শিশুদের ওসিডি অভিভাবকেরই দায় বেশি

শিশুদের ওসিডি অভিভাবকেরই দায় বেশি

অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার অথবা বাংলায় আমরা যাকে শুচিবাই বলে থাকি এটি আসলে এক ধরনের মানসিক রোগ। সাধারণত শুচিবাই বলতে শুধু আমরা অতিরিক্ত পরিষ্কারপরিচ্ছন্নতাকেই বোঝাই আর ভাবি এটা মনে হয় শুধু মহিলাদেরই হয়। কিন্তু এই ধারণাটি পুরোপুরি সত্যি নয়। শুচিবাই রোগে নারী-পুরুষ যে কেউ আক্রান্ত হতে পারে এমনকি শিশুরাও। যদিও আমাদের ধারণা শিশুদের মন! তার আবার মানসিক রোগ! কিন্তু বড়োদের মতো শিশুরাও এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

২০০৯ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) যৌথভাবে একটি জরিপ চালায়। তাতে দেখা যায়, বাংলাদেশে ১৮.৪ শতাংশ শিশু বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যায় ভুগছে। এর মধ্যে ১.৩ শতাংশ হলো শুচিবাই বা ওসিডি। সাধারণত এই সমস্যা ২৫ বছর বয়সের মধ্যেই শুরু হয়। অনেকের ক্ষেত্রে শৈশব, কৈশোর কিংবা যৌবনের শুরুতেও সমস্যার সূত্রপাত হতে পারে। স্কুল বা কলেজ পড়ুয়া শিশুদের মধ্যে ওসিডি বা শুচিবাই সমস্যাটি থেকে গেলে পরবর্তীতে অনেক অসুবিধা হতে পারে।

অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার বা শুচিবাই কী?

বারে বারে একই চিন্তা আসা ও সে অনুযায়ী একই কাজের পুনরাবৃত্তির প্রবণতাকে অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার বা শুচিবাই বলা হয়। অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডারের লক্ষণ অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার সাধারণত দুটি ভাগে বিভক্ত। ভাগগুলো হলো-

১. অবসেশন (Obsession) এটি আসলে একই ধরনের চিন্তা যা ক্রমাগত আসতে থাকে, যদিও রোগী বুঝতে পারে এ চিন্তা অহেতুক, অপ্রয়োজনীয়। এ ধরনের চিন্তা থেকে সে মুক্তি চায়, অস্থিরতায় ভোগে কিন্তু চিন্তা দূর করতে পারে না। অবসেশনের রকমভেদ-

  • Dirt & Contamination: পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও জীবাণু নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা আসে, এর ফলে বারবার হাত ধুতে হয়, গোসলে অনেক সময় লাগে। কারো কারো গোসলে তিন-চার ঘণ্টাও সময় লাগে।
  • Aggression: রোগীর মাথায় কাউকে আঘাত করার চিন্তা আসতে থাকে যদিও রোগী বুঝতে পারে তার এ চিন্তা অস্বাভাবিক কিন্তু তারপরও এ চিন্তা মাথা থেকে সরাতে পারে না।
  • Sex : Sexনিয়ে অশ্লীল আজেবাজে চিন্তা আসে, অশ্লীল ছবিও চোখে ভাসতে পারে।
  • Religion: ধর্মের বিরুদ্ধে, সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে অশ্লীল চিন্তা আসতে থাকে।
  • Orderliness: সবকিছু একদম সূক্ষাতিসূক্ষ গুছিয়ে রাখার প্রবণতা।
  • Illness: কোনো রোগ হলে সেই রোগ নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তা করা।
  • কোনো কিছু বারবার স্পর্শ করার চিন্তা।
  • সবসময় খারাপ কিছু ঘটবে এই চিন্তা আসা।
  • শুভ-অশুভ সংখ্যা ইত্যাদি।

২. কম্পালসন (Compulsion)

Obsession: অথবা একই চিন্তা অনুযায়ী যে কাজটি বারবার করতে হয় তা হচ্ছে Compulsive act। কম্পালসনের প্রকারভেদ-

Cleaning: বারবার হাত ধোয়া। অনেক সময় ১০০ বারও হতে পারে।

Cheking: একই জিনিস বারবার পরীক্ষা করা, যেমন-পরীক্ষার খাতায় বারবার রোল নম্বর চেক করা।

Counting: একটি কাজ নির্দিষ্ট সংখ্যক বার করা যেমন-তিন, তের এমনকি তেত্রিশ বার পর্যন্ত করতে পারে।

Dressing: একইরকমভাবে জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখে, এলোমেলো করলে অস্বস্তি বোধ করে

Hoarding: অপ্রয়োজনীয় জিনিস জমিয়ে রাখা।

একই প্রশ্ন বারবার করা ইত্যাদি।

ওপরের লক্ষণগুলো বড়োদের মতো শিশুদের ক্ষেত্রেও হতে পারে কিন্তু শিশুরা তাদের চিন্তাকে এত গুছিয়ে প্রকাশ করতে পারে না তাই বেশিরভাগ সময় তাদের আচরণের ওপর ভিত্তি করেই রোগ নির্ণয় করা হয়ে থাকে। এছাড়া এই রোগের কারণে শিশুদের মনোযোগ কমে যেতে পারে, পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হতে পারে। আমাদের দেশে বাবা-মায়েরা সাধারণত ছেলেমেয়েদের রেজাল্ট খারাপ হলেই মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হন। তারা মনে করেন, ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করতে চায় না অথবা মনোযোগ দিচ্ছে না। তাদের রেজাল্ট যাতে খারাপ না হয় বা তারা যেন মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করে, সেজন্যই বাবা-মায়েরা বিশেষজ্ঞের দ্বারস্থ হন। দীর্ঘদিন ধরে আক্রান্ত শিশু শারীরিক যেমন-অতিরিক্ত ধোয়া-মোছার ফলে হাতের চামড়া খসখসে হওয়া, চর্মরোগ, ঘুমের সমস্যা, বুক ধড়ফড় করা, খাবারে অনীহা ইত্যাদিতে আক্রান্ত হয়ে যখন মেডিক্যাল বিশেষজ্ঞ বা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়, তখনই রোগের কারণ খুঁজতে গিয়ে তা বেরিয়ে আসে। কিন্তু ওসিডির কারণেই যে ঐ শিশুর এমনটা হচ্ছে, তা বুঝতে চান না অনেক অভিভাবক। অনেক সময় রোগী নিজে তার সমস্যা বুঝতে পারে না, তাই তার পরিবার এবং আশেপাশের মানুষ যখন বুঝতে পারে তার এই সমস্যা তখন থেকেই তার সাথে যথেষ্ট বন্ধুসুলভ আচরণ করতে হবে, পরিবারের লোকজনের সহযোগিতাই এখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। ব্যাপারটিকে ছোটো করে না দেখে তাকে সুস্থ করে তোলার দিকে মনোযোগী হতে হবে। অধিকাংশ সময়ে সঠিক পদ্ধতিতে চিকিৎসার অভাবে এই রোগ ভয়াবহ পর্যায়ে চলে যায়।

ওসিডি একটি দীর্ঘমেয়াদি মানসিক রোগ। চিকিৎসার মাধ্যমে এর উপসর্গগুলোকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অনেক রোগীর জন্য ঔষধ, আবার কারও জন্য কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি বা আচরণগত চিকিৎসা পদ্ধতিতে ভালো ফল পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ঔষধ এবং কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি একসঙ্গে প্রয়োগ করলে রোগীর উপকার বেশি হয়।

সূত্র: মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিন, ২য় বর্ষ, ৮ম সংখ্যায় প্রকাশিত।

ট্যাগ্স: