মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রে

মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রে যুবককে পিটিয়ে হত্যা

কুষ্টিয়ার মিরপুরে একটি মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রে এক মানসিকভাবে অসুস্থ এক কলেজ ছাত্রকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে।

‘সমর্পণ’ নামের ওই মাদকাসক্তি মানসিক চিকিৎসা সহায়তা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের পক্ষ থেকে প্রথমে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যাওয়ার কথা বলা হলেও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজে ওই যুবককে পেটানো ও ইনজেকশন পুশ করতে দেখা যায়।

গতকাল বুধবার বিকালে মিরপুর এসিল্যান্ড ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রকিবুল হাসানের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালিত হয় নীতিমালার তোয়াক্কা না করে গজিয়ে ওঠা ‘সমর্পণ’ নামের ভুঁইফোড় ওই মাদকাসক্তি মানসিক চিকিৎসা সহায়তা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে ।

অভিযান শেষে মাদকাসক্তি মানসিক চিকিৎসা সহায়তা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রটি সিলগালা করে দেয়া হয় এবং আটক করা হয় প্রতিষ্ঠানের মালিক মতিন ও তত্ত্বাবধায়ক হাবিব উদ্দিনকে।

জানা যায়, নিহত ওই কলেজ ছাত্রের নাম কামরুজ্জামান ইমন। নিহত ইমন উপজেলার ধুবইল ইউনিয়নের কাদেরপুর গ্রামের এজাজুল আজিম রিপনের ছেলে ও রাজশাহী সিটি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিল। ২০ নভেম্বর ওই কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ইমনকে মিরপুর হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তবে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের দাবি ওই কলেজছাত্রের মৃত্যু হয়েছে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে। এমন দাবি করা হলেও সিসিটিভির ফুটেজে দেখা গেছে ওই ছাত্রকে পিটিয়ে ও ইনজেকশন পুশ করা হচ্ছে।

মঙ্গলবার সকালে সিসি টিভির ফুটেজে কলেজছাত্র হত্যার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে এ নিয়ে শুরু হয় তোলপাড়।

নিহত ইমন উপজেলার ধুবইল ইউনিয়নের কাদেরপুর গ্রামের এজাজুল আজিম রিপনের ছেলে ও রাজশাহী সিটি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিল।

পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত ১৯ নভেম্বর দুপুরে কলেজছাত্র ইমন আলীকে ভর্তি করা হয় মিরপুর বিজিবি সেক্টর এলাকার সমর্পণ মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রে। মানসিক সমস্যার কারণে ভর্তি শেষে পরিবারের সদস্যরা ফিরে যান বাড়িতে। পরদিন ২০ নভেম্বর সকালে ‘সমর্পণ’ নামের ওই প্রতিষ্ঠান থেকে ইমনের পরিবারকে জানানো হয় ইমনকে মিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়েছে। সেখানে ইমনের বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজন গিয়ে দেখতে পান তাদের ইমন আর বেঁচে নেই। ইমনের শরীরে বিভিন্ন অংশে নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে।

তবে ইমনের মৃত্যু যে স্বাভাবিক নয়, তাকে নির্যাতন করেই মেরে ফেলা হয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া গেছে মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে। ক্যামেরায় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে বেশ কয়েকজন ইমনকে হাত-পা বেঁধে মারধর করছে, শরীরে পুশ করা হচ্ছে ইনজেকশনও।

নিহত ইমনের পিতা এজাজুল আজিম রিপন বলেন, কোনো নেশার সঙ্গে জড়িত ছিল না ইমন। তবে সে বিভিন্ন সময় বাড়িতে ঝামেলা করত। অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার করার কারণে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছিল। এ কথা বলেছিল ডাক্তার। তাই মানসিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। চিকিৎসকরা বলে ছিলেন, কয়েকদিন পর আসেন ভর্তি করে নেয়া যাবে। বাড়িতে ফিরে এসে ইমন খুব ঝামেলা সৃষ্টি করে। ওইদিন সবাই আমাকে কোথাও রেখে আসতে বলেন, তখন আমি কোনো কিছু না ভেবেই পৌরসভার যোগীপুল মহল্লায় অবস্থিত ‘সমর্পণ’ নামের একটি বেসরকারি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে দিয়ে আসি। ছেলেকে সুস্থ করার জন্য। তারপর ২০ নভেম্বর বুধবার সকালে শুনছি আমার ইমন মারা গেছে।

মানসিক সমস্যার রোগীকে মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে না রেখে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে কেন রাখলেন? গণমাধ্যমের এমন প্রশ্নের জবাবে কেঁদে ফেলে বলেন, কি থেকে কি হয়ে গেল, কিছুই বুঝতে পারছি না।

নামপ্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় ও ইমনের কয়েকজন বন্ধু জানান, কোনো নেশার সঙ্গে জড়িত ছিল না ইমন। আমরা কখনই নেশা করতে দেখিনি। মৃত্যুর প্রায় ১৫ দিন আগে থেকে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছিল ইমন। প্রথম দিকে না বুঝলেও কয়েকদিন পর বিষয়টি বুঝতে পারে ইমনের পরিবার। তারপর ইমনের বাবা ইমনকে ডাক্তারও দেখিয়ে ছিলেন। ডাক্তার বলে ছিলেন, অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার ও ঘুম কম হওয়ায় এমন সমস্যা হয়েছে। কয়েকদিন বিশ্রাম করলেই সমস্যা ঠিক হয়ে যাবে।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রকিবুল হাসান জানান, গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। যেহেতু এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তাই প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠান মালিকসহ আরও একজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে।

‘সমর্পণ’ নামের ওই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি ৯ রোগীর মধ্যে ৫ জনকে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ৩ জনকে চিকিৎসার জন্য কুষ্টিয়ার একটি ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে।