সেল্ফ হার্ম

ডেলিভারেট সেল্ফ হার্ম: অন্তর্নিহিত মানসিক যন্ত্রণার লক্ষণ

ডেলিভারেট সেল্ফ হার্ম: অন্তর্নিহিত মানসিক যন্ত্রণার লক্ষণ

এক.

“অনামিকা চৌধুরী কে নিয়ে তার মা এসেছেন সাইকিয়াট্রিস্ট এর চেম্বারে। সাথে বড় ভাই এসেছে কিন্তু ভাইয়ের সামনে সব বলা যাবে না তাই ভাইকে তারা বাহিরে বসিয়ে এসছেন। অনামিকা বেশ ক’দিন যাবৎ মাথাব্যথা আর অঘুমায় কাটাচ্ছে। পড়াশোনায় খুবই ভালো ছিলো কিন্তু ইদানীং তার একাডেমিক পারফরম্যান্স খুব কম। মাথা ব্যথার পাশাপাশি অনামিকার মা তার আরো একটি অদ্ভুত আচরনের কথা জানালেন।

অনামিকা সামান্য বিষয় নিয়ে মাঝেমধ্যে খুব রাগারাগি করে, আসবাব পত্র ভাংচুর করে। অনেক সময় ঘরের দরজা লাগিয়ে বসে থাকে। আসলে বসে থাকলে বললে ভুল হবে। সে তীব্র রাগ দমাতে, বা মন খারাপ কমাতে ধারালো ব্লেড দিয়ে নিজেই নিজের হাত কাটে। গত মাস কয়েক থেকে এই কাটাকাটি শুরু। অনামিকা প্রথমে আঘাতের দাগ গুলো দেখায় নি। কিন্তু তার মা অনেকটা জোর করেই দেখালে। হাতের বাহু থেকে কব্জি পর্যন্ত অনেকে গুলো কাটা দাগ। প্রায় পঞ্চাশ টির মতো হবে। এগুলো সে নিজেই ব্লেড দিয়ে কেটেছে। মাঝেমধ্যে ওরনা দিয়ে গলায় ফাঁস ও দেবার চেষ্টা করেছে। বেশ করে ঘুমের ঔষধ ও খেয়েছে। এসব তাই বড় ভাই মোটেই জানেন না। জানলে আরো বেশি রাগারাগি বা ভয়ানক কিছু হয়ে যাবে। তাই তাকে তারা বাহিরে রেখে এসেছেন।

অনামিকার আচার আচরণ ভালো ঠেকছে না। ইদানীং সে খাচ্ছেও না ঠিকমতো। তাই শুকিয়ে যাচ্ছে। মায়ের কাছে অনামিকার এ সব আচরণ স্বাভাবিক ঠেকছে না। কেনো অনামিকা এসব করে? কি হচ্ছে তার মনের ভিতর”।

উপরে যে রুগীটির কথা বললাম সেই রোগের নাম হলো ডেলিভারেট সেল্ফ হার্ম। আসুন এ রহস্যময় রোগ নিয়ে সামান্য জানার চেষ্টা করি। এই সেল্ফ হার্ম রোগ কিন্তু প্রায়ই তরুণ তরুণীদের মধ্যে দেখা যায়।

দুই.

সেল্ফ হার্ম বা ডেলিভারেট সেল্ফ হার্ম কি? সেল্ফ হার্ম হলো নিজেই নিজেকে আঘাত করা। তীব্র মানসিক যন্ত্রনা মুক্তি পেতেই নিজেই নিজের হাত, বুক ব্লেড বা চাকু দিয়ে কাটাই ডেলিভারেট সেল্ফ হার্ম। রোগী সেল্ফ হার্ম এ যদিও তীব্র মানসিক যন্ত্রনা কিছুটা উপশম পায় তথাপি মানসিক যন্ত্রণা খানিকক্ষণ পর আবারও ফিরে আসে। রোগী আবার ব্লেড হাতে নেয় আবারও কাটে। অনেকটা অবসেসিব ইম্পালসিভ ডিসওর্ডার এর মতো, একই কাজ বার বার করা। স্বল্পতর মানসিক রোগীরা সেল্ফ হার্ম করে তবে তারা আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে এ আঘাত করে না, তবুও দূর্ঘটনা বশত এমন ঘটে যেতে পারে।

কি কি ভাবে সেল্ফ হার্ম হয়? সেল্ফ হার্ম কেবল বাহুতে ব্লেড দিয়ে কাটা নয়, যদি বেশির সেল্ফ হার্মে আঘাতের দাগ পাওয়া যায় হাতে। তবে সেল্ফ হার্ম আরো অনেক ভাবে হতে পারে। যেমন:

১) বুক বা পেটের চামড়ায় ব্লেড দিয়ে কাটা ২) দেয়ালে হাত দিয়ে বা মাথা দিয়ে আঘাত করা, অনেকটা বাংলা সিনেমার নায়কের মতো। ৩) হাত বা আংগুল আগুন দিয়ে ঝলসে দেয়া ৪) নিজেই নিজের নখ উপড়ে ফেলা ৫) গলায় ওরনা পেঁচানো, ফাঁস দেবার চেষ্টা, ৬) মাত্রাতিরিক্ত ঔষধ খেয়ে ফেলা ৭) বিষাক্ত দ্রব্য, ক্যামিক্যাল খেয়ে ফেলা ৮) খাবার দাবার খাওয়া বন্ধ করে দেয়া বা অতিরিক্ত খাবার খাওয়া।

এ কাজ গুলো রোগী একাকী করে, কখনো কারো সামনে নয়। অটিস্টিক বেবী ছাড়া। এরা আঘাতের স্থান সবসময় আড়াল করে রাখে। জিগ্যেস করলে এড়িয়ে চলে। মাঝেমধ্যে সেল্ফ হার্ম ভয়াবহ হতে পারে, হতে পারে জীবন নাশ। তাই কারো হাতে মুখে গায়ে ছোট ছোট কাটার দাগ দেখলে অথবা সেল্ফ হার্ম পেলে অবশ্যই তার সাথে এনিয়ে কথা বলতে হবে।

সেল্ফ হার্ম মানেই অন্তর্নিহিত মানসিক যন্ত্রণার লক্ষণ। সেল্ফ হার্ম তীব্র মানসিক যন্ত্রনার দৈহিক ভাবে প্রকাশ করা লক্ষণ। কেউ যদি তীব্র মানসিক অবসাদে বা কষ্টে ভোগে, ইমোশনাল আনস্টেবল থাকে তাহলে এ অদ্ভুত ও ধ্বংসাত্মক কাজের মাধ্যমে সে কিছুটা উপশম পায় বলেই সে এমন করে। তবে আশ্চর্য হলো এতে তার ব্যথা অনুভত হয়না।

সেল্ফ হার্ম কাদের হয়? কিছু কিছু সামাজিক, পারিবারিক টানাপোড়েন থেকে রোগী সেল্ফ হার্ম করতে থাকে। যেমন কারো সাথে সম্পর্ক খারাপ হওয়া, স্কুলের পারফরম্যান্স খারাপ হওয়া, শারিরীক মানসিক ভাবে নাজেহাল অপমান অপদস্ত হওয়া, যৌন হয়রানির শিকার হওয়া, নিদারুণ অর্থকষ্টে পড়া, প্রতারিত হওয়া, মাদকাসক্ত হওয়া ইত্যাদি।

এ সকল ঘটনা রোগীর মনে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। সে এ থেকে মুক্তি পথ খুঁজে পেতে ব্যার্থ হয় এবং ক্ষনিকের উপশম পেতে সে সেল্ফ হার্ম করতে থাকে। তীব্র মানসিক যন্ত্রনার সময় করে বলে রোগী নিজেকে আঘাতের সময় মোটেই ব্যাথা পায় না বা ব্যথা অনুভব করে না। মানসিক যন্ত্রণা সামান্য কমলে তখন দৈহিক যন্ত্রনা বা ব্যাথা টের পেতে থাকে। রোগী তখন ভাবে একাজ বা আঘাত আমি কেনো করতে গেলাম। নিজে নিজেই ব্যান্ডেজ দেয়।

ডেলিভারেট সেল্ফ হার্ম কিছু কিছু মানসিক রোগীদের মধ্যেও দেখা যায় যেমন: বাইপোলার মুড ডিসওর্ডার, স্কিজোফ্রেনিয়া, এনজাইটি ডিসওর্ডার, ডিপ্রেসিভ ডিসওর্ডার। কিছু কিছু পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার এ দেখা যায় যেমন: এন্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, বডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার

সেল্ফ হার্মের পাশাপাশি রোগীর আরো কিছু সমস্যা থাকে যেমন কানে আলগা আওয়াজ পাওয়া, কেউ আঘাত করার জন্যে কানে কানে নির্দেশ শোনা, নিজেকে অর্থহীন অপাংক্তেয় ভাবা ইত্যাদি।

তাদের ব্যক্তিত্বের সমস্যার পাশাপাশি মানিয়ে নেবার ক্ষমতা কম থাকে। যেকোন কিছুতেই উত্তেজিত হবার প্রবণতা থাকে প্রবল। তীব্র ইমোশনালও আনস্টেবিলিটি থেকে রক্ষা পেতে রোগী সেল্ফ হার্ম করে।

সেল্ফ হার্ম ও সুইসাইড

সুইসাইডের উদ্দেশ্যে সেল্ফ হার্ম না করলেও অনেক সময় দুর্ঘটনা বশত সেল্ফ হার্মের জন্যে সুইসাইড হয়ে যায়। শতকরা ৪০ থেকে ৬০ ভাগ সুইসাইড কেইস স্টাডি করলে তাদের অতীতে সেল্ফ হার্মের ইতিহাস পাওয়া যায়। সবচেয়ে বেশী সেল্ফ হার্ম দেখা যা ১২ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে। কিশোর তরুণ থেকে কিশোরী বা তরুণীদের মধ্যে সেল্ফ হার্ম বেশী। অনেক সময় বয়ষ্কদের মধ্যে সেল্ফ হার্ম দেখা যায়।

সেল্ফ হার্ম সাধারণত দেহের এমন জায়গায় করে যা সহজে কারো চোখে পড়ে না। এমন কি রোগী সেটা ঘুরিয়ে রাখার চেষ্টা করে। চরম ব্যথা থেকে মুক্তি পেতেও সেল্ফ হার্ম করে অনেকে। অটিস্টিক বাচ্চারাও অনেক সময় সেল্ফ হার্ম করতে থাকে। সেল্ফ হার্ম শুধুমাত্র মানবজাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কিছু কিছু জীবজন্তুর মধ্যেও সেল্ফ হার্ম দেখা যায়।

ডা. সাঈদ এনাম সাইকিয়াট্রিস্ট ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা