মানসিক স্বাস্থ্য-সমস্যা বাড়ছে? 1

মানসিক স্বাস্থ্য-সমস্যা বাড়ছে?

মানসিক রোগ, মানসিক সমস্যা, আত্মহত্যা এসব আজকাল অনেক বেড়েছে। বিভিন্ন মিডিয়ার আলোচনা সমালোচনা বা পর্যালোচনা, এমনকি মানুষের ব্যক্তিগত আলোচনায়ও এসব বিষয় আজকাল আলোচিত হয়। বলা হয়, পনেরো বছর আগেও এত মানসিক সমস্যা মানুষের ছিল না, মানুষ এত বেশি মানসিক রোগেও ভুগত না। সত্যি বলতে কী-পরিসংখ্যানও সাধারণ মানুষের এ ধারণাকেই সমর্থন করে। আমি বা আমরা যারা মানসিক রোগ নিয়ে কাজ করি, তারা এ ধারণার বাইরে গিয়ে অথবা এর বিপরীতে গিয়ে অনেক সময় বলতে চাই, ‘সমস্যা আগেও ছিল এখনো আছে। আগে মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য এবং এ সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে এতটা গুরুত্ব দিত না। এমনকি মানসিক সমস্যা যে স্বাস্থ্যসমস্যা সেটাও ঠিকভাবে ভাবা হতো না’।

কেন এমনটি বলছি বা কেন এই উল্টোরথ? এ প্রসঙ্গে কিছুটা ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে। মানসিক রোগ বা সমস্যার অনেকগুলোকেই, চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্য সমস্যা হিসেবে দেখা হতো বা ভাবা হতো। এমনকি অন্যকোনো শারীরিক সমস্যা ভেবে কিংবা শারীরিক সমস্যা দেখিয়ে, সেভাবেই চিকিৎসা দেয়া হতো। আরো একটি বড় অংশে মানসিক রোগগুলোকে আছড় কিংবা আলগা পাওয়া, বাতাস লাগা, জ্বিনে ধরাসহ বিভিন্ন কথা বলে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা থেকে ভুক্তভোগীদেরকে দূরে রাখা হতো। সুতরাং প্রকৃত মানসিক সমস্যা বা মানসিক রোগগুলোরও মানসিক সমস্যার পরিসংখ্যানের ভেতর আসার সুযোগ থাকত না। মানসিক সমস্যাকে যদি মানসিক সমস্যা হিসেবে ধরাই না হয় তাহলে তা কতজনের বা তার পরিসংখ্যানই-বা কী সেটা ঠিক থাকবে কী করে! গত কয়েক বছরে এসবের বেশ কিছু পরিবর্তন হয়েছে। আজকাল অনেক টেলিভিশন, রেডিও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সরাসরি কিংবা বিভিন্ন রেকর্ডেড প্রোগ্রাম করছে। এমনকি বিশেষ বিশেষ অবস্থা বা ঘটনা নিয়ে বিশেষ বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করে জাতীয় সংবাদ বা প্রধান সংবাদের ভেতরই প্রচার করছে। জাতীয় দৈনিকগুলোও বিষয়গুলো নিয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করছে মানসিক স্বাস্থ্যে সংবাদ। সাক্ষাৎকার, প্রতিবেদন, ক্রোড়পত্রসহ মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার অনেকদিক এবং বৈজ্ঞানিক বিভিন্ন তথ্যসহ তুলে ধরা হচ্ছে মানুষের সামনে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তো আছেই। সেখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যেমন শেয়ার করা হচ্ছে, তেমনি তুলে ধরা হচ্ছে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক তথ্যও। ইউটিউবে সারাবছর ধরেই বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিউদ্যোগে প্রচার করা হচ্ছে মানসিক রোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিভিন্ন তথ্যপূর্ণ ভিডিও। টেলিভিশনগুলো তাদের স্বাস্থ্য অনুষ্ঠানেও রাখছে মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষ এপিসোড, সেসব আবার ইউটিউবের মাধ্যমে জনসাধারণের মাঝে প্রচার করছে।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশে বেশকিছু এনজিও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছে। তারা আলোচনা সভা, সেমিনার, সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান, বিষয়ভিত্তিক বিভিন্ন ক্লাসসহ দিক নির্দেশনামূলক বিভিন্ন কর্মকান্ড এবং তথ্যও প্রদান করে যাচ্ছে। শিশু-কিশোরদের মন, অভিভাবকত্ব, মাদকাসক্তি নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করছে। এমনকি কর্পোরেটদের ভেতরও চলছে বিভিন্ন সচেতনতামূলক আয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিনিয়ত বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সেমিনার, গোলটেবিল আলোচনা, সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান করেই আসছে। একাডেমিক কারিকুলামেও যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়গুলো। সুতরাং বলাই যায়, অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। অথচ একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, কয়েক বছর আগেও চিত্রটি এমন ছিল না। এ প্রসঙ্গে একটু যোগ করতে চাই, বাংলাদেশের টেলিভিশনে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রথম অনুষ্ঠান প্রচার করা হয় ২০০৫ সালের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে। চ্যানেল আই সেটি করেছিল। পরপর চার বছর, ‘ও মন মনরে…’ নামের ঐ অনুষ্ঠানটি চ্যানেল আই প্রচার করে। সে অনুষ্ঠানের কো-অর্ডিনেটর এবং উপস্থাপকের দায়িত্ব আমি পালন করেছিলাম। অন্যকোনো টেলিভিশন, এমনকি পত্রিকা তখন মানসিক স্বাস্থ্য বিষয় নিয়ে কথা বলতেও রাজি হতো না। সেসব বিচারে বলাই যায়, বর্তমানে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। বিষয়গুলো সামনে আসছে এবং পরিসংখ্যানের ভেতরও আসছে। সে কারণেই একটু উষ্মা প্রকাশ করছি, বর্তমান পরিসংখ্যানের এই পরিবর্তনচিত্র কতটুকু সঠিক বা কতটুকু প্রতিনিধিত্বমূলক! এটাও স্বীকার করছি, বর্তমান পৃথিবী এবং পৃথিবীর মানুষের গতি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। গতির সঙ্গে বেড়েছে অনেক চাপ, মানসিক চাপ। চাপের কারণে মানসিক রোগ, মানসিক সমস্যা বা মানসিক অস্থিরতা বাড়াটা অস্বাভাবিক নয়।

তবে পূর্বে সেসব ছিল না সেটা ঢালাওভাবে বলা যায় না। মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মযজ্ঞের অংশ হিসেবে, মনের খবর গত প্রায় পাঁচ বছর যাবৎ মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসেই শুরু হয় মনের খবর’র আনুষ্ঠানিক যাত্রা। মনের খবর (www.monerkhabor.com) নামে বাংলা অনলাইন পোর্টাল হিসেবে কার্যক্রম শুরু হয়। যেটি বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রথম অনলাইন পোর্টাল। পরবর্তীতে মনের খবর  (www.en.monerkhabor.com) ইংরেজি অনলাইনও শুরু করে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকেই মনের খবর মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিনও প্রকাশ করে আসছে। প্রতি মাসে মানসিক স্বাস্থ্যের ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নিয়ে ম্যাগাজিনটি প্রকাশ করা হয়।

শিশুশিক্ষা, নারীর মানসিক স্বাস্থ্য, অটিজম, মাদকাসক্তি, পেশা ও মন, চিকিৎসক-রোগী সম্পর্ক, তরুণ ও মানসিক স্বাস্থ্য, বিষণ্ণতা ও আত্মহত্যা, সিজোফ্রেনিয়া এসব ছিল সংখ্যাগুলোর বিষয়। প্রতিমাসে বিষয় ভিত্তিক, অর্থাৎ প্রতিমাসের ম্যাগাজিনের নির্ধারিত বিষয় নিয়ে একটি ফেইসবুক লাইভ অনুষ্ঠান করা হয়। দর্শকরা সেখানে সরাসরি মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন বিষয় এবং চলতি সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন করতে পারেন। মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান এবং গোলটেবিল বৈঠক মনের খবর নিয়মিতই আয়োজন করে আসছে। খুব শীঘ্রই সারাদেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা তথ্য নিয়ে আরো একটি কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে মনের খবর।

খুব দ্রুত বা অল্প সময়ের ভেতর মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পূর্ণ চিত্র পরিবর্তন হয়ে যাবে সেটা আশা করাও কঠিন। যেমন ভাবা যায় না যে, পূর্ববর্তী চিত্রগুলো সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখনো প্রচুর মানুষ মানসিক সমস্যা নিয়ে সঠিক বিশেষজ্ঞের সহায়তা না নিয়ে অন্যকোথাও চিকিৎসা নিচ্ছেন বা সমাধানের চেষ্টা করছেন। এখনো অনেক মানুষ সমস্যাগুলোকে মানসিক সমস্যা ভাবতেই পারেন না। এখনো এসবের চিকিৎসার নামে সরাসরি শারীরিক নির্যাতন বা মানসিক নির্যাতন, এমনকি পাশবিক পদ্ধতিও অবলম্বন করা হচ্ছে। এখনো অনেক মানুষ মানসিক শব্দটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে আঁতকে ওঠেন। অনেক মানুষ জানেনই না এসবের আধুনিক চিকিৎসা আছে। অনেকে হয়ত ভাবতে পারেন বিষয়গুলো শুধু গ্রামেগঞ্জেই ঘটে বা ঘটছে। অবশ্যই না, শহরে এমনকি খোদ ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়াগায় জ্বিন হুজুর, পীর হুজুর বা আরো বিভিন্ন নামে এসব চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন সময় মিডিয়াতে এর কিছু কিছু প্রতিবেদন দেখাও যায়।

সুতরাং যে সমস্যাগুলোকে মানসিক সমস্যা হিসেবে দেখাই হয় না, সেসব বৈজ্ঞানিক পরিসংখ্যানে কীভাবে আসবে? আরো একটি জরুরি কথা বলা দরকার, মানসিক রোগের কারণে অনেক সময় বিভিন্ন শারীরিক উপসর্গ দেখা যায়। সমস্যাগ্রস্ত মানুষটি বা তাঁর আত্মীয়-স্বজন শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়ার পর হয়ত তাকে কোনো একজন ডাক্তারের কাছে যান, দুঃখের বিষয় হলো সেই অবস্থায় অসুস্থ মানুষটি বেশিরভাগ সময়ই আর সঠিক পথটি আর খুঁজে পান না। তাঁরা জানতেও পারেন না, তাঁরা মানসিক রোগে ভুগছেন। ফলে অনিবার্যভাবেই তাঁদের সমস্যাও দূর হয় না, ভোগান্তিও কমে না; বরং বাড়তে থাকে। মিডিয়া, বিভিন্ন ফোরাম, এনজিও, বিশ্ববিদ্যালয়, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, প্রফেশনাল সংগঠন, সোশ্যাল মিডিয়ার কার্যক্রম এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সরকারিবেসরকারি, ব্যক্তিগতসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণা সত্যেও, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা এখন পর্যন্ত যথাযোগ্য জায়গায় পৌঁছে গেছে বলে দাবি করা যায় না। ব্যক্তি মানুষের অন্তর্গত চিন্তা, সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন, সঠিক তথ্যের সরবরাহ, সর্বোপরি ঠিক ঠিক জায়গায় সঠিক বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি।

মানসিক স্বাস্থ্য শুধু রোগশোকের ভেতরই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিদিনের মন ভালো রাখার জন্য ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিকসহ বিভিন্ন পর্যায়ে নানামুখী কলাকুশল বা কার্যক্রম চালানোও এর অন্তর্ভুক্ত। ইন্টারনেটের বদৌলতে অনেককিছুই অনেক সহজলভ্য এখন। গান শোনা, আড্ডা দেয়া, ঘুরতে যাওয়াসহ, কার মন কীভাবে ভালো রাখা যায় সেসব সম্পর্কেও মানুষ ধারণা পেয়ে যায় সহজেই। বিপত্তি বাঁধে কার জন্য কোনটি প্রয়োজন সেটি নির্ধারণে। কোনোটি হয়ত অসুখের জন্য অর্থাৎ চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন আবার কোনোটি হয়ত স্বাভাবিক মনের জন্য প্রযোজ্য; কিন্তু কোনটি কখন প্রযোজ্য সেটি নির্ধারণে বিপত্তি তৈরি হয়। ভালো থাকার জন্য, আরো ভালো থাকার জন্য আর অসুস্থ না হওয়ার জন্য এক ব্যবস্থা প্রযোজ্য নয়। যেমন এক নয় চিকিৎসা আর স্বাভাবিক ভালো থাকার পদ্ধতি। মনের খবর প্রতিনিয়ত সেই কাজটি করার চেষ্টা করছে। কীভাবে সহজে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগুলি গ্রামে-গঞ্জে, শহরে সবখানে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া যায় সেই ইচ্ছা নিয়েই প্রতিদিন কাজ করছে। বলতে দ্বিধা নেই, শুরুতে যতটা কষ্ট বা ভয় ছিল, ধীরে ধীরে সেটা কমে আসছে। অনেকের বা অনেক সংগঠনের সরাসরি সহযোগিতা এখন আমরা পাই। পাঠক থেকে শুরু করে, কর্মী, লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা, গ্রাহক সবার কাছে মনের খবর কৃতজ্ঞ। সকলের সহযোগিতায় শুধু পরিসংখ্যানগতই নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের প্রকৃত ছবি উঠে আসবে, সেইসঙ্গে থাকবে সঠিক সমাধানের পথ খুঁজে নেয়ার কৌশল।

সূত্র: মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিন, ১ম বর্ষ, ১১ তম সংখ্যায় প্রকাশিত।