বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীরা যেখানে স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে এগিয়ে

আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের অর্জন খুব একটা চোখে পড়ার মত নয়। সেখানে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের অবিশ্বাস্য সাফল্য উদাহরণই বলতে হবে। বরং দেশের স্বাভাবিক ক্রীড়াবিদদের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছেন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ক্রিড়াবিদরা। লাল সবুজের এই দেশকে হাত ভরে স্বর্ণ উপহার দিচ্ছেন তারা।

জেনে নিন তাদের এই অসামান্য সাফল্যের পিছনের গল্পটি।

যারা বয়সের তুলনায় মানসিক দিক থেকে বেশ পিছিয়ে ও সমস্যাগ্রস্থ তাদের জন্য দেশের আনাচে কানাচে রয়েছে দুই শতাধিক বিশেষ স্কুল। এই স্কুলগুলোতে বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলা হয়। দেশের বোঝা নয় বরং দেশের নাগরিক ও জনসম্পদে পরিণত করে গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়।

এদের অসাধারণ অর্জনের পিছনে কাজ করছেন ৩০০ জন দক্ষ কোচ ও সংগঠিত দল। তাদেরই একজন হলেন ফারুকুল ইসলাম। বাংলাদেশ স্পেশাল অলিম্পিকের এই জাতীয় পরিচালকের উচ্ছ্বসিত কণ্ঠেই শুনুন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের গড়ে ওঠার গল্প, ‘দেশের ২০০ স্কুলের প্রায় সাত হাজার বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এবং এঁদের ক্রিড়াঙ্গনে নিয়ে আসার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। যার প্রতিফলন হিসেবে বিশেষ অলিম্পিকে দেশের হয়ে কুড়ি কুড়ি পুরস্কার নিয়ে আসে।’

স্পেশাল অলিম্পিক গেমস থেকে তারা প্রতিবারই নিয়ে আসেন ডজন ডজন সোনা, রুপা আর ব্রোঞ্জপদক। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ অলিম্পিকের ছয়টি ডিসিপ্লিনে অংশ নিয়ে ১৮টি স্বর্ণ, ২২টি রুপা ও ১৪টি ব্রোঞ্জপদক জিতে আনেন দেশের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদরা।

এতে করে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের পাশাপাশি তাদের পরিবার তথা সমাজের চিত্রও পাল্টে যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি, ‘ক্রিড়াঙ্গনে ভাল করার মাধ্যমে অভিভাবকসহ সমাজের মধ্যে একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিও তৈরি হয়। এতে করে তাদের মধ্যেও একটি বিশ্বাস জন্মে যায় যে তাদের দিয়ে কিছু হবে। তারাও দেশের নাম উজ্জ্বলে ভূমিকা রাখতে পারে’।

সেই ১৯৯৫ সাল থেকে তাদের এই অর্জন শুরু। সেবার আমেরিকার নিউ হ্যাভেনে অনুষ্ঠিত স্পেশাল অলিম্পিক গেমসে প্রথম অংশ নেন বাংলাদেশের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদরা। ওই আসরে ৬টি স্বর্ণ, ৭টি রুপা ও ৭টি ব্রোঞ্জ। পরের কাহিনী তো এখন ইতিহাস। বিদেশের মাটিতে বিভিন্ন গেমস ও টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছেন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী খেলোয়াড়রা। যেমন স্পেশাল অলিম্পিকস এশিয়া প্যাসিফিক বোচি প্রতিযোগিতা, আন্তর্জাতিক এশিয়া প্যাসিফিক ক্রিকেট কার্নিভাল ইত্যাদি ইত্যাদি। সবখানেই বাংলাদেশের এই বিশেষ ক্রীড়াবিদদের ছিল জয়জয়কার। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসের এই আসরের ছয়টি ডিসিপ্লিনে অংশ নিয়ে ১৮টি স্বর্ণ, ২২টি রুপা ও ১৪টি ব্রোঞ্জপদক জিতে আনেন দেশের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীরা। বাংলাদেশের ব্যাডমিন্টন তারকা আবদুল কাদের স্মরণ একাই ৩টি স্বর্ণপদক জেতেন। তবে স্পেশাল অলিম্পিকস ওয়ার্ল্ড গেমসে লাল সবুজের দেশের সর্বাধিক পদক আসে ২০১১ সালে গ্রিসের অ্যাথেন্স থেকে। সেবার ৩৫টি স্বর্ণ, ১৬টি রুপা ও ৭টি ব্রোঞ্জপদক জিতেছিল বাংলাদেশ। ২০০৭ সালের চীনের সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত স্পেশাল অলিম্পিক ওয়ার্ল্ড গেমসে দ্বিতীয় সর্বাধিক ৩২টি স্বর্ণ, ১৫টি রুপা ও ২৪টি ব্রোঞ্জ আসে বাংলাদেশে। ২০১৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসেলে অনুষ্ঠিত এশিয়া প্যাসিফিক আঞ্চলিক গেমসেও স্বপ্রতিভ ছিলেন বাংলাদেশের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীরা। ওই আসরে ক্রিকেট ও ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ৩৫টি স্বর্ণ, ১৫টি রুপা ও ৭টি ব্রোঞ্জ জেতে বাংলাদেশ। এছাড়া ২০০৯ সালে ভারতের দিল্লিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক এশিয়া প্যাসিফিক ক্রিকেট কার্নিভালে রানার্সআপ, ২০১২ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়ান ফুটবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন ও ২০১৩ সালে কোরিয়ার পেয়ংচাংয়ে অনুষ্ঠিত স্পেশাল অলিম্পিক ওয়ার্ল্ড উইন্টার গেমসের ফ্লোর হকিতে চ্যাম্পিয়ন হন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীরা।

জাহিদ হাসান, প্রতিবেদক
মনেরখবর.কম


লক্ষ্য করুন- মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক খবর বা প্রেস রিলিজও আমাদের পাঠাতে পারেন। বৈজ্ঞানিক সেমিনার, বিশেষ ওয়ার্কশপ, সাংগঠনিক কার্যক্রমসহ মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক যে কোনো খবর পাঠাতে news@monerkhabor.com এই ইমেইলটি ব্যবহার করতে পারেন আপনারা।