যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে যত ভুল ধারণা

যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে যত ভুল ধারণা

মানুষের আদিমতম প্রবৃত্তিগুলোর মাঝে একটি হচ্ছে যৌনতা। এটি যৌনতাড়না নিবারণ করার পাশাপাশি জীবজগতের ভারসাম্য রক্ষার জন্যও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। অধিকন্তু, মানসিক এবং শারীরিক সুস্থতা, যৌনতা বা যৌনস্বাস্থ্যের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। এ বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন  ধারণা এবং ভুল ধারণা।  যৌনতা নিয়ে এ দেশের মানুষের রয়েছে অজস্র ভুল ধারণা এবং অজ্ঞতা। সেইসব প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর বিপরীতে সঠিক তথ্য তুলে ধরা হলো।

ভুল ধারণা : কুমারী মেয়েদের হাইম্যান ইনট্যাক্ট থাকে।
সঠিক তথ্য : হাইম্যান হচ্ছে এক প্রকার ঝিল্লি বা পর্দা যা দিয়ে নারীর যোনীপথের মুখ ঢাকা থাকে। ব্যক্তিবিশেষে এর আকার, আকৃতি ভিন্ন হতে পারে। সাধারণত আংশিকভাবে এটি যোনীপথের মুখ ঢেকে রাখে। কারো কারে জন্মলগ্ন থেকেই এ পর্দাটি থাকে না। কারো ক্ষেত্রে এটি আবার যোনীপথের মুখ পুরোপুরি ঢেকে রাখে (ইম্পারফোরেট হাইম্যান); যা খুব বিরল এবং অস্বাভাবিক-তখন ঋতুস্রাব ও অন্যান্য স্রাব বের হতে পারে না, তাই মাইনর সার্জারির প্রয়োজন হয়। যৌনক্রিয়া, অত্যধিক শারীরিক ব্যায়াম, খেলাধুলা ইত্যাদির কারণে এ পর্দা ছিঁড়ে ও যেতে পারে। আবার অনেক নারীরই প্রম সঙ্গমের সময় রক্তপাত হয় না, হাইম্যান/পর্দা ছেঁড়ে না অথবা হাইম্যান ছিঁড়ে গেলেও রক্ত বের হয় না। তাই প্রচলিত ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কেউ কুমারী কিনা হাইম্যান দেখে কখনোই তা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।

ভুল ধারণা : সেফ পিরিয়ডে সঙ্গম করলে গর্ভে বাচ্চা আসে না।
সঠিক তথ্য : বিষয়টি ঋতুস্রাবের সময়কাল অথবা ওভ্যুলেশনের সাথে সম্পর্কিত। সাধারণত ৯০% নারীর ক্ষেত্রে ঋতুস্রাব চক্রটি ২৮-৩২ দিনের হয়ে থাকে। অর্থাৎ প্রতি ২৮-৩২ দিন পরপর এটি শুরু হয় এবং ৩- ৪ দিন, কারো তা ক্ষেত্রে ৭ দিন স্থায়ী হয়। এ সময় অনিষিক্ত ডিম্বাণু, জরায়ুর কোষ কলা ইত্যাদি নির্গত হয়। পরবর্তী ঋতুস্রাব পিরিয়ডের ১২-১৬ দিন পূর্বে ওভ্যুলেশন শুরু হয়; অর্থাৎ নতুন নতুন ডিম্বাণু তৈরি হয় এবং পরিণত ডিম্বাণু ডিম্বাশয় থেকে নির্গত হয়ে ডিম্বনালীতে আসে। নারী এ সময়টিতে সবচেয়ে বেশি ঊর্বর থাকে। বিভিন্ন পদ্ধতিতে এ ওভ্যুলেশন পিরিয়ড নির্ণয় করা যায়। সাধারণত ঋতুস্রাব চক্রের ১১-২১ দিনের মাঝে এই ওভ্যুলেশন টাইম হয়ে থাকে। এই সময়ে একটি ডিম্বাণু পরিণত হয় এবং ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বনালীতে নির্গত হয়ে জরায়ুতে আসে। জরায়ুতে এই পরিণত ডিম্বাণু ২৪-৪৮ ঘণ্টা বেঁচে থাকে। অন্যদিকে পুরুষের শুক্রাণু নারীর শরীরে সর্বোচ্চ ৫-৬ দিন বেঁচে থাকে। তাই যদি ওভ্যুলেশনের সময়ে সঙ্গম করা হয় তাহলে একটি শুক্রাণু একটি ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করতে পর্যাপ্ত সময় পেয়ে থাকে। আবার কোনো কোনো নারীর ক্ষেত্রে এ পিরিয়ডের চক্রটি (২৮ দিনের কম) ছোটো হয়ে থাকে, কারো কারো বড়ো (২৮ দিনের বেশি) হয়ে থাকে, কারো নিয়মিতভাবে অনিয়মিত, আবার কারো অনিয়মিতভাবে অনিয়মিত হয়ে থাকে। অর্থাৎ ওভ্যুলেশনও আগে, পরে, অনিয়মিত হয়। সেক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে উর্বর সময় নির্ধারণ করা এবং নিরাপদ সঙ্গমকাল নির্ণয় করা যায় না। তাই এসবক্ষেত্রে নিরাপদ সময়ের হিসাব করে জন্মনিয়ন্ত্রণ করা যায় না। অতএব, কারো যদি সন্তান নেয়ার পরিকল্পনা না থাকে তাহলে কনডম অথবা অন্যান্য জন্মনিরোধক পদ্ধতি ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ।

ভুল ধারণা : নারীর অর্গাজম রিপিটেড পেনিট্রশনে হয়-এ ধারণা বহুকাল ধরেই মানুষের মনে গেঁথে আছে।
সঠিক তথ্য : নারীর অর্গাজম বা যৌনতৃপ্তি বা সর্বাধিক যৌনানন্দ কিসে-ব্যক্তিবিশেষে এই যৌনানন্দের তারতম্য হতে পারে। কারো ক্ষেত্রে ক্লাইটোরিসকে (বহিঃজননাঙ্গের অংশ) উদ্দীপ্ত করা, কারো ক্ষেত্রে বারবার অথবা দীর্ঘ সময় ধরে পেনিট্রেট করা, কারো ক্ষেত্রে দুটোই একসঙ্গে পরিপূর্ণ যৌনানন্দ এনে দেয়। Essentials of Obstetrics and Gynaecology- তে Hacker Ges Moore প্রদত্ত তথ্যমতে শতকরা ৭৫ জনের অর্গাজম হয় ক্লাইটোরিসকে উদ্দীপ্ত বা স্টিম্যুলেশনের মাধ্যমে, আর শতকরা ২৫ জনের হয় বারবার পেনিট্রশনে। তাই সেক্স পার্টনার অথবা জীবনসঙ্গীর শরীরের সেনসিটিভ পার্টস সম্পর্কে জানা, বোঝা এবং গুরুত্ব দেয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ।

ভুল ধারণা : হস্তমৈথুন বা মাস্টারবেশন খারাপ। হস্তমৈথুন করলে অন্ধ হয়ে যায়। যারা হস্তমৈথুন করে তারা স্ত্রীসহবাসে গেলে যৌনাঙ্গ উত্থিত হয় না (ইরেকটাইল ডিজফাংশন হয়), যারা হস্তমৈথুন করে তাদের চেহারায় খারাপ ছাপ পড়ে ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে মানুষের মনে।
সঠিক তথ্য : এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ, সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যকর। মানুষের জননাঙ্গের সাথে চোখের কোনো সম্পর্ক নাই। তাই হস্তমৈথুনের সাথে চোখ নষ্ট হওয়ার কোনো সংযোগ নাই। বরং কোনো কোনো যৌন বিশেষজ্ঞ মনে করেন, হস্তমৈথুন করে কিছু স্বাস্থ্য সুরক্ষা পাওয়া যেতে পারে। যেমন মানসিক চাপমুক্ত হওয়া যায়, ঋতুস্রাবের সময় পেটব্যথা কমানো যায়, সর্বোপরি নিজের এবং সঙ্গীর শরীর সম্পর্কে জানা যায়। তাছাড়া, মাস্টারবেশন নারীদের ক্ষেত্রে দ্রুত এবং পরিপূর্ণ যৌনতৃপ্তি এনে দেয়। হস্তমৈথুনের ফলে ইরেকটাইল ডিজফাংশন হয়-এ ব্যাপারে সেক্স থেরাপিস্ট টিশা মরগ্যান বলেন, হস্তমৈথুনের সময় একজন পুরুষ তার পেনিসকে কয়েক মিনিট ধরে উদ্দীপ্ত করে ইজাক্যুলেশন হওয়া পর্যন্ত। এতে করে ঐ ব্যক্তি সেই কয়েক মিনিটের সাথে কন্ডিশন্ড হয়ে যায়। অর্থাৎ যখন সে সঙ্গীনির সংস্পর্শে আসে তখন ঐ কয়েক মিনিট পরই তার ইজাক্যুলেশন হয়ে যায়, আর তার সঙ্গীনি হয়ত অতৃপ্তই থেকে যায়। এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে তিনি বলেন, সেল্ফ মাস্টারবেশন এবং ইন্টারকোর্স উভয়ক্ষেত্রেই ইজাক্যুলেশন হওয়ার পর ও কাক্সিক্ষত সময় পর্যন্ত পেনিসকে স্টিম্যুলেট করে যেতে হবে। তবে মাস্টারবেশন যদি নেশা বা অ্যাডিকশনের পর্যায়ে পড়ে, তাহলে অন্যান্য অ্যাডিকশনের মতোই এটি ক্ষতিকর। আর যদি কারো হার্পিস (Herpes) থাকে তাহলে সেল্ফ মাস্টারবেশন বা মিউচুয়াল মাস্টারবেশন উভয়টিই নিজের এবং অন্যের হারপিস সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

ভুল ধারণা : সেক্স করলে অ্যাথলেটিক পারফর্মেন্স কমে যায়।
সঠিক তথ্য : সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, স্পোর্টস কম্পিটিশনের আগের দিন সেক্স করলে পারফর্মেন্স কমে যায় না। বরং কম্পিটিশনের আগের রাতে যদি পারফর্মার অতিরিক্ত টেন্সড থাকে, অস্থির থাকে, তখন একটি পরিপূর্ণ সেক্স তাকে রিল্যাক্স করতে পারে, রাতে ভালো ঘুম নিয়ে আসতে পারে-যা পরবর্তী দিনে তার স্ট্যামিনা বাড়াতে এবং ভালো পারফর্ম করতে সহায়তা করে। আবার ব্যক্তিভেদে তা নাও হতে পারে। তাই ব্যক্তির নিজেকেই এ ব্যাপার বুঝতে হবে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ভুল ধারণা : মাদক নিলে ভালো সেক্স করা যায়।
সঠিক তথ্য : মাদক গ্রহণের শুরুর দিকে এ ধারণা কিছুটা সঠিক মনে হলেও কিছু কিছু মাদক দীর্ঘদিন ধরে গ্রহণ করলে যৌনইচ্ছা কমে যায়, কিছু মাদকের ক্ষেত্রে ইরেকটাইল ডিজফাংশন হয় আবার কিছু মাদকের কারণে বিলম্বিত বীর্যপাত হয়।

ভুল ধারণা : সেক্স সবসময় পুরুষকেই শুরু করতে হবে।
সঠিক তথ্য : নারী বা পুরুষ যে কেউই শুরু করতে পারে। তবে উভয়কেই পুরো সময়টা জুড়ে সক্রিয় থাকতে হবে, পরস্পরকে সুখী করার, নিজে সুখ পাওয়ার দায়িত্ব নিতে হবে, সচেতন হতে হবে, বিজ্ঞানসম্মত এবং স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিকে বেছে নিতে হবে।

ভুল ধারণা : কনডম ব্যবহার মানেই নিরাপদ সেক্স।
সঠিক তথ্য : এটি ঠিক যে, কনডম ব্যবহার করলে গর্ভধারণ হয় না। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ইন্টারকোর্সের সময় কনডম ফেটে গেলে অনেক নারীই গর্ভবতী হন, তাই কনডম সঠিকভাবে পরতে শিখতে হবে, ফেলার সময় পরীক্ষা করে ফেলতে হবে-যাতে অপ্রত্যাশিত গর্ভধারণ প্রতিরোধ করা যায়।

ভুল ধারণা : পুরুষাঙ্গ যত দীর্ঘ হয় তত ভালো সেক্স পারফর্ম করা যায়।
সঠিক ধারণা : দৈর্ঘ্য নয়, কীভাবে এবং কতটুকু পারফর্ম করা যায়-তা গুরুত্বপূর্ণ।

ভুল ধারণা : বীর্যপাতের পূর্বে পুরুষাঙ্গ বের করলে যৌনবাহিত রোগ হয় না।
সঠিক তথ্য : উত্তেজিত অবস্থায় নারী এবং পুরুষ উভয়ের জননাঙ্গ থেকে কিছু তরল পদার্থ বের হয়, যেখানে যৌনবাহিত বিভিন্ন রোগের জীবাণু থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র বীর্যপাতের আগে জননাঙ্গ সরিয়ে ফেলাই একমাত্র নিরাপদ পদ্ধতি নয়। সাথে কনডম ব্যবহার করতে হবে, নারী এবং পুরুষ যৌনসঙ্গী উভয়কে একসঙ্গে যৌনবাহিত রোগের চিকিৎসা নিতে হবে।

যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে এ ধরনের ভুল ধারণা, ভুল সংস্কারের কারণে কাঙ্ক্ষিত যৌনক্রিয়া, যৌনতৃপ্তি ইত্যাদি ব্যাহত হয়, কিছু মানসিক সমস্যা, কিছু মানসিক রোগ হয়, কিছু আবেগীয় সমস্যা তৈরি হয়-যা আবার প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে নারী-পুরুষের যৌনসম্পর্ককে প্রভাবিত করে, কারো কারো যৌনইচ্ছাও কমে যায়। তাই যৌনস্বাস্থ্য বিষয়ে জানতে হবে, সচেতন হতে হবে। ভুল ধারণা থেকে বের হয়ে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি মেনে চলতে হবে।

সূত্র: মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত।