নারীর কর্মস্থল : চাওয়া-পাওয়া

নারীর কর্মস্থল: চাওয়া-পাওয়া

নারীদের অগ্রযাত্রা আজ সারা বিশ্বজুড়েই। যার কারণে তারা আজ সমাজের বিভিন্ন স্তরে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন, পরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করছেন, সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রটা অর্থাৎ কর্মস্থল নিয়ে কর্মরত নারীরা কী বলেন? সেখানকার পরিবেশ একজন নারীর জন্য কতটুকু সুবিধাজনক বা অসুবিধাজনক? যেসব নারী সবকিছু বাদ দিয়ে গৃহিণীর ভূমিকা পালন করছেন, তাদের ক্ষেত্রে কর্মস্থল কেমন মনে হয়? আবার একজন বিবাহিত কর্মজীবী নারী একইসঙ্গে একজন ঘরণী এবং কর্মজীবী মহিলা। সেক্ষেত্রে তার কর্মস্থল হয়ে যাচ্ছে দুটি। এই দুই কর্মস্থল কীভাবে তারা সামলাচ্ছেন? বর্তমানে সন্তানদের লালনপালনের ক্ষেত্রে পিতা-মাতার ভূমিকার কথা প্রায়ই বলা হয়। একজন কর্মজীবী মা কীভাবে সে দায়িত্ব পালন করছেন? তার কর্মক্ষেত্র কি এসবের জন্য কোনো ভূমিকা রাখে? নারীদের কর্মস্থলের বর্তমান বাস্তব চিত্রটা কেমন-তা জানতে সমাজের বিভিন্ন স্তরের নারীদের সাক্ষাৎকার নিয়ে আমাদের এবারের মনোসামাজিক বিশ্লেষণ-‘নারীর কর্মস্থল : চাওয়া-পাওয়া।’ মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিনের জন্য সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন- মো. মারুফ খলিফা এবং বিশ্লেষণ করেছেন ডা. পঞ্চানন আচার্য্য।

কর্পোরেট জগৎ নারীবান্ধব করার উদ্যোগ নিতে হবে
এ্যানী আচার্য্য, সিনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, এম-পাওয়ার, ঢাকা
আমি যে বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করি সেটার পরিবেশ যথেষ্ট সৌহার্দ্যপূর্ণ, তাই আমার তেমন একটা অসুবিধা হয় না। তবে বেশ কিছু অফিসে চাকরি করে আসারঅভিজ্ঞতায় কর্পোরেট জগৎ মেয়েদের জন্য একটু কঠিন বলেই আমার মনে হয়। এখানে একটা বড়ো সমস্যা হলো কর্মঘণ্টা। নির্ধারিত সময়ের বাইরেও অনেক সময় কাজ করতে হয়। সেইসাথে আছে যাওয়া আসার পথে জ্যাম, পরিবহনের অসুবিধা। সবমিলিয়ে একজন কর্মজীবী নারীকে দিনের একটা লম্বা সময় ঘরের বাইরে থাকতে হয়। ফলে সে পরিবার এবং সন্তানকে দরকারমতো সময় দিতে পারে না। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ছোটো বাচ্চা থাকার কারণে আমার ভেতরে সবসময় দ্রুত বাসায় ফেরার তাড়না কাজ করে। অফিস থেকে বের হওয়ার পরই মনে হয় যদি উড়ে উড়ে বাসায় ফিরতে পারতাম! দ্রুত ফিরতে না পারলে মানসিক যন্ত্রণা বাড়ে। আবার কর্পোরেট সেক্টরের সব অফিসেই নানা ধরনের প্রোগ্রাম, আউটিং, ডিনার, মিটিং, কর্পোরেট পার্টি ইত্যাদি থাকে-যার বেশিরভাগই অফিস সময়ের পরে অর্থাৎ রাতে হয়ে থাকে। এর অনেকগুলোতেই নারীকর্মীরা অংশগ্রহণ করতে পারে না এবং সেজন্য অফিসে কথা শুনতে হয়। এর বিপরীতে অফিসের কাজের জন্য পারিবারিক অনেক অনুষ্ঠানেও সময় দিতে পারে না, ফলে অনেক ধরনের জটিলতায় পড়তে হয়। এ সমস্যা পুরুষদের ক্ষেত্রেও হয়, তবে নারীদের মতো তাদের এত চাপ পেতে হয় না। একজন নারীর স্বনির্ভরতা ও পারিবারিক অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতায় অবদান রাখার জন্য তার উপার্জন সক্ষমতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য যদি কর্পোরেট জগতে আসতে হয়, তাহলে এখানে নারীদেরকে অনেক বেশি পরিশ্রমী হতে হবে এবং ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ আর ভিন্ন ভিন্ন মানুষের সাথে মেশার দক্ষতা অর্জন করতে হবে। আর আমাদের দেশে কর্পোরেট জগৎ নারীবান্ধব করার জন্য বিভিনড়ব উদ্যোগ নিতে হবে। যেমন-নতুন মায়েদের জন্য একটা আলাদা জায়গা থাকা; যেখানে বাচ্চাকে রাখা যাবে, ব্রেস্টফিড করানো যাবে। এতে কিন্তু নারীটির কাজে মনোযোগ দেয়া অনেক বেশি সহজ হয়-যার পুরো সুফলটা আসলে অফিসই পাবে। আর সবচেয়ে বেশি যেটি দরকার, তা হলো অফিসিয়াল দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। একজন নারীকে যে তার পরিবার এবং সন্তানকে সময় দিতে হয়, সে যে ঘরের পুরুষ মানুষটির মতো অফিসের আগে বা পরে উদাসীন থাকতে পারে না, সেটা অনুধাবন করা উচিত। যে কেউ তার নিজেদের আপনজন ও কর্মজীবী নারীদের অসুবিধাগুলো একটু লক্ষ করলেই কিন্তু সহকর্মীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সহজেই হয়ে যাবে। তখন নারীকে উৎসাহ দিতে বা সহায়তা করতে আটকাবে না। তা না হলে কর্পোরেট খাতে কাজ করা নারীদের মানসিক চাপ বাড়তেই থাকবে।

নারীদের মানসিকতাও পিছিয়ে থাকার একটা কারণ
নিপুণ, চিত্রনায়িকা
মিডিয়াতে আসার আগে আমি আমেরিকাতে ছিলাম। সেখানে আমি একটা জব করতাম। বর্তমানে ঢাকাতে আমি ‘টিউলিপ নেইলস অ্যান্ড স্পা’-একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছি। মিডিয়া জগতে আমি যখন কাজ শুরু করি তখন আমার পরিবার থেকে বেশ সহযোগিতা পেয়েছিলাম। যদিও পরিচিতরা অনেকে একটু দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। আসলে মিডিয়াতে অন্য যেকোনো ক্ষেত্রের চেয়ে কাজ বেশি করতে হয় এবং ৯টা-৫টার মতো নির্ধারিত কোনো সময় নেই। এখানে পরিচালক, সহকারী পরিচালক, প্রযোজক থেকে শুরু করে মেকাপ ম্যান, ড্রেস ম্যান, ক্যামেরাম্যান, ড্যান্স ডিরেক্টর, সহ-অভিনেতাসহ নানা ধরনের মানুষের সাথে কাজ করতে হয়। সেক্ষেত্রে দেখেছি যে, যখন কোনো নারী নিয়ন্ত্রণকারীর ভ‚মিকায় থাকে, তখন পুরুষ সহকর্মীরা সেটা মানতে পারে না। অবশ্য এখন পরিস্থিতি অনেক বদলেছে আমেরিকা এবং বাংলাদেশের অবস্থা তুলনা করে আমার যা মনে হয়, আমাদের এখানে কর্মক্ষেত্রে নারীদের সফলতা কম আসার পেছনে নারীরাও কতকাংশে দায়ী। আমাদের নারীরা অনেক বেশি পরনির্ভরশীল। যেমন, আমার নিজের প্রতিষ্ঠানে সকল কর্মীই নারী। দেখা যায়, তারা কোনো কাজ করতে গেলেই সেটা কীভাবে করবে, এটা তো কঠিন, এটা আমরা পারব না-এরকম নানা ধরনের দ্বিধায় ভুগতে থাকে। আমাদের এখানে নারীরা ব্যাংকিং না করে মাস শেষে নগদ টাকা পেতে আগ্রহী। সমস্যা হচ্ছে, নগদ টাকা পেলে তা দ্রুতই খরচ করে ফেলে। যার ফলে তাদের সঞ্চয়ও তেমন হয় না। আমাদের নারীরা অনেক বেশি কাজ করলেও গোড়ার কিছু জায়গায় পিছিয়ে থাকায় তার প্রাপ্যটা পাচ্ছে না। সেসব উনড়বয়নের জন্য নারীদেরকে ব্যাংকিং শিখতে হবে, দাপ্তরিক কথোপকথনে অভ্যস্ত হতে হবে, সময়ানুবর্তী হতে হবে। আমেরিকাতে চাকরিকালীন দেখেছি, বাচ্চার কারণে আমার দেরি হতে পারে- এটা অফিস শুনত না। কিন্তু আমাদের এখানে জ্যাম, বাচ্চা অসুস্থ কিংবা শরীর খারাপ এরকম নানা অজুহাত নারীরা দিয়ে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে এসব যৌক্তিক হলেও, আমার মনে হয়-এটা কর্মজীবী নারীদেরকে যোগ্য সম্মান না দিতে পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থাকে আরো উস্কে দিচ্ছে। আমেরিকার জব কালচার থেকে আমি শিখেছি যে, কাজের জায়গায় শুধু কাজ। কিন্তু আমাদের এখানে কাজের জায়গায় পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশি সাংসারিক আলাপ করে থাকেন। এরকম বেশ কিছু জায়গায় আমাদের নারীদেরকেও বদলাতে হবে।

কর্মক্ষেত্রে অবজ্ঞা নারীকে মানসিকভাবে পিছিয়ে রাখছে
রাবেয়া শারমীন, সফল উদ্যোক্তা, রূপকথা জামদানী, ধানমন্ডি, ঢাকা
আমাদের সমাজ ব্যবস্থা মোটেই নারীবান্ধব নয়। আমি প্রায় নয় বছর যাবৎ আমার ব্যবসাটি পরিচালনা করছি। এখন মোটামুটি একটা ভালো অবস্থানে থাকলেও যখন শুরু করি তখন আমাকে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা, অসহযোগিতা এবং প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। যেমন- ব্যবসা করতে গেলে কাঁচামাল ক্রয় থেকে পণ্য উৎপাদন ও বিতরণ পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে আমাদের নানা মানুষের সাথে কাজ করতে হয়। কিন্তু সবখানেই নারী হিসেবে আমাদের অবজ্ঞা করা হয়। একটা জায়গায় চারজন পুরুষের সাথে মালামাল কিনতে গেলে, সেখানে সবার শেষে নারীদের দেওয়া হয়। এখন পরিচিত দোকানদাররা এরকমটা করেন না, কিন্তু নতুন জায়গাতে গেলে আগের মতোই অভিজ্ঞতা হয়। এইগুলো প্রথমদিকে খুব খারাপ লাগত। আমার মনে হয় নারীকে মানসিকভাবে পিছিয়ে দেওয়ার জন্য এই ধরনের অবজ্ঞা বেশ বড়ো রকমের প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। একজন কর্মজীবী নারীকে তার সংসার, সন্তান সামলে কাজ করতে হয়। আমিও আমার দুটি সন্তানকে সামলে কাজ করছি। কিন্তু আমার সামনে কেউ কিছু না বললেও পেছনে আমার প্রতিবেশী, স্বজনরা, এমনকি আমার ব্যবসার কর্মীরাও সন্তান রেখে কাজ করার জন্য আমার সমালোচনা করছেন। তবে আমি কখনো ভেঙে পড়িনি। আমি জানতাম যে, নারী হিসেবে কাজে নামলে এগুলো শুনতেই হবে। আমি সফলতার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম। আমাদের সমাজে কাজের স্বীকৃতি পেতে হলে নারীকে পুরুষের তুলনায় তিন গুণ বেশি কাজ করতে হয়। তাই কর্মজীবী নারীর সফলতার জন্য জেদের বিকল্প নেই বলে আমার মনে হয়। আমাদের দেশে কর্মজীবী নারী বা ব্যবসা করেন এমন মেয়েদের ক্ষেত্রে বিয়ের সময়ও তারা সংসার সামলাতে পারবে কিনা এ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। আমি এক্ষেত্রে ভাগ্যবতী ছিলাম কারণ আমার স্বামী বেশ সহায়তাপ্রবণ ছিল। সমাজে যে যেভাবেই দেখুক না কেন, আমার মতে নারীর সফলতার জন্য বা তাকে সাহস যোগাতে পুরুষ সঙ্গীটির ভূমিকা অনেক। আর নতুন যেসব মেয়েরা কাজ করতে চান তাদের উদ্দেশ্যে আমি বলব-প্রত্যেকটা মানষু কোনো না কোনো দক্ষতা নিয়ে জন্মেছে। আপনি কোন বিষয়ে দক্ষ সেটি খুঁজে বের করুন, তারপর পুঁজির জন্য চিন্তা না করে কাজে নেমে পড়ুন। কাজ করলে সফলতা আসবেই।

নারীর গৃহকর্ম, কাজ হিসেবে দেখা হয় না
সালেহা আমজাদ, গৃহিণী
আমাদের সমাজব্যবস্থায় গৃহিণীকে পেশা হিসেবে দেখা হয় না। অথচ বেশিরভাগ নারী তাদের জীবনের অধিকাংশ সময় গৃহকর্মে দিচ্ছেন। আমার কাছে মনে হয় গৃহকর্মকে পেশা হিসেবে দেখার জন্য সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। তাহলে নারী অনেক বেশি মানসিক প্রশান্তি পাবে। মানসিক প্রশান্তি ছাড়া নারীর আসলে খুব বেশি কিছু চাওয়ার নেই। সেই সাথে নারীকে গৃহকর্মে সহযোগিতা করার দায়িত্ব পুরুষকে নিতে হবে। গৃহে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। সর্বোপরি নারীকে সম্মানের চোখে দেখতে হবে।

শ্রমজীবী নারীকে খারাপ চোখে দেখা হয়
তাসলিমা আক্তার, শ্রমজীবী
ছোটোবেলা থেকে শুনে আসছি কাজ ছোটো হোক বড়ো হোক সবই সমান। কিন্তু কাজ করতে এসে দেখেছি শ্রমজীবী নারীকে সমাজে খুবই খারাপ চোখে দেখা হয়। সেই সাথে কাজের জায়গায় নির্যাতন, যৌন হয়রানির মতো ঘটনা তো রয়েছেই। আবার কাজ শেষে বাসায় ফিরেও স্বামী, শ্বশুরবাড়ির নির্যাতন আমাদের প্রতিদিনই সহ্য করতে হয়। আমার মনে হয়, নারী হিসেবে জন্মানোই এই সমাজে অভিশাপ। আমি সরকার এবং যারা সমাজের শিক্ষিত মানুষ আছেন তাদের সবাইকে অনুরোধ করব কাজের জায়গায় এবং পরিবারে নারীর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করুন। কর্মস্থলে নিরাপত্তা এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা

নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে
মাহজাবীন আফতাব সোলায়মান, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ
কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ সময়ের পরিক্রমাতে বেড়েই চলেছে। তবে সামগ্রিকভাবে কর্মজীবী নারীদের কর্মস্থলের বর্তমান অবস্থা তেমন অনুকূলে নয় বললেই চলে। এখানে লিঙ্গবৈষম্য, পক্ষপাত, যৌন নির্যাতন, শত্রুতা, নিরাপত্তার অভাব, অবকাঠামোগত সমস্যা, যাতায়াতের অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি নৈমিত্তিক ঘটনা। সকালে যানবাহনে ওঠা থেকে শুরু করে সন্ধ্যায় বাসায় পৌঁছানো অবধি এই প্রতিক‚ল অবস্থা বিরাজমান। উপজেলা বা গ্রামের চিত্রও কমবেশি একই। একজন নারী কিন্তু অফিসের কাজ করার পাশাপাশি নিজের বাসায় একইভাবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। আপনজনের খাওয়া-দাওয়া, সন্তানের লেখাপড়া, স্কুল, কোচিং, অসুখ বিসুখে সেবা, ডাক্তার-এসবের অধিকাংশ দায়িত্ব কিন্তু তার ওপরেই ন্যস্ত। দায়িত্বে সমতা আনতে গিয়ে নারী অনেক সময়েই হিমশিম খেয়ে যান। আবার অনেক অফিসে কাজ করার জন্য অনুকূল পরিবেশ থাকে না। যেমন ধরা যাক, টয়লেটের অব্যবস্থাপনা। মেয়েরা স্বভাবগতভাবেই এই ব্যাপারটি নিয়ে খুবই দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকেন। মাসের বিশেষ দিনগুলোতে এই কষ্টটি আরো বেড়ে যায়। এরকম বিভিনড়ব প্রতিকূলতার ফলে নারী মানসিক চাপ, হতাশা, অতিরিক্ত ও অহেতুক চিন্তা, স্নায়বিক দুর্বলতা, বিষণ্ণতায় ভুগতে পারেন। এতে তার কাজের মান নষ্ট হয়, পদোন্নতি আটকে যায়, ফলে অনেকে চাকরি নামক এই সোনার হরিণের ইতি টানেন। আবার, আমাদের সমাজে নারীকে একজন মানুষ হিসেবে নয় বরং নারী হিসেবে বেশি দেখা হয়। একইভাবে নারী চিকিৎসককেও চিকিৎসক হিসেবে দেখার মানসিকতা অনেকের নেই। সরকারি, বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় নারী চিকিৎসকগণ দিন-রাত শ্রম দিচ্ছেন। তারা পুরুষ চিকিৎসকের পাশাপাশি মেডিক্যাল সায়েন্সের সকল ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। চিকিৎসক হিসেবে তাকেও হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী রাতে ডিউটি করতে হয়, রোগীর জরুরি অবস্থা হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে হয়। এ ব্যাপারটা পরিবারের গুরুজনদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন। আর স্বামীর সহযোগিতা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দরকার। আবার শহরের হাসপাতাল ছাড়া বিভিন্ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকে আবাসন সমস্যা প্রকট। সাথে আছে নিরাপত্তার তীব্র অভাব। অনেক সময়েই নারী চিকিৎসককে রোগীর নিকটজনের কাছে হেনস্থা হতে হচ্ছে, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে; এমনকি তারা নারী চিকিৎসককে যৌন নির্যাতনের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে-যা একজন নারীর জন্য চরম অবমাননাকর। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব লোক আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে কোনো শাস্তি ছাড়াই বের হয়ে যাচ্ছে। তাই ফলপ্রসূ চিকিৎসা প্রদানের লক্ষ্যে নারী চিকিৎসকদের আবাসন ও নিরাপত্তা অপরিহার্য। আবার, নিঃসন্দেহে মানসিক রোগ চিকিৎসা একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা। এই বিষয়ে নারীদের অংশগ্রহণও এখন লক্ষণীয়। আমার পরিচিত নারী চিকিৎসকরা, যেমন  আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষিকাগণ ও সহকর্মী, সকলেই ঘরসংসার সামলে ডাক্তারি করেছেন ও করছেন। যাঁরা পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করার লক্ষ্যে বিভিন্ন কোর্সে আছেন তাঁরা তো সংসার সামলে পড়াশুনাও করছেন, পরীক্ষা দিচ্ছেন। একজন নারী চিকিৎসক কিন্তু ছুটির দিনটাও সাংসারিক কাজে ব্যয় করেন। তবে পরিবারের নিকটজনের অবদান এ ক্ষেত্রে অনস্বীকার্য। আসলে নারী চিকিৎসকের প্রতি এসব বিরূপ ধারণা একেকজনের মানসিক উপলব্ধির ওপর নির্ভর করে। তবে সময় বদলাচ্ছে। এখন স্বামী-স্ত্রী উভয়ই দায়িত্ব ভাগ করে নিচ্ছেন। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে নারী চিকিৎসকদের কর্মস্থল খুব একটা নিরাপদ বা সহায়ক নয়। লোকবলের অপ্রতুলতা, প্রয়োজনীয় তত্ত্বাবধানের অভাব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, যাতায়াতের অব্যবস্থা, নিরাপত্তার অভাব প্রভৃতি যদি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করে, তবে নিশ্চিতভাবে নারী চিকিৎসকদের অংশগ্রহণ অনেকগুণ বৃদ্ধি পাবে।

বিশ্লেষণ
উপরের আলোচনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্তরে কর্মরত নারীদের বিভিনড়ব অভিজ্ঞতা ও মতামত উঠে এসেছে। যেটি নিঃসন্দেহে বৈচিত্র্যপূর্ণ, আর তাই এ আলোচনার গুরুত্বও অনেক। ভিন্নতা সত্ত্বেও, একটি বিষয়ে সবাই একমত যে, বর্তমানে নারীদের কর্মস্থল নারীদের জন্য সর্বক্ষেত্রে সহায়ক নয়। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে, নারী হিসেবে তাঁরা অবজ্ঞার শিকার হচ্ছেন, পরিবারে কম সময় দেয়ার জন্য সমালোচনার পাত্র হচ্ছেন, নিয়ন্ত্রণকারীর ভ‚মিকায় নারীকে বাধাগ্রস্ত হতে হচ্ছে, অফিসে যাতায়াতের ক্ষেত্রে অসুবিধা বেশি ভোগ করতে হচ্ছে, অফিস আর পরিবার-দুই দিকেই বিভিন্ন জটিলতায় পড়তে হচ্ছে, শ্রমজীবী নারীকে হেয় করে দেখা হচ্ছে। কেন হচ্ছে এসব? এর পেছনে আসলে রয়েছে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির দায়। এখনো আমাদের সমাজের বিভিন্ন স্তরে নারীদের একজন মানুষ হিসেবে না ভেবে কর্মদক্ষতায় পুরুষের চেয়ে নিচের পর্যায়ে ভাবা হয়। ফলে সম্ভব হলেই কিন্তু নারীকে অবজ্ঞা করতে অভ্যস্ত তারা। মানুষ হিসেবে একজন নারীকে তার প্রাপ্য সম্মান দেয়াকে অনেকে মনে করেন দয়া করা। এটা যে তার অধিকার সেটা তারা বুঝতে পারেন না বা বুঝতে চান না। সেজন্য কেউ কেউ বলে বসেন, ওদের এত কষ্ট করতে কে বলেছে কিংবা চাকরি করলে বাসায় বাচ্চা দেখবে কে? এক্ষেত্রে একই যোগ্যতাসম্পনড়ব হলেও সমাজ আশা করে পুরুষটি চাকরি করবে, নারীটি ঘরে থাকবে। সারাজীবন লেখাপড়া করে বড়ো হওয়ার স্বপড়ব দেখার ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারী একই স্তরে থাকলেও, সংসারের ক্ষেত্রে আশা করা হয়, নারীটিই যাবতীয় ছাড় দেবে। দুজনেই পরিশ্রম শেষে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরলেও আশা করা হয়, বাসায় ফিরে নারীটিই রান্নাবান্নাসহ সাংসারিক অন্য কাজ সম্পন্ন করবে। অন্যদিকে বাসায় থাকার আগ পর্যন্ত নারীর গৃহিণী ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করা হলেও, সত্যিই যদি চাকুরি ছেড়ে কেউ গৃহিণী হয়ে যান, তবে তার অবদান আর কারো নজর কাড়ে না। বরং অনেক সময় শুনতে হয় সারাদিন বাসায় থেকে কিছু না করার অপবাদ অথবা অফিসে কাজ করা যে কত কষ্টের তা বুঝতে না পারার অক্ষমতার কথা। কিছুদিন পর সন্তানেরাও সেই দৃষ্টিভঙ্গির ধারক বাহক হয়। বাবা-মাকে যথেষ্ট ভালোবাসলেও তাদের কাছে বাবা হয়ে যায় নায়ক আর মা কিছু না পারা, না বোঝা একজন সাধারণ নারী। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাব একটি অন্যতম সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে। যাতায়াত থেকে শুরু করে অফিসে কাজ করার ক্ষেত্রেও বিভিনড়ব স্তরেই একজন নারী অনিরাপদ বোধ করেন। একজন শ্রমজীবী নারী হয়ত বেশি অসুবিধায় পড়েন অর্থনৈতিক ও সামাজিক দুর্বল অবস্থানের জন্য। তবে বড়ো অফিসের নারীও অসুবিধায় পড়েন ভিন্ন আঙ্গিকে। সময় হয়েছে এদিকে যথাযথভাবে নজর দেয়ার। সেইসঙ্গে কর্মক্ষেত্রের সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, এতে নারীর কাজের গুণগত মানের উন্নয়ন হয়। নারীদের নিজেদের কিছু বিষয়ও তাদের পিছিয়ে থাকার কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। যেমন-দায়িত্ব নিতে ভয় পাওয়া, আত্মবিশ্বাসের অভাব, সাহসের অভাব, মানুষের সাথে মিশতে না চাওয়া, পেশাদারী মনোভাবের অভাব, আধুনিক পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হতে না চাওয়া প্রভৃতি। এসব বিষয় গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়ে নারীদেরও উচিত নিজেদের মধ্যে পেশাদারি মনোভাব গড়ে তোলা। যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারলেই কেবল অন্যরা সম্মান দিতে বাধ্য হবে। তবে সহকর্মীদের সহায়তা কিংবা পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতার কথাও উঠে এসেছে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে জীবনসঙ্গীর সহায়তা নারীদের সাফল্যেও পেছনে একটি বড়ো কারণ হিসেবেই ধরা দিয়েছে। তার ভিত্তিতে বলা যায়-সময় বদলাচ্ছে, যদিও খুব ধীর গতিতে। এই গতিকে বেগবান এবং নিয়মিত করতে হবে। কেননা দেশের অর্ধেক মানুষকে সাথে নিয়ে পা বাড়ানোতেই দেশের স্থায়ী অগ্রগতি নিহিত।

সূত্র: মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত।