মূল পাতা / সংবাদ / ‘আত্মহত্যার সংবাদ কেমন হওয়া উচিত’ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত

‘আত্মহত্যার সংবাদ কেমন হওয়া উচিত’ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত

আজ ১০ সেপ্টেম্বর। বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। আর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষ্যে শনিবার (৮ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ টেলিভিশন সেন্টারের কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ‘সংবাদ মাধ্যমে আত্মহত্যার সংবাদ কেমন হওয়া উচিৎ’ শিরোনামে এক কর্মশালা।

কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইএমএইচ) পরিচালক অধ্যাপক ডা. ফারুক আলম, এনআইএমএইচ এর সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ, এনআইএমএইচ এর সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ তারিকুল আলম, এনআইএমএইচ এর সহকারী অধ্যাপক ডা. ফারজানা রহমান এবং ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শক ডা. হাসিনা মমতাজ।

কর্মশালায় ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ একটি প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে সংবাদ মাধ্যমে আত্মহত্যার সংবাদ কেমন হওয়া উচিৎ এ বিষয়ে বিভিন্ন তুলে ধরেন। তিনি জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৪ সালে হিসাব মতে পৃথিবীতে প্রতিদিন আত্মহত্যা করে প্রায় তিন হাজার মানুষ। আর প্রতিদিন আত্মহত্যার চেষ্টা করে ষাট হাজার মানুষ। গবেষণা মতে, প্রতিটি আত্মহত্যার ঘটনাকে প্রতিরোধ করা না গেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটিকে অবশ্যই প্রতিরোধ করা যায়। তাই বলা হয়, আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রচারমাধ্যমের ভূমিকা

আত্মহত্যা প্রতিরোধ করার সামাজিক আন্দোলনে এবং এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে প্রচারমাধ্যমগুলো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রচারমাধ্যমগুলোর জন্য আত্মহত্যার সংবাদ পরিবেশনার একটা সাধারণ গাইডলাইন তৈরি করে দিয়েছে। আমাদের দেশে কোনো কোনো আত্মহত্যার ঘটনাকে সহমর্মিতা দেখাতে গিয়ে, আত্মহত্যার কারণ হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তি বা বিষয়কে ভিলেন হিসেবে উপস্থাপন করে। এর ফল হয় ভয়াবহ। বাংলাদেশে কিছু সংবাদপত্র এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া কয়েকটি আত্মহত্যার ঘটনাকে সঠিকভাবে প্রকাশ ও প্রচার না করায় আমরা দেখি সেটি প্রকাশের পরপরই আরো কয়েকটি লাগাতার আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটে।

আশার কথা এই যে, আমাদের দেশের বেশ কিছু পত্রিকা ও নিউজ চ্যানেল বিষয়টি সম্পর্কে খুবই সচেতন এবং যথেষ্ট সংবেদনশীলতার সঙ্গে আত্মহত্যার খবর পরিবেশন করে। কিন্তু তারপরও বিষয়টি নিয়ে সংবাদকর্মীদের একটি সাধারণ নীতিমালা মেনে চলা উচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশন যৌথভাবে আত্মহত্যার সংবাদ পরিবেশন বিষয়ে সংবাদকর্মীদের জন্য একটি গাইডলাইন প্রণয়ন করেছে। আমাদের সীমাবদ্ধতার কারণে হয়তো আমরা সেটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে পারব না কিন্তু আমাদের নিজেদের মতো করে সেটাকে যতটুকু পারি মেনে চললে প্রতিরোধ করা যাবে অনেক আত্মহত্যার ঘটনা।

কেমন হবে আত্মহত্যার সংবাদ

০১. আত্মহত্যার সংবাদটি প্রথম পৃষ্ঠায় বা অন্যত্র খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রকাশ করা যাবে না।
০২. সংবাদটির শিরোনামে এমন কোনো শব্দ বা বাক্যরীতি ব্যবহার করা উচিত নয় যা পাঠক বা দর্শককে উদ্দীপনার খোরাক দেয়। আবার এমনভাবেও প্রকাশ করা যাবে না যে আত্মহত্যা একটি মামুলি স্বাভাবিক মৃত্যুমাত্র, অর্থাৎ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে শব্দ বাছাই করতে হবে।
০৩. ‘অপমান সইতে না পেরে রেললাইনে মাথা পেতে দিল অমুক’ বা ‘অভিমান করে না ফেরার দেশে চলে গেলেন অমুক’ ইত্যাদি আলংকারিক বাক্যরীতির চেয়ে কেবল সংক্ষিপ্ত শিরোনাম দেওয়া উচিত ‘অমুকের আত্মহত্যা’।
০৪. শিরোনামে যেন এমন কোনো বার্তা না থাকে, যাতে মনে হয় আত্মহত্যা কোনো সমস্যার সমাধান। ‘ঋণ থেকে চিরমুক্তি পেল অমুক’ বা ‘প্রেমে ব্যর্থ হয়ে তরুণের বিষপান’ ইত্যাদি  শিরোনাম যেন না হয়।
০৫. আত্মহত্যার খবরটিকে নিয়ে পরপর ফলোআপ ‘স্টোরি’ করার কোনো প্রযোজন নেই। কীভাবে একজন আত্মহত্যা করেছে বা করার চেষ্টা করে কেন ব্যর্থ হয়েছে সে বিষয়গুলো যেন বিস্তারিত বিবরণ আত্মহত্যার সংবাদে না থাকে। এ ধরনের বিবরণ ভবিষ্যতে আরো একজনকে একটি ‘সফল’ আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
০৬. আত্মহত্যার স্থান নিয়ে যেন কোনো সংবাদ না থাকে- যেমন কোনো বিশেষ উঁচু স্থান, বিশেষ পুকুর ইত্যাদিতে প্রায়ই আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে বলে প্রচারমাধ্যমে সাধারণের জন্য সংবাদ পরিবেশন করা যাবে না। তবে স্থানটিকে নিরাপদ রাখতে প্রশাসন বা কর্তৃপক্ষকে আলাদা করে জানানো যেতে পারে।
০৭. আত্মহত্যাকারীর ছবি প্রকাশ না করাই শ্রেয় আর আত্মহত্যার পরে মৃতদেহের ছবি বা ভিডিও ফুটেজ কোনোভাবেই প্রকাশ করা উচিত নয়।
০৮. সেলিব্রিটি বা বিখ্যাত বা জনপ্রিয় কেউ আত্মহত্যা করে ফেললে বিষয়টি নিয়ে দ্বিগুণ সতর্কতার সঙ্গে সংবাদ পরিবেশন করতে হবে।
০৯. শোকের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে- এমন কোনো শব্দ বা তথ্য দেওয়া যাবে না যাতে নিকটজনদের শোক আরো ঘণীভূত হয় এবং তাদের মধ্যেও আবার আত্মহত্যার ইচ্ছা জেগে ওঠে।
১০. আত্মহত্যার প্রতিটি সংবাদের সঙ্গে এমন কিছু তথ্য সরবরাহ করতে হবে যেখানে উল্লেখ থাকবে যে আত্মহত্যার চিন্তা বা ইচ্ছা করলে একজন মানুষ কোথায় সাহায্য পেতে পারে।

বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর বাংলাদেশে আত্মহত্যা নিয়ে সচেতনতামূলক উদ্যোগ অনেক বেড়েছে কিন্তু সঠিক ও কার্যকরী প্রতিরোধনীতি করার জন্য সবার আগে প্রয়োজন জাতীয় পর্যায়ের একটি গবেষণা। যার মাধ্যমে তৈরি হবে কার্যকরী নীতিমালা।

পুলিশ সদর দপ্তর ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য মতে বর্তমানে বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন ২৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করে। যাদের অধিকাংশ বয়স ২১-৩০ বছরের মধ্যে। আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে অধিকাংশই নারী। বাংলাদেশ ২০১৩ সালে শুধু বিষপান ও ফাঁসীতে ঝুলে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১০১২৯টি।

বিশ্বে কত সংখ্যক মানুষ আত্মহত্যা করে থাকে, তা হিসাব করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থ্যা। তাদের হিসাব মতে বর্তমানে গায়ানা, উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ায় (যথাক্রমে বছরে ৪৪ জন/১০০,০০০, বছরে ৩৮ জন/১০০,০০০, বছরে ২৯/১০০,০০০) আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কায় আত্মহত্যার প্রবণতা (বছরে ২৯ জন/১০০,০০০) সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে আত্মহত্যা নিয়ে কোনো জাতীয় পর্যায়ের জরিপ না হলেও বিভিন্ন গবেষকের প্রাপ্ত উপাত্ত মতে, এ দেশে প্রতিবছর ১০,০০০ জন মানুষ আত্মহত্যার শিকার। বেশ কয়েকটি  ছোট ও মাঝারি পর্যায়ের গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রতি লাখে ৭ দশমিক ৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করে থাকে।