মূল পাতা / মন ও ক্রীড়া / মাঠ থেকে ডিভাইস: মানসিক বিস্তার নাকি বিকলাঙ্গতা

মাঠ থেকে ডিভাইস: মানসিক বিস্তার নাকি বিকলাঙ্গতা

প্রকৃতির আলিঙ্গন ছেড়ে আজ আমরা প্রযুক্তির পদতলে, যার প্রভাবে প্রভাবিত বড় থেকে শিশু। ১৯৭৬ এ স্টিভ জবস স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন কম্পিউটারের। ১৯৭৮-এ বাজারে আসে ভিডিও গেমস। ’৮০-এর দশকের জনপ্রিয় ভিডিও গেমস ‘স্পেসওয়ার’ হয়ত অনেকেই খেলেছেন। আর ‘মোস্তফা’ ভুলে গেছেন কি? এরপর ব্ল্যাকবেরি প্রথম দেখিয়েছিল স্মার্ট ফোনের ব্যবহার। আজ ২০১৮-তে এসে বিশ্বে সেই স্মার্টফোন ব্যহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২.৫৩ বিলিয়ন। শুধু ফোনকল আর বার্তা পাঠানোতে যার সীমা নির্ধারিত ছিল সেই সীমা ছাড়িয়ে গেছে যখন এর সাথে যুক্ত হলো ইন্টারনেট সুবিধা। আর এই সুবিধা সহজ করতে বড় হতে থাকল এর আকার। তাতেও যাদের পোষাল না তাদের হতাশায় আশা নিয়ে এলো ট্যাব, আর যাই হোক ল্যাপটপ নিয়ে তো আর সারাদিন ঘোরা যায় না। সত্যিই তো, কত কম সময়ে দূরদূরান্তের খবর চলে আসছে হাতের মুঠোয়, যার সঙ্গে কথা বলছেন তাকে আবার দেখছেনও; সময় কাটাতে খেলতে পারছেন, ব্রাউজ করতে পারছেন; হারিয়ে গেছেন তো কী হয়েছে, রাস্তা চিনিয়ে দেবে গুগল ম্যাপ।

ছোট থেকে বড়, গ্রাম কী শহর, সবাই আজ মগ্ন এতে। যারা একসময় ঘরকে সামলাত মন দিয়ে তারাও আজ এতে আসক্ত। শুধু কি তাই, বাড়ির বড় এলইডি টিভির জমজমাট আয়োজনে সময়টা ভালোই কাটে আজকাল। মোবাইল, ট্যাব, টিভি, ল্যাপটপ, ভিডিও গেইমস, ব্লুটুথ কত কী। ডিভাইসের ছড়াছড়ি। নতুন নতুন মডেলের, নতুন নতুন পরিসেবা নিয়ে হাজির হচ্ছে আমাদের সামনে। আপনি, আমি প্রায় সবাই আমরা মজে আছি এতে। আমাদের দেখে শিশুরাও আজ এতে আসক্ত হয়ে পড়ছে।

আমাদের সমাজে শিশুদের মাঝে দিনে দিনে এ সমস্যা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। হবেই না বা কেন? সন্তান যখন বাবা-মার কাছে পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছে না, বাইরে খেলার স্থান দিনে দিনে ছোট হয়ে আসছে, খেলার সময়ে প্রাইভেট টিউটর দিয়ে তাকে ব্যস্ত রাখছেন, তার ছোট ছোট জেদ, আবদারগুলোকে ঝামেলা মনে করে তা থেকে পরিত্রাণ পেতে মোবাইল হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন, মাঝে মাঝে পুরস্কার হিসেবেও যখন একটি ডিভাইস তার হাতে দিচ্ছেন তখন একবারের জন্য হলেও ভেবে দেখেছেন ঠিক হচ্ছে কিনা? এসব ডিভাইস ব্যবহার করার জন্য আপনার ছোট শিশুর মনটি প্রস্তুত ছিল না। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তার শরীর ও মনে। অনেক সময় বয়ঃসন্ধির সমস্যা, স্কুলের চাপ, বন্ধুদের চাপ, বিশৃঙ্খল বা কঠোর পারিবারিক পরিবেশ মোকাবেলা করতে অনেকেই এসব ডিভাইসের আশ্রয় নেয়। বাবা-মা অনেক সময় এই আসক্তির ব্যাপারটা বুঝতেই পারেন না, যতক্ষণ না বাচ্চার আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। একবার গেইমস খেলা শুরু হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেয়, একই সঙ্গে চলছে বন্ধুদের সাথে চ্যাটিং ও গেমস খেলা। বিকেলে বাইরে খেলতে যাওয়ার সময়ই! কী এক নেশার জালে জড়িয়ে যায় সে। বড় হতে হতে অস্থির, জেদি, অসামাজিক একটা মানুষে পরিণত হয় সে। স্কুলে ভর্তি হলে দেখা যায় ঠিকমতো স্কুলে যেতে চায় না, পড়ালেখায় মনোযোগ কমে গেছে, শিক্ষকের কথা ফলো করতে পারছে না। খাবার টেবিলেও চুপচাপ থাকে, খেতে চায় না, কারো সঙ্গে মিশতেও পারছে না, ঠিকমতো কথা বলতে পারছে না, বাসায় আত্মীয়-স্বজন কেউ আসলে তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে তেমন একটা আগ্রহ বোধ করে না। মাঠে-ঘাটে না খেলার কারণে তারা স্বাভাবিকের চেয়ে অধিক ওজনের অধিকারীও হয়ে থাকে। কারণ এতে শারীরিক পরিশ্রম কমে যায়। ডিভাইসের সঙ্গে সময় কাটাতে কাটাতে একসময় ঘাড় আর কোমরের হাড়ে সমস্যা হয়। বিভিন্ন ডিভাইস থেকে আসা নীল আলো আমাদের রেটিনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। হেডফোন ব্যবহারে আমরা শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলতে পারি। ডিভাইসের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে মস্তিষ্কের ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে।

যে মানসিক প্রশান্তির জন্য এসব ডিভাইস ব্যবহার করছি এসব ডিভাইস কিন্তু আমাদের মানসিক অশান্তিরও কারণ হতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায় মোবাইল ফোন মনের ওপর চাপ তৈরি করে, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় এমনকি তরুণদের মধ্যে বিষণ্ণতার কারণ হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৬ ভাগ মানুষ ঘুমানোর আগে মোবাইল ফোন চেক করে। ঘুমের পূর্বে ডিভাইস নিয়ে সময় কাটানোয় তাদের পরিপূর্ণ ঘুম হয় না। ফলে তারা সকালে ঘুম থেকে উঠে সতেজ অনুভব করার বদলে ক্লান্তি অনুভব করে ও তাদের মনোযোগের ঘাটতি দেখা দেয়।

সান ডিয়াগো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজির প্রফেসর জেন এম টয়েন দেখিয়েছেন যে মোবাইল ফোনের অতি ব্যবহারে মানুষ বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয়। তাছাড়া এর অতি ব্যবহারে দুশ্চিন্তাজনিত সমস্যাও দেখা দিতে পারে। ভিডিও গেমসের উত্তেজনায় শিশুর মধ্যে ডোপামিন ও এড্রেনালিন হরমোনের নিঃসরণ বাড়ায় যা মাদকদ্রব্য গ্রহণের ফলে যে মাত্রায় এই হরমোন নিঃসরণ ঘটায় তার প্রায় সমান। একটানা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা মাদকাসক্তির মতোই একটি শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। মোবাইলে আসক্তি বা নোমোফোবিয়ায় আক্রান্তদের মধ্যে দেখা যায় মোবাইলের কাছ থেকে দূরে থাকলে তারা চিন্তিত হয়ে পড়ে ও অস্থিরতায় ভোগে, কোনো কাজে বা কথায় মন দিতে পারে না, বারবার চেক করে কেউ কল দিল কিনা, ফেসবুকে কতগুলো লাইক পড়ল বা কেউ এসএমএস করল কিনা। ফোন না থাকলে নিজেকে একা মনে করে ও একসময় হতাশ হয়ে পড়ে।

গবেষণায় দেখা যায় ৪৩ ভাগ মানুষ মোবাইল ফোন সাথে না থাকলে দুশ্চিন্তায় ভোগে। অত্যধিক ব্যবহারের ফলে একটা সময় আসে যখন ডিজিটাল ডিভাইস থেকে বের হয়ে আসা কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। নেশাদ্রব্যের মতোই এর দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহার একে অভ্যাসে পরিণত করে। একপর্যায়ে দিনের একটা বড় অংশই এর পেছনে ব্যয় করে যা ব্যক্তির কর্মক্ষমতা ও সৃজনশীলতাকে হ্রাস করে। না ব্যবহারে যে অস্বস্তি হয় তা থেকে পরিত্রাণ পেতে দিনকে দিন এর ব্যবহার বেড়ে যায় ও একসময় পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পরে এর ওপর। ধীরে ধীরে তা শিশু বা ব্যক্তির মানসিক অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তার চিন্তা, কাজ ও অনুভূতিকে প্রভাবিত করে, আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, একা থাকার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয় ও তাকে নিঃসঙ্গ করে ফেলে। সমাজ ও পরিবার থেকেও সে অনেকটা একা হয়ে পরে তখন। বর্তমান যুগে প্রযুক্তিকে বাদ দিয়ে কিছু করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু এর ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তাকে ডিভাইস দিয়ে শারীরিক ও মানসিক বিকলাঙ্গ না বানিয়ে ঘরের বাইরের জগতে বের করে আনুন। তাকে ডিভাইস না দিয়ে খেলতে দিন, দৌড়াতে দিন। একসময় এত এত ডিভাইস ছিল না, মানুষ প্রকৃতি থেকেই অজস্র খেলনা বানিয়ে খেলেছে। গ্রামে সে সুযোগটা এখনো কিছুটা থাকলেও শহরে বেড়ে ওঠা শিশুটির সে সুযোগ নেই বললেই চলে। তবুও তাকে সাধ্যমতো খেলার পরিবেশ ও পর্যাপ্ত সময় দেবার চেষ্টা করতে হবে।

সময়োপযোগী নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও সর্বোপরি এসব ডিভাইসের মাধ্যমে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। তবেই তার সুন্দর বিকাশ ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

সূত্র: মনের খবর, মাসিক ম্যাগাজিন, ১ম বর্ষ, সংখ্যা-৯

ডাঃ ওয়ালিউল হাসনাত সজীব। জন্ম ১০ই জুন। পৈত্রিক নিবাস দিনাজপুরে হলেও বাবা-মা এর চাকুরিসূত্রে জন্ম ও শৈশব ঢাকার অদূরে সাভারে। সাভার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও ঢাকা কলেজ হতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্ব সমাপ্তির পর ভর্তি হন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে। সেখান থেকে এম.বি.বি.এস পাসের পর সরকারি চাকুরিতে যোগদান করেন ২০১০ সালে। ২০১৩ সাল হতে বিএসএমএমইউ এর মনোরোগবিদ্যা বিভাগে এম.ডি (রেসিডেন্সি) কোর্সে অধ্যয়নরত। মেডিকেলে পড়ার সময় থেকেই মনোরোগ নিয়ে পড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। ভালবাসেন বই পড়তে, ঘুরে বেড়াতে। অবসর সময়ের বেশির ভাগ কাটে গান শুনে, সিনামা দেখে। ইচ্ছে আছে মানসিক রোগ নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করতে, ইচ্ছে আছে অটিস্টিক চাইল্ডদের মানসিক সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করার।