অটিজমঃ সামাজিক বিকাশ ও যোগাযোগ স্থাপনের অন্তরায়

ইদানীং অটিজম নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। গণমাধ্যমেও লেখালেখি হচ্ছে বিস্তর। আর যেসব দম্পতির সন্তান অটিজিম আক্রান্ত, তারাও এখন অটিজমের সাথে লড়াই করছে।

অটিজম রোগটি স্নায়ু বিকাশ জনিত একটি সমস্যা (Neuro Developmental Disorder)। অটিজম, ইনফ্যানটাইল অটিজম(Infantile Autism), অটিস্টিক ডিসঅর্ডার(Autistic Disorder), অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার(Autism Spectrum Disorder), অথবা পারভেসিভ ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার(Pervasive Development Disorder) আসলে একই রোগের নাম।

১৯৪৩ সালে মি. ক্যানার প্রথম এই রোগের বর্ণনা দেন। ‍অটিজম রোগে মানসিক বিকাশের তিনটি ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা যায়। সামাজিক বিকাশে সমস্যা (abnormalities of social development), যোগাযোগ স্থাপনে সমস্যা (abnormalities of communication) এবং বারবার একই ধরনের কাজ করার প্রবণতা বা বারবার একই ধরণের কাজে আগ্রহ।

সামাজিক বিকাশে সমস্যাঃ
জন্মের অল্প কিছু পর থেকেই শিশুর আশেপাশের পরিবেশ ও মানুষের সাথে সামাজিক যোগাযোগ তৈরী করে। সামাজিক হাসি (social smile), চোখে চোখে তাকানো, আদর করলে খুশি হওয়া ইত্যাদি। একটু বড় হলে শিশুর তার বয়সী অন্য বাচ্চাদের প্রতি আগ্রহ দেখানো, অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলার প্রবণতা সবই সামাজিক বিকাশের অংশ। অটিস্টিক শিশুদের ক্ষেত্রে এই বিকাশ মারাত্মক ভাবে ব্যহত হয়। এরা চোখে চোখে তাকায় না, আদর করলে উত্তর দেয় না, একা একা খেলতে চায়। অন্য বাচ্চাদের সাথে মিশতে পারে না ইত্যাদি।

যোগাযোগ স্থাপনে সমস্যাঃ
আমরা আমাদের মনের ভাব, চিন্তা অন্যের সাথে বিনিময় করি প্রধানতঃ দুই ভাবে। এক, আমাদের ভাষা বা কথা বলার মাধ্যমে (verbal communication) । দুই, কথা না বলে আমাদের আচার-আচরণ বা শারীরিক অঙ্গ-ভঙ্গী ইত্যাদির মাধ্যমে (non-verbal communication)। যেমন, কিছু না বলে শুধু ভ্রু কোঁচকানোর মাধ্যমেই আমরা আমাদের বিরক্তি ভাব প্রকাশ করতে পারি। অটিস্টিক বাচ্চাদের এই দুই ধরনের যোগাযোগেই সমস্যা থাকে (both verbal and non-verbal communication)।

একজন সুস্থ শিশুর ভাষার বিকাশ শুরু হয় মোটামুটি ছয় মাস বয়স থেকে ব্যা ব্যা কিংবা ম্যা ম্যা (bubling)এর মাধ্যমে। এক বছরের মধ্যে সে একটা-দু’টা শব্দ বলে এবং দুই বছরের মধ্যে দুই শব্দ জোড়া দিয়ে কথা বলতে পারে। অটিস্টিক শিশুদের ক্ষেত্রে এই ভাষার বিকাশটা হয় দেরীতে বা হয় না, কোন কোন ক্ষেত্রে এক-দুই বছর পর্যন্তু ভাষার স্বাভাবিক বিকাশ হয়ে সম্পুর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং কথা কমে আসে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে অটিস্টিক বাচ্চারা কথা চালানোর মতো কথা বলতে পারে, এদের মধ্যে বড় একটা অংশের ক্ষেত্রে কথা চালানোর মতো ভাষা শিখতে পারে না। সর্বনাম ব্যবহারে সমস্যা থাকে, একই শব্দ বারবার বলে অথবা অন্যের কথা পুনরাবৃত্তি (repeat) করে। কখনও বা অনর্গল কথা বলে গেলেও সেই ভাষার কোন অর্থ থাকে না।

এছাড়া, চোখ মুখ বা শারীরিক অঙ্গ-ভঙ্গীর মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশের যে দক্ষতা থাকে সেটাতেও তারা ঠিকমতো করতে পারে না। দুই বছরের মধ্যেই একটা সাধারণ শিশু যেমন নানা ধরনের কল্পনা (imaginative play/symbolic play) করতে পারে যেমন, চামচ কে গাড়ি কল্পনা করা, কলমকে উড়োজাহাজ বানানো। কিন্তু অটিস্টিক বাচ্চারা এ ধরনের কাল্পনিক খেলা খেলতে পারে না। তাছাড়া খেলার সামগ্রী সঠিক ভাবে ব্যবহারেও বিভিন্ন সমস্যা থাকে।

একই কাজ বারবার করার প্রবণতাঃ
অটিজমে একই কাজ বারবার করার প্রবণতা অন্যতম বৈশিষ্ট্য। একই খেলনা, একই জামা, একই ধরনের খাবারের প্রতি আগ্রহ থাকে (obsessive desire for sameness)।

অন্যান্য বৈশিষ্ট্য:
উপরের তিন ধরনের মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছাড়াও সাংঘাতিক অস্থিরতা, ভাংচুর করার প্রবণতা, চিৎকার করা, নিজেকে আঘাত করা, ঘুমের সমস্যা ইত্যাদি দেখা দেয়।

অটিজম আক্রান্ত শিশুর লক্ষণ:
· ৬ মাস বয়স পর্যন্ত কোন হাসি না থাকা।
· ১২ মাস বয়স পর্যন্ত pointing না হলে (আঙ্গুল দিয়ে কোন বস্তুর দিকে নির্দেশ করা)।
· ১৬ মাসের মধ্যে কোন শব্দ না বলতে পারা।
· কথা তৈরী হয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া।

কোন বয়সে অটিজম হয়/কাদের হয়?
অটিজম যেহেতু একটি বিকাশ জনিত সমস্যা সেজন্য এর শুরুটা হয় শিশুর জন্মের পর থেকেই। সাধারণতঃ শিশুর ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যেই এর উপসর্গগুলো পূর্ণ মাত্রায় প্রকাশিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের মধ্যে অটিজম চার গুণ বেশী। প্রায় ১০,০০০ জনের মধ্যে ২০ জন শিশু অটিজমে আক্রান্ত (Fombonne-2009)। এছাড়াও বাংলাদেশে প্রায় ৮% শিশু অটিজমে আক্রান্ত।

অটিজম কেন হয়?
ঠিক নির্দিষ্ট কি কারণে অটিজম হয় সেটা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে মস্তিষ্কের স্নায়ুর শুধু একটা জায়গা (system) না হয়ে বেশ কয়েকটি জায়গাই দায়ী বলে মনে করা হয় (several neural system)।
আবার, বেশ কিছু গবেষণায় অটিজমের সাথে জিনগত ত্রুটির সংযোগ আছে বলে মনে করা হয়।

বাবা-মায়ের শিশু পরিচর্যা ও অটিজমঃ
এ ব্যাপার পরিষ্কার থাকা ভালো যে অটিজম হওয়ার জন্য কোন ভাবেই বাবা-মায়ের শিশু পরিচর্যার ধরণ দায়ী নয়। সন্তানকে সময় না দেয়া, বাবা-মায়ের মনোমালিন্য, বাচ্চাকে বেশী বেশী কার্টুন ছবি দেখানো ইত্যাদি কোন কিছুর সাথেই অটিজম হবার কোন সম্ভাবনা নেই।

monon-600

অটিজম কি আদৌ ভালো হয়?
অটিজম সম্পুর্ণ ভাবে ভালো না হলেও আগে থেকে চিকিৎসা করালে এর উপসর্গ সমূহ বয়সের সাথে সাথে কমে আসতে পারে। দেখা যায়, প্রায় ১০-২০% অটিস্টিক বাচ্চাদের ৪-৬ বছরের মধ্যেই বেশ খানিকটা উন্নতি হয়- তারা অন্য বাচ্চাদের মতো সাধারণ স্কুলে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারে এবং পেশাগত জীবন চালাতে পারে। কাকী ১০-২০% শিশুর প্রয়োজন হয় অটিস্টিক বাচ্চাদের জন্য বিশেষায়িত স্কুলের এবং তাদের জীবন যাপনের জন্য পরিবারের উপর নির্ভরশীল থাকতে দেখা যায়। বাকী ৬০% শিশুর অল্পই উন্নতি ঘটে এবং একেবারেই স্বাধীন ভাবে জীবন যাপন করতে পারে না।

অটিস্টিক শিশুর পরিচর্যাঃ
অটিস্টিক শিশুর পরিচর্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এই ধরনের শিশুর সীমাবদ্ধতাকে গ্রহন করে মেনে নেয়া। শিশুটিকে তার অবস্থান থেকে বুঝতে চেষ্টা করা। অটিস্টিক শিশু পালন বাবা-মায়ের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা। এক্ষেত্রে আশপাশের মানুষ সহমর্মিতা, সহযোগিতা বাবা-মায়ের এই কঠিন কাজটিকে সহজ করে দিতে পারে।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।

ট্যাগ্স:

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী অধ্যাপক জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা