মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবিলায় শহর সাজানো

বিশ্বের যে কোন শহরের পরিবেশ মানসিক দিক থেকে চিন্তা করলে খুব স্বাস্থ্যকর নয়। যেসব মানুষ শহরে থাকে তাদের গ্রাম, নগর কিংবা শহর থেকে একটু দূরে থাকা মানুষের তুলনায় বিষণ্ণতা, উদ্বিগ্নতা, স্কিজোফ্রেনিয়ার সমস্যা বেশি। আপনি কোথায় বসবাস করেন এটি কোন ব্যাপার না প্রত্যেক ৪ জন মানুষের মধ্যে একজন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগে, এবং প্রায় সব মানুষই জীবনের যে কোন সময়ে মন খারাপ থাকা, বিষণ্নতায় ভোগা, একাকীত্ব অনূভব করা, উদ্বিগ্ন থাকা এ ধরণের সমস্যায় পড়ে থাকে। আর এ ধরণের সমস্যা গুলো আমাদের সামাজিক জীবন, সম্পর্ক, স্থিতিস্থাপকতায় ব্যাঘাত ঘটায়।

মানসিক সমস্যা কোন আলাদা সমস্যা নয় এটি গোটা শহরের উপর প্রভাব ফেলে। ‘দ্যা অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট’ এর মত অনুসারে, ইকোনমিক খরচের মানসিক সমস্যার সাথে সম্পর্ক রয়েছে। জিডিপির ৪% খরচ হয় মানসিক স্বাস্থ্যের পিছনে। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা শহরের মানসিক সেবা খাতে বরাদ্দ টাকার ব্যয় বাড়ায় এবং এ সমস্যা মানুষের শারীরিক সমস্যার সূত্রপাত ঘটায়। পরোক্ষভাবে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সাথে আরো খরচ জড়িত, যেমন যে সব মানুষের মানসিক সমস্যা রয়েছে তারা পড়াশুনায় পিছিয়র থাকে, চাকরীতে পিছিয়ে থাকে, বলা যায় তারা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে থাকে। যার কারণে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নতিতে তাদের অবদান কমে যায়।

১৯ শতকের দিকে নগরকেন্দ্রিক জীবন এ ধরণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল শহরের মানুষের ভাল শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এর জন্য। আমাদের জন্য আসলে এমন পরিকল্পনার দরকার ছিল। শিল্প বিপ্লবের সময় গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ শহরকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছিল যার কারণে তখন তাদের মধ্যে নানা ধরণের রোগ ব্যাধি দেখা দেয়। ডাক্তার এবং সেবিকারা তাদের সর্বাত্বক চেষ্টা করছিল আক্রান্তদের সুস্থ করে তোলার। কিন্তু তাদের সুস্থ করার এক্মাত্র সমাধান ছিল বিভিন্ন ধরণের ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকা গুলো থেকে দূরে থাকা। কেননা এসব কারখানা থেকে বের হওয়া ধোয়া, বর্জ্য আক্রান্তদের শরীরের জন্য খুবই খারাপ ছিল।

যখন ডাক্তার এবং গবেষকগণ আরো গবেষণা করল দেখা গেল যে এই যে ঘনবসতি, পর্যাপ্ত বাতাসের অভাব, সঠিক স্বাস্থ্যকর পরিবেশের অভাবে মানুষের শারীরিক মানসিক দুই ধরণের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তখন তারা নগর পরিষ্কার করার, বিভিন্ন জায়গায় ডাস্টবিন বসানোর, ড্রেনের ময়লা ঠিকঠাক যাওয়ার পদক্ষেপ নিলেন। এরপর থেকে নগর কেন্দ্রিক জীবন এই পরিকল্পনা মানুষের পক্ষেই আছে। কিছু কিছু বড় ধরণের সমস্যা যেমন- হৃদরোগ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, ফুসফুসের সমস্যা এসব সারা বিশ্বের জন্যই চ্যালেঞ্জ।

মানসিক স্বাস্থ্য অনেক বড় একটি ব্যাপার নগর কেন্দ্রিক জীবন এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সমন্বয় করার জন্য। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে এই সমন্বয় এর কাজটি খুব ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। ২০১৬ সালের গ্লোবাল হেলথ কনফারেন্সে যখন ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন এর কাছে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠে তখন অনেকে শহর কেন্দ্রিক জীবন, শারীরিক স্বাস্থ্য প্রকল্প, অধিক জনসংখ্যা এসব দিক তুলে ধরেছেন। তারা আস্তে করে সরে গিয়েছেন, একে অন্যের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। কিন্তু তারা কেউ বলেলনি কিভাবে মানসিক সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় তারা কোন সমাধান অথবা সমাধানের পথ দেখান নি।

মানসিক সমস্যা নিয়ে মানুষের মনে যে চিত্রটি রয়েছে তা মোটেও ঠিক নয়। বিভিন্ন সংবাদের শিরোনাম মানসিক সমস্যাকে নানা ধরণের নেতিবাচক দিকের সাথে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন। যা মানুষের মনে ভ্রান্তি, ভুল ধারণার তৈরী করে। এবং যারা মানসিক সমস্যায় ভোগে তারা তাদের সমস্যা অন্যকে জানাতে চায় না কেননা তারা জানে তাদের সমস্যা কেউ বুঝবে না।

মানসিক সমস্যা সমাধানে শহর সাজানোর পদ্ধতি-
অনেক সবুজ থাকতে হবে, গাছপালা, ছায়া থাকতে হবে। পার্ক, রাস্তার পাশে গাছ এমনকি অফিসের জানালার বাহিরের প্রকৃতি যেন খুব সবুজ হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

ব্যায়াম শুধুমাত্র শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য ভাল না এটি নানাভাবে মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। যেমন পার্কে হাঁটার কারণে মানসিক চাপ কমে। পার্কের সবুজ পরিবেশ, হাওয়া মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।

আর সামাজিক সম্পর্ক গুলো ভাল থাকলে তা মানুষের মনে প্রভাব ফেলে। সামাজিক সম্পর্ক গুলো মানুষের একাকিত্ব, বিষন্নতা, উদ্বিগ্নতা দূর করতে সহায়তা করে।

যখন মানুষ মানসিক সমস্যায় ভোগে তখন তাদের সমর্থন এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ একান্তভাবে দরকার। আর যখন ইতিবাচক মানসিক স্বাস্থ্যের প্রচার করা হয় তখন শহর সাজানো, সামাজিক সম্পর্কের উন্নতি ভাল দিক হিসেবে কাজ করে।

তথ্যসূত্র-
(https://qz.com/934976/mental-health-problems-of-people-who-live-in-cities-need-to-be-solved-by-both-urban-designers-and-health-professionals/)

রুবাইয়াত মুরসালিন, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মনেরখবর.কম