মূল পাতা / জীবনাচরণ / অস্থিরতা অশান্তি আনে

অস্থিরতা অশান্তি আনে

অনুকূল আর প্রতিকূল পরিস্থিতির আবর্তেই জীবন। এ পরিস্থিতিগুলোকে একজন মানুষ কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে গ্রহণ করেন তার ওপরই নির্ভর করে জীবনের সাফল্য। তাই কখনো সুখ বা কখনো দুঃখ জীবনে প্রভাব বিস্তার করেকখনো বা জীবনের গতিপথকেই পরিবর্তন করে বা স্থবির করে দেয়। কিন্তু ইতিবাচক ও  প্রশান্ত চিত্তের অধিকারী একজন মানুষ যে-কোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে যেমন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তেমনি অনুপ্রাণিত করতে পারেন পারিপার্শ্বিকতাকেও।

জীবনে সাফল্যের বরমাল্য পড়তে হলে ধীর-স্থির ইতিবাচক হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। শান্ত পানিতে একটা ছোট্ট পাথর ফেললেও তার ঢেউ দূর থেকে দেখা যায়। অন্যদিকে উত্তাল সমুদ্রে একটা আস্ত জাহাজ ডুবে গেলেও তা টের পাওয়া যায় না। মানুষের মন যখন ধীরস্থির ইতিবাচক থাকে, তখন ছোট্ট একটা সূত্র ধরেও সে সমস্যার সমাধান করতে পারে। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তার মন যখন অস্থির, তখন তার সামনে অনেক বড় একটা সমাধানের সুযোগ থাকলেও সে তা সে দেখতেই পায় না। যেমন: একুরিয়ামে মাছ অস্থির হয়ে কাঁচ থেকে বের হতে চায় এবং বারবার কাঁচে বাড়ি খায়। ওপরে যে একটু ফাঁক আছে যা দিয়ে সে সহজেই বেড়িয়ে যেতে পারে, তা সে দেখতে পায় না। দেখতে না পাওয়ার কারণ সে স্থির নয়। একুরিয়ামের মধ্যে সে অস্থিরভাবে ঘুরে বেড়ায়।

একটি কথা আছে, কোনো ঘটনায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবেন না। একটু থামুন, লম্বা দম নিন। মনকে জিজ্ঞেস করুন, এ মুহূর্তে আমার করণীয় কী? আমাদের অনেক ভুলের জন্যে মাশুল গুণতে হয়, কারণ  পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে আমরা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করি। কারণ তখন আমাদের প্রবৃত্তি কাজ করে, আমাদের তখন হিতাহিতবোধ থাকে না। এ নিয়ে চেঙ্গিস খানের একটি ঘটনা রয়েছে।

মঙ্গল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা চেঙ্গিস খানের প্রিয় এক বাজপাখি ছিল। তিনি যেখানে যেতেন বাজপাখিকে সাথে করে নিয়ে যেতেন। একদিন তিনি গেছেন শিকারে। সাথে বাজপাখি। তিনি বনের মধ্যে একটি জায়গায় সুন্দর একটি ঝর্না দেখতে পেলেন। তার তেষ্টা পেয়েছে। তিনি পানি পান করার জন্যে ঝর্নার কাছে গেলেন। যখন তিনি পাত্রভর্তি করে ঝর্নার পানি মুখে দিতে যাচ্ছেন এ সময় হঠাৎ বাজপাখি পাশ থেকে ছো মেরে তার পানির পাত্র ফেলে দিল। চেঙ্গিস খান কিছুটা বিরক্ত হলেন। দ্বিতীয় বার যখন তিনি ঝর্নার পানি মুখে দিতে যাচ্ছেন, বাজপাখি এবারও পানি ঝাপটা দিয়ে ফেলে দিল। তৃতীয় বারও একই ঘটনা ঘটল। এ সময়ে চেঙ্গিস খান রাগ দমন করতে না পেরে তার তলোয়ারটি ছুড়ে মারলেন পাখিটির দিকে। পাখিটি তলোয়ারের আঘাতে মারা গেল।

চেঙ্গিস খান মর্মাহত হলেন এবং ভাবলেন, এতটা নির্দয় হওয়া উচিত হয় নি। সে সময়ে তিনি কিছুটা অগ্রসর হয়ে ঝর্নার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেন, সেখানে একটি সাপ মরে পড়ে আছে। অর্থাৎ সাপের বিষ ঝর্নার পানির সাথে মিশে গেছে। তিনি যদি ঐ ঝর্নার পানি মুখে দিতেন তাহলে তার মৃত্যু ছিল অনিবার্য। আসলে পাখিটিই তার প্রাণ বাঁচিয়েছে পাখি পান করতে না দিয়ে। যেহেতু বাজপাখির দৃষ্টি খুব তীক্ষ্ণ, এজন্যে বাজপাখি দূর থেকেই সাপটিকে দেখতে পেয়েছিল।

আসলে ধীরস্থির হওয়ার অর্থ হলো সবসময় ইতিবাচক থাকা, সময়, পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

বর্তমান সময়ে আমাদের বড় সমস্যা হলো আমরা ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে পারি না। রাগ, ক্ষোভ, অভিমান, প্রতিবাদ ও বিতর্কে জড়িয়ে পড়ি। কোনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে প্রথমেই রি-এ্যাক্ট করে ফেলি। মনে রাখতে হবে, বুদ্ধিমান মানুষ কখনো বির্তকে জড়ায় না বরং তিনি বুদ্ধিকে ব্যবহার করেন বির্তক এড়ানোর জন্যে। অস্থির অবস্থায় কখনো যুক্তি কাজ করে না, বিচার বিশ্লেষণ কাজ করে না। একটি কম্পিউটারের চেয়ে একটি মস্তিষ্ক যে মিলিয়ন গুণ বেশি শক্তিশালী সেই ক্ষমতাকে আমরা ব্যবহার করতে পারি না। ব্রেনের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম নিউরোন একটি আরেকটির সাথে যোগাযোগ করতে পারে না। ফলে আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। আর যারা মাথাটাকে ঠাণ্ডা রাখতে পারেন তারা সমাধান নিয়ে ভাবতে পারেন এবং সমস্যা সমাধানের বিকল্প কোনো পথও পেয়ে যান। কারণ মস্তিষ্ক হচ্ছে একজন মানুষের সবচেয়ে বড় বিশ্বস্ত বন্ধু।

এ প্রসঙ্গে একটি গল্প বলছি। দুর্দান্ত প্রতাপশালী এক রাজা। তার এক চোখ নেই। তার সাধ হলো নিজের ছবি তিনি আকাঁবেন। রাজ্যের সব নামকরা চিত্রকরদের খবর দেয়া হলো, রাজার ছবি আঁকতে হবে। কিন্তু কেউই সাহস করছে না এই একচোখওয়ালা রাজার ছবি আঁকতে। কেননা এই ছবি দেখলে রাজা ক্ষেপে যাবেন এবং চিত্রকরের ওপর শাস্তি বর্তাবে। যে-ই আসে সে কোনো না কোনো অজুহাত দেখিয়ে চলে যায়। কিন্তু রাজার সাধ পূরণ করতে হবে। একজন এসে রাজি হলো তিনি রাজার ছবি এঁকে দেবেন। এই চিত্রকর এমনভাবে ছবি আঁকলেন যেন এক চোখ বন্ধ করে রাজা শিকার করার ভঙ্গিতে রয়েছেন। এই ছবি দেখে রাজা তো মহাখুশি। তিনি চিত্রকরকে পুরস্কৃত করলেন। দেখুন, এই চিত্রকর কীভাবে পরিস্থিতিকে তার অনুকুলে নিয়ে এসেছে। তিনি পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেছেন এবং মাথা ঠাণ্ডা রেখেছেন। যে কারণে তার মাথায় বুদ্ধি চলে এসেছে এবং সে রাজার এই সীমাবদ্ধতাকে নতুন রূপে উপস্থাপন করতে পেরেছিলেন।

পারিবারিক জীবনে আমরা হেরে যাই, কাউকে অনুপ্রাণিত করতে পারি না এর কারণ হচ্ছে আমরা উত্তেজনাকে দমন করতে পারি না। মনে রাখতে হবে, কণ্ঠস্বর উঁচু করে কাউকে বোঝানো যায় না। কণ্ঠস্বর উঁচু করে আপনি আরেকজনকে চুপ করিয়ে দিতে পারবেন, বোঝাতে পারবেন না। যত ঠান্ডা থাকবেন তত তাকে বোঝাতে পারবেন। ঘরে ফেরা মাত্রই কাউকে অভিযুক্ত করবেন না, একটু সময় নিন। কোন পরিস্থিতিতে কোন কথাটা কীভাবে বললে এর ইতিবাচক একটি পরিসমাপ্তি ঘটবে তা নিয়ে একটু চিন্তা করুন।

দৈনন্দিন জীবনেও অনেক পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। নিয়ন্ত্রণে আনার জন্যে এই ব্রেনটাকে বেশি পরিমাণে ব্যবহার করতে হয় এবং কুশলী হতে হয়। ধরুন, আপনার ড্রাইভার প্রায়ই না জানিয়ে ছুটি কাটায়। এক্ষেত্রে তার সাথে চিৎকার-চেঁচামেচি করে কোনো লাভ নেই। এক্ষেত্রে ইতিবাচক কৌশল অবলম্বন করতে হবে। বলুন, এর পরে যদি এই কাজটা করো তাহলে তোমার বেতন থেকে এই টাকাটা কাটা যাবে।