কনভার্সন ডিসঅর্ডার: কারণ ও লক্ষণ 1

কনভার্সন ডিসঅর্ডার: কারণ ও লক্ষণ

জনাব আরিফুল ইসলাম একটি বেসরকারি ব্যাংকের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তার পদমর্যাদার কারণেই তার উপর অনেক কাজের চাপ থাকে। গত কয়েক মাস যাবত প্রতিদিন তার বাম পায়ের হাঁটুর নিচ থেকে প্রচণ্ড ব্যাথা হত। দিনে দিনে ব্যাথার পরিমাণ এতোই বেড়ে গেলো যে তার জন্যে অফিসে বসে কাজ করাটাও কষ্টকর হয়ে পড়েছিলো। এ সমস্যা নিয়ে তিনি একজন অর্থোপেডিকের শরনাপন্ন হলেন,অথচ ডাক্তারের পরীক্ষায় এবং মেডিকেল টেস্টে কোন সমস্যাই ধরা পড়লো না। আবার এদিকে তার পায়ের ব্যাথার অবস্থা দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছিলো। একদিন সকালে ঘুম ভেঙে প্রতিদিনের মত বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে আরিফুল সাহেব টের পেলেন তিনি হাঁটুর নিচ থেকে তার বাম পা নাড়াতে পারছেন না। তৎক্ষণাৎ তিনি ডাক্তারের কাছে গেলেন এবারও ডাক্তারের পরীক্ষায় কিংবা টেস্টে সবকিছু স্বাভাবিক আসলো। অথচ শত টেস্ট,ঔষধ দিয়েও আরিফুল সাহেব তার বাম পায়ের হাঁটুর নিচের অংশে কোন অনুভূতিই ফিরে পাননি।

উপরের বর্ণনা করা করা ঘটনাটির পেছনে মুখ্য কারণ হতে পারে কনভার্সন ডিসঅর্ডার। কনভার্সন ডিসঅর্ডার হলো ব্যক্তির এমন একটি মানসিক অবস্থা যেখানে তার ঐচ্ছিক পেশী এবং শরীরের সংবেদনশীল অঙ্গসমূহতে এমন কিছু শারীরিক উপসর্গ দেখা যায় যা প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থার কোন রোগের উপসর্গের সাথে মিলে না। অর্থাৎ,ব্যক্তি শারীরিক বিভিন্ন অসুবিধায় ভুগে থাকে অথচ শারীরিক উপসর্গগুলো প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থার কোন রোগের সাথে মিলে না । এটিকে ফাংশনাল নিউরোলজিক্যাল সিম্পটম ডিসঅর্ডারও বলা হয়ে থাকে। এ ডিসঅর্ডারটিকে ‘কনভার্সন’ ডিসঅর্ডার বলা হয় কারণ অনেক বিশেষজ্ঞের মতে এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি তার মানসিক চাহিদা বা দ্বন্দ্বকে স্নায়বিক লক্ষণসমূহতে রূপান্তর করে থাকে। কনভার্সন ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত আংশিক পক্ষাঘাত, অন্ধত্ব, বধিরতা- এ সকল সমস্যার বিষয়ে উল্লেখ করে থাকে। প্রকৃত শারীরিক সমস্যা থেকে এ ডিসঅর্ডারটিকে আলাদাভাবে নির্ণয় করা পারা চিকিৎসকদের জন্যেও অত্যন্ত কঠিন বিষয়। অনেক ক্ষেত্রেই আসল শারীরিক ব্যাধিই এবং কনভার্সন ডিসঅর্ডার আলাদাভাবে নির্ণয় করার ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। যেহেতু আসল শারীরিক ব্যাধি এবং কনভার্সন ডিসঅর্ডারের উপসর্গের মাঝে অনেক মিল পাওয়া যায়, তাই চিকিৎসকেরা সাধারণ আসল ব্যাধির উপসর্গ এবং রোগীর বর্ণনা করা উপসর্গের মাঝে পার্থক্য খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন । এ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা তার শারীরিক উপসর্গগুলোর কারণে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সাধারণত শৈশবের শেষের দিক থেকে তারুন্যের শুরুর দিকে এ ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে বেশি দেখা যায়। এ ডিসঅর্ডারে আক্রান্তের মাঝে পুরুষদের চেয়ে মহিলারা ২ থেকে ৩ গুণ বেশি ভুক্তভোগী হয়ে থাকে।

কনভার্সন ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হবার কারণসমূহ

কনভার্সন ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হবার মূল কারণ এখনও নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয়ে ওঠে নি। সাধারণত মাত্রাতিরিক্ত স্ট্রেস, দুঃশ্চিন্তা, উদ্বিগ্নতা, মানসিক দ্বন্দ্ব, ইমোশনাল ট্রমা কিংবা বিষণ্ণতা- এ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হবার কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এ ডিসঅর্ডারের কারণে ব্যক্তি প্রাথমিকভাবে দু;শ্চিন্তাজনক বা স্ট্রেস তৈরিকারী পরিস্থিতি থেকে সাময়িকভাবে পরিত্রাণ পায়।

দ্বিতীয়ত, এই উপসর্গগুলো ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান থাকলে দীর্ঘ সময়ব্যাপী সে স্ট্রেস তৈরিকারী পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, মস্তিষ্কের স্ট্রাকচারাল, সেলুলার কিংবা মেটাবলিক কার্যক্রমের পরিবর্তন বা বাধাপ্রাপ্ত হবার কারণেও শারীরিক উপসর্গগুলো দেখা যেতে পারে। এ ডিসঅর্ডারের ক্ষেত্রে যে শারীরিক উপসর্গগুলো দেখা যায় তা মুলত আসন্ন কোন আশংকাজনক পরিস্থিতি বা স্ট্রেস থেকে সাময়িক পরিত্রাণ পাবার জন্যে শরীরের একটি স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া । উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, একজন পুলিশ অফিসার যে প্রতিনিয়ত দাগী এবং ফেরারী আসামীদের নিয়ে কাজ করে, যাকে তার কাজের প্রয়োজনে আসামীর উপর গুলি চালাতে হয়। অথচ দেখা গেলো যে গুলি চালানো কিংবা কাউকে হত্যা করার কাজটি তিনি পছন্দ করেন না। কিন্তু কাজের প্রয়োজনে তাকে হয়তো প্রায়ই এ কাজটি করতে হয়ে থাকে। দেখা যেতে পারে যে, যে পরিস্থিতি এড়ানোর জন্যে তার শরীরের স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া হিসেবে তার হাত অবশ কিংবা প্যারালাইসিস হয়ে গেছে। তখন এটি কনভার্সন ডিসঅর্ডার হিসেবে বিবেচিত হবে।
অনেকে অনেক ক্ষেত্রে মনে করেন যে, আক্রান্ত ব্যক্তি হয়তো তার শারীরিক সমস্যার ব্যাপারে মিথ্যা বলছেন বা বানিয়ে বলছেন। তখন তাদেরকে জোরপূর্বক এ সকল প্রতিক্রিয়া প্রকাশে বাধা দেয়া হয় অথবা তাদের কথায় গুরুত্ব দেয়া হয় না। এ ক্ষেত্রে এটি কার্যকরী উপায় তো নয়ই বরং তা দূর্দশার সৃষ্টি করে থাকে। এর উপসর্গগুলো শারীরিক মুভমেন্ট এবং ইন্দ্রিয়গুলোকে প্রভাবিত করতে পারে।

কনভার্সন ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হবার ঝুঁকিসমূহ

  • যে সকল ব্যক্তি এ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হবার ঝুঁকিতে থাকে, তারা হলেন-
    ডিসোসিয়েটিভ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তি (এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, বাস্তবতা সম্পর্কে অবগত থাকে না)
  • পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তি ( যে ব্যক্তি কিছু সামাজিক পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত আচরণ এবং অনুভূতি প্রকাশে অক্ষম)
  • আগে থেকে মৃগীরোগ, কিংবা মুভমেন্ট জনিত সমস্যা থাকা
  • সাম্প্রতিক সময়ে কোন গুরুতর শারীরিক আঘাত বা মানসিক আঘাত পাওয়া
  • সম্ভবত, শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের ইতিহাস বা শৈশবে অবহেলার শিকার হওয়া
  • পরিবারে অন্য কেউ কনভার্সন ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত থাকলে

    কনভার্সন ডিসঅর্ডার: কারণ ও লক্ষণ 2
    মানসিক স্বাস্থ্যের সব খবর নিয়ে ‘মনের খবর’ জানুয়ারি সংখ্যা এখন সর্বত্র পাওয়া যাচ্ছে। আজই সংগ্রহ করে নিন আপনার কপিটি।

কনভার্সন ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হবার লক্ষণসমূহ
কনভার্সন ডিসঅর্ডারের লক্ষণগুলো ঠিক কোন ধরণের পরিস্থিতিতে কার্যকর হয়ে উঠবে তা সঠিকভাবে বলা কঠিন। এটি জীবনের যে কোন সময় কার্যকর হয়ে উঠতে পারে। এ উপসর্গগুলো নিজে থেকে চালু বা বন্ধও করা যায় না। এ ডিসঅর্ডারের বিভিন্ন রকম লক্ষণ থাকে বা তা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে উপস্থাপিত হতে পারে যা অনেক ক্ষেত্রে উপসর্গের প্রকটতার উপরও নির্ভর করে থাকে। এর উপসর্গগুলো শারীরিক মুভমেন্ট এবং ইন্দ্রিয়গুলোকে প্রভাবিত করতে পারে। উপসর্গগুলো একবার কিংবা স্ট্রেস তৈরিকারী পরিস্থিতি বারবার উপস্থাপিত হলে এর পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে ।

কনভার্সন ডিসঅর্ডারের উপসর্গগুলোকে মূলত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যেতে পারে, যথা-
• ইন্দ্রিয়জনিত লক্ষণ
• মোটর কার্যক্রম জনিত লক্ষণ
• খিঁচুনি

ইন্দ্রিয়জনিত লক্ষণ :
ইন্দ্রিয়জনিত লক্ষণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- অন্ধত্ব বা টানেল ভিশন, সাময়িক বা সম্পূর্ণ বধিরতা, ত্বকে অনুভূতি লোপ পাওয়া বা হ্রাস পাওয়া, কথা বলতে সমস্যা হওয়া বা কথা বলতে না পারা।

মোটর কার্যক্রম জনিত লক্ষণ:
মোটর কার্যক্রম জনিত লক্ষণের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো- শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গে দূর্বলতা অনুভব করা, পক্ষাঘাত বা শরীরের কোন অংশে অনুভূতি না পাওয়া, শরীরের ভারসাম্যহীনতা, কোন কিছু গিলতে অসুবিধা হওয়া বা গলায় কিছু আটকে আছে তা মনে হওয়া ইত্যাদি।

খিঁচুনি:
ব্যক্তির খিঁচুনির সাথে উপযুক্ত অভ্যন্তরীণ শারীরিক প্রক্রিয়া দেখা যায় না। এক্ষেত্রে ব্যক্তির খিঁচুনির পাশাপাশি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে কিংবা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াহীন হয়ে পড়ে।

উপরোক্ত তিনটি শ্রেণির সংমিশ্রণে কিছু লক্ষণ দেখা যেতে পারে যা ব্যক্তির জন্যে কষ্টদায়কও হতে পারে।

 

**আগামী পর্বে আমরা কনভার্সন ডিসঅর্ডার প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে জানবো।