মূল পাতা / জীবনাচরণ / মনোসামাজিক বিশ্লেষণ / আমাদের দৈনন্দিন জীবনচক্র
উদ্ভট উটের পিঠে চলছে দেশ

আমাদের দৈনন্দিন জীবনচক্র

একটি শিশু জন্মালে পরিবার জুড়ে কত আনন্দ, উল্লাস, উৎসবই না হয়! কোথাও আযানের ধ্বনি, কোথাও বা উলুধ্বনি দিয়ে নবজাতকের আগমন বার্তা জানানো হয়। তারপর তাকে ঘিরে জল্পনা কল্পনা কার মতো দেখতে ? বড় হয়ে কি হবে ? উপহারের বন্যা। এভাবেই কাটে কিছুদিন।

বাবা মা অভ্যস্থ হন নতুন জীবনে। কর্মক্ষেত্রে যান জীবনেরই প্রয়োজনে। নিঃসঙ্গ হতে থাকে শিশু। শহুরে স্বচ্ছল বাবা মা গভর্নেস রাখেন। কেউ সাধারণ কাজের লোকের কাছেই রেখে যান সন্তানকে। যে সংসারে নানি দাদি থাকেন সে সস্তান তো অসীম সৌভাগ্যবান। ইদানিং এমন পরিবার খুব বেশি দেখা যায় না। আজ মধ্যবিত্ত পরিবারের এমন এক সন্তানের কথা বলবো জীবিকার প্রয়োজনে যার মাকে পাঁচ বছরের সন্তানকে একা ঘরে রেখে চাকরিতে যেতে হতো।

স্কুল থেকে ফিরে এই শিশু তালা খুলে ঘরে ঢুকে নিজের কাপড় পাল্টে টেবিলে ঢেকে রাখা খাবার খেয়ে রান্নাঘরের উঁচু দেয়ালে বাড়ির একমাত্র জানালা দিয়ে আকাশ দেখতে দেখতে সেখানেই মেঝেতে ঘুমিয়ে পড়তো। ঘুম ভাঙলে নিজে নিজে উঠতো তখন থেকেই বই দেখা আর পড়ার চেষ্টা শুরু হয় ছেলেটির। পড়তে যা পারতো না সেগুলো দেখে কল্পনায় ডুব দিতো সে। এভাবেই নিজের তৈরি এক ফ্যান্টাসির জগতে ঢুকে যায় সে।

স্কুলে ক্লাস বাড়ে। নিঃসঙ্গতা দূর করতে বন্ধুদের সাথে স্কুল পালানো শেখে, শেখে টিকেট কেটে ভিসিআরে ছবি দেখা, নীলক্ষেতের ফুটপাত থেকে নিষিদ্ধ বই কিনে পড়া। বাবার সিগারেটের প্যাকেট থেকে সিগারেট সরিয়ে ধূমপানের অভ্যাসও হয় প্রাইমারি পাশের আগেই। পরীক্ষার ফল খারাপ হতে থাকে। লুকাতে শুরু করে মায়ের কাছে পরীক্ষার খাতা রিপোর্ট কার্ড। মিথ্যা বলা দিন দিন একটা আর্টে পরিণত হয় তার কাছে। সমাজের ন্যায় অন্যায়ের ধারনা তার কাছে “বুল শিট”!

সব পরিবারেই যেমন কিছু জটিলতা থাকে, সে সব জটিলতাও আরেক মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি করে । মানব মানবীর সম্পর্কের প্রতি অশ্রদ্ধা, সংসার আর সম্পর্কের প্রতি আনে এক বিতৃষ্ণা। সম্পর্ক তার কাছে খেলায় পরিণত হয়। ঘরে আসে সহোদর। এবার নানি আসেন শিশুর দেখাশুনার জন্য। এই ব্যবস্থাও ছাপ ফেলে শিশু মনে । ভাইকে নিঃসঙ্গ সময় কাটাতে হয় না। নিজেকে সংসারে অবহেলিত মনে করতে শুরু করে সে।

দুই সন্তান সংসার সামলাতে না পেরে চাকরি ছাড়েন মা। বড় ছেলেকে স্কুলে লেখাপড়ায় মনযোগী হতে হবে বলে অতিমাত্রায় শাসন শুরু হয়। স্কুল থেকে আনতে গিয়ে খাতা দেখে সেখানেই শুরু হয় মারপিট। ছোটভাই স্কুলে ভর্তি হলে শুরু হয় তুলনা। এতে আরো প্রতিক্রিয়া হতে থাকে। আরো লুকাতে থাকে সবকিছু মা বাবার কাছে। বাবার নানা আচরণে তার প্রতি একটা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। সেখান থেকে বাবাকে অগ্রাহ্য ও অপছন্দ। বাবাও নানা কারনে বেদম মারেন ছেলেটিকে। বড় হতে হতে বাবার প্রতি অশ্রদ্ধা চরমে ওঠে।

মাকে ভালোবাসলেও অনেক অভিযোগ মায়ের প্রতিও আছে। শ্রদ্ধা নেই মাতৃত্বের প্রতি। বাবা মা নিজেদের আনন্দে সন্তান জন্ম দেন তা কোন মহৎ কাজ নয় বলেই মনে করে সে। অসম প্রেম নানা বদ অভ্যাস সব কিছুর পরেও ভালো ফলাফল করেই সে পাস করে এস এস সি। ভর্তি হয় নামকরা কলেজে। চলে উদ্দাম জীবন৷ কিন্তু সবচেয়ে ভালো যেটা থেকে যায় তা হলো সেই বই পড়ার অভ্যাস। নানা বৈধ অবৈধ ভাবে যোগাড় করে বই পড়া। বাড়তে থাকে লাইব্রেরির কলেবর। নানা বিষয়ে তার প্রচুর জ্ঞান। ইন্টারনেটের চর্চা শুরু হয়। শুরু হয় লেখালেখি। অপূর্ব তার ভাষা, অনবদ্য লেখনি।

রাজনীতি বিষয়ে তার সচেতনতা আসে। লেখায় আসে সেই ছাপ। বাবা মায়ের ইচ্ছে ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হোক। চান্স হয়নি বুয়েটে বা কোন ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানেও ছিল কিছু ফাঁকি। ইচ্ছে নেই বাবা মায়ের ইচ্ছের ছাঁচে নিজেকে গড়তে । তাই কোথাও পরীক্ষা না দিয়েই বেড়িয়ে চলে আসে। কোথাও নামমাত্র বসে চলে আসে। ভর্তি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে । লেখাপড়ার পাশাপাশি চলে রাজনীতি আর সাহিত্য চর্চা।

কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের মিথ্যাচার, গোপন করার প্রবণতা, একাধিক সম্পর্ককে খুব স্বাভাবিক বলে মনে করে এবং জীবন চালিয়ে যায় এসবের মধ্যেই। সামাজিক সব নিয়ম প্রচলিত ধারনাকে বুড়োআঙুল দেখাতে দেখাতে ন্যায় অন্যায় বোধ সমাজ ছাড়া বল্গাহীন হয়ে পড়ে। মিথ্যাচার বাড়তে বাড়তে নিজের গলায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। জীবন হয়ে উঠছে অসহনীয়। কিন্তু জীবনের শুরুতেই লালিত ধারণাকে ছাড়তে পারে না সে কিছুতেই। জড়িয়ে যাচ্ছে অসীম জটিলতায় ,মুক্তি চায় সে , জানে না কীভাবে আসবে!

এই যে শিশুটি, তার প্রতি কি রাষ্ট্র আর পরিবারের কোন দায়িত্ব ছিল না? মাকে কাজে যেতে হয়। রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনা বা নারীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থানায় শিশুর জন্য ‘ডে কেয়ার’ থাকলে শিশুটির সুস্থ মানসিক বিকাশ হতো। যৌথ পরিবারগুলো টিকে থাকলে নানা নানি, দাদা দাদি, চাচা ফুপুর আদরে শাসনে অভিভাবকত্বে শৈশব হতো রঙিন।

বাবা মা নিজেদের অক্ষমতা ঢাকতে অতিরিক্ত শাসন করেন শিশুদের। যা শিশুকে সংশোধন না করে একগুঁয়ে আর বেয়াড়া করে তোলে। তাই মা বাবা হবার আগে বাবা মা হবার সামাজিক, শারীরিক, মানসিক,অর্থনৈতিক প্রস্তুতি থাকা জরুরি। বাবা মা নিজেদের সমস্ত অপূর্ণ সাধ সন্তানের দ্বারা পূরণ করতে চান এ অন্যায়। সন্তানেরও নিজের ভালোলাগা মন্দলাগায় জীবন গুছানোর স্বাধীনতা থাকতে হবে। সন্তানকে সবসময় বিশ্বাস করতে হবে। তার মধ্যে যদি এ ধারনা দেয়া যায় যে, বাবা মা তাকে বিশ্বাস করেন তবে তাদের ফাঁকি দিতে তার বিবেকে বাঁধবে। কোন সময় ফাঁকি দিয়ে ফেললেও দহন হবে। পরবর্তী সময় সে আর তেমন কাজ করবে না।

তাই বাবা মায়েরা সন্তানকে বুঝান যে তাকে আপনারা বিশ্বাস করেন। কোন সময় যদি বুঝতেও পারেন সে কিছু লুকাচ্ছে তবে বকাবকি না করে অপেক্ষা করেন। সে আসবে আপনার কাছে বলবে। না বললে কৌশলে জানবার চেষ্টা করেন। মিথ্যাবাদী বলে অবিশ্বাস করবেন না কখনোই। সন্তান আপনাকে ভয় পায় এটা কোন গর্বের কথা না। সন্তানের বন্ধু হন। নিজের ভালো মন্দ, সুখ দুঃখ তার সাথে শেয়ার করেন। তবেই সে নিজেকে সংসারে গুরুত্বপূর্ণ ভাববে। আপনাকে বন্ধু ভেবে নিজের ভালো মন্দ সে আপনার সাথে ভাগাভাগি করে নিবে। তখনই সম্পর্ক হয়ে উঠবে সহজ স্বাভাবিক।

তাই বাবা মায়েদের প্রতি অনুরোধ সন্তান শুধু জন্মই দিবেন না, তার লালন পালনেও যথেষ্ঠ দায়িত্বশীল হবেন। ক্ষনিকের শারীরিক সুখের ফল যেন কোন শিশুর জীবন না হয়। যথেষ্ট ভেবে চিন্তে যখন একটি নবজাতকের সারা জীবনের দায়িত্ব নেয়ার যোগ্য মনে করবেন নিজেদের, তখনই বাবা মা হন। কোন আবেগে বা হুজুগে নয়। আপনার এ দায়িত্বহীনতার দায় সমাজ ও রাষ্ট্রকেও বহন করতে হয়।