আচরণগত আসক্তি ও এর চিকিৎসা 1

আচরণগত আসক্তি ও এর চিকিৎসা

ফেসবুক, সেলফি, ইন্টারনেট, শপিং, খেলায় বাজি ধরা আমাদের সামাজিক জীবনে আজ খুবই পরিচিত অনুষঙ্গ। কিছু মানুষ ব্যস্ত মোবাইলে, কেউ বা কেনাকাটায় আবার কেউ বা সেলফিতে। প্রশ্ন হতে পারে, মানুষের এই আচরণগুলো কি আসক্তি? আসুন দেখি আসক্তির সংজ্ঞা কী বলে-আসক্তি হচ্ছে এমন কর্মকান্ড যা মানসিক, শারীরিক বা সামাজিকভাবে হানিকারক এবং ক্ষতিকর জেনেও অপ্রতিরোধ্য আকাঙক্ষার কাছে পরাস্ত হয়ে ব্যবহারকারী তার পুনরাবৃত্তি ঘটায়।

ডায়বেটিস, হাঁপানি বা উচ্চরক্তচাপের মতোই আসক্তি এমন একটি রোগ যা বারবার ফিরে আসে। শুধু মাদক জাতীয় দ্রব্যের অপব্যবহারই আসক্তি নয়, বরং যেকোনো কিছুর অপব্যবহার থেকে হতে পারে। যেমন : জুয়া খেলা, কেনাকাটা অথবা ইন্টারনেট আসক্তি। আসক্তি শুধু একটি খারাপ আচরণ নয়, এটি একটি মস্তিষ্কের ব্যাধি। লাখ লাখ লোক সকালে ঘুম থেকে উঠেই প্রথম যে কাজটা করেন তা হলো ফোন চেক করে দেখা। কেউ ফোন করল কিনা বা নতুন কোনো ম্যাসেজ আসল কিনা বা ফেসবুকে তার স্ট্যাটাসে কয়টা কমেন্ট বা লাইক পড়ল তা দেখতে উদগ্রীব হয়ে থাকেন অনেকেই। শিশুদের ক্ষেত্রেও তাই। পুরোনোগুলোর সাথে নতুন কোনো ভিডিও গেমস বা মোবাইলে নতুন কোনো গেমস আসল কিনা সেই ভাবনা দিয়েই যেন সকালটা শুরু হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভিডিও গেমসে আসক্তিকে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার তালিকাভুক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোগব্যাধির শ্রেণিবিন্যাসের তালিকায় এই আসক্তিকে গেমিংরোগ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর ইদানীং যোগ হয়েছে সেলফি তোলা এবং আইপিএল, বিপিএল নিয়ে জুয়া খেলার রমরমা ব্যাবসা। শুধু আইপিএল-বিপিএল নয়, জুয়া খেলা অনেক কিছু দিয়েই হতে পারে। জুয়া খেলে সর্বস্বান্ত হয়েছেন এমন মানুষ কিন্তু আপনার আশেপাশে খুঁজলেই পাবেন। আর তাই এখন জুয়া খেলাকে আসক্তির শ্রেণিবিন্যাসে গ্যাম্বলিং ডিজঅর্ডার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

স্মার্টফোনের এই যুগে সেলফি তোলাটা যেন একটা ফ্যাশন। আর এই ফ্যাশন এখন কারো কারো ক্ষেত্রে আসক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যে আসক্তি হতে পারে বিপজ্জনক। গত কয়েক বছরে সেলফি তুলতে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনা চোখে পড়ার মতো। এই মাধ্যমগুলোর অতিরিক্ত ব্যবহারে দিনদিন ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে থাকে, মেজাজ খিটখিটে হতে থাকে। এতে কাজকর্ম, পড়াশোনা, খেলাধুলা ও অন্যান্য সৃজনশীল কাজকর্ম ব্যাহত হয়। এজন্য ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার ফল ভালো হয় না, দিনদিন সবকিছুতে মনোযোগের ঘাটতি হতে থাকে, কাজের চাপ বেড়ে যেতে থাকে। শিশুদের ক্ষেত্রে অল্প বয়সে এর ব্যবহারে মানসিক ও সামাজিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

মিডিয়া-আসক্তি আমাদেরকে পরিবার ও সমাজ থেকে দিনেদিনে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এরই ধারাবাহিক পরিণতিতে মানুষের সঙ্গে মানুষের স্বাভাবিক যোগাযোগ ক্রমশই কমে যাচ্ছে। সেইসঙ্গে যাদের পর্ণগ্রাফিতে আসক্তি তাদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক যৌনজীবন বাধাগ্রস্ত হয়। শুধু তাই নয়, অন্যান্য নেশাদ্রব্যের মতো এই আচরণগুলো থেকে বের হতে গিয়েও দেখা দেয় বিপত্তি। এসবের ব্যবহার থামাতে গেলেই শুরু হয় অস্থিরতা, মেজাজের ওপর পড়ে নেতিবাচক প্রভাব, ঘুমের সমস্যা বেড়ে যেতে থাকে এমনকি দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতার মতো মানসিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

আসক্তি থেকে বের হওয়ার পথে দেখা দেওয়া এসব সমস্যাকে বলে উইথড্রয়াল সিম্পটম। সুতরাং দেখা যাচ্ছে গাঁজা, ইয়াবা যেমন আসক্তি তৈরি করে অর্থাৎ খেলেও সমস্যা না খেলেও সমস্যা তেমনি মানুষের এই আচরণগুলো আসক্তি তৈরি করে যাকে আমরা বলি আচরণগত আসক্তি। পিল তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, নেশা শুধু কোনো দ্রব্যে হয় না, এটা কোনো আচরণ থেকেও হতে পারে। যেমন : মিডিয়া, খাবার, কেনাকাটা, খেলা বা যৌন আসক্তি। এই দুই ধরনের আসক্তিই মস্তিষ্কের ডোপামিন সিস্টেমের ওপর কাজ করে যদিও আচরণগত আসক্তিগুলো সরাসরি ডোপামিনের ওপর কাজ করে না। আসক্ত ব্যক্তি এর সম্ভাব্য ক্ষতির ব্যাপারটা বুঝতে পারলেও সেই আচরণ অব্যাহত না রেখে পারেন না। নেশাদ্রব্য ছাড়া যতটা কঠিন, মিডিয়া-আসক্তি ছাড়াও কিন্তু ততটাই শক্ত, কেননা মিডিয়ার ব্যবহার তো সর্বত্র।

আসক্তি একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং বারবার ফিরে আসা সমস্যা। আসক্তি মস্তিষ্কে পরিবর্তন ঘটায় বলেই এর প্রতি ব্যক্তির প্রবল ইচ্ছা তৈরি হয়। তাই শুধু মনের জোর হলেই আসক্তি মুক্ত হওয়া যায় না। এর জন্য অনেক কষ্ট সহ্য করতে হতে পারে। আসক্তি থেকে মুক্তি পেতে সময় লাগে। প্রথমদিকে হয়ত কষ্ট হবে, কিন্তু হাল ছেড়ে দেয়া যাবে না। বেশিরভাগ মানুষ ভাবেন যে, চিকিৎসা শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। কিন্তু সুস্থ হয়ে ওঠা অতটা সহজ নয়, যেহেতু নেশার মতোই এই আচরণগুলো ছাড়ার পরে উইথড্রয়াল সিম্পটমস হতে পারে, এর জন্য তীব্র আকাক্সক্ষা অনুভ‚ত হতে পারে এবং ব্যক্তি আবার সেই আচরণগুলো শুরু করতে পারেন। এক্ষেত্রে ঔষধের ব্যবহারে ব্যক্তি এসব আচরণ করার প্রবল ইচ্ছে ওউইথড্রয়াল সিম্পটমসকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারে। সেইসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সাইকোথেরাপি বা কাউন্সিলিংয়ের প্রয়োজন হয়, যেমন : বিহেভিয়র থেরাপি, কগনেটিভ বিহেভিয়র থেরাপি, গ্রুপ থেরাপি ইত্যাদি। এসব থেরাপির ক্ষেত্রে রোগীর আসক্তির পেছনে কারণগুলো খুঁজে দেখা হয়, কোনো চাপ বা অশান্তি ছিল কিনা তা দেখা হয়, একইসঙ্গে আসক্তির পেছনে তার নিজের কোনো ভুল ব্যাখ্যা থাকলে তা সংশোধনের উপায় সম্পর্কে বলা হয়।

তবে শুধু এসব আচরণ সাময়িকভাবে ছেড়ে দেওয়া যথেষ্ট নয়, ব্যক্তি যেন সারাজীবন এর প্রতি আর আসক্ত না হন সেইজন্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুনর্বাসন খুবই জরুরি, যেমন-জুয়ার প্রতি আসক্তি। পুনর্বাসনের মাধ্যমে ব্যক্তি সেইসব পরিস্থিতির সাথে মোকাবিলা করতে শেখেন যার কারণে তিনি এসব আচরণের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন। এতে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রিত করতে শেখানো হয়। অন্যান্য মানসিক রোগের মতো, এই সমস্যার শুধু একটি কারণ হয় না। এর পেছনে অনেকগুলো পারিপার্শ্বিক এবং জিনগত কারণ থাকে। তাই আসক্তির সাথে লড়াই করতে প্রিয়জনদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

যদি আপনার সন্দেহ হয় যে, আপনার প্রিয়জন কোনো ধরনের আচরণে আসক্ত হয়ে পড়ছেন তাহলে আপনি লক্ষণগুলি চিহ্নিত করুন এবং তার সঙ্গে তার ব্যবহারের পরিবতর্ন নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করুন। তার আচরণের তির্যক সমালোচনা করবেন না। সমস্যার বিষয়ে ভালো করে জানুন। এতে আপনি বুঝতে পারবেন আপনার প্রিয়জনের কষ্টের কথা এবং তাকে সাহায্য করার উপায়ও খুঁজে বের করতে পারবেন। এগুলো ছাড়াও যে সুন্দরভাবে জীবনযাপন করা যায় সেই বিষয়ে তাকে আশ্বাস দিন। বলুন যে, আপনি সবসময় তার পাশে রয়েছেন। তাকে এই  পরিস্থিতির জন্য দোষারোপ না করে উৎসাহিত করুন। দৃঢ়ভাবে বলুন, কিন্তু অযথা চাপ সৃষ্টি করবেন না। পারিবারিক বা দলভিত্তিক থেরাপিতে তার সাথে যোগ দিন, চিকিৎসা পরবর্তী নতুন আচারআচরণের মূল্যায়ন করুন, সেইসঙ্গে তার জন্য ভবিষ্যৎপরিকল্পনা করুন।

মনে রাখবেন, সবার সুস্থ হয়ে ওঠার গতিপথ সমান নয়। কেউ কত তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবেন তা নির্ভর করে তিনি কতদিন ধরে, কোন ধরনের আচরণে আসক্ত, চিকিৎসা-পদ্ধতি সঠিকভাবে মেনে চলছেন কিনা, পরিবার আসক্তিমুক্ত হতে কতটুকু সাহায্য করছে ইত্যাদির ওপর।

মনে রাখতে হবে, নিজেকে বদলানোর দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে। একটি মজবুত সম্পর্কের প্রয়োজন এক্ষেত্রে খুবই বেশি, কিন্তু শুধু সেই ব্যক্তির অনুপ্রেরণা যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন পরিবার আর বন্ধুবান্ধবদের সহযোগিতা এবং কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ। আপনি যদি বুঝতে পারেন আসক্তির জন্য আপনার জীবনে সমস্যা হচ্ছে তাহলে আপনি সাহায্য চেয়ে নিন আর সুস্থ জীবনে ফিরে আসুন। আপনি নিজে যদি আসক্তিমুক্ত হতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হন তবে কোনো বাধাই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।

সূত্র: মনের খবর, মাসিক ম্যাগাজিন, ২য় বর্ষ, ৬ষ্ঠ সংখ্যায় প্রকাশিত।

ডাঃ ওয়ালিউল হাসনাত সজীব। জন্ম ১০ই জুন। পৈত্রিক নিবাস দিনাজপুরে হলেও বাবা-মা এর চাকুরিসূত্রে জন্ম ও শৈশব ঢাকার অদূরে সাভারে। সাভার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও ঢাকা কলেজ হতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্ব সমাপ্তির পর ভর্তি হন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে। সেখান থেকে এম.বি.বি.এস পাসের পর সরকারি চাকুরিতে যোগদান করেন ২০১০ সালে। ২০১৩ সাল হতে বিএসএমএমইউ এর মনোরোগবিদ্যা বিভাগে এম.ডি (রেসিডেন্সি) কোর্সে অধ্যয়নরত। মেডিকেলে পড়ার সময় থেকেই মনোরোগ নিয়ে পড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। ভালবাসেন বই পড়তে, ঘুরে বেড়াতে। অবসর সময়ের বেশির ভাগ কাটে গান শুনে, সিনামা দেখে। ইচ্ছে আছে মানসিক রোগ নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করতে, ইচ্ছে আছে অটিস্টিক চাইল্ডদের মানসিক সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করার।