলো

যখন প্রথমবারের মত ক্রমাগত বাহু ব্যথা, বুক ধরফর এবং নিশ্বাস নিতে সমস্যার মুখোমুখি হলাম, ভেবেছিলাম আমার হার্ট এটাক হচ্ছে। এ্যাম্বুলেন্সের জন্য ফোন করলাম। হাসপাতালে তারা আমার বুকে কিসব যন্ত্রপাতি লাগাল, ব্লাড প্রেসার পরীক্ষা করল। জানাল, আমি ঠিক আছি। দুশ্চিন্তার অভ্যাস কখনই ছিল না। এমনকি “মেনিনজাইটিস” নামে মস্তিকের এক রোগে কয়েকবছর আগে কোমায় পড়েছিলাম। সেখান থেকেও বেঁচে ফিরেছি। মানসিকভাবে কোনো আঘাত লাগতে দেইনি নিজেকে। তবুও যতবার আমার এ ধরনের কোনো কিছু হয়েছে, মনে হতো তাদের কিছু ভুল হচ্ছে। পরিণামে ধীরে ধীরে স্নায়ুবিক রোগীতে পরিণত হচ্ছিলাম।

এক সময় সামান্য ব্যাপারেও ডাক্তারদের আশ্বাস না পেলে নিশ্চিন্ত হতে পারতাম না। ফুসফুসের জটিল সমস্যায় আক্রান্ত এক রোগীর পাশের ওয়ার্ডে একরাতে হাসপাতালে ছিলাম। কিন্তু এই অভিজ্ঞতা শুধু আমাকে সাময়িক স্বস্তি দিয়েছিল। মন আমার সাথে অদ্ভুত খেলা খেলত। ভাবতাম, ডাক্তাররা কিছু ভুল করছে। সেক্ষেত্রে আমার কি কি সম্ভাব্য রোগ হতে পারে- সে চিন্তা করতাম। যে কোনো শারীরিক সমস্যায় অতিমাত্রায় সংবেদনশীল হয়ে যাচ্ছিলাম বা হয়েই গিয়েছিলাম বলা যায়। নিয়মিত নিজেকে বোঝাচ্ছিলাম, আমি মারা যাচ্ছি। যার কারণে যে কোনো ব্যথা হলেই আরও বেশি দুশ্চিন্তা হতো।

এক সপ্তাহ আমাকে পর্যবেক্ষণ করে “কগনিটিভ বিহ্যাভেরিয়াল থেরাপি” এর পরামর্শ দেয়া হল। আশার আলো দেখলাম। থেরাপির প্রথম সেশন ছিল প্রশ্নে ভরপুর। বিভিন্ন প্রশ্ন করে আত্মহত্যার প্রবণতা যাচাই করা হতো। শারীরিক কিছু নিয়ে কোনো কথাই হয়নি। শেষে শিখে ফেললাম থেরাপির মূল মন্ত্র। বের হয়ে আসলাম জীবনের এই অন্ধকার সময় থেকে। যদিও সময় লেগেছিল।

দুশ্চিন্তা দীর্ঘদিন আমাকে গ্রাস করে রেখেছিল। মন হয়তো নিজেও জানত না তা। মানসিক স্বাস্থ্য এখনও সমাজে কলঙ্কিত অধ্যায় ভাবা হয়। এ বিষয়ে খোলামেলা কথা হয় না বললেই চলে। কিন্তু এমন চিন্তাধারা ঠিক নয়। কথা বলতে হবে। শুনতে হবে। বের হয়ে আসা সম্ভব মানসিক সমস্যা থেকে। প্রিয়জনদের প্রতি সৎ থাকতে হবে।

রিয়ানোন লুসি কোস্লেট: স্থায়ী ভিত্তির সাথে স্পষ্টত সাধ্যমত মানসিকভাবে মোকাবেলা করব না

দুশ্চিন্তার বাতিক আর স্বাভাবিক দুশ্চিন্তার মধ্যে পার্থক্য জানাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দুশ্চিন্তার বাতিক একটা মানসিক সমস্যা। আর স্বাভাবিক দুশ্চিন্তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নানা কঠিন চাপের সাধারণ প্রতিক্রিয়া। আমি মনে করি, আমার দুইটাই আছে। তবে অনেক মানুষ না জেনেই একটা আরেকটাকে পোষে।

আমি স্পষ্টত সাধ্যমত মানসিকভাবে এই সমস্যার মোকাবেলা করব না। ব্যাখ্যা করছি। আমার একটা স্থায়ী ভিত্তি আছে বলে মনে করি। মাসের পর মাস ভাড়াটিয়ার মত থাকা আমাকে প্রতি রাতে আনন্দ দেয়- তা আমি বলব না। কিন্তু এটা আমার মনের অংশ। যখন পরিস্থিতি এমনিতেই প্রতিকূল, সেখানে কিছুদিনের মধ্যে ঘরছাড়া হবার খবর মোটেই সুখের নয়। কারণ ঐ ঘরের ছাদই অনেক সমস্যায় মানসিক স্বস্তি দিয়েছে।

তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দুশ্চিন্তার মহামারীর গল্প মিডিয়ার কল্যাণে ইতিমধ্যেই জানা আছে। আমি এটাকে অস্থিতিশীলতার এক ধরনের উপসর্গ হিসেবে দেখছি। শুধু বাসস্থান সংক্রান্ত নয়, আমাদের চাকরিগুলোও কম বেতনের- এ সব কিছু মনকে প্রভাবিত করে। অন্যদিকে কেউ নিজের নানা ধরনের ঋণ আর ক্রমবর্ধমান বাসা ভাড়ার চাপে যখন দেখে তারই কোনো ধনী পিতার সন্তান বন্ধুকে বাড়ি কিনে দেয়া হচ্ছে- এই সামাজিক অসামঞ্জস্যতা খুবই তিক্ত মনে হয়। এদের জন্য সত্যিই আমার খারাপ লাগে; যাদের এই অদ্ভুত প্রতিকূল পৃথিবীর মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

আমি আমার সামান্য স্থায়িত্ব যা আছে তাতেই জীবনের কাছে কৃতজ্ঞ। যদিও খুব দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়েছি; একটা দুশ্চিন্তা থাকে যেন আবার সেখানে ফিরে না যাই। একথা বলার অর্থ-  সাফল্যের উচ্চতাকে অতিরঞ্জিত না করা। আমার বাড়ি আমার এক টুকরো স্বপ্ন। এই স্থায়িত্ব আমার অন্যান্য সমস্যাকে দূর করবে না জানি। কিন্তু আমার দৈনন্দিন নানা মানসিক চাপকে অবশ্যই কমাবে।

সমাপ্ত