যৌন স্বাস্থ্য বিষয়ে কিছু কথা

যৌন স্বাস্থ্য বিষয়ে কিছু কথা

যৌন স্বাস্থ্য, সেক্স’ অথবা ‘সেক্সুয়ালিটি’ সেই আদিকাল থেকে আজো এমন একটি বিষয় যা একই সাথে নিষিদ্ধ এবং আকর্ষণীয়।

আঠারোশ’ শতাব্দীর আগে পর্যন্ত ‘sexual’ অর্থাৎ ‘যৌন’ শব্দটির অর্থ আজকের মতো ছিলো না। ‘sexual’ বলতে বোঝাতো শুধু মানুষের লৈঙ্গিক পরিচয় অর্থাৎ সে পুরুষ নাকি নারী।

তবে আজকের দিনে ‘sexual’ বলতে  লিঙ্গভিত্তিক পরিচয়ের পাশাপাশি ‘সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশনকেও বোঝায়।

আলফ্রেড কিনসে সর্বপ্রথম মানুষের যৌন আচরণ নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা করেন এবং সাধারণ মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেন। এরপর এলেন মাস্টার অ্যান্ড জনসন দম্পতি। তারা নারী ও পুরুষের যৌন বিষয়ে গবেষণা  ‘সেক্স থেরাপি’ প্রচলন করলেন। আর এর মধ্য দিয়েই ‘সেক্স’ অথবা ‘সেক্সুয়ালিটি নিয়ে লোকসমাজে প্রচলিত দীর্ঘকালের নানা মিথ এবং ভ্রান্ত ধারণাকে সর্বপ্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে চ্যালেঞ্জ করা হলো।

মধ্যম আয়ের মডারেট মুসলিম সমাজ হিসেবে বাংলাদেশে সামাজিকভাবে খোলাখুলি `যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা করা নিষিদ্ধ বিষয়। নিষিদ্ধ বিষয় বলেই ‘যৌন’ বিষয়ে সাধারণ জ্ঞান মানুষের কাছে পৌঁছার কোনো স্বাভাবিক রাস্তা নেই | বিভিন্ন উৎস থেকে এ বিষয়ে যা বা যতটুক জানছে তা হয়তো সঠিক নয়। এর ফলাফল হচ্ছে সেক্স নিয়ে আরো বেশি বেশি মিথ এবং ভ্রান্ত ধারণার অবাধ বিস্তার।

রোগী যেমন যৌন স্বাস্থ্য ও  সমস্যা নিয়ে কথা বলতে বিব্রত বোধ করেন, একই ব্যাপার ঘটে চিকিৎসকের ক্ষেত্রেও। বিশেষত রোগী বিপরীত লিঙ্গের হলে, কিংবা শিশুকিশোর হলে দেখা যায় চিকিৎসকরা ‘সেক্সুয়াল’ বিষয়টি সচেতনভাবে এড়িয়ে যান, যে কারণে সেক্সুয়াল সমস্যায় বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসার বদলে আজো আমাদের দেশে হাতুরে ডাক্তার, হার্বাল মেডিসিন ইত্যাদি হচ্ছে প্রথম পছন্দ।

আমাদের  যৌন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যা হলো প্রায় সময়ই ‘যৌন সংক্রান্ত সমস্যা’ বা সেক্সুয়াল ডিসফাংশন’ আর ‘যৌন বাহিত রোগ’ বা ‘সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ডিজিজ’ সংক্ষেপে ‘এস টি ডি’ কে গুলিয়ে ফেলা। যেখানে সেক্সুয়াল ডিসফাংশন’ বলতে বোঝায়, আকাঙ্খা, উত্তেজনা, চরম পুলক অথবা সেক্সুয়াল আকর্ষণের সমস্যা। অপরদিকে ‘সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ডিজিজ’ বলতে বোঝায় যৌন বাহিত রোগ বা ইনফেকশন যেমন- সিফিলিস, গনোরিয়া ইত্যাদি।

‘সেক্স’ এবং ‘সেক্সুয়ালিটি’ সংক্রান্ত সমস্যায় যথাযথ সমাধান না পেয়ে দাম্পত্য সম্পর্কে সমস্যা হচ্ছে, পরিণতি এমন কি ডিভোর্স পর্যন্ত গড়াচ্ছে| প্রচুর অপ্রয়োজনীয় ওষুধ, হার্বাল ওষুধ যত্রতত্র অবাধে বিক্রি হচ্ছে।

বর্তমানে আমরা  যৌন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ রেজিস্টার্ড চিকিৎসক নিয়ে শিক্ষামূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছি যার অংশ হিসেবে ২০১৪ সালে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সেমিনার, ওয়ার্কশপ আয়োজন করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগে ‘সাইকিয়াট্রিক সেক্স ক্লিনিক’ নামে একটি সেবা
খোলা হয়েছে। বলতে গেলে এখন পর্যন্ত এটাই দেশের প্রথম ও একমাত্র যৌন বিষয়ক একাডেমিক চিকিৎসা কেন্দ্র।

ডা. মোহাম্মাদ শামসুল আহসান মাকসুদ
সাইকিয়াস্ট্রিক অ্যান্ড সেক্সুয়াল হেলথ ফিজিশিয়ান
বঙ্গবন্ধুশেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়