মূল পাতা / জীবনাচরণ / মন প্রতিদিন / আমি চাই আমার সন্তানের প্রথম শিক্ষা হোক ম-তে মানুষ

আমি চাই আমার সন্তানের প্রথম শিক্ষা হোক ম-তে মানুষ

গর্ভবতী মায়ের সাক্ষাৎকার পর্বে এবারের বিষয় হচ্ছে প্যারেন্টিং স্টাইল নিয়ে একজন হবু মায়ের নিজস্ব ভাবনা। সন্তানের অভিভাবকত্ব, মানসিক বিকাশ, শিক্ষা বিষয়ে একান্ত ভাবনাগুলো নিয়ে মনের খবরের সাথে কথা বলেছেন সরমি।

এটা কি আপনার প্রথম সন্তান?

হ্যাঁ

মাতৃত্ব বিষয়টিকে কীভাবে অনুভব করেন?

এখনো যেহেতু আরেকটা প্রাণের অস্তিত্ব আমি টের পেতে শুরু করিনি তাই অনুভূতিও বুঝতে পারি না। কিন্তু একটা দায় কাজ করে। হাঁটতে গেলে নিজের ভেতর থেকেই কেউ বলে- দেখে হাঁটো, একবার খেতে খেতেই ঠিক করে নিই পরে কি খাবো। যখন থেকে নিশ্চিত হয়েছি আমার ভেতরে কেউ আছে তখন থেকে কেন যেন খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায়। তখন থেকে প্রতিদিন সূর্যোদয় দেখি। প্রতিদিন ভোরের সূর্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একটা অদৃ্শ্য অস্তিত্বকে উদ্দেশ্য করে বলি, ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্য সুন্দর…’। এটাই মাতৃত্ব কিনা জানিনা।

হঠাৎ করে নানারকম বিধিনিষেধের ভেতর পড়ে যাওয়ার বিষয়টিকে গ্রহণ করতে কি মানসিক কোনো বাধা কাজ করে?

না তেমন না। আসলে আগে মনে হতো কীভাবে এত দীর্ঘ সময় কোথাও না গিয়ে ঘরে বন্দি হয়ে থাকব। টং দোকানের চা, রাস্তার চটপটি, ফুচকা, চিতই পিঠা, ঝালমুড়ি না খেয়ে থাকব! কিন্তু যখন বাস্তব পরিস্থিতির ভেতর ঢুকে গেলাম তখন বুঝলাম শরীর নিজেই নিজেকে সুরক্ষিত করে। এখন টং দোকানের চা তো দূরে থাক ঘরের চা-ও খেতে মন টানে না। কোথাও যাব এটা ভাবতে শরীরই সমর্থন দেয় না।

গর্ভ ধারণের পূর্বে মায়ের কোনো মানসিক প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন কি?

অবশ্যই আছে। কারণ একটা নতুন মানুষের দায়িত্ব নেয়ার আগে যেকোনো ধরনের স্বেচ্চাচারিতাই করা সম্ভব। কিন্তু জীবনের সাথে নতুন কোনো মানুষের দায়িত্ব যোগ হলে সেটা আর সম্ভব না। আর একটা মানুষকে পৃথিবীতে নিয়ে আসা মানে তাকে একটা কাঙ্ক্ষিত জীবন দানের অলিখিত অঙ্গীকারে বদ্ধ হওয়া। সেই কাজটা সফলভাবে করার জন্য শরীর ও মনের শুদ্ধতা প্রয়োজন বলে আমার মনে হয়। আর এজন্য নতুন একটা প্রাণকে পৃথিবীতে আহ্বান জানাচ্ছি সে সিদ্ধান্ত নেবার সাথে সাথেই মানসিক প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি। আর এই প্রস্তুতি শুধু মায়ের না, মা ও বাবা দু’জনেরই থাকা উচিৎ।

প্যারেন্টিং স্টাইল নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা, বিশ্লেষণ আজকাল হচ্ছে। আপনি একজন হবু মা হিসেবে বিষয়গুলো নিয়ে কি কখনো ভেবেছেন?

অবশ্যই ভেবেছি। ভাবি। আমার চারপাশে যেসব মা-বাবা আছেন তারা তাদের সন্তানদেরকে কীভাবে অভিভাবকত্ব দিচ্ছেন, তার ফলাফল কী হচ্ছে, কোনটা ভালো হচ্ছে, কোনটা খারাপ হচ্ছে এই বিষয়গুলো নিয়ে নিজের ভেতরেই আমি এক ধরনের বিশ্লেষণ দাঁড় করাই। আমার স্বামীর সাথেও এগুলো নিয়ে আলোচনা করি। যেমন- আমরা সবসময় চেষ্টা করি আমাদের মধ্যে যেন কোনোভাবেই পারস্পরিক অশ্রদ্ধাবোধ কাজ না করে। কেউ কাউকে কোনোভাবেই হেয় না করি। আমি দেখেছি যে পরিবারে স্বামী তার স্ত্রীকে অথবা স্ত্রী স্বামীকে অবহেলা করে, অবজ্ঞা করে বা কথায় কথায় ছোট করে সন্তানদের মধ্যেও এই প্রবণতা সংক্রমিত হয়। আর কোনো সন্তান যদি মা-বাবাকেও অশ্রদ্ধা করতে শিখে যায় সে অন্যদেরকে কীভাবে যথাযথ সম্মান করবে! যদি সে মানুষকে মানুষ হিসেবে শ্রদ্ধা করতে না শেখে তাহলে নিজেও কোনোদিন সেটা পাবে না। আমার কাছে মনে হয় এটা মানবিক প্রতিবন্ধীত্ব। আর মানবিক প্রতিবন্ধী একজন মানুষ যত বড়ই হোক না কেন আমার কাছে তার কোনো মূল্য নেই।

আপনি বলেছেন সন্তান জন্মদানের আগে মা-বাবা উভয়েরই মানসিক প্রস্তুতি প্রয়োজন, আপনার সন্তানের পিতা হিসেবে আপনার স্বামীর কাছে আপনি কী প্রত্যাশা করেন?

ঐ যে বললাম সে যেন আমাকে কোনোভাবেই অশ্রদ্ধা না করে। দ্বিতীয়ত, যে বিষয়টা আমি তাকে বার বার বলেও থাকি যে, সে যেন কখনো এমন না ভাবে সন্তান পালন আমার একারই দায়িত্ব, সন্তানের অসুখ-বিসুখ বা খারাপ কিছু হলে তার দায় আমার। যেটা আমাদের সমাজে হামেশাই ঘটে থাকে। মা তার সর্বস্ব দিয়ে এমনকি নিজের শরীরটার দিকে না তাকিয়ে সন্তানের যত্ন করছে। তারপর কোনো কারণে অসুখ-বিসুখ করলে সন্তানের বাবা বা পরিবারের অন্যরা হয়তো মাকেই দায়ী করছে। আমার মনে হয় এরকম হলে সন্তান পালনটা মায়ের কাছে একটা ডিউটির মত হয়ে পড়ে। সন্তানের অসুখ হলে তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তার আগে মায়ের চিন্তায় কাজ করে যে তাকে কী জবাবদিহিতা করতে হবে। এটা কখনোই কাম্য নয়।

যদিও বিষয়টা অনেক দূরবর্তী তবু জানতে চাইছি সন্তানের স্কুলিং বিষয়ে কি আপনার কোনো ভাবনা আছে?

ভাবনা বলতে ভাবনা এটা ভাবতে গেলে তো আমি অথৈ সাগরে পড়ে যাই। কোথায় পড়াবো বাচ্চাকে! এই বিদ্যার জাহাজ তৈরির কারখানাগুলো দেখলে তো আমিই আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। খুব আনন্দিত হতাম যদি আমার সন্তানের যদি একটু কম বিদ্যা দানের কোনো বিদ্যালয় খুঁজে পেতাম। যে দু’চারটা আছে সেগুলোও আমার হাতের কাছে নেই এটা হচ্ছে আরেকটা সংকট।

অনাগত সন্তানের অভিভাবক হিসেবে নিজেকে কীভাবে তৈরি করছেন?

প্রথমত, আমি আমার বাবার মত অভিভাবক হতে চাই। যিনি তাঁর সন্তানদের মারেননি, বকেননি কিন্তু তাঁর কোনো সন্তান কোনোদিন তাঁকে উপেক্ষা করার স্পর্ধা দেখায়নি। তিনি হাতে ধরে ধরে আমাদের শেখাননি, শিখিয়েছেন তাঁর নিজের জীবন দিয়ে। তাঁর পুরো জীবনটিই আমাদের জন্য শিক্ষার আধার। দ্বিতীয়ত, নিজেকে এখন থেকেই এমনভাবে নির্মাণ করার চেষ্টা করি যেন সন্তানকে বিদ্যার জাহাজ বানাতে, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বানাতে উন্মত্ত না হয়ে উঠি, প্রতিযোগিতার অসুস্থ দৌঁড়ে তার জীবনটাকে যেন দুর্বিষহ বানিয়ে না ফেলি। আমি চাই আমার সন্তানের প্রথম শিক্ষা হোক ম-তে মানুষ। সে মানুষ শব্দটাকে শিখুক, বুঝুক, মানুষ হয়ে উঠুক। আর পৃথিবীতে টিকে থাকবার জন্য কু থেকে সু কে আলাদা করতে শিখুক। এর চেয়ে বেশি যেন আমি, আমরা তার কাছে প্রত্যাশা না করি।

‘যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ, প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবো সব জঞ্জাল’- নবজাতকের জন্য এমন উচ্চারণ হয়তো আমরা রচনায়, প্রবন্ধে অথবা বক্তৃতা মঞ্চেই বলে থাকি। বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন থাকলে হয়তো আমাদের মাথায় জঞ্জালের বোঝা আরো খানিকটা কম হতে পারতো। তবুও নিরাশায় ডুবে যাওয়ার সময় এখনো আসেনি। কারণ এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা এমন অনেক কিছু ভাবছি যা আগে ভাবতাম না। আগে সন্তানের জন্ম হতো আর জন্মদাতা-জন্মদাত্রী বাবা-মা হয়ে যেতেন। এখন সন্তান জন্মদানের আগে তার জন্মদাত্রী এবং জন্মদাতা ভাবছেন কীভাবে তারা মাত-পিতা হয়ে উঠবেন। নিশ্চয়ই এভাবেই একদিন সরমির প্রত্যাশামত তার সন্তানের হাত ধরে আমরা পেয়ে যাব মানবিক পৃথিবীর খোঁজ।

সাদিকা রুমন, বিশেষ প্রতিবেদক
মনেরখবর.কম