বাইপোলার ডিজঅর্ডার সঠিক চিকিৎসায় নিয়ন্ত্রণে থাকে 1

বাইপোলার ডিজঅর্ডার সঠিক চিকিৎসায় নিয়ন্ত্রণে থাকে

বাইপোলার ডিজঅর্ডার আবেগজনিত একটি মানসিক রোগ। নারী-পুরুষ উভয়ই এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। যাদের নিকটাত্মীয়ের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস আছে, তাদের ক্ষেত্রে এ রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেশি। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ২০১৮ সালে পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সীদের শতকরা ০.৫ ভাগ অর্থাৎ প্রতি হাজারে ৫ জন এ ধরনের রোগে আক্রান্ত।

এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির আবেগের দুটি পর্যায় থাকে। একটি পর্যায় হচ্ছে ম্যানিয়া বা হাইপোম্যানিয়া। ম্যানিয়া পর্যায়ে ব্যক্তিরা অস্বাভাবিক আনন্দ-ফূর্তি অনুভব করেন অথবা বিরক্ত বোধ করেন, নিজেকে অতি বিত্তশালী বা ক্ষমতাবান মনে করেন, কথা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বলেন। তাদের মধ্যে অতি উত্তেজনা বা অতিরিক্ত কাজের স্পৃহা দেখা দেয় কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে বা কথায় স্থির থাকতে পারেন না। বেশি খরচ করেন অথবা দান করেন। ঘুম কমে যায়। অনেকের যৌন আগ্রহ অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। কিন্তু আক্রান্তরা নিজেদেরকে স্বাভাবিক মনে করেন। তাদের আচরণের অস্বাভাবিকতা অন্যদের চোখে ধরা পড়ে। এসব উপসর্গ টানা সাতদিনের বেশি থাকলে একে ম্যানিয়া পর্যায় বলা হয়। উপসর্গের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব কম হলে একে হাইপোম্যানিয়া বলা হয়।

বাইপোলার ডিজঅর্ডারে আবেগের অন্য পর্যায়টি বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন। বিষণ্ণতায় আক্রান্ত ব্যক্তির দিনের অধিকাংশ সময় মন খারাপ বা ভার হয়ে থাকে। দৈনন্দিন কাজের অধিকাংশ বা সব ক্ষেত্রেই তিনি আর আগের মতো আগ্রহ পান না। এমনকি আগে যেসব কাজ উৎসাহ ভরে করতেন, এখন সেসবেও আনন্দ বা উৎসাহ পান না। মনোযোগের অভাব দেখা দেয়। যেকোনো কিছুতেই সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। ঘুমের সমস্যা দেখা দেয় যেমন-ঘুম আসতে দেরি হয়, তাড়াতাড়ি ভেঙে যায় বা ঘুম ভাঙার পর আর আগের মতো সতেজ বা চাঙা লাগে না, এক ধরনের ক্লান্তি ঘিরে ধরে। খাওয়ায় অরুচি হয় ফলে ওজন কমতে থাকে। চিন্তা ও কাজের গতি ধীর হয়ে যায়। নেতিবাচক চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে মনে, অযৌক্তিক বা অতিরিক্ত অপরাধবোধে ভোগেন। নিজেকে এবং জীবনটাকে অর্থহীন মনে হতে থাকে। মারাত্মক ক্ষেত্রে আত্মহত্যা প্রবণতা দেখা দেয়।

বাইপোলার ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত অনেকের ক্ষেত্রে শুধু ম্যানিয়া পর্যায়টিই দৃশ্যমান হয়, বিষণ্ণতার পর্যায়টি বোঝা না-ও যেতে পারে। কারো ক্ষেত্রে সারা জীবনে হয়ত দু-এক বার ম্যানিয়া পর্যায়টি দেখা দিতে পারে, কারো ক্ষেত্রে কয়েক বছর পর পর বা বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে এটি হতে পারে। তবে এর বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা রয়েছে। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে আবেগের অবস্থাটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।

অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের কারণে অনেকেই এই সমস্যাটিকে মানসিক রোগ বলে মানতে চান না। এ রোগ নিয়ে অনেকের মাঝে রয়েছে বিভ্রান্তি। তবে সর্বপ্রকার রোগ বিষয়ক আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রেণিবিভাগ ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অব ডিজিজ’ (আইসিডি) এবং মানসিক রোগ বিষয়ে আমেরিকার মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠন আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ) প্রণীত গাইডলাইন ‘ডায়াগনোস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিক্যাল ম্যানুয়াল অব মেন্টাল ডিজঅর্ডার’ অনুযায়ী বাইপোলার ডিজঅর্ডার একটি মানসিক রোগ।

এ রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে এখনো পর্যন্ত গবেষণালব্ধ প্রমাণ এবং এনআইসিই (ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ অ্যান্ড কেয়ার অ্যাক্সিলেন্স), ইংল্যান্ডের গাইডলাইন অনুযায়ী, ঔষধই এ রোগের প্রধান চিকিৎসা-পদ্ধতি। রোগ তীব্র হলে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি রেখেও চিকিৎসা করাতে হতে পারে। কারো কারো ধারণা, বাইপোলার ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত রোগীরা অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত ও মেধাবী হয়ে থাকেন। এ ধারণার সপক্ষে গবেষণালব্ধ কোনো প্রমাণ নেই। যেকোনো শ্রেণি-পেশা-বুদ্ধিমত্তার মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। বিখ্যাত কয়েক ব্যক্তি এ রোগে আক্রান্ত হওয়ায় এ ব্যাপারে ভুল ধারণা সৃষ্টি হতে পারে।

রোগীদের রোগের কারণে বহির্মুখী, দানশীল, আত্মবিশ্বাসী ও অতিরিক্ত সক্রিয় ভূমিকাও এ ধারণা তৈরি করতে পারে। আবার, এ রোগে আক্রান্ত হওয়া মানেই রোগী স্বাভাবিক কাজের অনুপযুক্ত-এরকম ধারণাও ঠিক নয়। সঠিক চিকিৎসায় এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রেখে রোগী তার বুদ্ধিমত্তা ও প্রতিভা অনুযায়ী সফলতা পেতে পারেন। তবে রোগীর অবস্থা অনুযায়ী তার জন্য বাস্তবভিত্তিক ভবিষ্যত লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয়। কাছের কারো মধ্যে এ রোগ দেখা দিলে কিংবা নিজের মধ্যে এরকম লক্ষণ মনে হলে বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা নেয়াটাই যুক্তিসঙ্গত।

সূত্র: মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিন, ১ম বর্ষ, ৫ম সংখ্যায় প্রকাশিত।