জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-১৯ এর ফল প্রকাশ

দেশে ১৭ শতাংশ মানুষ মানসিক রোগে আক্রান্ত, চিকিৎসা বঞ্চিত ৯২ শতাংশ

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ এর তথ্যানুযায়ী দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ১৭ শতাংশই কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। ১৮ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে এই হার ১৩.৬ শতাংশ। আক্রান্তদের ৯২ শতাংশই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন না।

আজ বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরিচালিত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-১৯ এর প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সচিব মো. আসাদুল ইসলাম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এর মহাপরিচালক ডা. মোহাম্মাদ আবুল কালাম আজাদ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি ডা. বর্ধন জং রানা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এর সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-১৯ এর কো-অর্ডিনেটর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এর লাইন ডাইরেক্টর অধ্যাপক ডা. এ এইচ এম এনায়েত হোসেন।

অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-১৯ এর প্রধান গবেষক অধ্যাপক ডা. ফারুক আলম এবং জরিপের অন্যতম দুই সমন্বয়ক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের কন্ট্রোলার রেজওয়ানুল শামীম।

অধ্যাপক ডা. ফারুক আলম জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই জরিপে ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রায় নয় হাজার জন প্রাপ্তবয়স্ক এবং দুই হাজার দুই’শ জন শিশুকে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে তাদের কি ধারনা, কুসংস্কার , সচেতনতা, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সেবা নেওয়ার প্রবণতা কতটুকু বা মানসিকভাবে অসুস্থ হলে তাদের সেবা গ্রহণে অনীহা কতটুকু,মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে তাদের বিশ্বাস কি সেসব বিষয়ে ইন্টারভিউ নেওয়া হয়।

তিনি জানান, প্রাপ্তবয়স্কদের ১৭ শতাংশই কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে ৬.৭ শতাংশ ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডার, ৪.৫ শতাংশ  এ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার, ২.১ শতাংশ সোমাটিক সিনটম সংশ্লিষ্ট ডিজঅর্ডার, ১ শতাংশ সিজোফ্রেনিয়া, ০.৯ ঘুমের সমস্যা, ০.৭ শতাংশ ওসিডি, ০.৪ শতাংশ বাইপোলার ডিজঅর্ডার, ০.৩ শতাংশ নিউরোডেভলেপমেন্টাল ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত। এছাড়াও সেক্সুয়াল ডিসফাংশন, পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার সহ অন্যান্য কিছু মানসিক রোগে আক্রান্তের উপসর্গ পাওয়া গেছে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ এর তথ্যানুযায়ী মানসিক রোগে আক্রান্ত এসব রোগীদের ৯২ শতাংশই কোনো চিকিৎসা নেন না। মানসিক রোগ বিষয়ে কুসংস্কারই এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। এবং কুসংস্কারে বিশ্বাসে নারীদের হার পুরুষের তুলনায় বেশি। যারা চিকিৎসা নেন তাদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে চিকিৎসা নেন। বাকীরা সাধারন চিকিৎসকদের কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন।

ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের ১৮ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে ১৩.৬ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে ৫.৯ শতাংশ নিউরোডেভলেপমেন্টাল ডিজঅর্ডার, ৪.৫ শতাংশ এ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার, বাকীরা কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডার সহ অন্যান্য মানসিক রোগে আক্রান্ত।

দেশে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞদের সংকট রয়েছে, মাত্র ২৭০ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মানসিক রোগে আক্রান্ত প্রায় আড়াই কোটি মানুষের চিকিৎসার জন্য যথেষ্ট নয়। তাই দেশে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞদের সংকট দূরীকরণে এমবিবিএস কারিকুলামে মানসিক রোগ বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে সংযুক্ত করতে সুপারিশ করেন ডা. হেলাল।

মানসিক স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়নে জেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, প্রান্তিক পর্যায়ে মানসিক রোগের ঔষধ সরবারহ, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলির মানসিক রোগ বিভাগ সমূহকে আরো বেশি সুসংগঠিত করার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে স্কুল কারিকুলামে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ের সংযুক্তির পাশাপাশি শিক্ষক ও ধর্মীয় নেতাদের অংশগ্রহণের সুপারিশ করেন তিনি। এক্ষত্রে গণমাধ্যমকে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে আহ্বান জানান ডা. হেলাল।

মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা সংকট দূরকরণে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটি এর পক্ষ থেকে জেলা উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-১৯ এর ফল প্রকাশ 1

প্রধান অতিথির বক্তৃতায় মন্ত্রী জাহিদ মালেক দেশের মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নির্দেশনায় করণীয় সবকিছু করা হবে বলে জানান।  দ্রুতই মানসিক স্বাস্থ্য নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান  ব্যুরো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিভিন্ন এনজিওর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ দেশের স্বনামধন্য চিকিৎসকগণ উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, এর আগে ২০০৩-০৫ সালে সর্বশেষ মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুষ্ঠিত হয়। দ্রুতই প্রধান গবেষক অধ্যাপক ডা. ফারুক আলম এর তত্ত্বাবধানে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-১৯ এর ৪৫০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে বলা জানানো হয় অনুষ্ঠান থেকে।