সুখী দাম্পত্য জীবন সমস্যা ও করণীয়

সুখী দাম্পত্য জীবন সমস্যা ও করণীয়

কথায় আছে, ‘আগে ঘর, তবে তো পর’। মানুষের জীবনে সুখের ক্ষেত্রে এই কথাটি খুবই সত্যি। নিজের পরিবারে যদি শান্তি না থাকে, তবে সে মানুষ বাইরে কীভাবে শান্তিতে থাকবে বা শান্তিতে কাজ করবে। আর একটি পরিবারের মূল ভিত্তি হচ্ছে দুজন মানুষের দাম্পত্য জীবন। দুজন মানুষের দাম্পত্য জীবনকে কেন্দ্র করেই তাদের পিতামাতা, ভাইবোন এবং সন্তানদের জীবন পরিচালিত হয়। তাই দাম্পত্য জীবনে স্থিরতা বা শান্তি একটা বড়ো বিষয়। কিন্তু আশঙ্কাজনক হারে দাম্পত্য অশান্তির মাত্রা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। নিত্যদিনের অশান্তি পরিবারকে বিধ্বস্ত করে ফেললেও বিবাহবিচ্ছেদ, আত্মহত্যা বা খুনের মতো ঘটনা না ঘটলে আমরা জানতেও পারি না। অনেকসময় পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি আমার পাশেই এরকম একটি অশান্ত দাম্পত্য জীবনযাপন করছিলেন, হয়ত আমাদেরই কোনো পরিচিত মানুষটি। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে কেন হচ্ছে এসব ঘটনা? কেন বেড়ে চলেছে এসব? সুখী দাম্পত্য জীবনের কী কী সূত্র? এখন আমাদের করণীয় কী? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে হাজির হয়েছিল মনের খবর এর মনোসামাজিক বিশ্লেষণ বিভাগ। মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিনের ১ম বর্ষ সংখ্যায় প্রকাশিত সেই মতামতের কিছু অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল-

দাম্পত্য অশান্তির কারণে সন্তানেরও ক্ষতি হয়- অধ্যাপক ডা. নাহিদ মাহজাবিন মোর্শেদ অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।

কিছুক্ষণ আগেই একজন নারী আমাকে ফোন করেছিলেন। তার স্বামীর সাথে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা চলছে। স্বামীটি মাদকাসক্ত এবং কোনো আয় উপার্জন করেন না। প্রায় প্রতি রাতে বাইরে থাকেন। সকালে বাসায় ফিরে রান্না পছন্দ হয়নিসহ বিভিন্ন ইস্যু তুলে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করেন, মারধর করেন, তাকে ডিভোর্স দেয়ার হুমকি দেন। কিন্তু নারীটি কখনো এসবের প্রতিবাদ করেন না, মুখ বুজে সব সহ্য করেন। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বাবা-মায়ের কষ্টের কথা চিন্তা করে চাকুরিজীবী এই নারীটি সমস্ত অত্যাচার সহ্য করে যাচ্ছেন। আজ মেয়েকে প্রচন্ড পরিমাণে মেরেছেন। ব্যাপারটি আসলে এরকম যে, মানুষ যখন অনেক দিন ধরে কোনো অন্যায় সহ্য করতে থাকে তখন তার ভেতরে ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে, তখন সেটি বেরোনোর পথ খুঁজতে থাকে, যখন একটু পথ পায় তখনই প্রচন্ড বেগে বের হতে থাকে। এই নারীর বেলায় মেয়েকে মারার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। আসলে দাম্পত্য অশান্তির কারণে শুধু স্বামী-স্ত্রী দুজনে ক্ষতিগ্রস্ত হন না, তাদের সন্তানেরও ক্ষতি হয়। আমাদের সমাজে দাম্পত্য অশান্তি সবসময়ই ছিল। তবে এটা নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট জরিপ নেই, তাই দাম্পত্য কলহ এখন আগের চেযে বেড়ে গেছে সেটা বলা যাচ্ছে না। এখন মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন, আগে যেখানে মানুষ পারিবারিক অশান্তি কিংবা নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করত এখন সেটা তারা প্রকাশ করছে, কাউন্সেলিং সেন্টারগুলোতে সেবা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, এই কারণে মনে হতে পারে যে পারিবারিক অশান্তি বাড়ছে। দাম্পত্য কলহ সৃষ্টির জন্য নানাবিধ কারণ আমরা দেখতে পাই। তবে সবচেয়ে বেশি যে কারণটি আমরা পাই তা হলো-ভুল বোঝাবুঝির দ্বন্দ্ব। আবার, আমাদের সমাজের অস্থিতিশীলতা দাম্পত্য কলহ সৃষ্টির পেছনে কাজ করছে। সমাজে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা কমে যাচ্ছে, ধৈর্যশীলতা কমছে, মাদকসহ অন্যান্য আসক্তি বাড়ছে, গণমাধ্যমগুলিতে শিক্ষণীয় ঘটনা কমছে এসব কিছুর প্রভাবই কিন্তু পরিবারের ওপর পড়ছে। এছাড়া দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সাথে আয়ের সংগতি না থাকা, তীব্র যানজটে সঠিক সময়ে কাজ করতে না পারাসহ নানা কারণে মানুষের মনমেজাজ খিটখিটে থাকছে। আমাদের দেশের গণমাধ্যমগুলিতে নেতিবাচক ঘটনার প্রচার বেশি। অনেক সময় এইসব পারিবারিক অশান্তি উস্কানি পায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। এখান থেকেও পারিবারিক অশান্তি বাড়ছে। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। যেকোনো সম্পর্কের সবচেয়ে বড়ো ভিত্তি হলো বিশ্বাস। বিশ্বাস এবং আস্থা ছাড়া যেকোনো সম্পর্কই ভঙ্গুর। সেবার পরিধি বাড়াতে হবে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দাম্পত্যকে আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

নারীরা অনেক বেশি সচেতন হয়েছেন-মিসেস সেলিনা ফাতেমা বিনতে শহিদ (ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট), সহকারী অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।

সহনশীলতার অভাব আমাদের দেশে দাম্পত্য কলহ বেড়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড়ো কারণ। মানুষের সহ্য করার ক্ষমতা আগের তুলনায় অনেকটা কমে গেছে। এটার পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। একটি হলো-নারীরা অনেক বেশি সচেতন হয়েছেন। আগে স্বামীরা অন্যায় করলেও স্ত্রীরা সেটি মুখ বুজে সহ্য করে নিতেন। এখন নারীরা স্বাবলম্বী হচ্ছেন, শিক্ষিত হচ্ছেন; ফলে তারা সবকিছু মেনে নিচ্ছেন না। অনেকক্ষেত্রেই তারা পারিবারিক শান্তির কথা চিন্তা না করে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছেন। ‘আমি কেন ছাড় দিব?’ ধরনের মানসিকতা এখন অনেক বেশি কাজ করে। এই ধরনের মানসিকতা যখন সহনশীলতার অভাবের মতো হয়ে যায়, তখন তা কলহ বাড়িয়ে দেয়। দুজনের মধ্যে একজন যদি মানসিকভাবে অসুস্থ হন। অসুস্থতা বলতে শুধু মানসিক রোগী হবেন তা-ই নয়; আত্মসম্মানবোধের অভাব, হীনম্মন্যতা, নেতিবাচক চিন্তা, দুজনের আয়ের পার্থক্যজনিত হীনম্মন্যতায় ভোগা ইত্যাদি বিষয়গুলোও কিন্তু কলহ বাড়ার পেছনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার বিষয়ে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বেশি বেশি নাক গলানো, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সঠিক যোগাযোগের অভাবও এক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। সুস্থ দাম্পত্য সম্পর্ক চালিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা পাঁচটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। যেমন-১. বোঝাপড়া ২. শ্রদ্ধাশীলতা ৩. বিশ্বস্ততা ৪. দায়িত্বশীলতা ৫. যত্নশীলতা। এই পাঁচটি বিষয়ের ঘাটতির ফলেও দাম্পত্য কলহ বেড়ে যায়। আর্থিক সমস্যার কারণেও অনেক সময় দাম্পত্য কলহ বাড়ে, তবে সেটি খুব কম ক্ষেত্রেই ঘটে। অর্থের অভাবের চেয়ে আবেগের অভাবেই দাম্পত্য অশান্তিটা বেশি হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় স্বামী-স্ত্রীর ভিন্ন চরিত্রবৈশিষ্ট্যও দাম্পত্য অশান্তি সৃষ্টি করে। সমস্যা হচ্ছে সম্পর্কের অবনতি মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার পরই দম্পতিরা আমাদের কাছে কাউন্সেলিংয়ের জন্য আসেন। তাদের সম্পর্ক খারাপের জন্য বাচ্চাদের যার যার নিজের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করেন, তাদের খারাপ সম্পর্কের কারণে বাচ্চারা প্রভাবিত হয়ে বখে যায়। সমস্যাগুলো তখন স্থায়ী একটা অভ্যাসের মতো হয়ে যায়। এর থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। অনেকেই ভাবেন যে, এতদিন যখন পার করে দিয়েছি তখন বাকি সময়ও পার করে দিতে পারব। আমাদের সমাজে অনেকেই দাম্পত্য কলহকে নিজেদের মধ্যকার ব্যাপার ভেবে সাইকিয়াট্রিস্ট বা সাইকোলজিস্টের কাছে আসতে চান না। এই ধারণা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।

পরিবার থেকেই সম্পর্ক রক্ষার শিক্ষা-শবনম আযীম সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়।

কিছুদিন আগে পত্রিকায় একটি পরিসংখ্যান দেখছিলাম যে, শুধুমাত্র ঢাকাতে প্রতিঘণ্টায় একটি করে অর্থাৎ দিনে চব্বিশটি করে ডিভোর্সের ঘটনা ঘটছে। এই পরিসংখ্যানের সত্যতা আছে কি নেই সেই বিচারে না গিয়েও যদি আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে বলি, তাতেও দেখা যায় যে আমাদের দেশে বিবাহ বিচ্ছেদসহ পারিবারিক অশান্তির পরিমাণ বাড়ছে। এর কারণ হিসেবে অনেকেই নারীর স্বাধীনতা, নারী শিক্ষাকে দায়ী করতে চান। কিন্তু আমি এই বিষয়টির সাথে একমত নই। আমার কাছে মনে হয় শিক্ষার হার বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ফলে নারীর আত্মসম্মান বৃদ্ধি পেয়েছে। একজন আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মানুষকে আপনি প্রতিনিয়ত অপমান করতে থাকলে সে সেটা মেনে নেবে এটা আশা করা ঠিক হবে না। আমি মনে করি অপমান, অবহেলা মেনে না নেওয়ার বোধ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই ডিভোর্সের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। নগরজীবনে এমন অনেক ঘটনা পাচ্ছি যেখানে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ডিভোর্স হচ্ছে। কারণ তাঁরা দুজনেই বুঝতে পেরেছেন যে তাদের একসাথে থাকা সম্ভব না। এই ব্যাপারটিকে আমি এক অর্থে পজিটিভভাবে দেখি। কারণ যখন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া ডিভোর্স হয় তখন আরো কিছু সহিংসতা এবং অপরাধমূলক ঘটনা বা বড়ো রকমের বিপদ ঘটার সম্ভাবনা কমে যায়। আমরা এখন খুব অস্থির একটি সময়ে বাস করছি। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে বাস করছি, যার ফলে আমাদের মধ্যে অস্থিরতা আরো বাড়ছে। প্রযুক্তি মানুষের চাহিদা বাড়াচ্ছে, আকাক্সক্ষা বাড়াচ্ছে। কিন্তু যে হারে চাহিদা এবং আকাক্সক্ষা বাড়ছে সেই হারে তা পূরণ হচ্ছে না। ব্যক্তির মধ্যে অস্থিরতা, অশান্তি, অতৃপ্তি অনেক বেড়ে যাচ্ছে। আগে মানুষের মধ্যে পরশ্রীকাতরতা কম ছিল, নিজেরটুকু নিয়ে নিজের মতো খুশি থাকার হার বেশি ছিল। কিন্তু তার সামনে যখন পুরো পৃথিবী উন্মুক্ত হয়ে যায়, যখন সে দেখে অমুক এই করছে, তমুক এই করছে তখন তার মধ্যে পরশ্রীকাতরতা ও অতৃপ্তি প্রকট হয়ে দেখা দেয়। অন্যদিকে, আমাদের সমাজে সহিংসতা এবং অপরাধ বেড়েছে। নিউক্লিয়াস ফ্যামিলির সংখ্যা বাড়ছে। এতে পারিবারিক এবং আত্মীয়তার বন্ধনগুলো দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। যখন কেউ এককভাবে বেড়ে ওঠে তখন তার মধ্যে আত্মকেন্দ্রিকতা, পারিবারিক বন্ধনগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা না থাকা, অন্যকে মূল্যায়ন না করাসহ ছোটো ছোটো কিছু মানসিক সমস্যা তৈরি হয়। এই ব্যাপারগুলো যখন কোনো মানুষের মধ্যে থাকে তখন সে কোনো সম্পর্ককে প্রাধান্য দিতে পারে না, আর যখন কেউ সম্পর্ককে প্রাধান্য দিতে পারে না, তখন সে খুব সহজেই একটি সম্পর্ক ভাঙতে পারে। পারিবারিক অশান্তির ক্ষেত্রে মিডিয়াও অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের মিডিয়াতে যেসব বিষয় নিয়ে সিরিয়াল দেখানো হয়, সেটি যদি কেউ নিয়মিত দেখেন তবে তার মনস্তত্ত্বে পরিবর্তন আসতে বাধ্য। দাম্পত্য কলহ বা বিবাহ বিচ্ছেদের মতো ঘটনা কমাতে হলে পরিবার থেকেই আমাদেরকে সেই শিক্ষাটা দিতে হবে। নিউক্লিয়াস পরিবারে সন্তানেরা যেহেতু আত্মীয় স্বজনের সাথে মেশার কম সুযোগ পাচ্ছে তাই বাবা-মায়ের সাথে তাদের সম্পর্ক এবং বাবা-মায়ের পারস্পরিক সম্পর্কও ভালো থাকতে হবে, যা দেখে সন্তানেরা নারী-পুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা শিখতে পারে। ইদানীং আমরা দেখি মেয়ে সন্তানকে শেখানো হয় যে, ‘তুমি মানুষ, তোমার সমান অধিকার’। কিন্তু কোনো ছেলে সন্তানকে শেখানো হয় না যে, একটি মেয়ের সাথে তার অধিকার সমান। ছেলে সন্তানকে যদি ছোটবেলা তার বোন বা পরিবারের অন্য নারী সদস্যদেরকে সম্মান করা শেখানো যায় তবে সে বড়ো হয়ে অন্য নারীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে। যা অবশ্যই দাম্পত্য অশান্তি সৃষ্টি না হওয়ার ক্ষেত্রে ভ‚মিকা রাখবে। তাই আমাদের দেশের মিডিয়াতে বেশি বেশি পজিটিভ জিনিস দেখাতে হবে, নারী-পুরুষ দুজন মিলে ভালো আছি, এই ধরনের বিষয়গুলোর প্রচার বাড়াতে হবে। বিচ্ছেদের সময় বা বিচ্ছেদের পরে সন্তানের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি থেকে বিরত থাকতে হবে।

মধ্যবিত্ত পরিবারে বিয়ে বিচ্ছেদের ভয় কমে থাকলে সেটা ভালোই- বন্যা মির্জা, অভিনেত্রী

দাম্পত্য অশান্তি বাড়ছে বা কমছে এগুলো আসলে খুব পরিসংখ্যান-নির্ভর কিনা আমি জানি না। কোনো নারী যদি অর্থনৈতিকভাবে উন্নত জীবনের অধিকারী হন, তাহলে তো অশান্তি বা সংঘর্ষপ্রবণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে চুপ থাকবার চেয়ে প্রতিবাদ করা বা বিচ্ছেদ চাইবার মানসিক প্রস্তুতি খানিকটা বেশি অর্জন করেছেন। সমাজে পুরুষাধিপত্য ছিল এবং আছে। কিন্তু নারীর কর্মক্ষেত্র ও মজুরিসাপেক্ষ কাজ করার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে সংঘর্ষ ও নির্যাতন কিংবা উপেক্ষার সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার প্রবণতা নারীর বাড়তে পারে। তর্কবিতর্কও বেড়ে থাকতে পারে। কিন্তু মধ্যবিত্ত নারীদের চেয়ে শ্রমিক নারীদের মধ্যে অত্যাচারী স্বামীকে ছেড়ে আসার প্রবণতা আগেও বেশি ছিল বলে আমি মনে করি। আর আমার অভিজ্ঞতা বলে এক পক্ষ চুপচাপ থাকার একটা চর্চা বহুকাল ধরেই আছে। সেটা শান্তির লক্ষণ হিসেবে দেখতে পারেন কেউ। কিন্তু সেটা একপেশে ভাবনা হবে। আমি আবারো বলি পরিবর্তনটা নিয়ে আমি খুব চিন্তিত নই। কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে বিয়ে বিচ্ছেদ নামক জুজুবুড়ির ভয় কমে থাকলে সেটা বরং ভালোই মনে করি। বিশেষ করে মেয়েপক্ষ নৈতিক চাপ মুক্ত হয়ে যদি দাম্পত্যকলহ বা বিবাহ বিচ্ছেদের বাস্তবতা মানতে পারেন, সেটা বিদ্যমান অত্যাচারমূলক বিয়েগুলোর ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি ভালো। মনে করি, বিয়ে একটা অত্যন্ত চাপের প্রতিষ্ঠান। মূলত, নারীর জন্য চাপ। কিন্তু খুব স্বাধীনতাকামী মানুষের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ নির্বিশেষেই এটা একটা চাপ। কিন্তু দাম্পত্যের মধ্যে আসা এতটাই সমাজ নির্ধারিত, এতটাই স্বাভাবিক যে মানুষ এর বাইরে সহজে ভাবতে পারেন না। তারপর বিবাহিত জীবনে প্রবেশের পর সেই চাপের অনুভূতিটা হতে পারে। তো যদি চাকুরিজীবী দম্পতি হন, অর্থাৎ যদি দুজনেই চাকরি করেন, সেক্ষেত্রে সম্পর্ক পরিস্থিতি যদি প্রতিকূল এবং পক্ষে কোনো বন্ধুবান্ধব বা সংগঠন পাওয়া যায় তাহলে বিয়ে থেকে বের হয়ে আসবার ইচ্ছেটা দানা বাঁধতে পারে। পারিবারিক অশান্তির ক্ষেত্রে নাটক-সিনেমা গল্পের কোনো প্রভাব নেই বলার মানে হয় না। আবার প্রভাব আছে ধরে নিলে দেশে তো দেশাত্মবোধক আর আধ্যাত্মিক মানুষে ভরে যাবার কথা। প্রথমত, আমি মনে করি নাটক-সিনেমাতে খুব গভীর ক্রিটিক্যাল কিছু কমই থাকে। আর শিল্পীদের বিবাহবিচ্ছেদ বা বহুবার বিয়েকে একটা প্রসঙ্গ হিসেবে দেখা মুশকিলের। আমরা এমন এক দেশের নাগরিক যেখানে একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির পর্যন্ত বহুবিবাহ ও বহুপ্রেম মানুষ সানন্দে গ্রহণ করেছেন। অন্তত তাঁর বিবাহসংখ্যার কারণে পদ নিয়ে টানাহেঁচড়া করতে দেখা যায়নি জনগণকে। তারকা শিল্পীরা অপেক্ষাকৃত পরিচিত বলে হয়ত তাঁদের দিকে চোখ পড়ে। যদি সমাজে সামগ্রিকভাবেই শান্তি বা আনন্দের চর্চা থাকে তাহলে সেটা দাম্পত্যে বা পরিবারেও প্রভাব বিস্তার করবে। তাছাড়া অশান্তিপূর্ণ সম্পর্ক ধরে রাখতেই হবে তাও আমি মনে করি না। কিন্তু আলাপ-আলোচনার পরিবেশ পরিবারে ও দাম্পত্যে থাকলে, খেতে বসে হাসি তামাশার চর্চাগুলো থাকলে হয়ত কিছু জিনিস সহজ হবে। কিন্তু চারপাশে এমনিতেই এত বিদ্বেষ আর হিংসা আর ঘৃণা-এসব থেকেই বা দূরে থাকতে পারছি কই আমরা!