দক্ষিণ এশিয়ায়

দক্ষিণ এশিয়ায় মানসিক স্বাস্থ্য বনাম শারীরিক স্বাস্থ্য

দক্ষিণ এশিয়ায় মানসিক স্বাস্থ্য বনাম শারীরিক স্বাস্থ্য

এই ২০১৯ সালে এসেও ‘মানসিক স্বাস্থ্য’ কথাটাই যখন অনেকের কাছে নতুন তখন বিভিন্ন মানসিক অসুস্থতার বহিঃপ্রকাশ যে যথাযথভাবে ঘটবে না তা সহজেই অনুমেয়। মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা নিয়ে আমাদের সাধারণ জ্ঞানের ঘাটতিই শুধু এর জন্য দায়ী নয় বরং সমাজ-সংস্কৃতিও এক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

উদাহরণস্বরূপ, আমাদের এই উপমহাদেশের (দক্ষিণ এশিয়ায়) দিকে তাকালেই বোঝা যায়, এখানে শারীরিক সুস্থতার জন্য যে স্বাস্থ্যব্যবস্থা বা স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন জ্ঞান, ডাক্তারের কাছে চিকিৎসার জন্য যাওয়া, ইত্যাদির জন্য জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে নানারকম কর্মসূচির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছুতে হয়েছে। কারণ মানুষের মধ্যে রোগ-বালাই নিয়ে কুসংস্কার, প্রচলিত ধারণা ইত্যাদি মানুষকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে চিকিৎসা নেয়া থেকে বিরত রাখত। সে অবস্থা থেকে অনেকাংশে উন্নতি সম্ভব হলেও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন কিংবা মানসিক অসুস্থতা যে একটা রোগ কিংবা সমস্যা যার জন্য ডাক্তার দেখানো দরকার সেটা এখনো অনেকেই জানেন না।

কারণ তারা অনেকেই মানসিক সমস্যার ধরন, প্রকাশ ইত্যাদি সম্পর্কে সন্দিহান থাকেন এবং একটা ধারণা মনে থাকে যে, ‘মন খারাপ লাগছে’ বা ‘ভালো লাগে না’ বললে সেটা অত গুরুত্ব পাবে না। কিন্তু শারীরিক সমস্যার কথা যদি বলা হয় যেমন : দুবর্ল লাগছে, মাথা ঘোরায়, পেট জ্বলে, মাথা শরীর জ্বালাপোড়া করে তাহলে তা গুরুত্বের দাবি রাখে। আবার সমাজ-সংস্কৃতির বিভিন্নতার জন্যও একই প্রকারের মানসিক সমস্যার বিভিন্ন রকম বহিঃপ্রকাশ হতে পারে অর্থাৎ এটা নির্ভর করে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চারপাশের পরিবেশ, সংস্কৃতি, শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর।

ব্রিটেন প্রবাসী দক্ষিণ এশীয় নারীদের নিয়ে একটি গবেষণায় উঠে এসেছে যে, তারা শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখেন এবং মানসিক অসুস্থতার প্রকারভেদ সম্পর্কেও ধারণা আছে। কিন্তু তারা মানসিক সমস্যা, চাপ বা অসুস্থতাকে যেভাবে বর্ণনা করেন তাতে তাদের নিজস্ব ভাষাগত কিছু পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন : ভয় লাগে বা অস্থির লাগে বোঝাতে বুক ধড়ফড় করে, মন খারাপ বোঝাতে পরাণে অশান্তি লাগে ইত্যাদি। এগুলো ব্রিটেনের ইংরেজি ভাষাভাষী নাগরিকদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

সমাজ বিজ্ঞানীগণ এবং নৃতাত্ত্বিকগণ বিভিন্নভাবেই মানসিক স্বাস্থ্য এবং মানসিক অসুস্থতা বিশেষভাবে বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশনের সঙ্গে এর প্রকাশভঙ্গির সম্পর্ক নির্ণয় করার গবেষণা করেছেন। মানুষ জীবনযাপনে কীভাবে মানসিক চাপ বা দৈনন্দিন আবেগের তারতম্য প্রকাশ করতে অভ্যস্ত তার ওপরও নির্ভর করে মানসিক সমস্যার প্রকাশভঙ্গি। কিন্তু সাউথ এশিয়ান (প্রবাসী) মহিলাদের মধ্যে এই গবেষণায় দেখা গেছে যে, ভালো না লাগা, দীর্ঘমেয়াদি বিষণ্ণতার মতো অনেক মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হলেও এগুলোকে তারা মানসিক অসুস্থতা হিসেবে চিহ্নিত করতে চান না এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না। কিন্তু এর ফলে মাথাব্যথা, ঘুমের সমস্যা হলে সেটিকে তারা গুরুত্ব দেন।

গবেষকরা উপসংহার টেনে জানিয়েছেন যে, দক্ষিণ এশিয়ায় নারীদের মধ্যে একটা প্রবণতা আছে মানসিক চাপকে শারীরিক সমস্যা হিসেবে প্রকাশ করার। এর চারটি কারণ তাঁরা উল্লেখ করেছেন : মানসিক সমস্যাকে চিহ্নিত করতে না পারা। মানসিক এবং শারীরিক সুস্থতা যে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সেটি বুঝতে না পারা। যেকোনো মানসিক সমস্যাকে শারীরিক উপায়ে প্রকাশ করার প্রবণতা। সচরাচর যে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের জন্য ডাক্তারের কাছে যান সেখানে মানসিক সমস্যার কোনো উপস্থাপন সাধারণত হয় না।

দক্ষিণ এশিয়ায় পাঞ্জাবি মহিলাদের মধ্যে গবেষণায় মন খারাপ কিংবা ভালো না লাগাকে কিছু মহিলা এভাবেও বর্র্ণনা করেছেন যে, বুকের মধ্যে অশান্তি লাগে এবং তারা শারীরিকভাবে কোনো হার্টের অসুখে ভুগছেন এমনটা ভাবছেন। কেউ কেউ বলেছেন এটা তাদের ভাগ্য। আবার কেউ কেউ এই অনুভূতিকে ব্যক্ত করেছেন তার সামাজিক অবস্থান দিয়ে যেমন : কাছের কোনো পরিবারের সদস্যের অনুপস্থিতি। একজন বলেছেন , এরকম অশান্তি বা দুশ্চিন্তা মাধ্যমেই হার্ট অ্যাটাক হয় এবং এই পাঞ্জাবি মহিলারা কেউই ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা বলেননি এবং এরা কেউই এ সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হননি।

তাদের নিজস্ব ভাষায় মানসিক চাপ বা সমস্যার কথা বলেছেন এভাবে-আমার হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে গেছে, দম বন্ধ লাগে, মাথা ফেটে যাচ্ছে, শরীর জ্বলে যাচ্ছে, সকালে উঠে মনে হয় বুকে কোনো ভারী পাথর চেপে বসে আছে, দুর্বল বা কমজোর লাগে। কেউই মন খারাপ বা কিছু ভালো লাগে না একথা বলেননি। শুধুমাত্র একজন বিষণ্ণতাকে একটি অসুখ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সবকিছু নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা মাথায় আসা যা দৈনন্দিন জীবনকে ক্ষতির মুখে ফেলে দেয় সেটা নিয়েও তাদের ধারণা ছিল সীমিত। তারা এটাকে মানসিক সমস্যা না বলে মনে করেন যে এটা কোনো ঘটনার (লাইফ ইভেন্ট) সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এসব সমস্যা কোনো ডাক্তার চিকিৎসা করবেন ঔষধ দিয়ে এটা নিয়ে তাদের বিশ্বাস ছিল না বললেই চলে।

শিক্ষা, পরিবেশ, সংস্কৃতি, পেশা এবং অন্যান্য কারণে মানসিক চাপ বা সমস্যার বিভিন্নরকম প্রকাশ থাকতেই পারে কিন্তু সেটাকে যদি শারীরিক অসুস্থতা মারফতই প্রকাশ করা হয় তবে মানসিক স্বাস্থ্যের অনেক বিষয়েই সাধারণ মানুষের কাছে অজানা থেকে যাবে। তাই এর জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা তৈরি করা, মানসিক স্বাস্থ্যের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে জাতীয় থেকে মাঠ পর্যায়ে কাজ করা, যা এখন অনেকখানিই করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে আরো উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন যেন মানুষ তাদের মানসিক সমস্যাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারে।

Reference: Sociology of Health & Illness Vol. 18, No. 1, 1996, ISSN 0141-9889, pp. 66-85 Culture, relativism and the expression of mental distress: South Asian women in Britain Steve Fenton and Ayra Sadiq-Sangster Department of Sociology, University of Bristol

** মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিন, ২য় বর্ষ, ২য় সংখ্যায় প্রকাশিত।