শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কেমন হবে?

শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কেমন হবে?

জন্মের পর থেকেই শিশু শিক্ষালাভ করতে শুরু করে। এক সময় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন হয়। আমাদের দেশে শিক্ষার বিভিন্ন মাধ্যম যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সেসব মাধ্যমের ভেতর বিভিন্ন ধরনের সিলেবাস পদ্ধতি। শিক্ষা বাণিজ্যিকীকরণের হাত ধরে আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছে কিন্ডারগার্টেন বা এ ধরনের নামধারী বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন ধরন তাদের শিক্ষাপদ্ধতির। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের বইয়ের বোঝা এতই বেশি যে, একটি শিশু তা বহন করেও নিয়ে যেতে পারে না। মানুষের শিক্ষার ভিত্তিমূল স্থাপিত হয় শৈশব ও কৈশোরেই। কিন্তু দেখা যায় একটি শিশুকে শিক্ষা শুরুর আগেই প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়। নামীদামি স্কুলে ভর্তির জন্য একটি শিশুকে ভর্তি কোচিংয়ের নামে নামতে হয় প্রতিযোগিতামূলক বিশাল যুদ্ধে। কোনোভাবে বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারলেই শুরু হয়ে যায় আবার প্রম হওয়ার প্রতিযোগিতা। জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতা। এতকিছুর মাঝে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শিশুদের শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখছে? কেমন হওয়া উচিত শিশুশিক্ষার প্রাথমিক স্তরগুলো? ‘মনোসামাজিক বিশ্লেষণ’-এ এবারের আয়োজন, শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, কেমন হতে হবে?

শিক্ষার উদ্দেশ্যেই গলদ
সংগীতা ইমাম
শিক্ষক, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ
লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে’ এমন একটি প্রবাদ শেখার মধ্য দিয়ে শুরু হয় আমাদের শিশুদের শিক্ষার প্রাথমিক স্তর। শিক্ষাব্যবস্থা ও পদ্ধতির চেয়ে এখানে যেটি মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়, সেটি হলো শিক্ষার উদ্দেশ্য। আমি বলব, একেবারে শিশু বয়স থেকেই আমাদের শিক্ষার উদ্দেশ্য তৈরি করে দেয়া হয় নিজেকে স্বার্থপর হতে শেখা। এখানে সহপাঠীরা বন্ধু নয় বরং প্রতিযোগী। এতে শিক্ষার যে মূল উদ্দেশ্য সেটি নষ্ট হয়ে যায়। আমরা কখনো বলি না যে, ভালো মানুষ হও, ভালো শিক্ষা গ্রহণ কর। বরং আমরা বলি ডাক্তার হও, ইঞ্জিনিয়ার হও। আমার মনে হয় আমাদের শিক্ষার এটি একটি মূল সমস্যা। শিশুদেরকে অজান্তেই অর্থনীতিমুখী করে তোলা। অস্বাভাবিক প্রতিযেগিতা সেখান থেকেই শুরু হয়।

বাচ্চারা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকছে
মামুনুর রশিদ, অভিভাবক
বাচ্চাদের পড়াশোনাটা দিন দিন ব্যয়বহুল হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে পড়াশোনার চাপ, স্কুল কোচিং, হোমওয়ার্ক এসব নিয়ে বাচ্চারা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকছে। অন্যদিকে সরকারি স্কুলগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের চাপ এত বেশি যে, সেখানে বাচ্চাদের পড়তে দিয়েও স্বস্তিতে থাকা যাচ্ছে না। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখা যায়, একজন শিক্ষকের বিপরীতে কোনো কোনো ক্লাসে ৯০-১০০ জন করেও বাচ্চা পড়ে। খুব স্বাভাবিকভাবেই একজন শিক্ষকের পক্ষে এতগুলো বাচ্চাকে দেখে রাখা, তাদের যথাযথ পাঠদান সম্ভব হয়ে ওঠে না। এই সুযোগটাই গ্রহণ করছে শিক্ষাকে পণ্য বানাতে চায় যারা তারা। আমরা অভিভাবকরাও এখানে অনেকটা জিম্মি। হয়তো আমি চাইলাম একটু খোলামেলা পরিবেশে আমার বাচ্চা প্রয়োজনীয় শিক্ষাটুকু পাক। আমাদের সমাজবদ্ধ হয়ে থাকতে হয় এবং কাজ করতে হয়, সেখানে সমাজের দুয়েকজন এমনটা চাইলে সেটা পূরণ করা সম্ভব হবে না। আমি মনে করি, এজন্য সামাজিক সচেতনতার যেমন প্রয়োজন আছে, তেমনি রয়েছে সরকারের কঠোর নীতিমালা এবং তার প্রয়োগ।

শিশুদের মূল কাজ শুধুই পড়া নয়
অধ্যাপক ডা. ঝুনু শামসুন্নাহার
মনোরোগবিদ্যা বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
ছোটবেলায় শিশুদের পড়াশোনায় এত চাপ নেয়া উচিত নয়। যদি আনন্দের সঙ্গে ৫-৬ ঘণ্টা পড়াশোনায় ব্যয় করে তাতেই ভালো ফল করা সম্ভব। তবে শিশুর মানসিক পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি অবশ্যই খেলাধুলা, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করা, ঘুরে বেড়ানো, অবসর সময় কাটানো উচিত। শিশুদের মূল কাজ শুধুই পড়া নয়। প্রতিবেশীর বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া, খেলাধুলা করা, দশজনের সঙ্গে মেশা, ঘোরাফেরা করাসহ আনন্দ নিয়ে পড়াটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকদের শিশুবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শিশুকে সারাক্ষণ পড়ার চাপে না রেখে তাদের মতো করে ভাবতে দিতে হবে। ভালো রেজাল্ট করতে হবে এমন চাপ দিয়ে পড়ানোর চেয়ে শিশুরা যাতে আনন্দের সঙ্গে পড়ে, সেদিকে শিক্ষক ও অভিভাবকের নজর দিতে হবে।

শিক্ষার ওজনের সঙ্গে নিজের এবং ব্যাগের ওজনও বাড়ছে
অধ্যাপক ডা. এ কে এম সালেক
ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।
পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য নির্দিষ্ট আরো কিছু কাজ আবশ্যকীয়। যেমন- খেলাধুলা বা দৌড়ঝাঁপ করে শক্তিক্ষয়, সুষম খাবার গ্রহণ, খোলামেলা পরিবেশ ইত্যাদি। বাচ্চারা এখন যেভাবে বড় হচ্ছে বিশেষ করে শহরের বাচ্চারা, সেটিকোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বলতে গেলে এখন তিন-চার বছর বয়সেই স্কুলে যাওয়া শুরু করে। সেখানে শুরু হয় তার পড়াশোনার প্রতিযোগিতা। বেশিরভাগ স্কুলেই খেলার খোলামেলা পরিবেশ নেই, কোনো কোনো স্কুলে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা থাকলেও সারা বছর খেলাধুলার কোনো ব্যবস্থা নেই। আমাদের স্কুলগুলোতে নিয়মিত আউটিং হয় না, অর্থাৎ শিক্ষণীয় কোনো স্থানে গিয়ে শেখা-যেটিকে- আমরা হাতেকলেম শিক্ষা বলি। একই সঙ্গে বাচ্চাদের খাবারের ব্যাপারে আমরা সচেতন থাকছি না। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে একটি বাচ্চা শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি মুটিয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন আগ পর্যন্তও মেডিক্যাল টার্মে বলা হতো ২৫ বছর বয়সের আগে কারো হার্টব্লক হয় না, কিন্তু এখন আমরা ১০-১২ বছর বয়সী অনেক বাচ্চা পাই হার্টব্লকের রোগী, কিডনি সমস্যা ইত্যাদি অনেক কিছু। এদিকে দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগতভাবে আমি বলে আসছি, বাচ্চারা যেন তাদের ওজনের শতকরা ১০ ভাগের বেশি ওজন কোনোভাবেই বহন না করে। এসব বলে লাভ কী? শুনছে কে? না শুনছে অভিভাবক, না শুনছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারিভাবে কিছু নিয়ম থাকলেও তার প্রয়োগ আমরা কোথাও দেখি না। এমন ওজন টানার কারণে বাচ্চারা দিন দিন কুঁজো হয়ে যাচ্ছে, তাদের গ্রোথের সমস্যা হচ্ছে, কাঁধ নিচে নেমে যাচ্ছে। এসব প্রজন্মের গড় আয়ু কত বছর হবে তা আমরা এখনো জানি না। শুধু বই পড়ে লাভ কী হবে?

পড়ার চাপে শৈশব বলতে কিছু থাকে না
ত্রপা মজুমদার ,নাট্যশিল্পী
শিশুরা সারাক্ষণ পড়াশোনার চাপে থাকতে থাকতে তাদের শৈশব বলতে আর কিছু থাকে না। জীবনকে উপভোগ করতে পারে না। ছোটবেলা থেকেই প্রতিযোগিতা করতে করতে তারা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। যার প্রভাব তাদের পরবর্তী জীবনে পড়ে। শিক্ষাব্যবস্থায় এমন একটা ধারা তৈরি হয়ে গেছে যে, পরীক্ষায় ভালো করতে হলে স্কুলের পাশাপাশি হাউজ টিউটরের কাছে পড়তে হবে। আবার ক্লাসরুমে পড়ার পাশাপাশি স্কুলশিক্ষকের কাছেও প্রাইভেট পড়তে হয় কিংবা কোচিং করতে হয়। এই অবস্থার অবসান হওয়া দরকার। এজন্য শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন দরকার।

শিশুদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে মানসিক বন্ধ্যত্ব
মেহতাব খানম, মনোবিজ্ঞানী
প্রতিটা এজ গ্রুপের জন্য আলাদা শিক্ষা কারিকুলাম আছে। আমাদের দেশে সেগুলো তেমন গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় না। শিশু বয়সের এসব সমস্যা শিশুদের যেমন মানসিক সমস্যা তৈরি করে, ঠিক তেমনি কৈশোরে এসেও এর প্রভাব আমরা দেখতে পাই। বাইরে বের না হতে পারার কারণে শিশু বয়স থেকেই বাচ্চারা ইন্টারনেট বা কম্পিউটার গেমের প্রতি আসক্ত হয়ে যাচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে অনলাইন সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাডিকশন, পর্নো অ্যাডিকশন ইত্যাদি থেকে তাদের বের করে আনা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। বিভিনড়ব অপরিকল্পিত নিয়ম-কানুনের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠায় শিশুদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে মানসিক বন্ধ্যত্ব, শিশুরা হয়ে পড়ছে আত্মকেন্দ্রিক।

একই সঙ্গে প্রতিটি শিশুর পড়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে
অধ্যাপক ডা. গোলাম রব্বানী
চেয়ারম্যান, নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট
শিশুদের জন্য সবই দরকার। প্রাথমিক দরকার হলো সন্তান লালন-পালনে পিতা-মাতার প্রশিক্ষণ। যে পরিবারে পিতা-মাতা অসহিষ্ণু,সে পরিবারের সন্তানদের মধ্যে মাদকাসক্তি, ভীতিজনিত রোগ ইত্যাদি বেশি দেখা যায়। এরপর আসে পড়াশোনা। শিক্ষা বৈষম্য আমাদের দেশের শিক্ষার একটি অংশ। অর্থাৎ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সন্তানদের জন্য বিভিনড়ব ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছলদের জন্য অভিজাত স্কুল, আবার মধ্যবিত্তের সন্তানদের জন্য আরেক ধরনের স্কুল। এর মধ্যে আবার আন-অফিসিয়ালি ভালো স্কুল বা খারাপ স্কুল নামকরণ রয়েছে। ভালো স্কুলে ভর্তির জন্য শিশুদের প্রতিযোগিতার চাপ আছে। শিক্ষার পদ্ধতির এই শ্রেণিবিন্যাস শিক্ষার ক্ষেত্রে একটা সমস্যা তৈরি করছে। আবার অনেক জায়গায় অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপের কারণে বাচ্চাদের কাছে পড়াশোনাটা হয়ে গেছে এক ধরনের শাস্তির মতো। এছাড়া সব সিলেবাস বা পড়াশোনার সিস্টেম পুরোপুরি শিশুবান্ধব নয়। একটি বাচ্চার ওপর যখন তার সক্ষমতার বাইরে কিছু চাপিয়ে দেয়া হয়, তখন বেশকিছু মানসিক রোগ দেখা দেয়। যেমন- স্কুল ফোবিয়া, কনভার্সন ডিজঅর্ডার, প্যানিক ডিজঅর্ডার বা হিস্টিরিয়া, অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার ইত্যাদি। বাচ্চাটির পরিবারের মধ্যে যদি মানসিক রোগের ইতিহাস থাকে, তাহলে এ সমস্যাগুলো আরো বৃদ্ধি পায়। বাচ্চাদের পড়াশোনার ব্যাপারটি হবে আনন্দদায়ক এবং একই সঙ্গে প্রতিটি শিশু যাতে তার কাছের স্কুলে সঠিক পড়াশোনার সুযোগ পায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। অনেক দেশে আমরা দেখি ইনক্লুসিভ এডুকেশন সিস্টেম চালু আছে। অর্থাৎ শিক্ষার কোনো বয়স থাকবে না, যে কোনো বয়সের মানুষ একই শ্রেণিতে একসঙ্গে পড়ার সুযোগ পাবে এমনকি ডিজঅ্যাবিলিটিতে আক্রান্তরাও স্বাভাবিক শিশুদের সঙ্গে একই সঙ্গে পড়াশোনা করবে, প্রতিটা স্কুলে শিক্ষার মান একই থাকবে। সম্প্রতি চীনেও শিক্ষার এই পদ্ধতিটি প্রয়োগ করা হচ্ছে এবং ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে।

বিশ্লেষণ
ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশেষজ্ঞরা যেসব মতামত দিয়েছেন, সেখানে তারা সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বিষয় উল্লেখ করেছেন। যদিও সেসবের বেশিরভাগই নেতিবাচক। তবে এই বিষয়গুলোকে সঠিকভাবে নিরূপণ, পরিবর্তন ও প্রয়োগ করা গেলে শিশু-শিক্ষা পদ্ধতিতে বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন পাওয়া সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের আলোচনার বিশেষ দিকগুলো হচ্ছে- শিক্ষার পেছনে অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা, বয়সের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত অন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বাদ দিয়ে শুধু পাঠ্যবই পড়ার প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দেয়া, বয়সের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে পড়ার সিলেবাস তৈরি করা, সরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের তুলনায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি থাকা, শিক্ষা ব্যয়বহুল ও পণ্য হয়ে ওঠা, অভিভাবকত্বের বিভিন্ন সমস্যা, খেলাধুলাসহ শারীরিক বিষয়গুলো গুরুত্বহীন হয়ে পড়া, পড়া ও পরীক্ষা বিষয়ে প্রতিযোগিতার কারণে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে ওঠা, সামাজিকতা বিবর্জিত হয়ে ওঠা, স্কুলে নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়ার পরও কোচিং এবং প্রাইভেট পড়া, প্রতিষ্ঠান-পরিবার এবং কোচিং সেন্টার মিলে অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগের ফলে বিভিনড়ব মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়া, অতিরিক্ত বইয়ের ওজন নিয়ে চলা, স্কুলগুলোর আয়তন বা জায়গার নির্দিষ্ট কোনো অবয়ব না থাকা, অভিভাবকের শ্রেণি-পেশার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে শিশুদের শিক্ষাব্যবস্থা নির্ধারণ করা, ভালো স্কুল বা খারাপ স্কুল নামের আন-অফিসিয়াল লেবেলিং করা, ভালো-খারাপের কারণে বাসস্থান থেকে দূরের প্রতিষ্ঠানে যাওয়া। ওপরের প্রত্যেকটি বিষয় এবং পয়েন্ট বিনা দ্বিধায় গুরুত্বপূর্ণ। এটি খুবই সত্যি, সবগুলো বিষয় একসঙ্গে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এসবের পেছনের কারণ পর্যবেক্ষণ বা নির্ণয় করাও হয়তো সময়ের বিষয়। তবে কিছু বিষয় নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করা যেতে পারে। যেমন- যেসব বিষয় সহজে পরিবর্তন করা যায়, এমন বিষয়গুলো নির্ধারণ করা এবং দ্রুত পরিতর্বনের ব্যবস্থা করা। পেছনের কারণগুলো বের করতে পারাও হবে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ও দিক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা বিষয়টি পণ্য হয়ে ওঠা এবং শিক্ষাকে অর্থনৈতিক নির্ণায়ক হিসেবে জীবনের শুরুতেই একটি বড় নিয়ামক হিসেবে দেখা, এমন সমস্যার বড় কারণ হতে পারে। শিক্ষাব্যবস্থায় শিশুদের প্রতিদিনের আনন্দ ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব না দিয়ে দূরবর্তী উদ্দেশ্যগুলোকে প্রাধান্য দেয়া একটি বড় কারণ হতে পারে। একজন পরিণত মানুষ যদি তার সারাদিনের অতিগুরুত্বপূর্ণ অফিসের কাজ অফিসেই সেরে আসতে পারেন, তবে একজন ছাত্র বা শিশুছাত্র কেন সেটা স্কুলেই সেরে আসতে পারবে না! শিশুরা যদি বয়সের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বিষয় নিয়েই দিন পার করার সুযোগ পায়, সেটাই হতে পারে সঠিক পদ্ধতি। আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই আলোচনায় উঠে এসেছে, তা হলো ‘ভালো স্কুল ও খারাপ স্কুলের কনসেপ্ট’। প্রতিযোগিতার এটিও একটি বড় কারণ। যদি প্রতিটি স্কুলের মান সমান করা যেত, সমান মানের শিক্ষক, পড়া-সিলেবাস বা পদ্ধতি হতো, তাহলে এসব সমস্যা কমে আসবে বলে আশা করা যায়। তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশ, জনসংখ্যার সমস্যা, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ ইত্যাদি বিষয় যেখানে আছে, সেখানে এমন সমস্যা হবেই, এটা না ভেবে উল্টো কেন হচ্ছে, কী হচ্ছে সেসব নিরূপণ করা জরুরি। জরুরি দ্রুত পরিবর্তন করার উদ্যোগ নেয়া। গবেষণারও প্রয়োজন আছে প্রচুর। ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষাপদ্ধতি, সমন্বয়হীনতা, বাড়ির পাশের স্কুলে পড়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সমমানের না হওয়া, স্কুল কোচিং এবং মাত্রাতিরিক্ত পড়ার চাপ শিশুকে সারাদিন ব্যস্ত রাখছে ক্লাস অথবা পড়ার টেবিলে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্যানিটেশন ব্যবস্থা পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসম্মত না হওয়ার কারণে শিশুদের মধ্যে জীবাণুঘটিত এবং সংক্রামক রোগের ঝুঁকির বিষয়টিও কোথাও কোথাও বেশ গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হয়। বাংলাদেশ ইনক্লুসিভ এডুকেশন নিয়ে ইউনিসেফ একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। প্রতিবেদনটি পড়তে পারেন এখান আজকের শিশুই আগামীর ভবিষ্যৎ। সচেতন দেশগুলো যে সময় তাদের সন্তানদের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য নিয়মিত গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে এবং সর্বস্তরে তার প্রয়োগ ঘটাচ্ছে, ঠিক সেই সময় আমাদের দেশের শিশুদের এসব বিষয় এখনো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না। তবে পাশাপাশি একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, পাশ্চাত্যের বিষয়গুলোকে হুবহু অনুকরণ করাও ঠিক হবে না। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, সামাজিক কাঠামো ও পারিবারিক বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই এসব সমাধানের পরিকল্পনা করা উচিত। এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য শিক্ষক, অভিভাবক, নীতিনির্ধারক, গবেষকসহ সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে।

সূত্র: মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিন,১ম বর্ষ, ২য় সংখ্যায় প্রকাশিত।