চিকিৎসা আর ভালোবাসায় সিজোফ্রেনিয়া থেকে মুক্তি

আমাদের জীবনে রোগ ও রোগ সম্পর্কে ধারণার অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। প্রয়োজনের তুলনায় সেটা হয়তো কম, তবে আশাব্যঞ্জক। যেমন- আমাদের সমাজে ‘সিজোফ্রেনিয়া’ রোগটির সার্বজনীন পরিচিতি ছিল না। তার মানে এই নয় যে, রোগটির অস্তিত্ব আমাদের সমাজে বা দেশে ছিল না। ছিল, তবে ভিন্ন পরিচয়ে- আমাদের ঘরের বা আত্মীয়-প্রতিবেশীর মধ্যে কারো আচরণে সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ প্রকাশ পেলে আমরা ‘ভূতে পেয়েছে’ ভেবে ঝার-ফুঁক করতেই অভ্যস্ত।

পরিবারের কারো ক্ষেত্রে এরকম ঘটলে আমাদের মধ্যে এক ধরনের সংকুচিত মনোভাব কাজ করে। কারণ যে কোনো ধরনের মানসিক ভারসাম্যহীনতা সমাজের চোখে ‘পাগল’ বলে চিহ্নিত হয়। আর কেউ চান না তার পরিবারের সদস্যটি সমাজের কাছে পাগল হিসেবে পরিচিতি পাক।

সিজোফ্রেনিয়া মানুষের স্বাভাবিক চিন্তাশক্তিকে বিঘ্নিত করে। স্বাভাবিক মানুষের মতো চিন্তা ও কাজের সামঞ্জস্য রক্ষা করার ক্ষমতা নষ্ট হয়। আতঙ্কিত হওয়া, সন্দেহ করা, দৈব কোনো আওয়াজ শুনতে পাওয়া, হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে যাওয়া সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ। এরকম লক্ষণ দেখা গেলে আমাদের দেশে রোগীকে প্রথমেই ওঝা বা কবিরাজের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। বিশেষত গ্রামাঞ্চলে। তবে এখন অনেকেই সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।

এমনই একজন টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুর থানার মো. সেলিম (ছদ্মনাম)। তার স্ত্রী রেবেকা সুলতানা (ছদ্মনাম)। দেড় বছর যাবৎ সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য নিয়ে এসেছেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে।

মো. সেলিম জানান, আগে কখনো তার স্ত্রীর ভেতর সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ দেখা যায়নি।

১৯৯৬ সালে তাদের বিয়ে হয়। এর মধ্যে কখনো তিনি তার স্ত্রীকে অস্বাভাবিক আচরণ করতে দেখেন নি। দেড় বছর আগে রেবেকার মধ্যে আচরণের অসামঞ্জস্যতা দেখা যায়। তিনি প্রায়ই কল্পিত সাপ দেখে আতঙ্কিত হতেন। মাঝে মাঝেই তিনি কানে বিভিন্ন আওয়াজ শুনতে পান। তখন চিৎকার করে গান করতে থাকেন। মানুষজনকে সন্দেহ করেন এবং হঠাৎ করে রেগে যান।

মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে আসার আগে স্ত্রীকে নিয়ে অনেক কবিরাজের কাছে গেছেন বলে জানান মো. সেলিম। তিনিই মন্তব্য করেন তাতে অবস্থার আরো অবনতি ঘটেছে। এক মেয়ে, এক ছেলের মা রেবেকা সুলতানা। স্বাভাবিক অবস্থায় ছেলে-মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক খুব ভালো। আবার কখনো হয়তো হঠাৎই রেগে যান।

তবে স্ত্রীর এ অবস্থা নিয়ে সামাজিক বিড়ম্বনার ভয়ে বিব্রত মনে হয়নি স্কুল শিক্ষক মো. সেলিমকে। তবে সামাজিক বিড়ম্বনায় যে তাকে পড়তে হয়নি এমন নয়। পাড়া প্রতিবেশীর সহানুভূতি মেলেনি এটা স্বীকার করেন তিনি। প্রতিবেশীরা তার স্ত্রীকে ‘অন্যভাবে’ দেখেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কিন্তু সামাজিক  দৃষ্টিভঙ্গিকে উপেক্ষা করে তিনি সহানুভূতি ও সহমর্মিতার সঙ্গে স্ত্রীর চিকিৎসার দায়িত্বটা পালন করছেন। এমনকি এ বিষয়টি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতেও তিনি ইতস্তত বোধ করেন না। তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে আসার পর থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ওষুধ খাচ্ছেন রেবেকা সুলতানা। তবে মাঝে কিছুদিন ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তখন রোগের মাত্রাও বেড়ে যায় । তার পর থেকে ওষুধ খেতে কোনো অনিয়ম করেননি।

মো. সেলিম সামাজিক সংস্কারকে অগ্রাহ্য করে তাঁর স্ত্রীর সুচিকিৎসার জন্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নিয়ে গিয়েছেন। চিকিৎসকের পরামর্শ মতো স্ত্রীকে নিয়মিত ওষুধ খাওয়াচ্ছেন এবং নিয়মিত চেকআপের জন্য চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাচ্ছেন। রেবেকা সুলতানা এখন আগের চেয়ে অনেকটাই সুস্থ। যেটা পারিবারিক সহমর্মিতা ছাড়া সম্ভব ছিল না বলে মো. সেলিম মনে করেন।

কাজেই, পরিবারের কোনো সদস্যের আচরণে সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে সামাজিক লজ্জাকে প্রাধান্য না দিয়ে আমাদের আগে তাঁর সুচিকিৎসার কথাই ভাবা উচিৎ। লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন, স্বাভাবিক জীবনের জন্য অযোগ্য বিবেচনা করে, চিকিৎসাহীন রেখে বা সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীকে আমরা সুস্থ মানুষরাই যেন ‘পাগল’ এ পরিণত না করি। তাই সিজোফ্রেনিয়ার রোগীকে ‘পাগল’ বলে হেয় না করে বা পরিত্যক্ত না ভেবে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। কারণ, যথাযথ চিকিৎসা আর ভালোবাসা দিয়ে এই রোগের নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

সাদিকা রুমন
বিশেষ প্রতিবেদক, মনেরখবর.কম