মূল পাতা / মানসিক স্বাস্থ্য / আপনার সঙ্গী কি অবসাদ বা উদ্বেগের সমস্যায় ভুগছেন?

আপনার সঙ্গী কি অবসাদ বা উদ্বেগের সমস্যায় ভুগছেন?

মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে মানসিক অবসাদ বা উদ্বেগের সমস্যার মোকাবিলা করা সত্যিই খুব কঠিন হয়ে ওঠে। যদিও ইদানীং মানুষের মধ্যে মেজাজ-মর্জির সমস্যাটা হামেশাই চোখে পড়ে। এই সমস্যার ক্ষেত্রে সামান্যতম মনোযোগ দেওয়ার প্রভাব মানুষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কগুলোর উপর বেশ ভালোই পড়তে দেখা যায়। আপনার সঙ্গীর যদি মেজাজ-মর্জির সমস্যা ধরা পড়ে তাহলে তা আপনাদের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে অত্যন্ত চাপের জন্ম দিতে পারে। এই প্রবন্ধে এই সংক্রান্ত প্রচলিত কয়েকটি প্রশ্ন-উত্তর আলোচনা করা হল-

কীভাবে আমি জানব যে আমার সঙ্গী অবসাদে ভুগছেন?

নানাভাবে অবসাদের লক্ষণ প্রকাশ পায়। যেমন আপনি প্রায়শই দেখবেন আপনার সঙ্গী হয় বিষণ্ণ অথবা খিটখিটে হয়ে রয়েছেন, একটুতেই কেঁদে ফেলছেন, মাঝে মাঝেই ক্লান্ত বা অবসন্ন হয়ে পড়ছেন। তাঁর ঘুমের ধরনে বদল দেখা যাচ্ছে। কম সময় ঘুমাচ্ছেন এবং খুব ভোরে উঠে পড়ছেন ও ঘুম থেকে উঠেই খুব বিষণ্ণ হয়ে আছেন। আপনার সঙ্গীর মধ্যে খিদের অভাবও আপনি লক্ষ করতে পারেন এবং কোনওরকম চেষ্টা বা কারণ ছাড়াই তাঁর দৈহিক ওজন কমে যেতে দেখবেন। এই সমস্যার ফলে তিনি নিজেকে সমাজ থেকে দূরে সরিয়ে নিতে পারেন এবং বন্ধুদের বা আপনার সঙ্গে বাইরে বেরোতে না-ও চাইতে পারেন। আগে তিনি যে কাজ করতে খুব পছন্দ করতেন সেই  কাজ করতে আর আগ্রহ দেখাতে না-পারেন। এছাড়া তাঁর মধ্যে ক্রমশ যৌন ইচ্ছা কমে যেতে পারে।

যদি আপনি আপনার সঙ্গীর মধ্যে এই সমস্যাগুলো বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ করতে থাকেন তাহলে তাঁর সমস্যার কথা তাঁকে আপনি জিজ্ঞাসা করতে পারেন। তবে দেখতে হবে যে তিনি তাঁর সমস্যার কথা আপনাকে জানাতে চাইছেন কিনা। এর মানে একসপ্তাহ ধরে তিনি বিষণ্ণ হয়ে আছেন বলেই তাঁর অবসাদ হয়েছে তা মনে করা ঠিক নয়। এক্ষেত্রে লক্ষ করা জরুরি যে তাঁর মধ্যে যে লক্ষণগুলো প্রকাশ পাচ্ছে তা আসলে অবসাদের লক্ষণ কিনা এবং সমস্যা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য লক্ষণগুলোকে অন্ততপক্ষে দু’সপ্তাহ ধরে প্রকাশ পেতে হবে।

আমার সঙ্গীর মানসিকভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন কিনা তা আমি কীভাবে বুঝতে পারব?

অবসাদের তুলনায় উদ্বেগের সমস্যা ধরতে পারা একটু বেশি কঠিন। অবসাদের মতো  উদ্বেগের ক্ষেত্রে আপনার সঙ্গী নিজেকে সমাজ থেকে দূরে সরিয়ে নিতে না-ও পারেন। কিন্তু তাঁর মধ্যে কোনও একটা বিষয় নিয়ে এতটাই চিন্তা বা উত্তেজনা দেখা দিতে পারে যেগুলো আগে কখনও তাঁর চিন্তার কারণ হয়ে দেখা দেয়নি। কোনও একটা বিষয় নিয়ে তিনি বারবার আপনাকে প্রশ্ন করতে পারেন এবং কোনওবারই আপনার উত্তরে তিনি সন্তুষ্ট না-ও হতে পারেন। নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতি তিনি এড়িয়ে চলতে পারেন। প্রায়শই তাঁর মাথাব্যথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা হতে পারে। তিনি সবসময়ে খুব দিশাহারা বোধ করতে পারেন এবং প্রায়শই তাঁর মনে হতে পারে যে তাঁর মধ্যে উত্তেজনা দমন করার প্রয়োজনীয় রসদ নেই।

কীভাবে আমি আমার সঙ্গীর মনে দুঃখ না দিয়ে তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা বলতে পারি?

সঙ্গীর সঙ্গে কার্যকরী যোগাযোগ গড়ে তোলার প্রথম ধাপ হল সংবেদনশীলতার সঙ্গে তাঁর প্রতি মনোযোগ দেওয়া। এর ফলে তাঁর আচরণের ক্ষেত্রে কিছু বদল আপনার চোখে পড়বে। তাঁকে দোষারোপ না করে তাঁর সঙ্গে কথা বলাই এক্ষেত্রে আপনার জন্য সেরা উপায়। এই অবস্থায় সঙ্গীকে খুব খোলাখুলি প্রশ্ন করা জরুরি, যেমন- ”তোমাকে কিছুটা চিন্তিত মনে হচ্ছে, তুমি ঠিক আছো তো? তুমি কি এবিষয়ে আমায় কিছু বলতে চাও, তাহলে আমি তা অবশ্যই শুনব?” এভাবে তাঁর অসুস্থতার কথা শান্তভাবে তাঁকে   জিজ্ঞাসা করার মধ্য দিয়ে তাঁর মধ্যে এমন একটা নিরাপত্তার বোধ তৈরি হতে পারে যার ফলে তিনি তাঁর চিন্তা এবং অনুভূতির কথা খোলাখুলিভাবে আপনাকে জানাতে দ্বিধা করবেন না।

যদি আমার সঙ্গী কারও সাহায্য নিতে না চায় তাহলে আমি কী করব?

যদি আপনি দেখেন যে সঙ্গীকে তাঁর সমস্যার কথা জিজ্ঞাসা করার পর তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা আপনাকে জানিয়ে স্বস্তি পাচ্ছেন বা সমস্যামুক্ত হতে পারবেন বলে মনে  করছেন তাহলে এই দুই প্রতিক্রিয়াকে অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। একজন অবসাদগ্রস্ত মানুষের সমস্যা কতটা গুরুতর তা বোঝা যায় যে, কোনও কাজ সে বিনা বাধায় কতখানি করতে সক্ষম হচ্ছে এবং প্রায়শই তার মধ্যে বিষণ্ণতা দেখা দিচ্ছে কিনা তার উপর নির্ভর করে। যখন আপনার সঙ্গীর জীবনে  অবসাদের মতো দুঃসময় চলে তখন তাঁকে মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি যে এর জন্য তাঁর কোনও দোষ নেই। এক্ষেত্রে আপনি একজন মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর সাহায্য চাইতে পারেন। যদি দেখেন যে আপনার সঙ্গী বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়াটা পছন্দ করছেন না এবং দিশাহারা বোধ করছেন, তাহলে আপনি সেলফ-হেল্প বিষয়ক বইয়ের সাহায্য নিতে পারেন। এছাড়া মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে আরও ভালোভাবে জানার জন্য আপনি বিভিন্ন ওয়েবসাইট দেখেত পারেন।

মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া একজন মানুষের অত্যন্ত ব্যক্তিগত বিষয় বা পছন্দ। এক্ষেত্রে আপনার সঙ্গী নিজের সমস্যা সম্পূর্ণ দূর করার জন্য একজন থেরাপিস্ট বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে পছন্দ করতে পারেন আবার না-ও পারেন। এব্যাপারে আপনার উদ্দেশ্য কতটা ভালো এবং আপনি আপনার সঙ্গীকে কতটা সুস্থ দেখতে চাইছেন, সেগুলো তত গুরুত্বপূর্ণ নয়। আসলে এটা এমন একটা বিষয় যা আপনার নেওয়া সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে না।

যখন বেশিরভাগ সময় আমি আমার সঙ্গীর দেখভাল করে কাটাব তখন কীভাবে আমি নিজের যত্ন নেব?

যখন আপনি আপনার অবসাদগ্রস্ত বা উদ্বেগে ভোগা সঙ্গীর প্রাথমিক পরিচর্যাকারী হিসেবে কাজ করবেন তখন নিজের যত্ন নেওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর তিনটি দিক রয়েছে-

বিবেক বা চেতনার দিক থেকে আপনি নিজেকে অপরাধী ভাবতে পারেন। কারণ নিজের যত্ন নিলে আপনার সঙ্গী আপনার সম্পর্কে কী ধারণা করছেন সেই প্রশ্ন আপনার মনে দেখা দিতে পারে। আপনি নিজেকে নানারকম প্রশ্ন করতে পারেন, যেমন- ”আমি কি কোনওভাবে আমার সঙ্গীর অবসাদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছি?”, ”আমার আচরণের জন্যই কি তাঁর অবসাদের সমস্যা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে?” প্রভৃতি। এসব চিন্তা করে আপনি হতাশ হয়ে পড়তে পারেন। সেক্ষেত্রে আপনি আপনার সঙ্গীকে সুস্থ করার জন্য কতটা চেষ্টা করছেন তা আপনার কাছে বড় হয়ে না-ও উঠতে  পারে। এই অবস্থায় আপনাকে মানতে হবে যে সঙ্গীর অবসাদের জন্য আপনি কোনওভাবেই দায়ী নন। সঙ্গীর অবসাদের জন্য নিজেকে দায়ী ভাবার ফলে আপনার মধ্যে এমন পাহাড়-প্রমাণ অপরাধ বোধের জন্ম হতে পারে যা কখনও শেষ হওয়ার নয়। এর ফলে আপনাদের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল হয়ে উঠতে পারে।

আবেগানুভূতির দিক থেকে এমন সময় আসতে পারে যখন আপনার সঙ্গীর মেজাজ-মর্জি আপনার মনে আঘাত দিতে পারে। এই অবস্থায় খুব বুদ্ধি করে চলতে হবে।  সমানুভূতিসম্পন্ন হতে হবে যাতে অন্যদিক থেকেও খুব তাড়াতাড়ি একইরকম অনুভূতি ভাগ করে নেওয়ার মনোভাব জন্মায়। নিজের সুস্থতার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য একটা সীমারেখা বজায় রেখে চলতে হবে। আপনার মধ্যে যে একপ্রকার অপরাধ বোধ জন্মাচ্ছে সেকথা সঙ্গীকে বলতে হবে। এটি আপনার নিজের আবেগকে অনেক বেশি করে ধরে রাখতে সাহায্য করবে। নিজের আবেগ বা অনুভূতিগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। সেক্ষেত্রে সঙ্গী আপনার সম্পর্কে কী ধারণা করল তা তত গুরুত্ব দিয়ে না
ভাবলেও চলবে।

বাস্তব দিক থেকে, আপনার উচিত নিজেকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া। এমন কাজ করা প্রয়োজন যাতে আপনার ভালো লাগতে পারে। যেদিন আপনার মনে হবে একটু বিশ্রামের প্রয়োজন রয়েছে সেদিন সঙ্গীর দেখাশোনা করার জন্য কোনওরকম দ্বিধা না করে বন্ধু বা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে সাহায্য চাইতে পারেন। সাহায্য মানে তাঁকে সময় মতো ওষুধ খাওয়ানো, বাড়িতে তাঁকে সঙ্গ দেওয়া, তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়া প্রভৃতি।

এমন কোনও সময় আসতে পারে যখন আপনার সঙ্গী আপনার এবং আপনাদের সম্পর্ক নিয়ে নেতিবাচক কথাবার্তা বলতে পারেন। এই বিষয়টাকে সবসময়ে ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ করা উচিত নয়। কারণ অবসাদ বা উদ্বেগের কারণে এমনটা ঘটতে পারে। তাই আপনার সঙ্গী খুব দুঃখ পায় বা মানসিক আঘাত পায় এমন কোনও কাজ আপনার করা উচিত নয় এবং কিছু ক্ষেত্রে তাঁর থেকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখাও একান্ত জরুরি।

কতদিন সময় লাগতে পারে আমার সঙ্গীর সুস্থ হতে? সুস্থ হওয়ার পরে যাতে আবার সেই একই সমস্যা দেখা না দেয় তার জন্য আমার কী করা প্রয়োজন?

সাধারণত অবসাদ কাটিয়ে উঠতে একজন মানুষের ২ থেকে ৮ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। অনেকসময়ে কোনও নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বা চাপের ফলে যদি অবসাদ দেখা দেয় তাহলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পরিস্থিতির বদল ঘটাতে হবে এবং জীবন থেকে চাপ দূর করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে অবসাদের সমস্যা একনাগাড়ে দীর্ঘ সময়  ধরে চলতে পারে। এই অবস্থায় পরিস্থিতি বদলানোর জন্য আপনার উচিত অনেক বেশি ধৈর্য ধরা।

সঙ্গী সুস্থ হয়ে যাওয়ার পর আপনি দুটো কাজ করতে পারেন। প্রতিকূল পরিস্থিতি থিতিয়ে যাওয়ার পর যদি আবার কোনও সমস্যা আপনার চোখে ধরা পড়ে তাহলে সম্ভব হলে তাড়াতাড়ি তার বদল ঘটাতে চেষ্টা করবেন। যদি বিপদ বুঝতে পারেন তাহলে বাস্তবসম্মত উপায়ে সেগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবেন। এক্ষেত্রে সমস্যা যাতে দেখা না দেয় তার জন্য সুপরিকল্পনা করে চলতে হবে। এই অবস্থায় একজন মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া জরুরি এবং নিজের চেষ্টায় অনলাইনের মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে বের করাও যেতে পারে। ব্যক্তিগত স্তরে আপনার সঙ্গীর সুস্বাস্থ্য এবং জীবনধারণের নিয়ম-নীতি যেমন পর্যাপ্ত ঘুম, খিদে বোধ এবং সঠিক খাদ্য তালিকা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোর পরিবর্তন ঘটলেই আবার অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি জন্মায়। থেরাপিস্ট বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অথবা সাধারণ ডাক্তারের কাছে রুগির অবস্থার উন্নতি বা অবনতির বিষয় নিয়মিত জানাতে হবে এবং এক্ষেত্রে কোনওরকম ভুল করলে চলবে না। আগে যেসব চিন্তাভাবনার কারণে অবসাদ বা উদ্বেগের সমস্যা দেখা দিয়েছিল তা যাতে আর  দেখা দিতে না পারে সেজন্য যথাযথ কৌশল রপ্ত করতে হবে। এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক স্বাস্থ্যের সুস্থতার জন্য এই কৌশল বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।