আচরণগত আসক্তি কী এবং কত প্রকার 1

আচরণগত আসক্তি কী এবং কত প্রকার

আবীর একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী সন্তান। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করা ও ভালো কলেজে ভর্তি হতে পারা উপলক্ষে বাবা-মা একটা স্মার্টফোন কিনে দিলেন। অনেকদিনের আবদার ছিল তার। টাকা-পয়সার সমস্যা আর পড়ালেখায় ক্ষতি হবে ভেবে এতদিন দেয়া হয়নি। এতদিন পরে কাঙ্ক্ষিত মোবাইল পেয়ে আবীর খুব খুশি। প্রথম দিন তার কাছে মনে হলো, সে যেন হাতে আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে। মোবাইলে নতুন বন্ধুদের সাথে কথা বলা তো আছেই। ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলল, জিমেইল, আরো কত কিছু! আছে ভিডিও দেখা, ‘টিকটক’ এর ভিডিও তৈরি, শেয়ার করা, ‘লাইক’ ‘কমেন্টে’র জন্য অপেক্ষা! দিনের অধিকাংশ সময়ই, মানে যখন একটু সময় পাওয়া যায়, কেটে যায় এসবের পেছনে। বাবা-মা প্রথমে কিছুই বলেননি। ভাবলেন মাস কয়েকের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু, মাস ছয়েকের পরও যখন কিছুই ঠিক হলো না, বরং বেড়েই চলেছে; তখন তারা বাধা দিতে লাগলেন। শুরু হলো খটমট, বিরক্ত হওয়া, রাগ করে জিনিসপত্র ভাঙা। মোবাইল কেড়ে নেয়া হলো একদিন। আবীর নিজেও চেষ্টা করল শক্ত থাকতে, মোবাইল এড়িয়ে চলতে। কিন্তু তার কাছে মনে হতে লাগল দুনিয়াটা যেন রংহীন, ফাঁকা ফাঁকা, কিছুই ভালো লাগে না, জীবনধারণের কোনো অর্থই খুঁজে পাচ্ছে না আর। শেষ পর্যন্ত না পেরে আবারো ঝগড়াঝাটি করে মোবাইলটা হাতে নিয়ে শান্ত হলো সে।

কিছুদিনের মধ্যেই বন্ধুদের সহায়তায় সে খুঁজে পেল ইন্টারনেটে পর্নের নীল জগতের সন্ধান। শুরুতে তেমন আগ্রহ ছিল না। কিন্তু মোবাইলে শুধুই স্বাভাবিক ভিডিও দেখা, ফেসবুকে চ্যাট করা একঘেয়ে লাগতে থাকায় উত্তেজনার খোঁজে ঝুঁকে পড়ল নীল দুনিয়ায়। কিছুদিনের মধ্যেই যৌনতা তাকে পেয়ে বসে। চলতে ফিরতে, শয়নে-স্বপনে মাথায় শুধু একই চিন্তা আর কল্পনা। বিপরীত লিঙ্গের কাউকে দেখলেই মনে তৈরি হতে থাকে বাজে কল্পনার জাল। অবস্থা এমন হলো, মেয়েদের নিয়ে ভালো কিছু ভাবাই যেন কঠিন হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু এখানেও সেই একই সমস্যা। একই ধরনের কল্পনা বেশিদিন ভালো লাগে না, পানসে লাগে। তাই চিন্তাভাবনাগুলো দিনে দিনে বিকৃত হতে থাকে। যা কিছু যত অসম্ভব, যত বেশি পীড়াদায়ক অন্যের জন্য, সেটাই তত বেশি উত্তেজনা জাগায় মনে। এমনকি সেটা নিজের জন্য বিপদজনক কিছু হলেও, ধরা পড়লে মানসম্মান সব যাবে জেনেও সে বের হয়ে আসতে পারে না এই জাল থেকে।

সব কিছুরই সীমা আছে, সবকিছুই শেষ হয়ে আসে একদিন। আবীরের জীবনে ঘটে যায় এমন এক অদ্ভুত ঘটনা। টিকটকের এক ভিডিও দেখতে গিয়েই প্রেমে পড়ে যায় এক সহপাঠিনীর। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া, বিত্তবান বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ের প্রেমে পড়ে সে। ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা বারণ করে তাকে। কিন্তু আবীর মানতে নারাজ। নিজের মনেই প্রতিজ্ঞা করে, সিনেমার সেই চিরাচরিত কাহিনিকে সে বাস্তবে রূপ দিয়ে দেখাবেই। ওদিকে মেয়েটি তাকে ঠিক ভালোবাসে না। কিছুটা পছন্দ করে আবীরের জোরাজুরিতে। অবশ্য এরকম একটা প্রেমে অন্ধ, স্তাবক পর্যায়ের প্রেমিক পেলে কিছুটা ভালো লাগতেই পারে। আবীরের সারাদিনের বেশি সময়ই কাটে তার মানসীর চিন্তায় চিন্তায়, তাকে নিয়ে বিভিন্ন কল্পনায়। তার ছবি দেখে, তাকে মেসেজ দেয়, আর কিছুক্ষণ পরপরই ফোন দেয়। মেয়েটি প্রথম প্রথম ধরত। কিন্তু, বিরক্ত হতে হতে এখন আর ফোন ধরে না বললেই চলে। মাঝে মাঝে ধরে, মন ভালো থাকলে দুয়েকটা কথা বলে, নয় তো ঝাড়ি দিয়ে কেটে দেয়। তাতেও খুশি হয় আবীর। বন্ধুরা তাকে কটাক্ষ করে আবীর না ডেকে ‘দেওয়ানা’, ‘আশিক’ ডাকলেও তার ভালো লাগে। আজকে এই গিফট কালকে ওই গিফট নিয়ে হাজির হয় মেয়েটির কাছে। বড়োলোকের মেয়ে, তাই গিফটও হয় বেশ দামি দামি। কিন্তু মোবাইলের খরচ, গিফটের খরচ সব মিলিয়ে বিশাল ধাক্কা। প্রাইভেটের টাকা, মায়ের কাছ থেকে হাত পেতে নেয়া কিংবা রাগারাগি করে টাকা আদায় করেও হিমশিম খেতে থাক আবীর। এমনই একদিন এক বন্ধুর কাছে হাত পাতলে সে দেখিয়ে দেয় বিনা পুঁজিতে হাজার হাজার টাকা আয়ের পথ-জুয়া।

টাকার প্রয়োজনে কিছুদিন পরে আবীর পা বাড়ায় জুয়ার আসরে। টাকার বিনিময়ে তাস খেলে প্রথমে টাকা হারাতে থাকে। তবু বন্ধু ভরসা দেয়। সেও খেলাটা ববুঝতে চেষ্টা করে। সত্যিই কিছুদিন পরেই সে জিততে থাকে। প্রথমে অল্প অল্প দান, পরে দানের মাত্রা বাড়তে থাকে। জিততে জিততে আর আশেপাশের জুয়াড়িদের কাছ থেকে বাহবা পেতে পেতে, আত্মবিশ্বাস উঠে যায় তুঙ্গে। তাই মাস কয়েক পরে হারতে শুরু করলেও গা করে না। এর মধ্যে কয়েকদিন জিতে যায়, বাকি দিন নিয়মিত হারতে থাকে। ধার করে জুয়া খেলে, আবার ধার পরিশোধ করতে জুয়া খেলে। মনে এখন একটাই চিন্তা, ধারগুলো শোধ হয়ে গেলেই ছেড়ে দেবে এই জুয়া। তাসের পাশাপাশি ‘আইপিএল’ এর খেলা নিয়েও চলে জুয়া। ব্যাটসম্যান চার মারবে, না ছয়, নাকি আউট হয়ে যাবে-সবকিছু নিয়েই চলে আইপিএলের জুয়া। দিনে দিনে আরো ধারের অতলে ডুবে যেতে থাকে সে। এবার পাওনাদাররা চাপ দিতে থাকে। একদিন বাড়িতে গিয়ে হাজির হয় আর অনেক ঝামেলা-হাঙ্গামা শেষে হুমকিধামকি দিয়ে বিদায় নেয় তারা। আবীরের বাবামা বুঝতে পারেন কী এক অন্ধকার জগতের সাথে জড়িয়ে গেছে তাদের আদরের আবীর। তাকে ভর্তি করে দেয়া হয় এক রিহ্যাব সেন্টারে। আর ধারদেনা শোধ করা হয় কোনোমতে। রিহ্যাব থেকে ফিরে আসে আবীর একদিন। কিন্তু, সেই আগের আবীর নয়-নিঃস্ব, রিক্ত এক আবীর। যে আবীরের জীবনের তাল কেটে গেছে, ভেঙে গেছে একতরফা প্রেম। যে আবীর পড়ালেখায় অনিয়মিত, সমাজে অপাঙ্ক্তেয়, বাবার বিরক্তির কারণ। শুধু মা’ই এখনো চোখের জল ফেলে আবীরের মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে। মায়ের সে কান্নায় মিশে থাকে মধ্যবিত্তের স্বপ্নভঙ্গের বেদনা আর অপত্যস্নেহ।

মানুষের মানসিক কর্মকান্ডের যা কিছুই দৃশ্যমান হয় তাকেই বলা হয় আচরণ। এই আচরণের অবশ্যই কোনো না কোনো কারণ থাকে, আরো গভীরভাবে বললে কোনো একটা চিন্তা থাকে। এই চিন্তা যদি কোনো একটা দুষ্টচক্রে আটকে যায় তবে দেখা যাবে একজন মানুষ সেই একই আচরণ বারবার করছে। শত অসুবিধা বা ক্ষতির শিকার হওয়া সত্ত্বেও এই আচরণ বারবার করাকেই বলা চলে আচরণগত আসক্তি।

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এইসব আচরণগত আসক্তি বিভিন্নভাবেই অনেকটা মাদকাসক্তির মতোন। যেমন : এর পেছনের কারণ, মস্তিষ্কের দায়ী অংশগুলো, চিকিৎসার প্রতি সংবেদনশীলতা এরকম প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রেই ঠিক মাদকাসক্তির মতো ঘটনা ঘটে। যদিও আচরণগত আসক্তি নিয়ে বিজ্ঞানীমহলে বিভিন্ন মতামত আছে, তবু বেশ কিছু ধরনের আচরণগত আসক্তি চিহ্নিত করা হয়েছে। এসবের মধ্যে জুয়ায় আসক্তিকে The Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders, Fifth Edition (DSM-5) সম্প্রতি সংযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া আরো যেসব বিষয়কে আচরণগত আসক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলো হলো-যৌন আসক্তি (Sex Addiction), খাবার আসক্তি (Food/Eating Addiction), ইন্টারনেট আসক্তি (Internet Addiction), কেনাকাটায় আসক্তি (Compulsive Buying Addiction), ভালোবাসার আসক্তি (Love Addiction), ব্যায়াম আসক্তি (Exercise Addiction) প্রভৃতি।

শুনতে মনে হতেই পারে এগুলো সব সাধারণ বিষয়, আসক্তি হবে কীভাবে? আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের এইসব আচরণগুলো যখন বিভিন্নভাবে অস্বাভাবিক ধরনের হয়ে পড়ে তখনই তাদেরকে সাধারণত আসক্তি হিসেবে নির্দেশ করা হয়। বিতর্ক সত্ত্বেও এই অস্বাভাবিকতাগুলো মোটামুটি অনেকটা এই রকম-এইসব বিষয়ে দিনের অধিকাংশ সময় ব্যয় হয়, জীবনের নানা ক্ষেত্রে ক্ষতি হতে থাকে, নিত্যনতুন পদ্ধতিতে অথবা সময় বৃদ্ধি করতে হয় পূূর্বের মতো উত্তেজনা পেতে, মাঝেমধ্যেই এসব ছেড়ে দেয়ার অসফল কিছু চেষ্টা থাকে, ছেড়ে দিতে গেলে খুব অস্থিরতা বা বিরক্তিতে ভোগে, মানসিকভাবে অবসাদে ভুগলেই এসবে জড়ায়, এসব কিছুই গোপন রাখার চেষ্টা করে যতটুকু সম্ভব বা যতদিন সম্ভব, এগুলোর কারণে সম্পর্ক বা চাকুরি বা অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রচুর ক্ষতির শিকার হন। দিনে দিনে এই ধরনের আসক্তির পরিমাণ বেড়েই চলেছে। একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে, আমাদের দেশের তরুণ সমাজ আজ মোবাইলে আসক্ত, ইন্টারনেটে আসক্ত। বারবার এবং কিছুক্ষণ পরপর ফেসবুকটা একটু চেক করে দেখা খুবই প্রচলিত। বিশ্বজুড়েও একই সমস্যা।

গবেষকদের মধ্যে ভিন্নমত থাকলেও, একটা গবেষণায় দেখা গেছে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে জুয়ায় আসক্তির মাত্রা ০.১% থেকে ২.৭% পর্যন্ত, যেটা আবার কলেজ পড়–য়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৭.৮৯%। আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, কিশোর বয়সীদের মধ্যে ইন্টারনেটে আসক্তির মাত্রা ৪.০% থেকে ১৯.১% এবং ভিডিও গেমে আসক্তির মাত্রা ৪.২% থেকে ২০.০%। অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ইন্টারনেট এবং ভিডিও গেমে আসক্তির মাত্রা যথাক্রমে ০.৭% থেকে ১৮.৩% এবং ১১.৯%। মাদকাসক্তির মতোই এসব আচরণগত আসক্তিতেও নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা, সুখী জীবন। অনেক সময়, আচরণগত আসক্তির লোকেরা ঝুঁকে পড়ছে মাদকের মরণনেশায়। সেইসঙ্গে ভুগতে হচ্ছে নানাবিধ মানসিক জটিলতায়, মানসিক অসুখে; এমনকি আত্মহত্যার মতো পরিণতিতে। নষ্ট হচ্ছে ব্যক্তিজীবন, জটিলতা তৈরি হচ্ছে পারিবারিক-সামাজিক জীবনে, আর রাষ্ট্র পাচ্ছে দক্ষ জনশক্তির স্থলে বোঝাস্বরূপ কিছু জনগোষ্ঠী। তাই সময় এসেছে সতর্ক হবার। আপনার পরিবারেই আগে চোখ রাখুন, আপনার পরিবারের কোনো সদস্যের স্বাভাবিক আচরণগুলো কি পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে আচরণগত আসক্তিতে? পরিবর্তিত হয়ে যাবার আগেই হস্তক্ষেপ করুন। প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। তাহলেই শুধু সম্ভব আচরণগত আসক্তির ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া।

ডা. পঞ্চানন আচার্য্য। স্থায়ী ঠিকানা চট্টগ্রাম। তবে, কলেজ শিক্ষক মায়ের চাকুরিসূত্রে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কেটেছে শৈশব। মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হন পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবং উচ্চ-মাধ্যমিক চট্টগ্রাম কলেজ থেকে। সিলেট এম. এ. জি. ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ থেকে এম.বি.বি.এস পাসের পর সরকারি চাকুরিতে যোগদান করেন। মেডিক্যালে পড়ার সময় থেকেই মনোরোগ নিয়ে পড়ার প্রতি আগ্রহ। তাই, ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্ধারিত সময়ের চাকুরি শেষে ভর্তি হন মনোরোগবিদ্যায় এম.ডি(রেসিডেন্সি) কোর্সে। বর্তমানে তিনি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। বংশপরম্পরায় প্রাপ্ত শিক্ষকতার ধারা বজায় রেখে চিকিৎসক ও শিক্ষক হওয়াটাই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। বই, সঙ্গীত আর লেখালেখিতেই কাটে অবসর সময়ের বেশির ভাগ। স্বপ্ন দেখেন - মেধা ও মননশীলতার চর্চায় অগ্রগামী একটা বাংলাদেশের।