মূল পাতা / জীবনাচরণ / মন প্রতিদিন / সন্তানের শিশু বয়সটাই শুধু আমাদের, বড় হবার পর তারা অন্য কেউ

সন্তানের শিশু বয়সটাই শুধু আমাদের, বড় হবার পর তারা অন্য কেউ

সন্তানের ভেতর দিয়ে মানুষ খোঁজে নিজের প্রতিচ্ছবি। সন্তানই তার কাছে পৃথিবী, সন্তানই সকল আনন্দের উৎস। আবার এই সন্তানই বয়ে নিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস- যখন সে ছিটকে পড়ে মা-বাবা’র আরাধ্য স্বপ্নের জগত থেকে। সন্তানের বড় হওয়া, পাওয়া-না-পাওয়ার অনুভূতি নিয়ে মনের খবর প্রতিনিধির সাথে কথা বলেছেন বিভা (ছদ্মনাম)।

আপনার ক’জন সন্তান?

২ জন।

ওদের বয়স কত?

একজনের ২২ আরেকজন ১৫।

সন্তানদের নিয়ে আপনি পরিতৃপ্ত?

অবশ্যই পরিতৃপ্ত। কিন্তু…

কিন্তু কী?

আসলে আমরা তো নিজেদের মত করে সন্তানদের নিয়ে স্বপ্ন সাজাই, কিন্তু আস্তে আস্তে আবিষ্কার করি সন্তানদের জগৎ কীভাবে আমাদের চিন্তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তখন মেনে নেয়া কষ্টের হয়। আর এখন তো মা-বাবা আর সন্তানদের সম্পর্কের মাঝে আরো কত বিষয় চলে এসেছে। তাই পরস্পরকে দেয়ার সময়টাও সংকুচিত হয়ে গেছে।

আপনি কি প্রযুক্তির কথা বলছেন?

হ্যাঁ প্রযুক্তি তো বটেই। এছাড়াও জীবনযাত্রা এখন আগের চেয়ে অনেক দ্রুতগতি সম্পন্ন। আমাদের মধ্যে যতটা পরিবারকেন্দ্রিক হওয়ার সুযোগ ছিল এখন সেটা কমে গিয়েছে।

কিরকম?

যেমন আমরা অবসরগুলোতে হয়তো পরিবারের সবার সাথে কাটাতাম, খাবার সময় একসাথে সবাই খেতাম। বছরে একবার হলেও পরিবারের সাথে আত্মীয়ের বাড়ি, দাদা-বাড়ি বা নানা-বাড়ি যেতাম। কিন্তু এখন তো অবসরই নেই। যাও বা আছে তাও তো প্রযুক্তির দখলে। আমরা একসাথে খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতাম। হয়তো মা খায়নি বা বোন খায়নি অপেক্ষা করতাম কখন তার কাজ শেষ হবে একসঙ্গে খাব। আমার বাচ্চাদের মধ্যে কিংবা ওদের সমসাময়িক অন্যদের মধ্যে এই অনুভূতি দেখি না। এ হয়তো আমার বা আমাদেরই ব্যর্থতা।

কখনো কি এমন মনে হয়েছে এই অনুভূতির ঘাটতি কোনোভাবে মেটানো যেত?

অনেক সময় আমি নিজের ব্যর্থতাগুলো খুঁজে দেখার চেষ্টা করি। হ্যাঁ মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের দায় ছিল। যেমন- আমি আর ওদের বাবা-ই খুব কমসময় একসঙ্গে বসে খেয়েছি, একসঙ্গে ঘুরতে গিয়েছি কিংবা খুব আন্তরিক পারিবারিক সময় কাটিয়েছি। ওরা আমাদেরকে বিচ্ছিন্নভাবেই পেয়েছে অধিকাংশ সময়। তাই হয়তো ওদের মধ্যে প্রত্যাশিত পারিবারিক বন্ধনের অনুভূতি তৈরি হয়নি।

এমন কেন হয়েছে? ওদের বাবার সাথে কি সন্তান প্রতিপালন নিয়ে আপনি বোঝাপড়ায় যাননি?

আসলে সত্যি বলতে সেই অর্থে আমাদের মধ্যে খুব শেয়ারিং এর সম্পর্ক ছিল না। সন্তানের বেশির ভাগ দায়িত্বই দেখা যেত আমি পালন করতাম। আমার স্বামী তার কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকতো।

তার মানে কি আপনাদের সন্তান দু’জনের সমান অভিভাবকত্ব পায়নি?

সত্যি বলতে পায়নি। আর এখন তার ফলাফলটা অনুভব করি। ওদের বাবাও সেটা এখন বুঝতে পারে। আমি তো আমার সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু প্রত্যাশামত ভবিষ্যত পেলাম কোথায়!

কীভাবে সেই ফলাফল অনুভব করেন?

এসব বলতে বা ভাবতে কষ্ট হয়। তবুও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ওদের মধ্যে খুব ইগনোর করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। আমরা বাবা-মা’কে যেরকম শ্রদ্ধার চোখে দেখে এসেছি সারাজীবন খুব স্বাভাবিকভাবে সেটাই আমাদের কাছে মানদণ্ড, কিন্তু ওদের ক্ষেত্রে সেই জিনিসটা খুঁজে পাই না। ওরা অনায়াসে আমাদের অশ্রদ্ধা করে বসে। সবচেয়ে কষ্ট হয় যখন আমাদের অনুভূতি ওদের স্পর্শ করে না।

যদি আবার ওদেরকে নতুন করে বড় করার সুযোগ পেতেন তাহলে কী করতেন?

আসলেই জানি না। হয়তো প্রত্যাশা একটু কমাতাম। আমরা সন্তানদেরকে সকল সুখের আধার মনে করি। কিন্তু বাস্তবতা কখনো তেমন নয়। সন্তানের শিশু বয়সটাই শুধু আমাদের বড় হবার পর তারা অন্যকেউ, অন্য কোনো ভুবনের বাসিন্দা। তখন তাদের জীবন অনেক সময় বাবা-মা’র জন্য হয়ে যায় অনধিকার প্রবেশের স্থান।

সন্তান বড় করতে গিয়ে যে সংকটগুলো আপনাকে ভুগিয়েছে সেই অভিজ্ঞতা থেকে অন্য অভিভাবকদের জন্য কিছু বলার আছে আপনার?

হয়তো পুরোটাই ভাগ্য। তবুও যথাসম্ভব একটা সহজ আনন্দময় পারিবারিক পরিবেশ সন্তানের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য সহায়ক হতে পারে। বাবা-মা’র বোঝাপড়াটা খুব দরকারি মনে হয় এখন।

বিভা’র মত অনেক অভিভাবককেই দীর্ঘশ্বাস ফেলতে দেখা যায় সন্তানদের জন্য। অনেকেই অভিযোগ করেন- সন্তানরা বাবা-মা’কে বোঝে না, বাবা-মা আর সন্তানের মানসিক দূরত্ব বাড়ছে কিংবা সন্তানের উচ্চাকাঙ্ক্ষা-জেদ-ঔদ্ধত্যের কাছে পরাজিত হচ্ছেন বাবা-মা। প্রশ্ন তৈরি হয়- কেন এমন হচ্ছে? এ থেকে উত্তরণের উপায়ই বা কী? সন্তান প্রতিপালনে মা এবং বাবার সমান অংশগ্রহণ এবং সুচিন্তিত-ভারসাম্যপূর্ণ অভিভাবকত্ব অবশ্যই সবচেয়ে আগে জরুরি। তবে একক প্রচেষ্টায় কোনো অভিভাবকের এইসব সংকট থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। কেননা দেখা যায় কোনো মা-বাবা তার সন্তানকে একভাবে প্রতিপালন করলেন, বড় করলেন- কিন্তু সেই সন্তান যখন স্কুলে পা রাখলো তখন সে প্রভাবিত হতে থাকলো তার বন্ধুদের দ্বারা। কাজেই সন্তানকে সঠিকভাবে বড় করার জন্য প্রয়োজন সামষ্টিক সচেতনতা, প্রয়োজন সামাজিক দায়বোধ।

সাদিকা রুমন, বিশেষ প্রতিবেদক
মনেরখবর.কম