মূল পাতা / জীবনাচরণ / মন প্রতিদিন / সংসার এবং সন্তান প্রতিপালনে মায়ের অধিক অংশগ্রহণ সন্তানকে ভাবতে বাধ্য করবে সংসারের এমনই ধারা

সংসার এবং সন্তান প্রতিপালনে মায়ের অধিক অংশগ্রহণ সন্তানকে ভাবতে বাধ্য করবে সংসারের এমনই ধারা

যখন কোনো দম্পতি সন্তান জন্মদানের সিদ্ধান্ত নেন তখন তারা আসলে জীবনমেয়াদী একটা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হন। যুদ্ধের প্রথম অংশে শারীরিকভাবে একজন মাকে যে কষ্ট স্বীকার করতে হয় সেটাতে সন্তানের বাবার অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। কিন্তু জীবনমেয়াদী এই যুদ্ধে জয় নিশ্চিত করতে হলে একজন বাবার মানসিক অংশগ্রহণ জরুরি এবং সন্তান জন্মের পর তাকে সঠিক অভিভাবকত্বে বড় করার জন্য বাবা-মা উভয়ের সমান অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের অভিভাবকত্ব বিষয়ে নিজস্ব ভাবনা নিয়ে মনের খবরের সাথে কথা বলেছেন মিতুল (ছদ্মনাম)।

আপনার সন্তানের বয়স কত?

এক বছর নয় মাস।

ওর মানসিক বিকাশের জন্য কী করেন?

কিছু ছবির বই কিনে দিয়েছি, আমি যখন পড়তে বসি তখন ছেলেও তার টেবিলটিতে বসে, নিজের মতই আঁকাআঁকি করে, মাঝে মাঝে বিকেলে বের হই- মাঠে ছেড়ে দিলে নিজেই দৌড়ে বেড়ায়, সেখানে তার পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা, তার সাথে বসে কার্টুন দেখতে হয়। বলতে পারেন, ছেলের জগতে আবার বেড়ে উঠছি।

আপনি কি কোনো চাকরি করছেন?

আপাতত নয়। বাচ্চার জন্মের পর ছেড়ে দিয়েছি।

আপনি কি মনে করেন চাকরিজীবী একজন মায়ের জন্য সন্তানকে যথাযথভাবে দেখভাল করা সম্ভব নয়?

সন্তানের সঠিক বেড়ে উঠা যদি নিশ্চিত করতে হয় তাহলে চাকুরিজীবী মায়ের পক্ষে তা সম্ভব নয়। কারণ বাসার পরিচারিকা তাকে আমার মনের মতো করে বড় করতে পারবেনা। অবশ্য বাড়িতে দাদী বা নানী থাকলে আলাদা ব্যাপার। ৯টা-৫টা অফিস করা একজন মা দেখছেন না সন্তান কি খাচ্ছে (আদৌ খাচ্ছে কিনা), কি দেখছে, কি শিখছে। তাই সন্তানের সঠিক বেড়ে উঠা নিশ্চিত করা তার পক্ষে কষ্টসাধ্য। বিশেষ করে প্রথম পাঁচ বছর সন্তানের সাথে মায়ের সম্পৃক্ততা খুবই জরুরি। শিশুর ভিত এসময়ই গঠিত হয়।

কী ধরনের সহযোগিতা পেলে আপনি চাকরি না ছেড়েই সন্তানের দেখাশোনা করতে পারতেন বলে মনে করেন?

পৃথিবীতে সবারই সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল ‘মা’- আমিও এর ব্যতিক্রম নই। মা বা শ্বাশুড়ি মা যে কোনো একজন নিরবিচ্ছিন্ন সময় দিতে পারলে হয়তো চাকরি না ছেড়েই সন্তানের দেখাশোনা করতে পারতাম।

আপনার পরিবারে কে কে আছেন?

আমি, আমার স্বামী আর আমার ছেলে।

সন্তান পালনের জন্য স্বামীর সার্বিক সহযোগিতা পান?

একদমই পাই না- এটা বলা ভুল হবে। হয়তো আর একটু পেলে ভালো হতো। ৯টা- ৫টা অফিস করে, নিজের কাজ গুছিয়ে যতটা তার পক্ষে সম্ভব ততটুকুই সময় দেয়। ছেলের অসুস্থতার সময় আমার পাশে তো সে-ই থাকে। সন্তান হওয়ার পর আমার চাকুরিকালীন পুরো দায়িত্বটাই সে নিয়েছিল। টীকা দেওয়া থেকে ডাক্তার দেখানো পর্যন্ত।

সন্তানকে সুসন্তান করে গড়ে তোলার জন্য কী ধরনের অভিভাবকত্ব যথাযথ বলে আপনি মনে করেন?

আমি তাকে ভালবাসি এটা বোঝানো জরুরি। সে আমার কাছে আকাঙ্ক্ষিত এটাও তাকে জানানো গুরুত্বপূর্ণ। যদিও আমার মতো সদ্য মা যারা হয়েছেন তাদের অনেকেই মনে করেন যে হয়তো থেমে গেলাম চিরতরে। আমরা আমাদের এই নতুন জন্মকে স্বাগত জানাতে পারিনা। আমিও এর ব্যতিক্রম নই।

এছাড়া দিনের সুনির্দিষ্ট একটা সময় সন্তানের সাথে কাটানোর জন্য বরাদ্দ রাখা, বছর দু’য়ের মধ্যেই তার খাদ্যাভ্যাস ঠিক করা, শিক্ষণীয় বিষয়ের সাথে পরিচিত করানো, সন্তানের অপ্রয়োজনীয় আবদারের ক্ষেত্রে তাকে রাগ না দেখিয়ে বুঝিয়ে বলা ইত্যাদি জিনিসগুলো সতর্কভাবে পালন করা উচিৎ। কিছুতেই স্বামী- স্ত্রীর মধ্যকার উত্তপ্ত বাক্যালাপ কখনও সন্তানের কান অবধি পৌঁছানো উচিত নয়। নতুবা সন্তান বিষণ্নতায় ভুগতে পারে বাবা মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা হারাতে পারে।

আমাদের সমাজে বাবার পক্ষে হয়তো মায়ের মতো দীর্ঘক্ষণ সন্তানকে দেয়া সম্ভব হয় না তবে অফিস থেকে ফিরে যতটা সম্ভব সময় দেওয়ার মানসিকতা থাকা উচিত। সপ্তাহে অন্তত একটি দিন সন্তানের সাথে বেশি সময় কাটানো উচিত তাদের। মায়ের সাথে অতিরিক্ত সময় কাটানো সত্ত্বেও কীভাবে যেন সব সন্তানেরই অনুকরনীয় হয়ে উঠে পিতা। আর ছেলে সন্তান হলে তো কথাই নেই। তাই তাদের সঠিক বেড়ে উঠায় বাবারও সচেষ্ট এবং সতর্ক হওয়া উচিত। বাবাদের অপ্রয়োজনীয় অভ্যাসগুলো তারা ত্যাগ না করলে সেগুলো সন্তানের মধ্যে সঞ্চারিত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে। একজন ধূমপায়ী পিতার বাসায় ধূমপান থেকে বিরত থাকাই বাঞ্চনীয়। আর সন্তানকে শিক্ষাদানের বিষয়টি শুধু মায়ের উপর চাপিয়ে না দিয়ে বাবারও এ বিষয়ে দয়িত্ববান হওয়া উচিত।

সন্তান প্রতিপালনে বাবা-মায়ের অংশগ্রহণ কেমন হওয়া উচিৎ?

বাবা-মা দুজনই সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে পারলে ভালো। না পারলে নিজেদের সর্বোচ্চটুকু দেওয়া উচিত। একা মায়ের উপর সন্তানের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব দিয়ে পিতার নিশ্চিন্তে বসে থাকা উচিত নয়। বন্ধের দিন গুলোতে পিতারও জানা উচিত সারাটি সপ্তাহ তার স্ত্রীর কেমন কাটে, কোথায় সন্তান মা কে বিড়ম্বনায় ফেলছে। রাতে সন্তান কেঁদে উঠলে নিশ্চিন্তে না ঘুমিয়ে দেখা উচিত সমস্যা কোথায় তার আদরের সন্তানের। আমার মনে হয়, এতে পারিবারিক বন্ধনও অটুট থাকে।

যদি সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে কোনো একজনের অংশগ্রহণের ঘাটতি থাকে তাহলে কি সেটা সন্তানের যথার্থ মানসিক বিকাশে প্রভাব রাখতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

অবশ্যই একজনের অংশগ্রহণের ঘাটতি সন্তানের মানসিক বিকাশে প্রভাব ফেলে। সন্তান যা দেখবে তাই শিখবে। সন্তান বড় হবে আর বলে বলে শেখাবেন এটা অসম্ভব। মা অথবা বাবা যার কাছেই সন্তান অধিক মূল্যায়ণ পাবে তারই  নিকটবর্তী হবে। সংসার এবং সন্তান প্রতিপালনে মায়ের অধিক অংশগ্রহণ সন্তানকে ভাবতে বাধ্য করবে সংসারের এমনই ধারা। মা সংসারের যাবতীয় কাজ করবে আর বাবা শুধু অফিস করবে। পরবর্তীকালে তার নিজের জীবনেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাবে। সেক্ষেত্রে আপনার শিশুর যথাযথ বেড়ে ওঠা কতটা নিশ্চিত করতে পারলেন তাতে সন্দেহ থেকে যায়।

আপনার সন্তানের বাবার কাছে আপনি কী ধরনের অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করেন?

হয়তো তার দৃষ্টিতে সে তার সর্বোচ্চটুকুই দিচ্ছে। মোবাইলে গেইম না খেলে সন্তানের সাথে গল্প করলে খুশি হতাম। আশা রাখি পেয়ে যাব বাকি দু’ আনা।

ভারসাম্যহীন অভিভাবকত্বে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে সন্তানের মানসিক বিকাশ। তাই কোনো সন্তানকে সুসন্তান হিসেবে বড় করে তোলার জন্য প্রয়োজন মা ও বাবার যৌথ, সুচিন্তিত এবং ভারসাম্যপূর্ণ অভিভাবকত্ব। বর্তমান পৃথিবীতে যখন জীবনের নানামুখী হাতছানির ভেতর জন্ম নিচ্ছে নতুন মানুষ তখন ভাববার সময় এসেছে কি ধরনের অভিভাবকত্ব তাকে সঠিক পথের নিশানা দেবে। কেননা মানুষ বৃক্ষ নয় যে বীজ ফেলে রাখলে আপন স্বভাবে বেড়ে উঠবে।

সাদিকা রুমন, বিশেষ প্রতিবেদক
মনেরখবর.কম