মূল পাতা / প্রশ্ন-উত্তর / বদ্ধঘর বা লিফটে উঠলে দম বন্ধ হয়ে আসে

বদ্ধঘর বা লিফটে উঠলে দম বন্ধ হয়ে আসে

প্রশ্ন: আমার নাম আরিফ। আমার বয়স ২৫ বছর। আমি ঢাকায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করি। আমার সমস্যা প্রায় দুইবছর ধরে যেকোনো বদ্ধঘর অথবা আটকানো জায়গা যেমন লিফট বা ভিড় বাসে উঠলে আমার দম আটকে আসতে থাকে। এ কারণে আমি এখন লিফটে বা ভিড় বাসে উঠতে পারি না। মনে হয়, লিফট আটকে গেলে বা বাসের ভিড়ে আমি দম বন্ধ হয়ে মারা যাব। আমাকে বাসে করেই চলাফেরা করতে হয় আর প্রায়সময়ই বাসে অনেক ভিড় থাকে। কিন্তু বাসে ভিড় থাকলে আমি সেই বাসে উঠতে
খুব ভয় পাই। যদিও বাধ্য হয়ে কখনো কখনো উঠতে হয়-যতক্ষন বাসে থাকি খুব কষ্টে থাকি। আমার খুব খারাপ লাগে ,ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়; মনে হয় কখন নেমে পড়ব। শুনেছি এই সমস্যাগুলো নাকি মানসিক। তাই আপনাদের কাছে পরামর্শ চাইছি। আমাকে পরামর্শ দিয়ে উপকতৃ করবেন।

উত্তর: তোমার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। দু-বছর ধরে তোমার আটকানো জায়গায় গেলে যেমন : লিফটে উঠলে দম বন্ধ হয়ে আসে বা ভিড় বাসে উঠলে মনে হয় দম বন্ধ হয়ে মারা যাবে। ভিড় বাসে উঠতে ভয় পাও বা যদি কখনো বাধ্য হয়ে ওঠো খুব খারাপ লাগে, না নামা পর্যন্ত কষ্টে থাকো ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়। সব সমস্যাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তুমি ক্লস্ট্রোফোবিয়া নামক এগোরা ফোবিয়াতে ভুগছো।যা ফোবিক অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডারেরই একটি প্রকারভেদ। এটি একধরনের মৃদু মানসিক সমস্যার মধ্যে পড়ে। তারপরও সমস্যা তো সমস্যাই সেটা শারীরিক হোক আর মানসিকই হোক। ক্লস্ট্রোফোবিয়া হলে বদ্ধ কোনো স্থানে যেমন : লিফটে ওঠলে বা বাসে আটকা পড়লে এসব উপসর্গ দেখা যায়। আর ফোবিয়া হলো এক ধরনের আতঙ্কিতভাব-অহেতুক, অকারণ, ভিত্তিহীন
দুশ্চিন্তা। এই অবস্থায় যখন কোনো ব্যক্তির দৈনন্দিন কোনো কাজকর্ম নিজের এবং অন্যের অসুবিধা বা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় তখন সেটাকে রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই এগোরাফোবিয়া সাধারণত প্যানিক অ্যাটাক বা সোশ্যাল অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডারের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। চিকিৎসা : তোমার চিকিৎসা হবে দু- রকমভাবে-ফার্মাকোথেরাপি (ঔষধের মাধ্যমে) ও সাইকোথেরাপি (কগনেটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি)। ফার্মাকোথেরাপির মধ্যে রয়েছে বেনজোডায়াজিপিন নামক ঔষধ এবং অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট (ক্লোমিপ্রামিন, ইমিপ্রামিন, এসএসআরআই ইত্যাদি) যেকোনো অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট প্রথমে অল্প মাত্রায় দিয়ে শুরু করতে হবে এবং আস্তে আস্তে বাড়াতে হবে। আবার বন্ধ করার সময় অল্প অল্প করে ডোজ কমাতে হবে। এর জন্য সময় লাগবে এবং সময় দিতে হবে। ঔষধ খেলে অনেক সময় অনেকের  ‍মুখ, গলা শুকিয়ে যেতে পারে। তবে ঘাবড়ে যাবার কিছু নেই; পানি খেলে আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। যদি কোনো নেশার আসক্তি থাকে যেমন : অ্যালকোহলবা ধূমপান তাহলে তা ত্যাগ করতে হবে। কারণ এগুলো রোগের তীব্রতা ও সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। আর সাইকোথেরাপির মধ্যে রয়েছে এক্সপ্রোজার থেরাপি এবং ডিপ ব্রিদিং এক্সারসাইজ। এখানে তোমার ভয় এবং আতঙ্কের জন্য এক্সপ্রোজার থেরাপি নিতে হবে। স্ট্রেস এগোরাফোবিয়া এবং প্যানিক অ্যাটাকের জন্য করতে হবে ব্রিদিং এক্সারসাইজ। এটা কীভাবে করতে হবে?  ‍খুব সহজভাবে এটা করা যায়। প্রথমে আস্তে আস্তে নাক দিয়ে নিঃশ্বাস নিতে হবে, যতটকুু পারা যায় বায়ু ততখানি ফুসফুসে ধারণ করতে হবে এবং ৫-১০ সেকেন্ড ধরে রাখতে হবে। তারপর মুখ দিয়ে আস্তে আস্তে শ্বাস ছাড়তে হবে। খেয়াল রাখতে হবে শুরু করার আগে যাতে চোখ বন্ধ থাকে। শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে মনটা নিবদ্ধ রাখতে হবে। এভাবে ৫-১০ মিনিট করার পর ভালো অনুভব করবে। প্রতিদিন কমপক্ষে দু-বার করতে হবে। এতে স্ট্রেস এবং প্যানিক অ্যাটাক দুটোই কমে আসবে। রোগ সম্পর্কে জানা, মনে মনে সাহস আনা এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞের চিকিৎসা ও পরামর্শে সঠিক ডোজে, নির্দিষ্ট মেয়াদে ঔষধ সেবন এবং ধৈর্য সহকারে ফলোআপ এই সমস্যা থেকে মুক্তির সহায়ক হবে।

উত্তর দিয়েছেন: অধ্যাপক ডা. মহাদেব চন্দ্র মন্ডল মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট শের-ই-বাংলা নগর, ঢাকা।

ট্যাগ্স: