মূল পাতা / মন প্রতিদিন / ভার্চুয়ালের আমি আর বাস্তবের আমির মাঝে আকাশ পাতাল তফাৎ

ভার্চুয়ালের আমি আর বাস্তবের আমির মাঝে আকাশ পাতাল তফাৎ

সমস্যা: আমার বয়স ২১ বছর। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়ছি। সমস্যার কথা কোথা থেকে যে শুরু করবো বুঝতেই পারছি না। এটা নতুন না, সবসময়ই এমন সিদ্ধান্ত শূন্যতায় ভুগি। তাই প্রত্যেকটা কথা, কাজ আর ভাবনার জন্য আমায় পরে প্রচণ্ড অনুশোচনা করতে হয়। সবসময় শুধু মনে হয়, কেন এ কথা বললাম, না বললেও পারতাম, অন্যভাবে বলা উচিত ছিল, কেন এ কাজ করলাম, কেনই বা এ কথা ভাবলাম; অনুতাপের আগুনে দগ্ধ হয়ে, রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে মরে যেতে ইচ্ছে করে।
কারো মামুলি কথাও কখনো কখনো ভীষণ পীড়া দেয় আমায়, আর কটু কথা বললে তো উপায়ই নেই, একদম মুষড়ে পড়ি। কারো সাথেই সহজে মিশতে পারি না, কথা বলতে পারি না, সবসময় একটা ভয়, সংকোচ, সিদ্ধান্তশূন্যতা আর আফসোসের আবর্তে আটকে আছি। আমি সবসময়ই চাই, কেউ যেন আমার কথায় কষ্ট না পায়, কিন্তু অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাউকে না কাউকে ঠিকই কষ্ট দিয়ে ফেলি, অন্তত আমার তা-ই মনে করি। যা আমার রাতের ঘুম হারাম করে দেয়। তাই নিজেকে একেবারে নিজের ভেতর কচ্ছপের মতো গুটিয়ে রাখি। সবসময় ডিপ্রেশনে থাকি। কেন ডিপ্রেসড থাকি, কি নিয়ে আমি এত ডিস্টার্ব তার কিছুই খুব একটা স্পষ্ট নয় আমার কাছে। কোনো দায়িত্ব বা বাধ্যবাধকতা একদমই ভালো লাগে না। মেসে থাকি, সিঙ্গেল রুমে। একা থাকতেই বেশি ভালো লাগে। দিনের আলো ভালো লাগে না। তাই দিনের বেলাতেও ঘর অন্ধকার বানিয়ে রাখি। ভালো লাগে শুধু ভূতের মুভি দেখতে আর অনলাইনে সময় কাটাতে।
ভার্চুয়ালে কিন্তু আমি ভীষণ এক্সট্রোবার্ট, সহজেই কথা দিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করে ফেলতে পারি। ভার্চুয়ালের আমি আর বাস্তবের আমির মাঝে লোকে আকাশ পাতাল তফাৎ দেখে, দেখাটাই স্বাভাবিক হয়তো। ভীষণ খুঁতখুঁতে মন আমার। কেমন খুঁতখুঁতে তা একটু পরিষ্কার করি, প্রতি রাতেই আমার ঘুমোতে যাওয়ার আগে অন্তত আধঘণ্টা প্রস্তুতির প্রয়োজন পড়ে। রুমের লাইট ফ্যানসহ সকল সুইচ বন্ধ আছে কিনা, বাথরুমের ট্যাপ বন্ধ আছে কিনা, সদ্য কেনা বইটা ঠিক জায়গায় রেখেছি কিনা তা বারবার চেক করতে হয়, তবুও বিশ্বাস হয় না, ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে হয়। শোয়ার পর যদি কখনো আবার মনে হয় হয়তো কোনো সুইচ অন আছে, ব্যস বিছানা ছেড়ে উঠে ওটা চেক না করে উপায় নেই, শান্তি নেই, ঘুম আসবে না। আবার ধরুন, কখনো মনে হয় কোনো একটা কথা চারবার বলতে হবে, কোনো জায়গায় চারবার টোকা দিতে হবে, নয়তো আমার প্রিয়জনদের কারো ক্ষতি হবে। এই চারের চক্কর থেকে অবশ্য বেরিয়ে এসেছি অনেকদিন হলো। কিন্তু মনে হলেই হলো, না মেনে উপায় নেই।
আমার চালচলনে অনেকে আমায় ভীষণ অহংকারী ভাবে, এমনকি কেউ কেউ ডাক্তার দেখানোরও পরামর্শও দিয়ে বসে; বিশেষ করে আমার সহপাঠীরা। ওদের এই ভ্রান্ত ধারণাই আমার সবচে’ খারাপ লাগে, ইনফেরিওর কমপ্লেক্সিটি আরো বাড়িয়ে দেয় বোধহয়। আমি প্রাণপণে চেষ্টা করেও মানুষের এই ভুল ধারণা দূর করতে পারি না। Ego শব্দটা আঁঠার মতো কতকাল ধরে যে লেগে আছে আমার সাথে বলা মুশকিল। কারো সাথেই সহজে সহজ হতে পারি না। কথা বলতে গেলেই মনে হয় সব উলটপালট হয়ে যাচ্ছে, যা বলতে চাইছি তা হয়তো গুছিয়ে বলতেই পারছি না। যা বলছি, তা নিয়ে হয়তো আবার পরে আফসোস করতে হবে। তাই কারো সাথেই খুব একটা কথা বলি না। আঁতেল ভেবে আমাকেও সকলে এড়িয়ে চলে। কিছু ফোবিয়া আছে। যেমন ধরুন, মেয়েদের ভয় করি প্রচণ্ড। সরাসরি কথা বলা দূরে থাক, ফোনেও কথা বলতে পারি না। ছোট থেকেই আরশোলা জিনিসটা যতটা ঘৃণা করি, ভয় করি বোধহয় তার থেকেও বেশি। নিজের ফটো তুলি না সচরাচর। রাগ হয় নিজের ফটো দেখলে। আমার বিশ্বাস, ভীষণ বিশ্রী উঠে আমার ফটো। খুবই সাধারণভাবে চলাফেরা করি। প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত কোনো কিছুতে খুব একটা আগ্রহ নেই। কেউ কোনো কথার, কাজের বা নতুন পোশাকের প্রশংসা করলে তা এতটাই অতিরিক্ত অতিরঞ্জিত মনে হয় যে, সহ্য করতে পারি না, মনে হয় গুল মারছে, ঠাট্টা করছে।
আমার এখনকার একটা কথা, একটা স্ট্যাটাস একটা লেখা একটু পরেই আদিখ্যেতার মতো লাগে। মাসছয়েক হলো, গোঁদের উপর বিষফোঁড়ার মতো নতুন আরেকটা সমস্যা পয়দা হয়েছে। টুকটাক লেখালেখি করি, শখের লিখিয়ে যাকে বলে। একটা মনস্তাত্বিক গল্পের প্লট মাথায় এসেছিল। গল্পটা ছিল এমন যে, একটা ছেলের বাবা মারা যায়, ডানহাতি ছেলেটা তখন বাঁ হাতে সব কাজ শেখা শুরু করে। কেননা তাঁর বিশ্বাস ছিল, সে যেমন ছোটকালে পরম নির্ভরতায় তার বাবার বাঁ হাত ধরে রাস্তায় হাঁটতো ঠিক তেমনি সবল, শক্তিশালী আর বিশ্বাসযোগ্য হাত তার এখন দরকার; বাবার অবর্তমানে। মোটামুটি এরকমই ছিল কনসেপ্টটা। কিন্তু এটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে এখন দেখছি, তিল তাল হয়ে একেবারে হ্যালুসিনেশন হওয়া শুরু করেছে। রাস্তায় চলার সময় কারো হাত পকেটে বা পেছনে লুকোনো থাকলে মনে হয়, লোকটার হয়তো হাতই নেই। কিন্তু যখনই লোকটা হাত বের করে ভীষণ ভয় পেয়ে যাই। জানি, কথাগুলো অদ্ভুত শোনাচ্ছে। কিন্তু এটাই সত্য। আমার কিছু কিছু লেখা পড়ে কেউ কেউ মন্তব্য করে এই বলে যে, এইরকম অমানুষিক চিন্তা চলতে থাকলে একদিন না একদিন আমি নিশ্চিত পাগল হয়ে। এতদিন আমার এই ইনফেরিওর কমপ্লেক্সিটি ভীষণ শ্লাঘার বা পৈশাচিক আনন্দের ব্যাপার ছিল আমার কাছে। কিন্তু সম্প্রতি নানা মানসিক জ্বালা যন্ত্রণা, চাপ, বিচ্ছিন্নতা, বিতৃষ্ণা, মানুষের অহংকারী মনে করার গ্লানি নিজের প্রতি, নিজের জীবনের প্রতি সত্যিই বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছে। কি করবো, কি করা উচিত কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। কনফিউজড। নিজেকে কেমন বুদ্ধি প্রতিবন্ধীর মতোন লাগে। দক্ষতা নেই, যোগ্যতা নেই, মানুষের সাথে মেশার ক্ষমতা নেই। বেঁচে থাকার কোনো মানেই যেন খুঁজে পাচ্ছি না। নেহাত বেঁচে থাকতে হয় বলেই যেন বেঁচে আছি। মৃত্যু জিনিসটাও ভীষণ ভাবায় আমায়। জীবনটা ভীষণ ছোট মনে হয়। মানুষ কত সহজেই না মরে যায়। এত এত স্বপ্ন সাধ আহ্লাদের যেন দরকারই নেই এই ঠুনকো অনিরাপদ অনিশ্চিত জীবনে। আমি বারবার ভাবি, কোনোদিন যদি ঘুম থেকে উঠে দেখতাম জন্মপূর্বের অন্ধকারে মিলিয়ে গেছি, মিশে গেছি, আমার কোনো অস্তিত্বই নেই, না পৃথিবীতে, না কারো মনে। জন্মের আগে যেমন ছিলাম তেমনি যদি থাকতে পারতাম। কিন্তু আফসোস, সেটা তো আর সম্ভব হচ্ছে না। 
ছাদে উঠলে প্রায়শই রেলিং ধরে নিচের দিকে তাকাই, অনিচ্ছা সত্ত্বেও মাথায় সবসময় একটা চিন্তাই আসে তখন, এখান থেকে লাফ দিলে মরা সম্ভব কিনা। জানি না কেন এমন সব অসংখ্য উদ্ভট চিন্তা সবসময় মাথায় কিলবিল করে আমার। কোনোকিছুর প্রতি একটা অজানা রাগ ক্ষোভ বিদ্বেষের বশে সবসময় আমায় দাঁতে দাঁত চেপে বেঁচে থাকতে হয়। শুধু চিৎকার করতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে হয় প্রচ্চণ্ড এক চিৎকার দিয়ে ধ্বংস করে দিই চারপাশের সবকিছু। বহুকষ্টে নিজেকে সংযত রাখি, সংযত থাকি। কিন্তু আর পারছি না। মনে হচ্ছে শিগগিরই পাগল হয়ে যাবো, নয়তো কোনো অঘটনই ঘটিয়ে বসবো। নিজেকে ভীষণ বিপজ্জনক মনে হয়। আমি নিজেই যেন নিজের শত্রু। আমি তো আমার সমস্যা, আমার হ্যালুসিনেশন বুঝতে পারছি; তবুও কেন এগুলো থেকে এখনো নিস্তার পাচ্ছি না? আর পারছি না…কথাগুলো হয়তো মনমতো গুছিয়ে লিখতে পারিনি, লেখা হয়তো সম্ভবও না। এটা নিয়েও না আবার আফসোস করতে হয়।
পরামর্শ: এত বড় লেখা পড়া এবং উত্তর তৈরি করা কঠিন। আপানার লেখার সবটা জুড়েই আছে আপনার সিদ্ধান্তহীনতা, দোদুল্যমান মনের অবস্থা আর সে কারনে বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে স্লো হয়ে যাওয়া। আপনার বন্ধুরা আপনাকে চিকিৎসার কথা বলেছেন আপনি তাতে রাজি হননি। আবার নিজেই বিষয়গুলিকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তার মানে বন্ধুরা অযৌক্তিক কথা বলেন নি। আপনার উচিত ছিলা আরো আগেই কোন ডাক্তারের সাথে দেখা করা। আপনার সমস্যাটির পিছনের কারণ, হয় আপনি অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজর্ডার (ওসিডি) অথবা অবসেসিভ কম্পালসিভ পারসোনালিটি ডিজর্ডার (ওসিপিডি) এই দুটির যেকোনো একটিতে ভুগছেন। দুটিরই চিকিৎসা আছে। চিকিৎসা না করিয়ে যত দেরি করবেন ততই আপানার ভোগান্তি বাড়বে। আপনার থাইর‍য়েড হরমোন পরিক্ষা করানো দরকার। ওষুধ এবং সাইকোথেরাপি দুই ধরনের চিকিৎসাই আপনার দরকার হবে। আপাতত টেবলেট নেক্সিটাল ৫ মিগ্রা সকালে নাস্তার পর একটা করে খাওয়া শুরু করতে পারেন।
এ বিষয়ে আর কোনো কনফিউশনে না গিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের সাথে দেখা করুন। নিজের যত্ন নিন। ভালো থাকবেন।
মন প্রতিদিন-বিভাগে দৈনন্দিন মনোসামাজিক বিষয়ে কথা বলবেন মনের খবর এর সম্পাদক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এর মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সালাহ্‌উদ্দিন কাউসার বিপ্লব। আপনার কোন প্রশ্ন থাকলে ইনবক্স করুন মনের খবর ফেসবুক পেজে: https://www.facebook.com/monerkhabor/