গণমাধ্যম এবং তারুণ্যের ভাষার পরিবর্তন

গণমাধ্যম এবং তারুণ্যের ভাষার পরিবর্তন

ভাষা নদীর মতো, সদা বহমান, সতত পরিবর্তনশীল। নিয়ত চলতে থাকে ভাঙাগড়ার খেলা। নদীর বয়ে আনা অজস্র পলিমাটির মতোই ভাষা বয়ে আনে অন্য অনেক ভাষার বিভিন্ন শব্দ। এসব আমদানি করা বিভিন্ন শব্দ কখনো সশব্দে, কখনো নীরবে আত্মীকৃত হয়ে যায় সেই ভাষার মধ্যে। কিন্তু, এই প্রক্রিয়াটি নিয়ে রয়েছে অনেক বিতর্ক, অনেক সমালোচনা। সেইসঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে বিকৃত উচ্চারণে, কদর্য অঙ্গভঙ্গিতে, বিদেশি শব্দের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার। সেসব আবার হাল আমলের স্মার্টনেস হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে তরুণ সমাজে। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, এই প্রক্রিয়ার পরিণাম হিসেবে বাংলা শব্দগুলো হয়ে পড়ছে অপ্রচলিত এবং অনেক শব্দই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনামুখে দাঁড়িয়ে আছে। উদাহরণ স্বরূপ, স্মার্টনেস শব্দটির দাপটে অপ্রচলিত হতে হতে হারিয়ে যাচ্ছে সপ্রতিভতা শব্দটি। অথচ, শব্দটি অম্লজান, উদযান’ এর মতো অপ্রচলিত ছিল না। আরেকটু নির্মমভাবে বললে বলতে হয়, সপ্রতিভতা শব্দটি শোনার সঙ্গে সঙ্গেই অনেকেরই ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের বা কৌতুকের হাসি উঁকি দিয়ে যাবে। অন্যদিকে ভাষা আবার একটা অঞ্চলের সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করে। যে কারণে, আগের শ্রদ্ধাসূচক চাচা, কাকা সম্বোধন পালটে গেছে সর্বজনীন মামা ডাকে। সেই মামা-ও আবার রূপ পালটে মাম্মা হয়ে গেছে বন্ধুত্বের সম্ভাষণে। একইভাবে চালু হয়ে গেছে, চাপ নিস না কিংবা পাঙ্গা নিস না-র মতো সিনেমাটিক বাক্যের প্রচলন। প্রযুক্তির ব্যবহারে এখন চালু হয়েছে- ট্যাগানো, টেনশিত জাতীয় ক্রিয়াপদ। আবার, সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রভাব ফেলে মানুষের মনের ভুবনে। এই যে পরিবর্তিত পরিস্থিতি, সময় হয়েছে এসব নিয়ে নতুন করে ভাবার। কেন এই পরিবর্তন, এই পরিবর্তন কি সঠিক পথে এগুচ্ছে, এর সম্ভাব্য ফলাফল কী-এসব বিষয় নিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে এবারের মনোসামাজিক বিশ্লেষণ-‘গণমাধ্যম এবং তারুণ্যের ভাষার পরিবর্তন।’ বিশ্লেষণ করেছেন ডা. পঞ্চানন আচার্য্য।

আমাদের শিশুদেরকে কেন একটি ভিনদেশি ভাষা শিখতে দিব তা প্রত্যেকের ভেবে দেখা প্রয়োজন
অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল,মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও কথা সাহিত্যিক।
:প্রতিটি ভাষায় যুগে যুগে নতুন শব্দ যোগ হবে, কিছু শব্দ বাদ যাবে। এটা ভাষার ধর্ম। তবে খেয়াল রাখতে হবে, ভাষার বিকৃতি যেন না হয়। শব্দের ভুল উচ্চারণ করি কিংবা কথ্য ভাষার মধ্য যদি আমরা বিভিনড়ব ঢং ব্যবহার করি-এতে মূল জিনিসটি বিকৃত হয়ে যায়। অর্থাৎ আমরা যেভাবে লিখি, সেভাবে উচ্চারণ না করে ভিন্ন ঢংয়ে উচ্চারণ করি তবে সেটা ক্ষতিকর। সাহিত্যে চরিত্রগুলো যে এলাকায় ঘোরাফেরা করে সেই এলাকার ভাষায় কথা বলবে এটা সাহিত্যের দোষ নয়; বরং গুণ। এটাকে নেতিবাচকভাবে আমরা দেখব না। ময়মানসিংহের প্রেক্ষাপটে রচিত নাটক যদি ময়মানসিংহের ভাষায় কথা বলে তবে সেটি খুবই যুক্তিযুক্ত। চরিত্রকে বাস্তবমুখী করার জন্য চরিত্রটি সংশ্লিষ্ট ভাষায় কথা বলবে এটা সাহিত্য বা নাটকের ক্ষেত্রে দূষণীয় নয়। কিন্তু ভাষার বিকৃতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। চরিত্রের প্রয়োজনে আপনি আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করতেই পারেন। তবে ভিন্ন ঢংয়ে বা নতুন করে আরোপিত কোনো রীতিতে কিংবা ভিন্ন ভিন্ন ভাষার মিশ্রণে ব্যবহার করা উচিত নয়। অশুদ্ধ এবং মিশ্রিত ভাষার ব্যবহার আমাদের ভাষার জন্য সুখকর নয়। এটা ভাষা-দূষণ কিন্তু এখন যেটা হরদম ঘটছে। দেশপ্রেমের একটা বড়ো ঘাটতি থেকে এরকম হচ্ছে বলে মনে হয়। আমি তরুণ প্রজন্মকে বলব, ‘তোমরা ভাষার বিকৃতি কর না। হয় তোমরা শুধু ইংরেজি বলো, না হয় শুধু বাংলা বলো। কিন্তু দুই ভাষার মিশ্রণ কর না। শুধু ইংরেজি বলার মধ্যে আমি দোষের কিছু দেখি না। কারণ এই সমস্ত ছেলেমেয়েরা দারুণ মেধাবী। এরা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে পারবে। ক্ষতিকর এবং বিকৃত উচ্চারণ মনস্তাত্ত্বিক বিকাশকেও বাধাগ্রস্ত করে। যার ফলে সুস্থ এবং সৃষ্টিশীল চিন্তা বাধাগ্রস্ত হয়। এই বিষয়গুলোর অবশ্যই পরিবর্তন প্রয়োজন। শৈশবে মানুষ যেটা শেখে সেটা তার মস্তিষ্কে সবচেয়ে বেশি থেকে যায়। তাই ছোটবেলা থেকেই শিশুদেরকে শুদ্ধ বানান এবং শুদ্ধ উচ্চারণ শেখানোর প্রতি মনযোগী হতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলা একাডেমি, গণমাধ্যম এবং সরকারের ভ‚মিকা রয়েছে। ভাষার জন্য আমরা রক্ত দিয়েছি। সেই রক্তের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে ভাষার বিকৃতি রোধ এবং সঠিক বানান ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার এবং বাংলা একাডেমিকে প্রচলিত বানান এবং উচ্চারণরীতির ব্যবহার নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। আমারা ইদানীং দেখি বিভিন্ন হিন্দি সিরিয়াল দেখে আমাদের শিশুরা সেই ভাষা ব্যবহার করে থাকে। এটি আমাদের শিশুদের ভাষাশিক্ষণকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আমরা আমাদের শিশুদেরকে কেন একটি ভিনদেশি ভাষা শিখতে দিব তা প্রত্যেকের ভেবে দেখা প্রয়োজন। এসব ভাষা থেকে প্রভাবিত হয়ে আমাদের তরুণ প্রজন্মের মাঝে ভাষার বিকৃতি ঘটছে। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য যে, কল্পনাশক্তি মেধার একটি অঙ্গ, অনেক ক্ষেত্রে এসব সিরিয়ালে এমন সব ঘটনা দেখানো হয় যা একেবারেই অবাস্তব, যা কল্পনাশক্তিকে বিকশিত করার পরিবর্তে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

শহুরে, উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত, ইংলিশ মিডিয়াম বা ভার্সনে পড়ুয়া তরুণদের ভাষা-বিকৃতির প্রবণতাটি শ্রেণি অহমিকারই প্রকাশ
হিমেল বরকত, সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
:ভাষা পরিবর্তনশীল-এটা স্বতঃসিদ্ধ। কিন্তু, এই পরিবর্তনের ধরন খুবই বিচিত্র এবং বহুমাত্রিক। যেমন, কোনো একটি ভাষা ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে একই সময়ে রয়েছে নানা বিভাজন-অঞ্চল, ধর্ম, বিত্ত, লিঙ্গ, শিক্ষা ইত্যাদি ভেদে এই বিভাজন ক্রিয়াশীল। ফলে কোনো একটিকে মানদন্ড ধরে পরিবর্তনশীলতার পরিমাপ করাটা ঝুঁকিপূর্ণ । আবার, ভাষার মাধ্যম ভেদেও এই সংকট রয়েছে। ধরা যাক, একজন লেখক নিজের ঘরে যে-ভাষায় কথা বলেন, সাহিত্য-সভায় সে ভাষায় কথা বলেন না। আবার, লেখার সময় তিনি বেছে নেন আরেক ভাষাভঙ্গি। ফলে একই ব্যক্তির ভাষাই ভিনড়ব-ভিনড়ব মাধ্যমে ভিন্ন-ভিন্ন রূপ লাভ করে। এসব কারণে ‘ভাষার পরিবর্তনশীলতা’ নির্ণয় খুবই ঘোলাটে একটি বিষয়। একই বাংলা ভাষা গ্রামে-শহরে ভিন্নরকম। এমনকি একই গ্রামের স্কুল-শিক্ষকের এক রকম, কৃষকের আরেক রকম। ফলে, কাদের ভাষার পরিবর্তন শনাক্ত করতে চাইছি, সেটি আগে স্থির করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো অস্বাভাবিকত্ব যদি ভাষার ওপর আরোপ করা হয়, কালক্রমে তা এমনিতেই খসে পড়ে। নাটকে বা সিনেমায় কাহিনি ও চরিত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার করা যেতেই পারে। কিন্তু আমাদের দেশে বেশিরভাগ নাটকে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহৃত হয় দর্শক হাসানোর স্থূল কৌশল হিসেবে। এটি খুবই আপত্তিজনক। কোনো অঞ্চলের ভাষাকে এভাবে অসম্মান করা রুচিসম্মত বলে মনে করি না। প্রচার-মাধ্যমে ভাষা-ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতার প্রয়োজন। সব বয়সের এবং সব অঞ্চলের মানুষ যেহেতু এটি দেখে বা শোনে, তাই মান ভাষা ব্যবহার, শুদ্ধ উচ্চারণ এবং শব্দ ব্যবহারে মার্জিত রুচির পরিচয় দেয়া প্রয়োজন। বাংলা চলচ্চিত্রে শব্দ-প্রয়োগে এই রুচিবোধের অভাব প্রায়শই দেখা যায়। আর নাটকের ক্ষেত্রে ‘জগাখিচুড়ি’ যে ভাষা ব্যবহারের কথা বলা হয়, আসলে তা নকল বলেই এমন। সস্তা, চটকদার আর লোক হাসাতে গিয়ে তাদের এই অপচেষ্টা তাদেরকেই হাস্যকর করে তোলে। অন্যদিকে ইংরেজি ভাষার ধ্বনিক বৈশিষ্ট্য আরোপ করে অনেকে যে বাংলা উচ্চারণ করেন, তাকে বাংলা বলে চিনতে কষ্ট হয়। অবশ্যই তা জঘন্য। নিজের ভাষা নিয়ে একধরনের হীনম্মন্যতা থেকেই এই ব্যাধি সংক্রমিত হয়েছে। এটি শুরু হয়েছিল উনিশ শতকে-‘বাবু’ শ্রেণি বাংলা বলতে পারেন না বলে গর্ব করতেন। এখনকার এই উপদ্রব সেই মানসিকতারই উত্তরসূরি। এখন ‘বর্তমান ধ্যান-ধারণা, শিক্ষা, জীবনযাপন ও বেড়ে ওঠাই তো ভিন্নভাবে। ভিন্নভাবে বাংলা বলাটাই এদের জন্য স্বাভাবিক। এদের বাইরে যে বৃহত্তর তরুণ প্রজন্ম-যারা গ্রাম কিংবা মফস্বলে থেকে পড়া শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছে, তাদের মুখে কিন্তু এমন বিকৃত বাংলা পাওয়া যাবে না। আশার কথা, এরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। শহুরে, উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত, ইংলিশ মিডিয়ামে বা ভার্সনে পড়ুয়া তরুণদের ভাষা-বিকৃতির প্রবণতাটি শ্রেণি-অহমিকারই প্রকাশ। সংস্কৃতিগত পার্থক্যই জীবনযাপনের মতো এদের ভাষাতেও সুস্পষ্ট। এই অবস্থার পরিবর্তন অবশ্যই জরুরি। এই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বদল। শ্রেণিদম্ভ যেখানে প্রকট, সেখানে এই বিভাজন অনিবার্য। মনোজগতে ঔপনিবেশিক প্রভাবকেও তাড়াতে হবে- সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মাধ্যমেই তা সম্ভব। এভাবে সমাজের মর্মে যদি বদল আনা যায়, তবে ভাষার বিকৃতিও অনায়াসে রোধ করা যাবে। বর্তমান সময়ে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রিত উচ্চবিত্ত শ্রেণির দ্বারা। বিজ্ঞাপনসর্বস্ব পুঁজিবাদী এই গণমাধ্যম ভাষাকেও পণ্য করে তুলেছে। চটকদারিত্বের প্রয়োজনে ভাষাকে বিকৃত করতে তাদের সংকোচ হয় না। এ থেকেই বোঝা যায়, ভাষার প্রতি তাদের মমত্ব ও মনোযোগের অভাব। দর্শক-শ্রোতারা যেহেতু গণমাধ্যম দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং হচ্ছেন কাজেই একে প্রতিহত করতে সামাজিক চাপ সৃষ্টি করা উচিত। গণমাধ্যমের বদৌলতে ভাষা-বিকৃতির সকল অপচেষ্টা বন্ধে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

আমরা আসলে মানুষ হয়েছি কিন্তু বাঙালি হয়ে উঠিনি
শিমুল মুস্তাফা, আবৃত্তিশিল্পী
:ভাষা পরিবর্তন হবে, এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু, ভাষাকে বিকৃত করা গ্রহণযোগ্য নয়। সব ভাষাতেই কিছু বিদেশি শব্দ থাকে। কিন্তু, আমাদের দেশে আসলে ভাষাকে অবহেলা করা হয়। সততার জায়গা থেকে বা ভাবনার জায়গা থেকে যে ভাষাটা ব্যবহার করা উচিত এই বোধটুকু তেমন কারো মধ্যে নেই। আমরা রাষ্ট্রভাষা নিয়ে আন্দোলন করেছি এটা গর্বের। তবে কষ্টের কথা হলো, আমাদের এখানে আন্তর্জাতিক ভাষা ইনস্টিটিউট হয়েছে, ভাষা ইনস্টিটিউট, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার রয়েছে অথচ তারা কেউই ভাষা নিয়ে জনসাধারণের কাছে জোরদার কোনো ভূমিকা রাখছে না। প্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের অনেক শব্দ ব্যবহার করতে হয়। যেগুলোর অনেক শব্দেরই এখনো বাংলা প্রতিশব্দ আমরা পাইনি। যেমন : ইমেইল, ইনবক্স-এসব শব্দ ব্যবহারে আমার কোনো দ্বিমত নেই। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু ধরুন, এফএম রেডিওগুলোতে বলছে, ‘গানটা প্লে করছি’-এটার কিন্তু ব্যবহার্য বাংলা শব্দ আছে। এটা বলা যেত, চলুন গানটা শুনি। এই যে, শুনি না বলে প্লে বলছি এই পরিবর্তনটা অস্বাভাবিক। আমাদের দেশে একেক অঞ্চলের ভাষা একেক রকম। বিভিনড়ব অঞ্চলের ভাষাকে আমি আঞ্চলিক ভাষা বলব না। এটা মানুষের মাতৃভাষা। এই ভাষাটা সে নির্ধারিত গন্ডিতে ব্যবহার করবে। কিন্তু কেউ যখন সার্বজনীন কাজে বা আনুষ্ঠানিক কোনো কাজে ব্যবহার করবে তখন ঐ রাষ্ট্রীয় ভাষা অর্থাৎ, সকলের বোধগম্য প্রমিত ভাষাই ব্যবহার করা উচিত। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যে, আমরা যেন আঞ্চলিক ভাষাগুলোকে আনুষ্ঠানিক ভাষার স্বীকৃতি দিয়ে না ফেলি। এক ধরনের আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করে কিছু নাটক নির্দিষ্ট কিছু মানুষের কাছে জনপ্রিয় হচ্ছে বা শুধু ঐসব অঞ্চলের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হচ্ছে। সকলের কাছে জনপ্রিয় করার জন্যও প্রমিত ভাষার বিকল্প নেই। একটু চটুল না হলে টেলিভিশনগুলোও নাটক নেয় না। তাই কর্পোরেট বাণিজ্য ধরে রাখতে অনেকে এটা করছে। এক্ষেত্রে শুধু নির্মাতা নয়, বিজ্ঞাপনদাতা, কর্পোরেট কোম্পানি, টেলিভিশনসহ সকলের একটা ষড়যন্ত্র জড়িত। এটা আসলে ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা না থাকার ধারাবাহিকতার ফল। সাথে সস্তা জনপ্রিয়তা আর ঐ বাণিজ্যিকীকরণ এবং মনোবৈকল্যের প্রভাব। আর এসব বর্তমান তরুণ প্রজন্ম পছন্দ করছে অনেক সময়। এটাও আসলে ভাষার প্রতি সততা, সতেচনতা ও ভাবনা না থাকার কারণেই হচ্ছে। আমাদের পূর্বসূরিরা বাংলা বর্ণকে উর্দু হরফে লিখবেন না বলে রক্ত দিয়েছিলেন। তাঁদের উত্তরসূরি হয়ে আমরা বাংলা বর্ণ এখন ইংরেজি অক্ষরে লিখছি। এটা ভয়ানক লজ্জার। অনেকে বলে থাকেন-আমি বাংলা বলতে পারি, কিন্তু লিখতে কষ্ট হয়। তাদেরকে আমি বলব, একটু কষ্ট হলেও অভ্যাসটা করুন। এই পরিবর্তনগুলো আমাদের সংস্কৃতি ও স্বকীয়তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আমরা আসলে মানুষ হয়েছি কিন্তু বাঙালি হয়ে উঠিনি। বাঙালি হয়ে ওঠার জন্য এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। সেজন্য রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে ব্যক্তি পর্যায়ে সকলকে নিজের ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আমরা লড়াই করেছি রাষ্ট্রভাষার জন্য। মাতৃভাষা হলো আমাদের নিজস্ব অঞ্চলের ভাষা। আর রাষ্ট্রভাষা হলো আনুষ্ঠানিক কাজে ব্যবহারের ভাষা। এই ব্যাপারটা অনেকেই বোঝেন না। আর ভাষার পরিবর্তনের জন্য গণমাধ্যমের অনেকটা দায় রয়েছে। এখানে যারা কাজ করছেন তাঁরা কেউই ভাষা সম্পর্কে সচেতন নন। গণমাধ্যমে খবর পাঠকে এখন আর খবর জানা আর শোনার মাধ্যম রাখা হয়নি। এটাকে এখন দেখার বিষয় করা হয়েছে। কোনো চ্যানেলে দেখা যাবে না যে, একটু বয়স্ক বা দেখতে ফর্সা নন এমন কেউ খবর পড়ছে। এখন চেহারা দেখে সংবাদ পাঠক নেয়া হয়, তাঁদের উচ্চারণ কতটা সঠিক সেটা দেখা হয় না। আমাদের বাংলা একাডেমি কর্তৃক নির্ধারিত কিছু উচ্চারণ সূত্র আছে, এটা কেউ মেনে চলে না। দাঁত চিবিয়ে কথা বলাকে আধুনিকতা মনে করছে অনেকেই।

বাংলাদেশে ভাষার বিচিত্র ব্যবহার সংস্কৃতির বৈচিত্র্য ও নৈরাজ্য, দুটোই বাড়িয়েছে
পিয়াস মজিদ, কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি।
:ভাষা মাত্রই পরিবর্তনশীল। মানুষ যেমন অনড় পাথর না, তেমনি মানুষের ব্যবহৃত ভাষাও অনড়, অচল হতে পারে না। তবে, মানুষের উদ্দিষ্ট কথা চর্যাপদ থেকে অধুনাতম কবিতায় তো একই; পরিবর্তনটা বহিরঙ্গে। অন্তর্লীনে ভাষা আবহমান কাল ধরে যোগাযোগেরই মাধ্যম খোঁজে। এটা পরিমাপ করা সহজসাধ্য নয়। কবির কথা আছে ‘ভাষাই আপন করে আবার সেই ভাষা করে পর।’ মানুষ যদি আঞ্চলিক ভাষায় লেখা গল্প-উপন্যাস-কবিতার রস আস্বাদন করতে পারে তবে সে ভাষার নাটক উপভোগ তো নিশ্চয়ই করতে পারে। কিন্তু স্বেচ্ছাচারি মিশ্রণটা বড়ো আশঙ্কাজনক। শুধু প্রদর্শনপ্রিয়তার জন্য যখন একটি মিশ্রিত আঞ্চলিক ভাষার চর্চা হয় তখন সেটা ভাষাস্বাধীনতা থেকে ভাষাটা ভাঁড়ামোর পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যাকে আমি বলতে চাই ভাষা-ভাঁড়ামো। মাঝে মাঝে মনে হয় অনেক রেডিও জকির যোগ্যতার মাপকাঠিই হচ্ছে বিকৃত উচ্চারণ। এটা বন্ধ হওয়া উচিত কারণ শিশু-কিশোরদের মাঝে এর প্রভাব পড়ছে। তারুণ্য যদি তার আত্মার স্বর খোঁজে তবে ঠিক আছে। কিন্তু রক্তসড়বাত পথে পাওয়া ভাষার বিকৃতি ঠেকানোও তো তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সংস্কৃতি তো ভাষাবাহিতই। দেশের ভাষা পরিস্থিতি আর দেশের সংস্কৃতি এক হতে বাধ্য। বাংলাদেশে ভাষার বিচিত্র ব্যবহার সংস্কৃতির বৈচিত্র্য ও নৈরাজ্য, দুটোই বাড়িয়েছে। পরিবর্তনের বোধটা জনগণের কাছ থেকে আসতে হবে। এভাবে ব্যবস্থাপত্র দিয়ে হবে না। গণমাধ্যমের একটা বড়ো দায় আছে ভাষার বিকৃত ব্যবহার ঠেকানোর ক্ষেত্রে। আবার বিদ্যমান ভাষা-পরিস্থিতির প্রতিনিধিত্বের দায়ও তার। ফলে সহজ কোনো সমাধান নেই। আমি মনে করি, এ বিষয়ে প্রত্যেক শিল্পী, অভিনেতা-অভিনেত্রী, ঘোষক, সঞ্চালক-সবার আত্মদায়ের বোধই পারে ভাষার মর্যাদা রাখতে। সেই সাথে তরুণদের মতামতও গুরুত্বপূর্ণ, এটা জানতে হবে কেন মান ভাষাকে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের প্রকাশমাধ্যম ভাবতে পারছে না।

শিল্পমাধ্যমে ভাষার দূষণ, জগাখিচুড়ি কোনোটাই কাম্য নয়
আবিদা সুলতানা, ছাত্রী।
:ভাষা পরিবর্তন এবং ভাষা দূষণ দুটো ভিন্ন জিনিস। সময়ের পরিক্রমায় ভাষার স্বকীয়তা ঠিক রেখে কিছু পরিবর্তন স্বাভাবিক তবে দূষণ কাম্য নয়। একটা ভাষার বিভিন্ন  আঞ্চলিক ভাষা কিংবা উপভাষা থাকতে পারে এটা ভাষার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। বিশাল ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর আলাদা আলাদা আঞ্চলিক ভাষা থাকাটা স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে বৃন্দাবন দাসের ময়মনসিংহ অঞ্চলের ভাষা নাটকে যদি যথাযথ ভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে তবে তা দোষের নয় বলে আমার মনে হয় কারণ এতে বাংলা ভাষার বৈচিত্র্য তুলে ধরা হচ্ছে সবার মাঝে। তবে কোনো ব্যক্তি বিশেষ যদি নিজের মতো করে কোনো শব্দ বিকৃত করে বানানোর চেষ্টা করে তা নাটকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন সেটা নিন্দনীয় বলে মনে করি। নাটক বা সিনেবা এসব থেকে মানুষ দ্রুত শেখে। একটা প্রজন্মের ওপর এসবের প্রভাব লক্ষণীয়। তাই এসব শিল্পমাধ্যমে ভাষার দূষণ, জগাখিচুড়ি কোনোটাই কাম্য নয়। নাটক সিনেমায় ব্যবহৃত ভাষা শুদ্ধ বাংলা কিংবা আঞ্চলিক যা-ই হোক সেটা নিয়ম মেনে হওয়া উচিত। এছাড়া শিশু-কিশোরদের বেড়ে ওঠার সময়গুলোতে তার নাগালের মধ্যে থাকা গণমাধ্যমগুলো তার ভাষার ওপর বড়ো একটা প্রভাব ফেলে। তাই এফএম রেডিও গুলোর বিকৃত ও অশুদ্ধ উচ্চরণের কারণে তরুণরা ভাষার বিষয়ে বিভ্রান্ত হচ্ছে। এতে শুধু বাংলা নয় অন্য যে ভাষার শব্দাংশ যোগ করে অদ্ভুত মিশ্রণ তৈরি করা হচ্ছে সে ভাষারও অমর্যাদা করা হচ্ছে। আবার বর্তমান তরুণ প্রজন্ম এই ধরনগুলো পছন্দ করছে কারণ তারা হালের যেকোনো ফ্যাশানকে বিচার বিবেচনা ছাড়াই দ্রুত রপ্ত করে সেটার প্রয়োগ করাকে আধুনিকতা ভাবে। তাই এই গণমাধ্যমগুলোর প্রচার করা বিকৃত শব্দগুচ্ছোকে ব্যবহারের মাধ্যমে তারা নিজেদের তথাকথিত স্মার্ট এবং আধুনিক ভাবতে শুরু করছে। এতে ভাষা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। বর্তমানে ভাষার এই সংকটাবস্থা পরিবর্তন প্রয়োজন। অন্যভাষার চর্চা দোষের নয় কিন্তু তা হতে হবে শুদ্ধ ভাষায়। বিশেষ করে গণমাধ্যম এবং সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে ভাষা দূষণ রোধ করা এবং বিকৃতি বর্জনের জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তরুণরা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করতে পারে। পরিবর্তন অনিবার্য তবে সেই পরিবর্তন যেন সুন্দরের দিকে হয় তা নিশ্চিত করতে তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে।

আগের প্রজন্ম হিসেবে আমাদেরই হাল ধরতে হবে।
সালমা নাসরিন,  অভিভাবক।
বাংলা ভাষার বিভিন্ন রূপ আছে। সাধু, চলিত, আঞ্চলিক। বর্তমানে অনেক নাটকে আঞ্চলিকতার নামে এক ধরনের মিশ্র ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে। আঞ্চলিক ভাষা মেনে নেওয়া যায় কিন্তু গুরুচন্ডালী দোষে দুষ্ট এই মিশ্রভাষা মেনে নিতে পারি না আগের প্রজন্মের একজন মানুষ হিসেবে। রক্ত দিয়ে কিনেছি যে ভাষা তাকে যথাযথ মর্যাদার সাথে বলতে ও লিখতে পারাটাই আমাদের এখনকার প্রজন্মের সাধনা হওয়া উচিত। এফএম রেডিওতে এক ধরনের বিদেশি শব্দের বাহুল্যযুক্ত ও তাড়নজাত ধ্বনি শুনেছি। সম্ভবত এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা এটির একটি নামও দিয়েছে। ইংলিশ/বাংলা কোনোটিই নয়। এটা হলো বাংলিশ। আমি এই বিষয়টাকে মেনে নিতে পারি না কখনোই। এ অবস্থা পরিবর্তনের এখনই সময়। আর বাংলাই পৃথিবীর একমাত্র ভাষা যার প্রতি ভালোবাসা ও মর্যাদাবোধ থেকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম। আর এ প্রজন্মকে এই বোধে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, ভাষার প্রতি মমত্ব জাগাতে হবে। শৈশব থেকেই বাংলা ভাষা কীভাবে পেয়েছি সেই ইতিহাস আগামী প্রজন্মের মগজে বপন করতে হবে। আগের প্রজন্ম হিসেবে আমাদেরই এর হাল ধরতে হবে।

বিশ্লেষণ:
উপরের আলোচনা থেকে যা যা উঠে এল, সেসব বিষয়গুলো সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। দেখা যাচ্ছে, ভাষার পরিবর্তনটা আসলেই অপ্রতিরোধ্য এবং স্বাভাবিক। বিভিনড়ব নিয়ামকের ভিত্তিতে এই পরিবর্তন ঘটে থাকে। যেমন : শিক্ষার প্রভাব, বসবাসরত এলাকার প্রভাব, ধর্মীয় পরিচয়ের প্রভাব, সময়ের ভিনড়বতার প্রভাব। এদের মধ্যে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যে পরিবর্তন- সেটাই বেশি আলোচিত বা সমালোচিত হয়ে এসেছে যুগে যুগে। সাহিত্য বা বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমে ভাষার ব্যবহারে প্রাচীনপন্থিদের সাথে নতুনদের বিবাদটাও চিরন্তন। সেই বিবাদের শিকার হতে হয়েছে রবীন্দ্রনাথকেও, যিনি নিজেও আবার জীবনানন্দকে অভিযুক্ত করেছেন তাঁর কবিতায় ভাষার ব্যবহার ঠিক হয়নি বলে। সাহিত্যে চলিত রীতি প্রবর্তনের প্রবাদপুরুষ প্রমথ চৌধুরীর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। ভাষা পরিবর্তনের বিষয়টা একারণেই গুরুত্বপূর্ণ-কেননা এর প্রভাব রয়েছে একটা এলাকার সংস্কৃতির ওপর। কিন্তু প্রশড়ব হচ্ছে, এই পরিবর্তনের সীমারেখা কতটুকু বা উচিত-অনুচিত বলার মানদন্টাড কী হবে? এখানেই অস্পষ্টতার শুরু। প্রায় সব আলোচকদের মতেই, ভাষার পরিবর্তন ব্যাপারটা নয়, ভাষার বিকৃতি বা ভুল ব্যবহারটাই দোষের বা অনাকাঙিক্ষত। বিশেষ করে নাটকে বা শিল্পমাধ্যমে এ ধরনের বিকৃতি বা ব্যবহারকে একজন বলেছেন ভাষাভাঁড়ামো, অন্যজন বলতে চান ভাষা-দূষণ হিসেবে। প্রকৃতপক্ষে, এটাই ঘটে চলেছে বর্তমানে। এফএম রেডিওগুলোতে তাড়নজাত ধ্বনির বাহুল্য, বিদেশি শব্দের অহেতুক ব্যবহারসহ চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ যেমন ভাষাকে কুৎসিত করে তুলছে, তেমনই বিভিন্ন নাটকে শুধু হাসির উদ্রেক করার জন্য আঞ্চলিক ভাষার ভুল প্রয়োগ বা জগাখিচুড়ি প্রয়োগ সচেতন মানুষের মর্মপীড়ার কারণ হচ্ছে। এর পেছনের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে-জাতিগত হীনম্মন্যতা, নিজ ভাষার প্রতি মমত্ববোধের অভাব, গড্ডালিকাতে ভেসে গিয়ে সহজে আধুনিক হিসেবে পরিচিত হবার উদ্ভট বাসনা, যথাযথ ভাষা শিক্ষার অভাব, বিপণন কৌশলের কাছে শিল্পবোধ হেরে যাওয়া প্রভৃতি। একইসঙ্গে ভাষার এই অবক্ষয় মূলত সামাজিক অবক্ষয়েরই আরেকটি রূপ। কিন্তু, কীভাবে সম্ভব এই অবক্ষয় রোধ করা, এই ভাষা- দূষণ বন্ধ করা? এ বিষয়ে সবাই একমত যে, নিয়ম করে বা আইন বানিয়ে এই অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব না। এ জন্য জনগণকেই এগিয়ে আসতে হবে। তাঁদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। তাঁদেরকে বোঝাতে হবে, নিজের ভাষা সঠিকভাবে ব্যবহার করা উচিত কেন, কেন আমাদেরকে অপ্রয়োজনে বিদেশি শব্দ বা বিদেশি উচ্চারণে কথা বলা বন্ধ করতে হবে, ভাষাকে বিকৃত করার মাধ্যমে আমরা যে আমাদের আত্মপরিচয় হারিয়ে ফেলছি, যেটি দিনশেষে আমাদেরকে বিশ্বের দরবারে হেয় করে তুলছে তা বোঝাতে হবে। জানাতে হবে, আত্মপরিচয়হীন বা স্বকীয়তাবিহীন জাতিকে বৈশ্বিক মানদন্ডে কেউ সম্মানের চোখে দেখে না, সে যতই আমরা নিজেদের আধুনিক হয়ে উঠছি মনে করি না কেন। একজন অনাথ মানুষের যেমন জীবনের প্রতি পদে পদে কষ্ট করতে হয় প্রতিষ্ঠিত হতে, লাঞ্ছিত হতে হয় ক্ষেত্রবিশেষে, একই কথা একটা জাতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাই, ইংরেজি বা হিন্দিতে বা অন্য কোনো ভাষায় যতই চৌকষ হয়ে নিজেদের উন্নত ভাবি না কেন, কোনো জাতিগোষ্ঠীই আমাদের বুকে টেনে নিয়ে নিজেদের লোক ভাববে না। বরঞ্চ, নিজেদের ভাষাকে ব্যবহার করেও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে জাপান বা চীন আজ বিশ্বে মর্যাদাবান জাতি। সবশেষে, এখানের একজন আলোচক, যিনি একই সাথে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও প্রথিতযশা সাহিত্যিক, তাঁর বক্তব্যের রেশ ধরে জানাতে চাই, ভাষার বিকৃতি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে, ফলে সুস্থ ও সৃষ্টিশীল চিন্তা বাধাগ্রস্ত হয়। আর, একথা অনস্বীকার্য, ‘মনুষ্যপদবাচ্য’ হতে গেলে সুস্থ ও সৃষ্টিশীল চিন্তার কোনো বিকল্প নেই।

সূত্র: মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত।